নতুন ড্যাপে পরিকল্পিত শহর

রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ)-এর আওতাধীন অঞ্চলকে আধুনিক ও বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে সংশোধিত বিশদ অঞ্চল বা নগর পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রণয়ন করেছে রাজউক। ২০১৬ থেকে ২০৩৫ সাল মেয়াদি ২০ বছরের জন্য প্রস্তাবিত নতুন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে উদ্যোগী প্রতিষ্ঠানটি। রাজউকভুক্ত এলাকাকে বাসযোগ্য, মানবিক ও টেকসই অঞ্চলে পরিণত করতে সংশোধিত এই ড্যাপে রয়েছে মহা কর্মপরিকল্পনা। এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে ড্যাপের প্রাথমিক খসড়া। খসড়া প্রকাশিত হওয়ার পর ড্যাপে প্রস্তাবিত নানা বিষয় নিয়ে দেশের পেশাজীবী মহলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। সবাই চায় একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য ড্যাপ প্রণয়নের মাধ্যমে আধুনিক, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব তিলোত্তমা নগর গড়তে।

ড্যাপ নিয়ে যত কথা

সংশোধিত ড্যাপ (২০১৬-২০৩৫) এর আগেও একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে রাজউকের আওতাভুক্ত ৫৯০ বর্গমাইল (১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার) এলাকার জন্য ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান (১৯৯৫-২০১৫) এবং আরবান এরিয়া প্ল্যান (১৯৯৫-২০০৯)-এর আলোকে ড্যাপ প্রণয়ন করা হয়। সর্বশেষ ২০১০ সালের ২২ জুন চূড়ান্ত ড্যাপ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। মেয়াদকাল ছিল ২০১০-২০১৫ সাল পর্যন্ত। কিন্তু প্রণীত ওই ড্যাপে দেখা দেয় নানা অসঙ্গতি। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এটি ছিল বাস্তবতাবিবর্জিত। যার পরিপ্রেক্ষিতে ড্যাপ সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে ২০১৫ সালে মাস্টারপ্ল্যান তথা ‘বিশদ অঞ্চল বা নগর পরিকল্পনা (২০১৬-২০৩৫) প্রণয়নের কাজ শুরু হয়। ড্যাপ প্রণয়নের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয় দুটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান শেলটেক প্রাইভেট লি. ও ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালট্যান্টস প্রা. লি.-কে। ২০১৭ সালে এটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দফায় দফায় বাড়ানো হয় সময়। জনমত জরিপ বা গণশুনানি প্রকল্পের আওতাধীন এলাকার সংসদ সদস্য, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র, পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, পরিবেশবিদ, এনজিও, সুশীল সমাজসহ সবার মতামত ও অংশগ্রহণে প্রণীত হচ্ছে ড্যাপ, দাবি রাজউকের। প্রকল্পের মেয়াদ কয়েক দফায় বৃদ্ধি করার পর এখন রয়েছে খসড়া প্রণয়ন পর্যায়ে। চলছে বিভিন্ন মহলের চূড়ান্ত মতামত গ্রহণের ভিত্তিতে শেষ পর্যায়ের সংশোধনী। এরপর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হবে গেজেট আকারে। 

রাজউক কর্তৃক প্রণয়নাধীন বিশদ অঞ্চল বা নগর পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার জন্য; বিবিএস (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো)-এর তথ্যমতে, ২০১১ অনুযায়ী জনসংখ্যা ১৫ দশমিক ৫১ মিলিয়ন এবং ২০৩৫ সাল প্রক্ষেপণ অনুযায়ী প্রক্ষেপিত জনসংখ্যা ২ কোটি ৬০ লাখ। সমগ্র রাজউক এলাকা তিনটি জেলায় (ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর), চারটি সিটি করপোরেশন এলাকা (ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ), পাঁচটি পৌরসভা (সাভার, তারাবো, কালীগঞ্জ, সোনারগাঁ ও কাঞ্চন) এবং ৬৯টি ইউনিয়ন পরিষদের সমন্বয়ে গঠিত। প্রকল্প এলাকাকে ৬টি স্বতন্ত্র প্রধান অঞ্চলে এবং ৭৫টি উপ-অঞ্চলে বিভক্ত করে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। পরিকল্পনা প্রণয়নে মোট পাঁচটি ধাপ অনুসরণ করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- 

