কোভিড-১৯ বা নভেল করোনাভাইরাস এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত নাম। ভয়াবহ এই ‘পেন্ডামিক’ বা মহামারিতে বিশ^ আজ স্তম্ভিত, শঙ্কিত। দেশে দেশে চলছে জরুরি পরিস্থিতি ও লকডাউন। সর্বত্রই স্থবিরতা। দীর্ঘ সাত মাসের ভোগান্তির পর মহামারি পরিস্থিতি অনেক দেশ কাটিয়ে উঠলেও সংক্রমণ শুরু হচ্ছে আবার নতুন করে। বিভিন্ন সময়ে বৈশি^ক কলেরা, বসন্ত, স্প্যানিশ ফ্লু, বার্ড ফ্লু, ইবোলাসহ নানা ধরনের মহামারিতে প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য মানুষ। তবে বর্তমান শতাব্দীকে বলা হচ্ছে ‘এরা অব পেন্ডামিক’ বা ‘মহামারির কাল’। এই পরিস্থিতি কবে নিয়ন্ত্রণে আসবে; কবে আবিষ্কৃত হবে কার্যকরী প্রতিষেধক বা টিকা, জানা নেই কারোরই। মানুষ আর কত দিন গৃহবন্দী কোয়ারেন্টাইন-জীবন কাটাবে! এ যাত্রায় করোনাভাইরাস থেকে রেহাই যদিও মেলে, তবুও প্রকৃতিতে বিদ্যমান ভয়াবহ নানা ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস মানুষের জন্য হতে পারে চরম প্রাণঘাতী। অথচ জীবন ও জীবিকা চলে হাত ধরে। জীবিকা তথা বৈশি^ক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক রাখতে ভাইরাসের সঙ্গে সহাবস্থানে বেঁচে থাকা শিখতে হবে। তাই ভবিষ্যতে প্রাণঘাতী ভাইরাস; ব্যাকটেরিয়ার কবল থেকে বাঁচতে গড়তে হবে কার্যকর নগর অবকাঠামো আর ব্যবস্থাপনা। গড়ে তুলতে হবে নিরাপদ বাসযোগ্য এক নগর।
ভাইরাস কী
ভাইরাস (Virus) এক প্রকার অতিক্ষুদ্র অণুজীব। এরা অতি-আণুবীক্ষণিক, অকোষীয় রাসায়নিক পদার্থ, শুধু জীবিত কোষেই বংশ বৃদ্ধি করতে সক্ষম। ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া থেকেও ক্ষুদ্র। ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া এদের দেখা যায় না। পোষকদেহে সক্রিয় জীব হিসেবে আচরণ করতে সক্ষম এই অণুজীবটি মাত্র দুটো অংশে গঠিত। ভাইরাসের বৈশিষ্ট্যধারী নিউক্লিক অ্যাসিড আর প্রোটিন আবরণ। নিউক্লিক অ্যাসিড দুই রকমের হতে পারেÑ ডিএনএ (DNA) ও আরএনএ (RNA)। ভাইরাস মানুষ, পশুপাখি, উদ্ভিদের বিভিন্ন রোগের জন্য দায়ী। নিষ্ক্রিয় অবস্থায় বাতাস, মাটি, পানির মতন প্রায় সব জড় মাধ্যমে ভাইরাসের অবস্থান। জীবনযাত্রায় ব্যাকটেরিয়ার মতো স্বাধীনতা তার নেই, টিকে থাকতে প্রয়োজন পোষকদেহ। ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে আরেকটি পার্থক্য হলো, ভাইরাসমাত্রই রোগব্যাধির বাহক। বাদুড়, বানর, গন্ধগোকুল, সাপসহ বিভিন্ন প্রাণী ভাইরাসের বাহক। এদের থেকে মানুষ ও অন্যান্য জীবদেহে প্রবেশ করে ছড়াতে পারে মারাত্মক সব অসুখবিসুখ। ভাইরাসবাহিত রোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্যÑ
- ইবোলা
- রোটা
- হান্টা
- সার্স
- মার্স
- ডেঙ্গি
- এইচআইভি
- নিপাহ
- ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রভৃতি।
ভাইরাসজনিত রোগের মধ্যে রয়েছেÑ
- করোনা
- জলবসন্ত
- গুটিবসন্ত
- এইডস
- বার্ড-ফ্লু
- হার্পিজ
- জ¦র
- সর্দি
- পশুপাখির রোগ
- উদ্ভিদের রোগ ইত্যাদি।
অকোষীয় ভাইরাসের এ রাসায়নিক পদার্থটি মিউটেশন নামক অনন্য এক প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত দক্ষ। ভাইরাসের ইতিহাস এই পৃথিবীর বুকে নতুন নয়, সৃষ্টির আদি থেকেই বিদ্যমান। কিন্তু ভাইরাস সম্পর্কে অনেক কিছুই রয়েছে অজানা। অতীতে সৃষ্ট নানা মহামারি যেমন, ২০০২-০৩ সালে চীনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সার্স, ২০০৯-১০ সালে সোয়াইন ফ্লু মতন ভয়াবহ ভাইরাস রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল লক্ষণীয়। এসব মহামারি সীমাবদ্ধ ছিল পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে। কিন্তু এবার কোভিড-১৯ ছড়িয়েছে বিশ^ময়।
মহামারির নগর ব্যবস্থাপনায় ভাইরাসজনিত রোগের উপসর্গ
