অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেল

প্রকৃতির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে স্থাপনার সুরক্ষা নিশ্চিত করা মোটেও সহজ নয়। আর্দ্র জলবায়ু, লবণাক্ততা, ফাঙ্গাস, রৌদ্রতাপ ও আবহাওয়ার সকল বৈরিতা থেকে স্থাপনা তথা ভবনের সুরক্ষা প্রদানে তাই কত কিছুই না করতে হয়! এই যেমন, দেয়ালে প্লাস্টার, টাইলস স্থাপন, বছর বছর রং করা আরও কত-কী! এতে স্থাপনার সৌন্দর্য বজায় রাখা গেলেও তাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। তবে উভয় সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করতে পারেন এক জুতসই উপকরণ, অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেল। এই প্যানেল এসিপি নামেই অধিক পরিচিত। স্থাপনার অভ্যন্তরীণ নকশা, বাইরের দেয়ালের সৌন্দর্যবর্ধন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এমনকি দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেল অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত নির্মাণ উপকরণ। 

কম্পোজিশন

অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেল তৈরি করা হয় কম্পোজিট অ্যালুমিনিয়াম উপাদানে। ব্যবহারের সুবিধার্থে এটা শিট বা প্যানেল আকারে তৈরি করা হয়, অনেকটা স্যান্ডউইচের মতো করে। এর ওপর-নিচে থাকে অ্যালুমিনিয়াম এবং মধ্যে মিনারেল কোর। অ্যালুমিনিয়াম শিট এসিপি বোর্ডকে করে দৃষ্টিনন্দন, মজবুত ও স্থায়ী এবং মিনারেল কোর দেয় থার্মাল ইনস্যুলেশন-ক্ষমতা। এ ছাড়া এই মিনারেল কোর প্যানেলকে দেয় অগ্নিরোধক, তাপরোধক ও আবহাওয়ার নানা বৈরিতা রোধের ক্ষমতা। স্যান্ডউইচের মতো হওয়ায় এবং মধ্যে এলডিপিই কোর থাকায় মূলত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। অ্যালুমিনিয়াম শিটে বিশেষ কোটিং প্রদান করে প্যানেলকে করা হয় আগ্নিরোধী ক্ষমতাসম্পন্ন। সাধারণত কোটিংয়ে ব্যবহার করা হয়-

  • পলিভিনাইলডেন ফ্লুরাইড (PVDF)
  • ফ্লুরোপলিমার রেসিন ও 
  • পলিস্টার পেইন্ট (FEVE)

এসিপি প্যানেলের পুরুত্ব সাধারণত ৩ মি.মি, ৪ মি.মি ও ৬ মি.মি হয়ে থাকে। সম্প্রতি থ্রিডি-স্ট্রিপড এসিপিও বাজারে ছেড়েছে কিছু প্রতিষ্ঠান। এই প্যানেলগুলো সাধারণ বোর্ডের থেকে উজ্জ্বল ও কারুকাজ করা। এর মধ্যে ব্যবহৃত টোন ও হাইলাইটারগুলো জীবন্ত বলেই মনে হয়।

বৈশিষ্ট্য

এসিপি আধুনিক যুগের চমৎকার এক সৃজনশীল নির্মাণ উপকরণ। এর আকর্ষণীয় রং, টেক্সচার এবং অনন্য বৈশিষ্ট্য স্থাপনার সৌন্দর্যের আবেদনকে বাড়িয়ে তোলে। এটি বাঁকানো যায় ও ভাঁজ করে এমন আকার প্রদান করা যায়, যা অন্য কোনো উপকরণে সহজতর নয়। ফলে এসিপি ডিজাইনে দেয় স্বাধীনতা। এসিপির অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে-