সংশোধিত ড্যাপে (২০১৬-২০৩৫) গুরুত্বপূর্ণ যত প্রস্তাব

ঢাকাকে বাসযোগ্য, নাগরিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত করতে ড্যাপ প্রস্তাবে প্রতিটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এসেছে পরিবর্তন। নগরে বিদ্যমান সমস্যাগুলো নিরসনের জন্য নগর পুনঃউন্নয়ন, জনঘনত্ব জোনিং, জোনভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, স্থাপনা, সড়ক, নদী-খাল-জলাধার, পার্ক, খেলার মাঠসহ নানা বিষয়ে আনা হয়েছে নতুন প্রস্তাব। এসব প্রস্তাবের মধ্যে অন্যতম বিষয়সমূহ হচ্ছে- 

  • সংশোধিত ড্যাপে পুরোপুরি আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার চেয়ে আবাসিক-বাণিজ্যিক এলাকার মিশ্র ব্যবহার উৎসাহিত করা হয়েছে। ঢাকার কোন এলাকা আবাসিক, কোনটা বাণিজ্যিক, কোনটা মিশ্র আবার কোনটা বিশেষ বৈশিষ্ট্যযুক্ত হবে, এসব নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ঢাকাকে ১৩ ধরনের ‘ভূমি ব্যবহার জোন’-এ ভাগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পুরো মেট্রোপলিটন এলাকার প্রায় ৯৪ হাজার ৫৮ দশমিক ৪২ হেক্টর জমি নগর এলাকা হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মধ্যে আবাসিক এলাকা ১৯ হাজার ৪৫৭ দশমিক ৬৭ একর, মিশ্র ব্যবহার এলাকা (আবাসিক প্রধান) ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৩১ দশমিক ০৯ একর। মিশ্র ব্যবহার এলাকা (আবাসিক-বাণিজ্যিক) হিসেবে ১ হাজার ৭৭৮ দশমিক ৯৩ একর ব্যবহার করা যাবে।
  • এ ছাড়া বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে ১৪৩ দশমিক ৩৩ একর ব্যবহার করা হবে। মিশ্র ব্যবহার এলাকা (বাণিজ্যিক প্রধান) ৪ হাজার ৯৩৩ দশমিক ৯১ একর, মিশ্র ব্যবহার এলাকা (শিল্পপ্রধান) ২৯ হাজার ৭৩৭ দশমিক ১১ একর, প্রাতিষ্ঠানিক এলাকা ১৩ হাজার ৫৪২ দশমিক ৬৫ একর, ভারী শিল্প এলাকা ৬ হাজার ৪৬৫ দশমিক ৪১ একর ব্যবহার করা হবে। পরিবহন ও যোগাযোগ (বিদ্যমান) এলাকা হিসেবে ১৯ হাজার ৮২৩ দশমিক ৫০ একর, পরিবহন ও যোগাযোগ (প্রস্তাবিত) হিসেবে ৭ হাজার ৬৬৮ দশমিক ৯২ একর ব্যবহার করা যাবে। 
  • কৃষি এলাকা হিসেবে ১ লাখ ১১ হাজার ২০৩ দশমিক ৬৯ একর, জলাশয় ২৯ হাজার ৭০৩ দশমিক ৭৭ একর, বনাঞ্চল ৫ হাজার ৩৪০ দশমিক ৯২ একর এবং উন্মুক্ত স্থান হিসেবে ৩ হাজার ৯৩৩ দশমিক ৩২ একর। সব মিলিয়ে এই ১৩ ধরনের কাজে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ২৬৪ দশমিক ২২ একর ভূমি ব্যবহার হবে।