ভাইরাসজনিত রোগের উপসর্গ নির্দিষ্ট নয়। একই ভাইরাস বিভিন্ন ব্যক্তির ওপর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলে। এর অন্যতম কারণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার পার্থক্য। এ জন্য উপসর্গের ক্ষেত্রেও তারতম্য দেখা যায়। তবে সাধারণ জ্বর বা হেমোরেজিক জ্বর, সর্দি-কাশি, শ^াসকষ্ট, শারীরিক অস্বস্তি, ব্যথা; বিশেষ করে ঊরু, কোমর, পিঠ আর কাঁধের পেশিতে ব্যথা অনুভূত হয়। সঙ্গে মাথাব্যথা, বমি-বমি ভাব, পেট খারাপ আর পেটে ব্যথা অনুভূত হয়। গায়ে চুলকানি ভাইরাস সংক্রমণের অন্যতম উপসর্গ। পরিস্থিতির অবনতি হলে নিম্ন রক্তচাপ, হার্ট, ফুসফুস ও কিডনিতে সমস্যা দেখা দেয়।
ভাইরাসের মোকাবিলায় করণীয়
প্রকৃতি থেকে ভাইরাস নির্মূল অসম্ভব। তবে ভাইরাস বাহকের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে অথবা বাহক যেন না ছড়াতে পারে সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। সাধারণভাবে বলা যায়, যেসব প্রাণী ভাইরাসের বাহক, তাদের মল, মূত্র, লালার মাধ্যমে ছড়ায় এই ভাইরাস। কোনো কোনো সময় সেই বাহকের কামড় থেকেও এই ভাইরাস সংক্রমিত হয়। সংক্রমণের হার ব্যাপক হলে কোয়ারেন্টাইন, লকডাউন, জরুরি অবস্থা জারি করে জনসমাগম রোধের মাধ্যমে মহামারি প্রতিরোধ করা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিকে রোগমুক্ত এলাকায় প্রবেশ করতে না দিয়েও ভাইরাস মোকাবিলা সম্ভব। যেমনÑভিয়েতনাম, ভুটান, দক্ষিণ কোরিয়া তাদের কৌশলগত পদক্ষেপে করোনা মহামারি রুখতে পেরেছে। তবে এসব পদ্ধতি সাময়িক। দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে যা যা করণীয়Ñ
স্বাস্থ্যবিধি ও দেশীয় গবেষণার ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি
একটি ভাইরাস থেকে জন্মাতে পারে বিলিয়ন বিলিয়ন ভাইরাস, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। ভাইরাস সংক্রমণের হাত থেকে নাগরিকদের রক্ষায় হেলথ সায়েন্সের (স্বাস্থ্য বিজ্ঞান) ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে নিতে হবে যুগোপযোগী স্বাস্থ্য পরিকল্পনা। এ ছাড়া দেশে গবেষণার ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। প্রতিটি বিশ^বিদ্যালয়, মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় ও কলেজ হাসপাতাল সম্পর্কিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে গড়তে হবে আধুনিক বায়োলজিক্যাল ল্যাব। সম্ভব হলে ল্যাব স্থাপন করতে হবে প্রতিটি শহরে। আমাদের দেশে অনেক মেধাবী বিজ্ঞানী ও গবেষক রয়েছেন, যাঁরা বাংলাদেশ ছাড়াও বিশে^র উন্নত অনেক দেশে গবেষণারত; যেখানে দিচ্ছেন মেধার পরিচয়। এসব খ্যাতিমান গবেষককে সম্পৃক্ত করতে হবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। তা ছাড়া নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারেও থাকবে নীতিমালা। নতুন কোনো ভাইরাস দেখা দিলে তা যেন অন্যকে সংক্রমিত করতে না পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় কিছু করণীয় বিষয়ে স্বাস্থ্যবিধি জারি করতে হবে। মানুষের অভ্যাসগত পরিবর্তন আনতে শিক্ষা কার্যক্রমের সকল পর্যায়ে তা নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রচারসহ নানাভাবে তা তুলে ধরতে হবে। এসব স্বাস্থ্যবিধির মধ্যে যেসব বিষয় থাকতে পারে তা হলো-
- নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা
- মুখে মাস্ক ব্যবহার
- হাঁচি বা কাশির শিষ্টাচার মেনে চলা
- নগরে কেউ যেন যত্রতত্র থুতু, কফ না ফেলে
- বাসাবাড়িতে থার্মোমিটার ও জীবাণুনাশক রাখা
- জীবাণুনাশক দিয়ে বাড়ির ভেতর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা
- ডাস্টবিনে বা নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া ময়লা-আবর্জনা না ফেলা
- বদ্ধ জায়গা তথা হাসপাতাল, সেলুন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, কমিউনিটি সেন্টার, সিনেমা হলসমূহ নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করা
- অফিস বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের শারীরিক তাপমাত্রা নিয়মিত মনিটরিং করা
