আমরা সব সময় আমাদের শহরের পরিবেশ নিয়ে কথা বলি। আমি আমার লেখার মধ্যে শহরের সবুজ প্রাকৃতিক পরিবেশ, স্থাপত্য, নগরায়ণ, মানুষজন, তাদের জীবনযাত্রা- এগুলোকে তুলে আনতে চাই। কারণ, একটি সবুজ সুন্দর স্বাস্থ্যসম্মত নগরী প্রতিটি নাগরিকের আশা-ভরসার জায়গা। তা ছাড়া বর্তমানে এই করোনা-পরবর্তী সময়ে আমাদের নগরগুলো এবং এর বিন্যাস নিয়েও রয়েছে চিন্তাভাবনা। কারণ, সে চিন্তাগুলো নাগরিক জীবনকে ভবিষ্যতে কীভাবে সুরক্ষিত করবে, সেসব বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আমরা আমাদের শহর নিয়ে, শহরের সবুজ পরিবেশ নিয়ে বিভিন্ন সময় আক্ষেপ প্রকাশ করি। কারণ, একটি সুন্দর নগরী গড়ে তোলার জন্য সবুজ পরিবেশ রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। যে শহর ঘিঞ্জি, রয়েছে খোলা জায়গার অভাব, নেই সবুজের সমারোহ, সেখানে ইকোলজিক্যালের বিন্যাস সঠিকভাবে না হওয়ায় দিন দিন শহরগুলোকে আমরা নষ্ট করে ফেলছি।
মেলবোর্ন শহরটিকে দেখছি রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে। এই শহরের যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে সেটি হচ্ছে কমিউনিটি বেজড ছোট ছোট সবুজ পার্ক। যেখানে তার আশপাশের বসবাসকারীরা দিনের বিভিন্ন সময় সবুজ পরিবেশে তাদের সময় কাটায়। বিশেষ করে ছোট ছেলেমেয়েরা। কারণ, সেই ছোট ছোট সবুজ পার্কে একদিকে যেমন রয়েছে বড়দের জন্য বসার জায়গা, ঠিক তেমনি রয়েছে ছোটদের জন্য খেলার বিভিন্ন সামগ্রী। এমন বলা যাবে না এই সবুজ পার্কগুলো আকারে খুব বড়। কিন্তু এমনভাবে বিন্যাস করা, যেখানে আশপাশে বসবাসকারীরা প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর প্রায় সব রকম উপাদান পেয়ে যায়। কারণ, ছোট পরিসরের সবুজ পরিসরগুলোর বিস্তার একটি শহরে কিংবা শহরের জীববৈচিত্র্যের একটি নতুন কাঠামো তৈরিতে সব সময় অবদান রাখে। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি থেকে শুরু করে খাবার তৈরি করে এমন গাছপালার সঙ্গে বন্য প্রাণীর একটি সম্পূরক অবস্থান তৈরি করে। যার সঙ্গে নাগরিক জীবনের মানবিক বিকাশ এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কযুক্ত, যা প্রজন্মের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে এবং এর মাধ্যমে নগরে বসবাসরত প্রতিটি নাগরিকের জীবনমান উন্নয়ন হয় সব ক্ষেত্রে, যাকে আমরা ইংরেজিতে বলে থাকি ‘Health & Wellbeing ’।
মেলবোর্ন শহরে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয়, যা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সেটি হচ্ছে রাস্তায় পাশে বাগানগুলো বা স্ট্রিট গার্ডেন, যেখানে নগরবাসীরা তাদের শহরে ব্যস্ততম জীবনের অনেক সুন্দর সময় কাটায়। এমনকি রাস্তার পাশে রয়েছে ছোট ছোট সবুজ চত্বর। সেই সবুজের চারপাশে রয়েছে ছোট ছোট খাওয়ার জায়গা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কৃত্রিম উপায়ে সবুজ ঘাস লাগিয়ে একটি চত্বর তৈরি করা হয়। সে চত্বরের ওপর একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর কিছু বড় প্ল্যান্টার বক্স (গাছ লাগানোর জায়গা) রাখা হয় এবং দুইটি প্ল্যান্টার বক্সের মধ্যবর্তী স্থানে কয়েকটি চেয়ার এবং ছোট টেবিল দিয়ে বসার কিংবা খাওয়ার জায়গা তৈরি করা হয়। সেখানে পাখি আছে, রংবেরঙের বিভিন্ন ফুল ফোটে, প্রজাপতি ওড়ে। আর সেই প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো শহরে বসবাসরত যেকোনো নাগরিকের উপভোগের বিষয় হয়ে ওঠে, যা তার মন-মানসিকতা এবং স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এমনকি তার কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