এ ছাড়া ভূমি ব্যবহারে আরও ৮টি নিয়ামককে প্রাধান্য দেওয়া হবে। এগুলো হচ্ছে-

  • বন্যা ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা
  • মুখ্য জনস্রোত এলাকা
  • সাধারণ জনস্রোত এলাকা
  • সাধারণ বন্যা অববাহিকা
  • দুর্যোগসংক্রান্ত
  • ভূতাত্তি¡ক ও ভূ-কম্পনসংক্রান্ত
  • বিশেষ ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত এবং
  • গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
  • মিশ্র ব্যবহার এলাকায় বড় ধরনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহার যেমন পরিবেশদূষণকারী এবং ভারী শিল্পসমূহ ও সার্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ এবং জনমানুষের নিরাপত্তা বিঘœকারী সব কর্মকান্ড মিশ্র ব্যবহার এলাকায় নিষিদ্ধ করে তার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা বাসযোগ্য জোনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
  • অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণে থাকছে নিষেধাজ্ঞা। এখন থেকে ভূতাত্তি¡ক ও পরিবেশকে প্রাধান্য দিয়েই করতে হবে নতুন ভবন নির্মাণ।
  • রাজধানীর ৯৯ শতাংশের বেশি আর আবাসিক ভবনের মধ্যে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ ভবন আটতলার নিচে। ড্যাপে আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে এলাকাভেদে ছয় থেকে আটতলা উচ্চতা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। রাস্তার প্রশস্ততা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা বিবেচনায় বহুতল ভবন নির্মাণে কিছুটা শিথিলতা থাকবে। বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের জন্য কোনো ধরনের বিধিনিষেধ থাকবে না। 
  • প্রতিটি এলাকার রাস্তা সর্বনিম্ন আট ফুট প্রশস্ত করা হবে। এর কম হলে দোতলার বেশি উচ্চতাসম্পন্ন ভবন তৈরির অনুমতি দেওয়া হবে না। 
  • প্রতিবেশ-পরিবেশ রক্ষায় সংশোধিত ড্যাপে বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলে রাস্তা তৈরির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। প্রয়োজনে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা ফ্লাইওভার তৈরি করে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করতে বলা হয়েছে। ড্যাপে বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলে বিদ্যমান রাস্তা অপসারণের কথাও বলা হয়েছে। বিশেষ করে আশুলিয়া ও সাভারের ধউর পর্যন্ত বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলের ৩ কিলোমিটার সড়ক অপসারণ করে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করতে বলা হয়েছে।
  • যানজট নিরসনে ২ হাজার ৭৪৮ কিলোমিটার নতুন রাস্তা তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে।
  • ড্যাপ এলাকায় নতুন ৫৬৬ কিলোমিটার নতুন নৌপথ তৈরি করা হবে এবং খালের পানিপ্রবাহ সচল রাখতে এবং নৌযান চলাচলের রাস্তা উন্মুক্ত রাখতে বক্স কালভার্ট রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
  • ড্যাপের আওতায় মহানগরীর আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প, কৃষি ও বন্যাপ্রবাহ এলাকা, রাস্তাঘাট, উন্মুক্ত স্থান, খেলার মাঠ, পার্ক, প্রাকৃতিক জলাধার সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ পরিকল্পনায় ঢাকা শহরকে জলাবদ্ধতা ও যানজটমুক্ত করতে ১৬টি আবাসন প্রকল্প ও স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার এবং ২ হাজার ৭২৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন না দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