- অফিস শুরুর আগেই প্রবেশপথে জীবাণুনাশক প্রয়োগ করা
- অফিস বা বাসাবাড়ির দরজার হাতল, লিফটের বাটন, বাথরুম জীবাণুমুক্ত রাখা
- বাজার, চিড়িয়াখানা, পার্ক, সাফারি পার্কসহ জনাকীর্ণ স্থানে থার্মাল স্ক্যানার ও জীবাণু নিষ্ক্রিয় চেম্বার স্থাপন করা।
বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন ও সঠিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে দেশের করোনা চিকিৎসায় নির্ধারিত হাসপাতালগুলো। এমনকি করোনা রোগীদের চিকিৎসা প্রদানের জন্য নেই পর্যাপ্ত আইসিইউ, আইসোলেশন ইউনিট, ভেন্টিলেটর, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি, লোকবলসংকটসহ ব্যবস্থাপনার চরম অভাব রয়েছে হাসপাতালগুলোতে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোরও করোনা চিকিৎসায় নেই তেমন আগ্রহ। এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর কয়েক দিনের মধ্যে চীন মাত্র ১০ দিনে হাজার শয্যার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরিতে সক্ষম হয়। এ ছাড়া ১ হাজার ৩০০ শয্যার আরও একটি হাসপাতাল তৈরির কাজ চলছে দেশটিতে। জরুরি অবস্থায় দ্রুত সময়ে হাসপাতাল তৈরির ঘটনা চীনের জন্য এটিই প্রথম নয়। ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসার সুবিধার্থে হাজার শয্যার একটি হাসপাতাল তৈরি করে দেশটি।
করোনাসহ যেকোনো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসাসেবা প্রদানে দেশের স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজাতে হবে। এ খাতে রাখতে হবে বিশেষ বরাদ্দ; কমাতে হবে দুর্নীতি। গড়ে তুলতে হবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিশেষায়িত হাসপাতাল, যেখানে থাকবে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা-
- ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (ICU) স্থাপন
- আইসোলেশন ইউনিট
- ভেন্টিলেটর
- রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি
- অক্সিজেন সিলিন্ডার
- উন্নত মানের পিপিই, মাস্ক, গ্লাভস ও অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম
- অ্যাম্বুলেন্স
- আধুনিক বায়োলজিক্যাল ল্যাব
- দক্ষ ও পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্সসহ আনুষঙ্গিক জনবল
- জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ থেকে নিয়মিত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা।
নগর ব্যবস্থাপনায় জীবাণুরোধী পদক্ষেপ
কয়েক দিন আগেও যানজট, আবাসন সমস্যা, দূষণ, জলাবদ্ধতাই একটি বাসযোগ্য নগরের প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচিত হতো। অথচ সম্প্রতি করোনা পরিস্থিতি নগর ব্যবস্থাপনায় নতুন হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। যদিও বিষয়টি নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কিন্তু ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া নগরের নাগরিকদের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশের মতো ঘন বসতিপূর্ণ দেশে এই পরিস্থিতি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। নগরে যখন অস্বাস্থ্যকর ও ঘিঞ্জি পরিবেশ বেড়ে যায়, তখনই বাসা বাঁধে নানা রকম ক্ষতিকর রোগ-জীবাণু, মশা-মাছি, পরজীবী, অণুজীব, কীট, ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস। আর এসবই হয়ে দাঁড়ায় মানবস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। দূষণ, জলাবদ্ধতা, ঘিঞ্জি পরিবেশের কারণে শহরে সৃষ্টি হচ্ছে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ-জীবাণু। বিশেষত বস্তি ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর আবাসস্থলে।
