কোভিড-১৯ ও বৈশ্বিক আবহাওয়া

ডিসেম্বর ২০১৯, কোভিড-১৯ প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হয় চীনে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের সর্বত্র। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের ভয়াবহ থাবায় পৃথিবীর উন্নত ও অনুন্নত সব দেশের জনজীবন আজ চরমভাবে বিঘ্ন্নিত; মরেছে ছয় লক্ষাধিক মানুষ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রায় সব দেশে বিশেষত স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করতে হয়েছে; সব দেশ গ্রহণ করেছে লকডাউন পলিসি। এ ছাড়া কোভিড-১৯-এর কারণে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ, সমাবেশ এবং সামাজিক অনুষ্ঠান বাতিল করে আরোপ করা হয়েছে বিধিনিষেধ। অনিবার্যভাবে অর্থনীতি, সামাজিক ও পারিবারিক বিষয়সমূহ অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এইটাই বর্তমান পৃথিবীর বাস্তবতা কোভিড-১৯ নিয়ে। কিন্তু একজন গবেষক হিসেবে বিষয়টা অন্যভাবে চিন্তা করতে চাই। কোভিড-১৯ সঙ্গে আবহাওয়া, জলবায়ু, বৈশ্বিক তাপমাত্রা, বায়ুদূষণের সম্পর্ক আছে কি না, থাকলে কী রকম, এই বিষয়টা তুলে ধরতে চাই।

সমগ্র পৃথিবী যখন কোভিড-১৯-এর মহামারিতে আক্রান্ত তখন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলছেন ভিন্ন কথা। যেহেতু মহামারির ফলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, মানুষ ঘরে বসে সময় কাটাচ্ছে। তখন বায়ুদূষণের মাত্রা অকল্পনীয়ভাবে কমে এসেছে। সম্প্রতি এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পৃথিবী ব্যস্ততম সব শহরের বায়ুদূষণের মাত্রা কমেছে উল্লেখযোগ্যহারে আগের বছরের তুলনায়।

অন্যদিকে সমুদ্র বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রের বাস্তুসংস্থার অবস্থা যাচ্ছে আরও ভালোর দিকে। বিভিন্ন সমুদ্র সৈকতের চিত্র বলছে সমুদ্রের প্রাণিকুল নির্ভীকভাবে ঘুরে ফিরছে আর স্বচ্ছ থাকছে সামুদ্রিক পানি। সমুদ্রের এই অবস্থাকে একটি অনুকূল চিত্র হিসেবে দেখছেন সমুদ্র বিজ্ঞানীরা।

সারকথা, কোভিড-১৯ যেন আমাদের পরিবেশ, আবহাওয়া ও জলবায়ুকে ফিরিয়ে দিচ্ছে, যা মানুষের জীবনযাত্রার অনুকূলে। পরিবেশের এই পরিবর্তন আমাদের নবায়নযোগ্য শক্তিকে করছে আরও প্রাণবন্ত। যেখানে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং সমুদ্র (পানি) শক্তি আরও প্রকট ভূমিকা রাখবে ভবিষ্যতে। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সমস্যা বৈশ্বিক তাপমাত্রার ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি। কিন্তু কোভিড-১৯-এর প্রভাব বৈশ্বিক তাপমাত্রার ওপর পজেটিভ প্রভাব ফেলবে বলে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী।

সমগ্র পৃথিবী যখন বায়ুদূষণের মাত্রা কমিয়ে এনে বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে যাচ্ছে, তখন পরিবেশ তার আপন গতিতে নিজেই হচ্ছে পরিশোষিত।

আর তাই, কোভিড-১৯ যেন আমাদের পরিবেশ, আবহাওয়া ও জলবায়ুর সঙ্গে অন্য এক সম্পর্ক গড়ে তুলছে, যা পৃথিবীকে আরও বাসযোগ্য করতে সাহায্য করবে। তাই পরিবেশের ক্ষেত্রে আমরা কোভিড-১৯-কে পরিবেশ সহায়ক ভাইরাস বলতে পারি কি না সেটা প্রশ্নবিদ্ধ বিবেচ্য?