  • প্রতিটি ওয়ার্ডে তিন থেকে চারটি এবং ড্যাপ এলাকায় মোট ৬২৭টি স্থানে সরকারি স্কুল স্থাপনের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। প্রতিটি স্কুলে খেলার মাঠ রাখার বিষয়ে বলা হয়েছে। সব কটি ওয়ার্ডে ৫০ শয্যার হাসপাতাল রাখার বিষয়েও বলা হয়েছে। বিনোদনের জন্য ৫টি আঞ্চলিক পার্ক, ৪৯টি জল পার্ক, ৫টি ইকো পার্ক ও ৮টি ছোট আকারের পার্ক তৈরির কথা বলা হয়েছে।
  • বালু নদের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত না করে এক্সপ্রেসওয়ে বা ফ্লাইওভার নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলের জমির মালিকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভের ওপর নির্ভর করে ড্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে। 
  • ঢাকার পুকুর উদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
  • বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় নদী, খাল ও লেক সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের জলাশয় যেমন, নদী, খাল, লেক ইত্যাদিকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে ব্লু নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করার সুপারিশ করা হয়েছে। সড়কপথের পাশাপাশি উপেক্ষিত জলপথকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৫৬৬ কিমি নৌ-চলাচলের উপযোগী নৌপথ উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব করা হয়েছে।
  • নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের আবাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় প্রস্তাবিত উন্নয়ন স্বত্ব বিনিময়ের কৌশল প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সুলভ আবাসনের সংস্থান রাখার বিনিময়ে উন্নয়ন প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
  • শহরের আবাসন চাহিদা পূরণে প্লটভিত্তিক আবাসনের বদলে বøকভিত্তিক আবাসন পদ্ধতি, উল্লম্ব অর্থাৎ উচ্চতা সম্প্রসারণে উৎসাহিত করা, যাতে যত্রতত্র নগরাঞ্চল সম্প্রসারণ কমিয়ে আনা এবং শহরের নিচু ও কৃষিজমি সুরক্ষিত হয়।
  • পরিকল্পনায় সড়কপথ, নৌপথ ও রেলপথকে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। সর্বমোট ২ হাজার ৭৪৯ কিলোমিটার সড়কপথের প্রস্তাব করা হয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা কার্যকর, নির্বিঘœ ও যানজটমুক্ত করার জন্য ঢাকার সঙ্গে আশপাশের শহরকে যুক্ত করতে পাঁচটি মেট্রো, দুটি বিআরটি, ছয়টি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের সমান্তরালে দুটি প্রধান সড়ক, দুটি রিংরোড, রিংরোডের সঙ্গে সংযুক্ত রেডিয়াল রোড এবং বৃত্তাকার নৌপথের প্রস্তাব করা হয়েছে। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনা এবং যানজট নিরসনে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজের মাধ্যমে বাস পরিচালনা পদ্ধতি প্রবর্তন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
  • ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়ন অর্থাৎ গণপরিবহন কিংবা ট্রানজিট স্টেশনকে কেন্দ্র করে মিশ্র উন্নয়ন (আবাসিক, বাণিজ্যিক কিংবা গণপরিসর তৈরি করে ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার) নিশ্চিত করা।
  • পথচারী ও অযান্ত্রিক যান চলাচলের বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে থাকছে সাইকেলের জন্য আলাদা লেন করার সুপারিশ।
  • যানজট নিরসনে স্কুলগুলোকেও বিকেন্দ্রীকরণ করার কথা বলা হয়েছে।