নগর পরিকল্পনা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি এসব ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়াকে নির্মূল করতে হবে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আবাসনে নিতে হবে বাড়তি সতর্কতা। বস্তি বা নিম্ন আয়ের মানুষের কলোনিকে হেলাফেলা করা যাবে না কিছুতেই, কেননা সেখান থেকেই রোগ-জীবাণু সংক্রমিত হতে পারে নগড়জুড়ে। এ জন্য পরিবর্তন আনতে হবে নগর ব্যবস্থাপনায়। সুস্বাস্থ্যের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি-
- নগরের পানি সরবরাহ লাইন দূষণমুক্ত রাখা ও নিয়মিত পরিষ্কার করা
- পার্ক, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, বাজারসহ সব ধরনের গণপরিসর জীবাণুমুক্ত রাখা
- সড়ক ডিভাইডার স্টিল, সাঁটার, ল্যাম্পপোস্ট, বৈদ্যুতিক পোল জীবাণুনাশক স্প্রে করে জীবাণুমুক্ত রাখা
- নগরে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ
- মশা দমন
- ইঁদুর, ছুঁচো, তেলাপোকা নির্মূল করা প্রভৃতি।
কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ অনেকটাই পিছিয়ে। অসচেতন নাগরিকেরা যেখানে-সেখানে বর্জ্য ফেলায় নগরে জন্ম নেয় ক্ষতিকারক নানা জীবাণু। সাম্প্রতিক করোনা পরিস্থিতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্ভূত হয়েছে ভয়াবহ সমস্যা। কোটি কোটি মানুষ এখন মাস্ক, গ্লাভস, পিপিইসহ নানা রকম সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার করছে। ব্যবহারকাল অতিবাহিত হওয়ার পর সেগুলোকে ডাস্টবিন, ড্রেন এমনকি যেখানে-যেখানে ফেলা হচ্ছে। বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো)-এর তথ্যমতে, করোনাকালে একবার (ওয়ান টাইম) ব্যবহারকৃত প্লাস্টিক বর্জ্য আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এগুলো সাধারণ বর্জ্যরে সঙ্গে একত্রে মিশে যাচ্ছে। ফলে সেটা যেমন পরিবেশের জন্য হচ্ছে ক্ষতিকর, সেই সঙ্গে যারা বর্জ্য সংগ্রহ করছেন, তাঁদের স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। কিন্তু এই বিষয়ে কোনো নজরদারি, নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। হাসপাতালের কিছু মেডিকেল বর্জ্য মাতুয়াইলে ‘প্রিজম’ নামক একটি এনজিওর নিজস্ব প্লান্টে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু বাসাবাড়িতে ব্যবহার করা মাস্কসহ অন্যান্য বর্জ্য করোনার সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করছে। এগুলো জীবাণুমুক্ত না করে সাধারণ বর্জ্যরে সঙ্গে ফেলে দেওয়ায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ অনেকের করোনায় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। করোনার ঝুঁকিকে প্রাধান্য দিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি। যে ব্যবস্থা গ্রহণে করোনাসহ অন্যান্য ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর ঝুঁকি এড়ানো সম্ভবÑ
- মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গাইডলাইন পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসরণ করে কাজ করা
- মেডিকেল ও রাসায়নিক বর্জ্য পরিশোধন করে তা ডাম্পিং করা
- মেডিকেল বর্জ্য অটোক্লেভস মেশিনের মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করে তা বায়োসেফটিক্যাল ব্যাগে ভরে রাখা এবং পরে তা উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়ে ফেলা
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিশোধনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো
- পরিছন্নতা কর্মীদের নিরাপত্তায় সব ধরনের সামগ্রী প্রদান করা
- পরিছন্নতা কর্মীদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান
- বাসাবাড়িতে আইসোলেশনে থাকা ব্যক্তিদের ব্যবহার করা জিনিসপত্র ও মেডিকেল বর্জ্য আলাদা প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে সম্ভব হলে পুড়িয়ে ফেলা, অন্যথায় পরিছন্নতা কর্মীদের কাছে প্রদানের সময় অবহিত করা
- সিটি করপোরেশনের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে হবে, পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে জবাবদিহি।
পরিবেশবান্ধব সবুজ নগর