  • বাজারে প্রাপ্ত অন্যান্য প্যানেলের তুলনায় স্থায়িত্ব বেশি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয়ী।
  • আধুনিক বোর্ডগুলো বিভিন্ন রং এবং ডিজাইনে অর্থাৎ প্রাকৃতিক পাথর, কাঠ ও মেটালের টেক্সচারে পাওয়া যায়।
  • প্যানেগুলোর চমৎকার থার্মাল ইনস্যুলেটর বা তাপ নিরোধক হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
  • স্থাপনার দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। 
  • ওজনে হালকা কিন্তু মজবুত।
  • অ্যালুমিনিয়াম যেহেতু হালকা ওজনের ধাতু, তাই এটি ইনস্টল করা সহজ।
  • ফায়ারপ্রæফ বিধায় আগুন লাগে না, এমনকি অগ্নিফুলকিও ছড়িয়ে পড়ে না।
  • এসিপি পুনর্ব্যবহারযোগ্য; এর ৮০ শতাংশ উপকরণ রিসাইকেল ম্যাটেরিয়ালে তৈরি। 

ব্যবহার বৈচিত্র্য

বিশ্ব ব্যাপী ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে টেকসই উপকরণ ব্যবহার প্রাধান্য পাচ্ছে। অ্যালুমিনিয়াম প্যানেল নতুন ধরনের সামগ্রী হিসেবে ১৯৮০-৯০-এর দশকে এর ব্যবহার শুরু হয়।  স্থাপনা বা ভবনের নির্মাণ উপকরণ হিসেবেই নয়, মোটরগাড়ি শিল্পে এর ব্যবহার ব্যাপক হাওে বেড়েছে। বিশেষ করে জার্মান, চীন ও ভারতে। রং-বৈচিত্র্য, সুবিধাজনক নির্মাণপদ্ধতি, দুর্দান্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ কর্মক্ষমতা, চমৎকার অগ্নি প্রতিরোধ, গুণগতমানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে এসিপি। বিশেষ করে-  

  • বাণিজ্যিক ভবন
  • শপিংমল 
  • মাল্টিপ্লেক্স
  • হোটেল
  • অফিস
  • হাসপাতাল
  • মেট্রো স্টেশন 
  • মোটরগাড়ি ও বিমানে। 

প্রাথমিক পর্যায়ে এসিপি এক্সটেরিয়র বা ইন্টেরিয়ের ক্লাডিং (ফ্যাসাদ) উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডিজাইন, রং এবং টেক্সচারের প্রচুর উন্নয়ন সাধন করেছে। ফলে এই উপকরণটি যেসব অ্যাপ্লিকেশনে ব্যবহৃত, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম-

  • এক্সটেরিয়র
  • ইন্টেরিয়র
  • ক্লাডিং বা ফ্যাসাদ
  • পার্টিশন
  • ফলস সিলিং
  • সাইনেজ
  • যানবাহনের বডি প্রভৃতি।

এক্সটেরিয়র

স্থপতি ও ডিজাইনারা স্থাপনার এক্সটেরিয়র ম্যাটেরিয়াল হিসেবে বেছে নেন এমন এক উপকরণ, যা ভবনকে করবে দৃষ্টিনন্দন পাশাপাশি পরিবেশের যেকোনো প্রভাব মোকাবিলা করে দিবে দীর্ঘস্থায়িত্বের নিশ্চয়তা। পাশাপাশি বসবাসকারীদের আরাম ও ব্যয় সাশ্রয়ের বিষয়টাও পাবে গুরুত্ব। এসিপির চমৎকার রং-বৈচিত্র্যের কারণে স্থাপনার বাহ্যিক সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। বছর বছর পেইন্টিংয়ের ঝামেলাও থাকে না। থার্মাল ইনস্যুলেশন-ক্ষমতা থাকায় অতিরিক্ত সৌরতাপ থেকে রক্ষা করে। এ ছাড়া মসৃণ পৃষ্ঠদেশ হওয়ায় বৃষ্টির পানি, ধুলা, ময়লা ও ফাঙ্গাস থেকে স্থাপনাকে রাখে সুরক্ষিত। তা ছাড়া হালকা ওজনবিশিষ্ট হওয়ায় অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেল সহজেই ভবনে স্থাপন করা যায়। দেয়ালের গায়ে ড্রিল করে স্থাপন করা হয় অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম। তারপর প্যানেল বসিয়ে স্ক্রু দিয়ে অথবা রেসিন দিয়ে তা সেটে দেওয়া হয়। এরপর প্যানেলসমূহের মধ্যের গ্যাপ বা ফাঁকা স্থান সিলিকন গ্যাসকেট দিয়ে পুরণ করে দিলেই এসিপি স্থাপন সম্পন্ন হয়। 