ড্যাপ (২০১৬-২০৩৫) নিয়ে বিশেষজ্ঞ ভাবনা 

প্রায় সাড়ে ছয় বছর আলোচনা-পর্যালোচনার পর সংশোধিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) তৈরি করে রাজউক। রাজউক প্রণীত এই ড্যাপের প্রস্তাবকে সাধুবাদ জানালেও তাতে নানা অসঙ্গতি দেখছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। বেশ কিছু বিষয় সুনির্দিষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন দেশের প্রথিতযশা নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, প্রকৌশলী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি), বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বেলাসহ দেশের বিশিষ্ট নাগরিকেরা। বিভিন্ন আলোচনা, সভা, সেমিনার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা নিজেদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। এসব পর্যবেক্ষণের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অংশসমূহ তুলে ধরা হলো- 

  • প্রস্তাবিত ‘বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (২০১৬-২০৩৫)’ এর পূর্বসূরি ‘কাঠামোগত পরিকল্পনা’ চূড়ান্ত করার আগেই প্রণয়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা পরিকল্পনা প্রণয়নের মৌলিক মানদন্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩-এর ৭৩ ধারার অধীনে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রথমে সরকারের বিবেচনাধীন কাঠামোগত পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ ও জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে চূড়ান্ত করার পর যথাযথ ধারাবাহিকতায় বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজউকের আওতাধীন এলাকার জন্য ড্যাপ চূড়ান্তকরণ করাই প্রত্যাশিত। 
  • ড্যাপ প্রণয়নের আইনগত ভিত্তি ১৯৫৩ সালের নগর উন্নয়ন আইন। এত পুরোনো আইন দিয়ে ঢাকার উন্নয়ন কতটা বাস্তবসম্মত তা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। 
  • প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণে রয়েছে ঘাটতি।
  • প্রস্তাবিত ড্যাপে ঢাকা শহরে আবাসিক এলাকার পরিমাণ মাত্র পাঁচ শতাংশ। বাকি আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা মিশ্র এলাকা হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সরকারি বা বেসরকারি আবাসিক এলাকা বাদে পুরো ঢাকা শহর মিশ্র হবার শঙ্কা রয়েছে। আবার মিশ্র হিসেবে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক ব্যবহার যুক্তিসঙ্গত হবে, সে বিষয়টি নিয়েও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে পুরান ঢাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ বিধ্বংসী রাসায়নিক গুদাম, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কারখানা স্থানান্তর করে উপযুক্ত শিল্প এলাকায় নেওয়া প্রয়োজন। শিল্প এলাকার বিষয় ড্যাপে সংযোজন করা জরুরি।
  • ড্যাপ পরিকল্পনায় রাজউকের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা কী থাকবে, তারও একটা সুনির্দিষ্ট কাঠামো থাকা উচিত।
  • মিশ্র ব্যবহার শর্তসাপেক্ষে প্রয়োগ করা যাবে বলা হলেও শর্তগুলো কোথাও উল্লেখ নেই। মিশ্র ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে কী না। অন্যথায় ঢাকা শহর অবাসযোগ্য হবে।
  • ঢাকা ওয়াসার ওয়াটার মাস্টারপ্ল্যানের বাস্তব প্রতিফলন ড্যাপে প্রতিফলিত হয়নি।
  • রাস্তায় কী পরিমাণ ট্রাফিক ভলিউম, সেই ভলিউমের ভিত্তিতে কোথায় স্টপেজ হবে, রাস্তার চওড়া কেমন হবে, সেটাও পরিকল্পনায় বলা হয়নি। ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্টের জন্য যেসব জোনের কথা বলা হয়েছে, সেখানে কীভাবে আইন প্রয়োগ করা হবে, তারও কোনো উল্লেখ নেই এ পরিকল্পনায়। নতুন স্টেশনগুলো তৈরি হলে সেটার জন্য যে পরিমাণ যানবাহনের চাহিদা তৈরি হবে, তা পূরণ করার জন্য করণীয় কী, সে সম্পর্কিত কোনো দিকনির্দেশনা এ পরিকল্পনায় বলা হয়নি।