প্রাণীদের পাশাপাশি একটি নগরেরও প্রয়োজন সবুজ পরিবেশ। পার্ক ও সবুজ গাছপালা শহরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক। ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে যে পরিমাণ সবুজ বনভূমি থাকা প্রয়োজন, রয়েছে তার খুব সামান্যই। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এক গবেষণা বলছে, নাগরিকদের সুস্থতায় একটি শহরের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য কমপক্ষে ৯ বর্গমিটার সবুজের আচ্ছাদন থাকা প্রয়োজন, যা ঢাকায় রয়েছে ২ বর্গমিটারেরও কম। পর্যাপ্ত গাছপালা না থাকায় ঢাকায় মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা বিরাজ করায় ক্রমেই বাড়ছে এ নগরের তাপমাত্রা।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নগরের পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হবে এটাই স্বাভাবিক। বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বার্ষিক বৈশি^ক সামগ্রিক মৃত্যুর ৬৩ শতাংশ মানুষ মারা যায় ক্রনিক ডিজিসের (সংক্রামক রোগ) কারণে। আর এর পেছনে অন্যতম দায় অপরিকল্পিত নগরায়ণের। নাগরিকদের সুস্থতায় ইকো নগরায়ণের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসম্মত সবুজ নগর গড়ে তুলতে ইউরোপের নগরসমূহের মতো যান্ত্রিক যানবাহন কমিয়ে সাইকেলের মতো পরিবেশবান্ধব যান চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। নদীপথগুলোকে দূষণমুক্ত করতে নৌ-পরিবহনব্যবস্থা চালু করতে হবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসম্মত নগর সৃজনে নিতে হবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ-
- নগর পরিকল্পনা ও শহর উন্নয়নে প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ স্থপতিদের সম্পৃক্ততা
- স্থাপত্য ডিজাইনে প্রকৃতি ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন প্রয়োজন
- ভূমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ
- শারীরিক ব্যায়াম ও খেলাধুলার পরিবেশ সৃষ্টি
- পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার
- নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রভৃতি।
নগর পরিবহনব্যবস্থা
নগর পরিবহনব্যবস্থা রোগ সম্প্রসারণে রাখে অনেক বড় ভূমিকা। ব্যাপক জনবহুল দেশ হওয়ায় এখানকার যানবাহনগুলোতে গাদাগাদি করে যাত্রী সেবা দেওয়া হয়। এতে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায় সংক্রমণের প্রকোপ। করোনা পরিস্থিতিতে যানবাহনগুলোতে সীমিত যাত্রী ওঠানো হলেও তাতে নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রাখার সুযোগ কম। শুধু বাস বা ট্রেন নয়, অটোরিকশা, রিকশা, ভাড়ায় চালিত মোটরবাইক সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত না করলে তাতে সংক্রমণের ঝুঁকি রোধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন পরিবহনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা। করোনাকালে ইউরোপসহ সারা বিশে^ ব্যক্তিগত বাহন হিসেবে ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হচ্ছে বাইসাইকেল। পরিবেশবান্ধব এ বাহনটিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে একদিকে যেমন কমবে সংক্রমণের ঝুঁকি, অন্যদিকে ভালো থাকবে পরিবেশ-স্বাস্থ্য; কমবে যানজট।
বাজার ব্যবস্থাপনা
ভাইরাস সংক্রমণরোধে বাজার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখনো এ দেশের শহর-নগরে মান্ধাতা আমলের বাজারব্যবস্থা লক্ষণীয়। নোংরা-আবর্জনা, কাদা, মশা, মাছিসহ নানা ধরনের জীবাণুতে পরিপূর্ণ। এ ছাড়া বাজারের যেখানে মুরগি, হাস, মাছ ও মাংস বিক্রি হয়, সেখানে ঝুঁকির পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই বেশি। আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা না গেলে রোগ-ব্যাধি বাড়বে। আর তাই যেসব ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে সেগুলো হচ্ছেÑ