একটা বিষয় পরিষ্কার যে পরিবেশের ওপর দূষণ প্রভাব কমছে কোভিড-১৯-এর জন্য। যেমন, গত ২০১৯-২০ সালে আবহাওয়াবিদেরা বায়ুদূষণের যে মাত্রা পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাতে সুস্পষ্টভাবে দেখা গেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় বায়ুদূষণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে ২০২০ সালে। পরিবেশের এই পরিবর্তন জলবায়ু ওপর প্রভাব ফেলছে। এতে ভবিষ্যতে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়বে; কমবে কয়লাশক্তির ব্যবহার। স্যাটেলাইটের ছবিতে সম্প্রতি চীন, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন স্থানে আকাশ পরিষ্কার দেখা গেছে।

বায়ুদূষণের মাত্রা কমলেও হয়তো বাড়বে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিংসরণ কোভিড-১৯ মহামারি কমলেও। কারণ, বৈশ্বিক অর্থনীতিকে সচল করতে চালু হবে সমস্ত শিল্পকারখানা। অতএব এখনই সময় যথোপযুক্ত অর্থনীতি ও জলবায়ুবান্ধব পলিসি ঠিক করার। বৈশ্বিক জলবায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত সব বিষয় নিয়েই কাজ শুরু করতে হবে আগামীর টেকসই পরিবেশ গড়তে। একটি জরিপের তথ্যমতে বিশ্বের ৭১ শতাংশ মানুষ মনে করে জলবায়ু পরিবর্তন মারাত্মক একটি সমস্যা, যেটা করোনাভাইরাসের মতো। যদিও ২১ শতাংশ মত দিয়েছে এর বিপক্ষে।

অনেক বিজ্ঞানী ও গবেষক মনে করেন, এই কোভিড-১৯ পরিস্থিতির মাধ্যমে মানুষকে আরও একটি বৈশ্বিক সমস্যার কথা সহজে সচেতন করা যেতে পারে আর সেটা হলো বৈশ্বিক তাপমাত্রা সমস্যা। কোভিড-১৯ যেমন একটি বৈশ্বিক মহামারি তেমনি বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও এক একটি মহামারি, যার জন্য মূলত বৈশ্বিক জলবায়ু সমস্যা দায়ী। মানুষের অসচেতনতায় কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ যেমন আস্তে আস্তে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে, যা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে সংক্রমিত হচ্ছে, তেমনি জলবায়ুর পরিবর্তন হয় খুব ধীরে ধীরে যা সহজে বোঝা যায় না। জলবায়ু পরিবর্তন হয় বছরের গড় তাপমাত্রার মাধ্যমে, যেটাকে সহজেই উপক্ষো করা যায় যে এই অল্প তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে পরিবেশের ওপর এর কোনো প্রভাবই পড়বে না। কিন্তু বছরের পর বছর যখন অল্প অল্প করে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে, তখন একসময় বড় ধরনের পরিবর্তন ধরা পড়ে। যার ফলে এই তাপমাত্রায় বরফ গলতে থাকে এবং বাড়তে থাকে সমুদ্রের পানির উচ্চতা। এ ছাড়া আরও প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি হতে থাকে। অতএব ভবিষ্যৎ পরিবেশের হুমকি বিবেচনায় আমরা এই অল্প তাপমাত্রার পরিবর্তনকে উপেক্ষা করতে পারি না কোনোভাবেই।

এখানে বুঝানোর জন্য কোভিড-১৯ এবং জলবায়ু কার্ভ এর চিত্র তুলনা করা হল। যা থেকে বুঝা যায় যে বৈশি^ক জলবায়ু পরিবর্তন, নিয়ন্ত্রন একই কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে করা যেতে পারে।

ইতিমধ্যে কোভিড-১৯ আমাদের শিক্ষা দিয়েছে কিভাবে মহামারীকে নিয়ন্ত্রন করতে হয়। আমরা জানি, প্রাথমিক পদক্ষেপ নিলে এবং নিয়মগুলো মেনে চললে ভাইরাস আক্রান্তদের সংখ্যা কমানো যেতে পারে। যেমন সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা, ঘর থেকে বের না হওয়া ইত্যাদি নিয়ম মানার ফলে মহামারী কার্ভ নিম্নগামী হচ্ছে। এই শিক্ষা আমরা জলবায়ু সংকটের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারি। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারলে বৈশি^ক তাপমাতত্রা সমস্যা দূর করা সম্ভব। সে লক্ষ্যে সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন প্রাথমিক পদ্ধতি গ্রহন করতে হবে। যেমন, কার্বন নিয়ন্ত্রন কমানো, শিল্প-কারখানাগুলো পরিবেশবান্ধব করতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া, পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানো ইত্যাদি।

কিন্তু পরিবেশ সংস্থাগুলো বাস্তবে এই কোভিড-১৯ শিক্ষা জলবায়ু নিয়ন্ত্রনে কতটুকু ব্যবহার করতে পারবে তা দেখার বিষয়। তবুও আমরা আশাবাদী, জলবায়ু সংকট কমিয়ে বিশ^কে একটি টেকসই পরিবেশ দেওয়া সম্ভব নিকট ভবিষ্যতে।    

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১২০তম সংখ্যা, এপ্রিল-আগস্ট ২০২০।

ড. শেখ খালেদুজ্জামান শাহ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top