সৌরবিদ্যুতের আলোয় আলোকিত সেন্টমার্টিন

দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ দ্বীপ সেন্টমার্টিন। নৈসর্গিক এ দ্বীপটি বঙ্গোপসাগরের মধ্যে দেশের সর্বদক্ষিণের টেকনাফে অবস্থিত। দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন অঞ্চল হওয়ায় এ দ্বীপে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা একেবারেই কম। দেশের অন্যতম পর্যটনপ্রিয় স্থান হওয়ার পরও খুব সামান্যই উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে এ দ্বীপজুড়ে।

বহুযুগ পর আলোকিত সেন্টমার্টিনের অন্যতম সমস্যা ছিল বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা। কেরোসিনের কুপিবাতি ও জেনারেটরই ছিল একমাত্র ভরসা। এরপরও রাত ১১টার পর জেনারেটর বন্ধ হলে পুরো জনপদটি পরিণত হতো ভুতুড়ে দ্বীপে। স্থানীয় লোকজন এই পরিস্থিতিতে অভ্যস্ত থাকলেও বিড়ম্বনার শিকার হতো দ্বীপে বেড়াতে আসা পর্যটকেরা। দ্বীপের নিস্তব্ধতা ম্লান করা জেনারেটরের তীব্র আওয়াজ ছিল বিরক্তির অন্যতম কারণ। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় দ্বীপে একটি সৌরবিদ্যুৎ মিনি গ্রিড প্ল্যান্ট স্থাপনের ফলে। দ্বীপজুড়ে এখন আলো-ঝলমলে পরিবেশ। দ্বীপের মানুষ ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-সুবিধা পাচ্ছে। পর্যটকেরাও আনন্দিত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-সুবিধা পেয়ে।

আলোকিত সেন্টমার্টিনে হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ ও আবহাওয়া কার্যালয়সংলগ্ন এলাকার ৪ দশমিক ৫ বিঘা জমিতে এ সৌরবিদ্যুতের প্রকল্প স্থাপিত হয়েছে। এর ক্ষমতা ২ লাখ ৫০ হাজার ওয়াট। ৪৬৫টি বৈদ্যুতিক খুঁটি দিয়ে দ্বীপে ১৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন স্থাপন করা হয়েছে। এ প্রকল্পে খরচ হয়েছে ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) অর্থায়নে এক্সিলন বাংলাদেশ লিমিটেড ও এসকিউব টেকনোলজিস লিমিটেড ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে এ সৌর প্রকল্পটিতে।

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের আগে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় পুরো দ্বীপে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুতের সুবিধা পেয়েছিলেন এখানকার বাসিন্দারা। এই সুবিধা মিলত সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত। এই সৌর প্রকল্পটি দ্বীপে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দূর হয়েছে দ্বীপের মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যা। দ্বীপের মানুষ কখনো কল্পনাও করেনি একদিন এসি চলবে; ঘুরবে বৈদ্যুতিক পাখা; পান করা যাবে ফ্রিজে রাখা কোমল পানীয়। আলোকিত সেন্টমার্টিন জেটির দুপাশে রকমারি দোকানপাট। এসব দোকানে জ্বলছে বিদ্যুতের বাতি। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-সেবার কারণে পর্যটকেরা এখন এখানে রাত যাপনে উৎসাহ বোধ করছেন। হোটেল ব্যবসায়ীদের জন্য এটা হয়েছে শাপেবর। আগে কেরোসিনের কুপিবাতি জ্বালিয়ে লেখাপড়া করত ছাত্রছাত্রীরা। এখন সৌরবিদ্যুতের আলোয় গভীর রাত পর্যন্ত লেখাপড়া করতে পারছে তারা।

শুরুতে মোট ৫৪৮ জন গ্রাহককে বিদ্যুতায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এ সৌরবিদ্যুতের মিনি গ্রিড প্রকল্পটির নকশা করা হয়। খোলা জায়গায় সারি সারি করে বসানো হয়েছে ৯২৫টি সৌর প্যানেল (প্রতিটি ২৭০ ওয়াট করে)। এ জন্য একটি সাবস্টেশনও তৈরি করা হয়। এসব সোলার প্যানেল থেকে দৈনিক প্রায় ১০০০ ইউনিট ব্যবহারের উপযোগী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। গ্রাহক তালিকায় রয়েছে ৩৩৬টি আবাসিক ঘরবাড়ি, ২২টি আবাসিক হোটেল-রিসোর্ট, ১৫৭টি দোকান ও খাবারের হোটেল, ১০টি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ১৫টি ইজিবাইক চার্জিং, ৬টি সেচ পাম্প, ১টি বরফকলসহ আরও রয়েছে ১টি ওয়ার্কশপ।

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৫তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১

কাজী গোলাম মোর্শেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top