ইন্টেরিয়র

এক্সটেরিয়রের ইন্টেরিয়রের এসিপি বেশ মানানসই। মূলত এর চমৎকার ফিনিশিং সারফেস ইন্টেরিয়রের আবেদনকে বাড়িয়ে তোলে। তবে বাসাবাড়ির তুলনায় অফিস ও বাণিজ্যিক ভবনের ইন্টেরিয়রে এসিপি বেশি ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া এসিপি দিয়ে ইন্টেরিয়র ডিজাইনের অংশ হিসেবে কেবিনেট, ওয়ার্ডরোব, বুকশেলফ, সুর‌্যাক এবং অন্যান্য আসবাবও তৈরি করা সম্ভব। বিশেষ করে রান্নাঘর ও বাথরুমের জন্য এই প্যানেল ব্যবহার আদর্শ।  

ক্লাডিং

এসিপি প্যানেলের দীর্ঘস্থায়িত্ব আর নমনীয়তার কারণে এটি ক্লাডিংয়ের জন্য আদর্শ। আধুনিক স্থাপনার ক্লাডিং তৈরিতে বিশেষ করে অফিস ও বাণিজ্যিক ভবনে এসিপি ব্যাপক আকারে ব্যবহার করা হচ্ছে। পুরোনো ভবন সংস্কার করে নতুন ফ্যাসাদ তৈরিতেও এই প্যানেলের জুড়ি মেলা ভার। এসিপি যেকোনো আকারে কাটা যায় বিধায় ক্লাডিং ডিজাইনেও আনা যায় বৈচিত্র্য।

পার্টিশন

আজকাল বেশির ভাগ অফিস ভবনের পার্টিশন দেয়ালকে যতটা সম্ভব কম পুরুত্বে তৈরি ও ব্যবহার করা হয়। অনেকে চান ফ্লোর ওপেন রেখে ন্যূনতম পার্টিশন-ব্যবস্থা। এ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ পার্টিশন তৈরিতে এসিপি দারুণ কার্যকর। ইটের গাঁথুনির বদলে এসিপি দিয়ে পার্টিশন দিলে তা যেমন কিছুটা বাড়তি পরিসর দেয়, তেমনি প্রয়োজনে তা খুলে ঘরের আকার ছোট-বড় করা যায়। 

ফলস সিলিং

ফলস সিলিং কেবল অভ্যন্তর নকশার সৌন্দর্য আবেদনকে বাড়িয়ে তোলে না, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করে। এসিপির যেহেতু পলিথিলিন কোর সমন্বিত, যা তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য হিট-প্রæফিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। এ ছাড়া সহজে ধুলা-ময়লা পরিষ্কার করা যায় বিধায় এসিপি ফলস সিলিংয়ের জন্য আদর্শ।

সাইনেজ

পণ্যের বহুমুখী আউটডোর ও ইনডোর ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য চাই দৃষ্টি আকর্ষক উপকরণ। সেক্ষেত্রে সাইনেজ বেশ কার্যকরী। সাইনেজ হিসেবে এসিপি ব্যবহৃত হচ্ছে বিশ্ব ব্যাপী। সাইনেজকে যেহেতু আবহাওয়ায় নানা বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করতে হয়, সেহেতু এসিপিকে অন্যান্য মাধ্যম থেকে এগিয়ে রাখাই যায়। উজ্জ্বল রং, ওজনে হালকা, টেকসই ও সহজে স্থাপনযোগ্য হওয়ায় এসিপি সাইনেজের জন্য আদর্শ।