রাতের কথা চিন্তা করে সেই পার্কগুলোতে ছোট ছোট জলাশয় তৈরি করা হয়, যাকে পানির ফোয়ারা বললে ভুল হবে না। সেখানে সুসজ্জিত করা থাকে বিভিন্ন রকমের আলো। রাতের বেলায় সেই আলো পার্কের ও জলরাশির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তোলে। এমনকি সেই ফাউন্টেনগুলো থেকে জল পড়ার শব্দ পরিবেশকে আর মানুষের মনকে অনেক বেশি বিমোহিত করে। তবে যে বিষয়টি উল্লেখযোগ্য এখানকার নাগরিকেরা তাদের নিজ প্রয়োজনে এই জায়গাগুলো সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে। তা ছাড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাবিষয়ক সব ক্ষেত্রে কঠিন নিয়ম থাকায় কোনো নাগরিক যত্রতত্র আবর্জনা ফেলতে পারে না। এতে করে সামগ্রিক পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও সুখকর এবং সৌন্দর্যমন্ডিত। যেখানে বড় বড় বহুতলবিশিষ্ট আবাসন তৈরি হয়েছে, সেই আবাসনগুলোর চারপাশেও বসবাসকারীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে সবুজ পার্কের ব্যবস্থা রয়েছে। যেখানে বিভিন্ন প্রজাতির দেশি-বিদেশি গাছপালা রয়েছে। ঢালাওভাবে একদিকে চিন্তা করে এসব সবুজ পার্কগুলো গড়ে ওঠেনি। এখানকার বৃক্ষের বিন্যাসের ক্ষেত্রে চিন্তা করা হয়েছে ইকোলজিক্যাল সিস্টেমের বিষয়টি। সেই কারণে বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় বৃক্ষের সমারোহ রয়েছে এসব পার্কে। কিছু কিছু বৃক্ষ রয়েছে শুধু বিভিন্ন রঙের ফুলের জন্য। আবার কিছু কিছু বৃক্ষ রয়েছে যেখানে নাগরিকেরা খুব সহজেই ছায়াঘেরা একটি পরিবেশ পাবে। আর সব সময় সঠিক পর্যবেক্ষণ আর পরিচর্যার মাধ্যমে সবুজ ঘাস থেকে শুরু করে গাছপালার পর্যবেক্ষণ করা হয়। যার জন্য আলাদা আলাদা কমিউনিটি টিম কাজ করে দিনের বিভিন্ন সময়।
মেলবোর্ন শহরে প্রায় ৬০০ হেক্টর সবুজ ভূমি রয়েছে, যা শহরের আকারের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এই শহরকে স্বাস্থ্যবান্ধব, প্রাকৃতিক শহর হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য এই সবুজ ভূমির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু শহরটির জনসংখ্যা বাড়ছে, বর্তমান বছরগুলোতে এখানকার স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় সবুজ ভূমিকে আরও বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে সব ক্ষেত্রে। তা ছাড়া এই সবুজ ভূমি মেলবোর্ন শহরের হিট আইল্যান্ড ইফেক্টকে প্রশমিত করে শহরের তাপমাত্রাকে একদিকে যেমন বৃদ্ধি করতে রোধ করে, ঠিক তেমনি শহরের অবকাঠামো বিশেষ করে ড্রেনেজ সিস্টেম থেকে শুরু করে বায়ুদূষণের মাত্রা কমিয়ে রাখে। এই সবুজায়নগুলো অতিমাত্রায় শব্দ বিস্তারের প্রতিরোধক হিসেবেও কাজ করে। সব থেকে যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এই সবুজ ছোট পার্কগুলো থেকে নাগরিকেরা তৎক্ষণাৎ তাদের শারীরিক এবং মানসিক উন্নতি লাভ করে।
চলবে
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৫তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১