- নিয়মিত জীবাণুমুক্তকরণ
- বাজারের পরিসর বাড়ানো, যেন ভিড় কমে
- পানি-কাদা যেন জমে না থাকে সে ব্যবস্থা গ্রহণ
- প্রতিদিনকার ময়লা-আবর্জনা ঠিকভাবে অপসারণ প্রভৃতি।
বন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সুরক্ষার ব্যবস্থা
ভাইরাস সংক্রমণ রোধে দেশের সব এয়ারপোর্ট, ল্যান্ডপোর্ট ও সিপোর্টের নিরাপত্তা বিধান অত্যন্ত জরুরি। কারণ, অধিকাংশ সংক্রমণ ঘটে সংক্রমিত কোনো দেশ থেকে আসা বাহকের মাধ্যমে। উন্নত দেশের এয়ারপোর্টগুলোতে আধুনিক কনটাক্টলেস স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা, যা থেকে কোনো যাত্রীর শরীরের তাপমাত্রা ও অন্যান্য উপসর্গ জানা যায়। ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে বিমানবন্দরসহ সব আন্তর্জাতিক প্রবেশপথগুলোতে বিশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ ছাড়া অন্যান্য সুবিধার আওতায় যা যা থাকবেÑ
- অত্যাধুনিক থার্মাল স্ক্যানার
- স্বাস্থ্য পরীক্ষার আধুনিক বুথ
- জীবাণু দূরীকরণ টানেল
- বিশেষ কোয়ারেন্টাইন জোন
- বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্যানেল প্রভৃতি।
পরিবেশের ভারসাম্য ও বাস্তুসংস্থান
জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধি রোগ সৃষ্টির অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে বৈশি^^ক সংকটও হচ্ছে প্রবল। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে কোনো কোনো কীট-পতঙ্গের স্বাভাবিক জীবনকাল দীর্ঘায়িত হয়। জন্ম নেয় নতুন নতুন ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়াসহ নানা ধরনের জীবাণু। জলবায়ু পরিবর্তন ও বাস্তুসংস্থান রোধে যে পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি-
- বনভূমি উজাড় বন্ধ করে নতুন বন সৃষ্টি
- প্রাণী নিধন বন্ধকরণ
- দেশি প্রজাতির পাখি, মাছ, সাপ, ব্যাঙসহ অন্যান্য প্রাণী সংরক্ষণ করতে হবে
- কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে
- খনিজ জ্বালানির ব্যবহার কমানো
- অতিরিক্ত খনিজ পদার্থ উত্তোলন বন্ধকরণ
- নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো।
ডিজিটাল সেবা ও সঠিক তথ্যভান্ডার
একটি দেশের নাগরিকদের সুস্থতার জন্য রোগ-ব্যাধি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রোগ-ব্যাধির প্রকৃত চিত্র না জানলে তা মোকাবিলা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সঠিক তথ্য জানা থাকলে সে অনুযায়ী গবেষণা ও করণীয় নির্ধারণ করা সম্ভব। এ জন্য দেশের ডেটা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকদের শারীরিক অবস্থা, রোগ-ব্যাধির ইতিহাস, ডাক্তার, ব্যবস্থাপনাপত্রের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। নগরে কোন কোন এলাকায় রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি, আক্রান্তদের বয়স, মৃত্যুর হার প্রভৃতির তথ্যও রাখতে হবে। প্রয়োজনে মোবাইল লোকেশান ট্রাক করে আক্রান্ত ব্যক্তির গতিবিধি নজরদারি করতে হবে। ভিড় এড়াতে অনলাইনভিত্তিক লেনদেন, ভর্তি কার্যক্রম, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যন্য সেবা বিল অনলাইনে প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রকৃতিতে বিভিন্ন ধরনের প্রাণঘাতী জীবাণু মহামারি সৃষ্টি করছে, ভবিষ্যতেও করবে। বিগত ২০ বছরে সার্স, মার্স, ইবোলা, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, সোয়াইন ফ্লুÑএ পাঁচটি মহামারি রোধ করা গেলেও করোনার হাত থেকে এখনও বাঁচা সম্ভব হয়নি। ভাইরাসের এটাই শেষ আক্রমণ নয়; আবারও আসবে। আর সে কারণেই প্রস্তুতি নিতে হবে। জনসচেতনতা, জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার সম্পৃক্ততা অত্যন্ত জরুরি। এসব বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলেই নিশ্চিত হবে নিরাপদ আগামীর নগর।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১২০তম সংখ্যা, এপ্রিল-আগস্ট ২০২০।