  • ঢাকা শহরে বাসস্থানের চাহিদার পরিমাণ কত তারও কোনো উল্লেখ ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় নেই। নিম্ন আয়ের মানুষের বাসস্থানের চাহিদা পূরণ করতে কতগুলো আবাসন তৈরি করতে হবে এবং কোন এলাকায় তারা বসবাস করবে, তা উল্লেখ থাকা জরুরি ছিল। নগরের প্রায় ৪৪ শতাংশ নিম্নবিত্তের আবাসনের ব্যাপারে সুনির্ধারিত প্রস্তাব নেই ড্যাপে।
  • ১০ লাখ বাসিন্দার জন্য পূর্বাচলে যে পরিকল্পিত শহরের পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেখানে কর্মসংস্থানের কতটা সুযোগ রয়েছে এবং নাগরিক সুবিধাগুলো কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে প্রস্তাবে রয়েছে দিকনির্দেশনার অভাব।
  • জমির কোনো কোনো দাগ নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে সিএস (ব্রিটিশ আমলে করা ক্যাডাস্ট্রেল সার্ভে) খতিয়ান অনুযায়ী। আবার কোনো কোনো দাগ নম্বর দেওয়া হয়েছে আরএস (পাকিস্তান আমলে করা রিভিশনাল সার্ভে) অনুযায়ী। এতে জমির প্রকৃত মালিকানা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
  • বর্তমানের খসড়ায় জিআইএস ডেটাবেইস ও ওয়ার্কিং পেপার সংযুক্ত না করায় ভূমি ব্যবহারে বিশেষত জলাশয়, উন্মুক্ত স্থান ও কৃষিক্ষেত্রে তুলনামূলক চিত্র কিংবা প্রস্তাবগুলোর যৌক্তিকতার অভাব রয়েছে।
  • ‘মুখ্য জলস্রোত’ ছাড়া ‘সাধারণ জলেস্রোত’ ও ‘সাধারণ প্লাবনভূমি’তে শর্তসাপেক্ষে ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন ও স্থাপনা অনুমোদনের যে প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তা আইন-আদালতের আদেশ ও জনস্বার্থপরিপন্থী। এমন প্রস্তাব গৃহীত হলে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও ভূগর্ভস্থ পানি স্তরের আশঙ্কাজনক হ্রাসের ঝুঁকিতে থাকা এই নগরী তার ৭০ শতাংশ প্রাকৃতিক জলাশয় হারাবে এবং প্লাবনভূমি সংকুচিত হয়ে ৬৬ শতাংশের পরিবর্তে ১৭ শতাংশে নেমে আসবে। 
  • প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় আবাসিক এলাকা, কৃষি অঞ্চল, বনাঞ্চল, ৪ ধরনের মিশ্র ব্যবহার এলাকা, উন্মুক্ত স্থান, প্রাতিষ্ঠানিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা এবং ভারী ও দূষণকারী শিল্প এলাকার প্রস্তাব থাকলেও কোথাও জলাভূমি বা প্লাবনভূমির উল্লেখ নেই। উপরন্তু, হালের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় জলাভূমি বা প্লাবনভূমিকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত এলাকা (ওভারলে জোন) হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা কিনা আবার কৃষি অঞ্চলের অন্তর্গত। 
  • খাল উদ্ধারের মাধ্যমে ‘ব্লু-নেটওয়ার্ক’ প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট প্রকল্প প্রস্তাব বা কৌশলের কোনো উল্লেখ প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় নেই। ইতিমধ্যে নদী টাস্কফোর্স কর্তৃক চিহ্নিত ৬৫টি খালকেও (বর্তমানে ২৬টিতে এসে ঠেকেছে) উদ্ধার করে জলাঞ্চল সংরক্ষণে কঠোর অনুশাসন প্রস্তাবের পরিবর্তে ‘সিএস এবং আরএস মৌজা খালসংলগ্ন প্লটে ইমারত নির্মাণের বিধান’ অনুযায়ী বর্তমানের ‘অবৈধ দখলে শীর্ণকায়’ খালকে যোগাযোগের মাধ্যম ধরে সরাসরি সড়ক না থাকা প্লটগুলোতে ভবন নির্মাণ অনুমোদন দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
  • বাস বা ট্রাক টার্মিনালের অনুপস্থিতি, পুলিশের জব্দ করা পরিবহনগুলোর জন্য কোনো ডাম্পিং স্টেশন নেই। এ বিষয়ে ড্যাপে নেই কোনো দিকনির্দেশনা।
  • ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮-এর আবাসিক ভবনের পার্কিংয়ের বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে এতে।

গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর ড্যাপ বাস্তবায়ন

ঢাকাকে বসবাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়, তার নেপথ্যেই থাকে ড্যাপ। এজন্য ড্যাপ হওয়া চাই বিজ্ঞানসম্মত, আধুনিক, বাস্তবসম্মত ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। নিঃসন্দেহে এবারের ড্যাপ বিগত যেকোনো পরিকল্পনা থেকে অধিক কার্যকর, তবে একে আরও ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে। তবে এ দেশে অনেক বিষয় আছে, যেগুলো প্রস্তাব বা নীতিমালাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে আধুনিক ঢাকা পেতে শুধু প্রস্তাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বাস্তবায়নও করতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিদ্যমান ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন না করে নতুন ড্যাপ চূড়ান্ত করা হলে সেটি বাসযোগ্য ও পরিকল্পিত নগর উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হবে; উপরন্তু নতুন করে আরও অনেক সমস্যার সূত্রপাত ঘটাবে, যা মোটেই কাম্য নয়। তা ছাড়া একটি মানবিক ও নান্দনিক ঢাকা গড়তে ড্যাপ প্রণয়নে শুধু নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি কিংবা প্রকৌশলীর সম্পৃক্ততা নয়, বরং ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক, শিল্পী, ব্যবসায়ী, আবাসন নির্মাতা, পরিবহন ও নির্মাণশ্রমিক, পথচারী, শিশু-কিশোরসহ সাধারণ মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।  গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর ড্যাপ বাস্তবায়নে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে সেগুলো হচ্ছে- 

  • সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে উন্নয়ন হচ্ছে অপরিকল্পিত ও ক্ষণস্থায়ী। এ জন্য প্রতিটি কাজ সমন্বিতভাবে করতে হবে।
  • অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে একটা শহরের বাসযোগ্যতা নির্নীত হবে না, বাসযোগ্য শহর গড়তে হলে অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক সংশোধন করতে হবে এবং অতীতে পরিকল্পনাগুলো কেন বাস্তবায়ন করা হয়নি, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
  • দীর্ঘ মেয়াদে ভূমি ব্যবহার, পরিবহন ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পরিকল্পনার মধ্যে এনে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
  • ভূমির সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত বিন্যাস নিশ্চিত করার মাধ্যমে টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং প্রাকৃতিক জলাশয়, খাল, পুকুর সংরক্ষণ করতে হবে।
  • বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে জলাধার রক্ষা, দখলকৃত নদী, খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার এবং জলাশয় আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে।
  • আবাসন সমস্যা নিরসনে ও সবার জন্য আবাসন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ কতটুকু জমি পাবে এবং কোথায় পাবে, সেটাও উল্লেখ করতে হবে। এ ছাড়া কত জনসংখ্যার জন্য কতটুকু খোলা জায়গা, খেলার মাঠ বরাদ্দ রয়েছে সেটার বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • ঢাকা শহরকে বাঁচাতে জনঘনত্ব কমানো জরুরি। এ জন্য বিকেন্দ্রীকরণে যাবতীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। 
  • একটা শহরের অন্তত ২৫ শতাংশ সড়ক প্রয়োজন সঠিক যোগাযোগব্যবস্থার জন্য। অথচ রাজধানীতে রয়েছে ৫ শতাংশের কিছু বেশি। সড়ক যোগাযোগ বাড়াতে ড্যাপে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব প্রয়োজন। 
  • ঢাকার নদী, খাল, জলাধার ও উন্মুক্ত স্থানকে অবৈধ দখলমুক্ত করতে কার্যকর প্রস্তাব প্রণয়ন অতীব জরুরি।

পরিশেষে

রাজধানী ঢাকাকে আধুনিক ও বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রণয়ন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো পরিকল্পনা শতভাগ নির্ভুল না হওয়াটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে রাজউকের খসড়া ড্যাপও ব্যতিক্রম নয়। খসড়ায় যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে, পেশাজীবীদের মতামতের ভিত্তিতে তা সংশোধন করে ঢাকাকে বসবাসযোগ্য আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সবারই প্রত্যাশা। আশার কথা, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বিশেষজ্ঞদের সমালোচনা ও পরামর্শ গ্রহণের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। সবার অংশগ্রহণ ও মতামতের ভিত্তিতেই প্রণীত হতে পারে একটি গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা, যার ভিত্তিতেই গড়ে উঠতে পারে একটি চমৎকার বাসযোগ্য নগর ঢাকা। 
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৫তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১

মঈন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top