যানবাহনের বডি

অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেলগুলো গণপরিবহনের বডিতে ব্যবহারের জন্য দারুণ কার্যকর। শব্দ নিরোধী এবং ডিজাইনের স্বাধীনতা থাকায় এসিপি ব্যবহৃত হচ্ছে বাস, ট্রেন, বিমান ও জাহাজেও। এসব যানবাহনের বডি, দরজা, সিলিং ও ক্যাবিনেট তৈরিতে দারুণ কার্যকর এ উপকরণটি। ওজনে হালকা হওয়ায় এটা যানবাহনের জ্বালানি ব্যয়ও হ্রাস করে, কমায় কার্বন নিঃসরণের হার।

এসিপির আরও যত ব্যবহার

তবে শুধু স্থাপত্য ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজেই সীমাবদ্ধ নেই এই এসিপি প্যানেল। রয়েছে আরও বহুমুখী ব্যবহার। তা ছাড়া স¤প্রতি এসিপি ডিজাইন, রং এবং টেক্সচারের প্রচুর উন্নয়ন সাধন করেছে। এ জন্য যেসব মাধ্যমে বেড়েছে এর ব্যবহারবিধি সেগুলো হচ্ছে- 

  • ক্যানোপি বা তাঁবুর আচ্ছাদন
  • নামফলক
  • ফার্নিচার 
  • লোগো
  • ডিসপ্লে প্যানেল
  • টেবিল টপ
  • কলামের কভার প্রভৃতি।

ব্যবহারের যত সুবিধা

অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেল ব্যবহারে যেসব সুবিধা পাওয়া যায়; সেগুলো হচ্ছে-

  • টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী
  • রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম এবং সহজ রক্ষণাবেক্ষণ
  • মসৃণ পৃষ্ঠদেশ হওয়ায় সহজেই পরিষ্কার করা যায় 
  • ধুলা-ময়লা পরিষ্কার করলে দীর্ঘদিনেও নতুনের মতোই দেখায়
  • এটি সহজে ভাঙে না
  • দাগ ও আঁচড় লাগে না
  • তাপ, ফাঙ্গাস, লবণাক্ততা থেকে স্থাপনাকে রাখে সুরক্ষিত
  • আগুনরোধী বিধায় নিরাপদ
  • রং জ¦লে যায় না বিধায় রং করার প্রয়োজন হয় না
  • ব্যাকটেরিয়ার প্রজনন রোধ করে বিধায় হাসপাতাল ও অন্যান্য স্থাপনার জন্য স্বাস্থ্যকর।

অসুবিধা

  • এসিপি ব্যবহারে বড় ধরনের কোনো অসুবিধার প্রমাণ নেই। তবে একেবারেই যে নেই তা ঠিক নয়। কতিপয় অসুবিধার মধ্যে রয়েছে-
  • হারিকেনের মতো বড় ঝড় মোকাবিলায় ব্যর্থ। তবে কিছু এসিপি নির্মাতা বড় ঝড়ের ক্ষতি রোধ করতে বিশেষ থ্রেডসহ প্যানেল জুড়ে দিচ্ছেন বোর্ডগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে।
  • প্যানেলের জয়েন্টগুলো খুব সাবধানতার সঙ্গে সিল করে পানিরোধী ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়, তা না হলে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করে ড্যাম্পের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। 

দরদাম

এসিপির দাম নির্ভর করে এর পুরুত্ব, কোটিং, টেক্সচার, পরিমাণ, গুণগত মানের ওপর। এ দেশের বাজারে প্রাপ্ত এসিপিগুলোর দাম পড়বে প্রতি বর্গফুট ১০০-৭০০ টাকার মধ্যে।

প্রাপ্তিস্থান

বনানী চেয়ারম্যানবাড়ি, গুলশান, পল্টন, হাতিরপুল, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, মিরপুর, চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়িসহ বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায় এসিপি। এ ছাড়া অনেক আমদানি ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও সংগ্রহ করতে পারেন পণ্যটি। তবে বিভিন্ন স্থাপত্য ও ইন্টেরিয়র ফার্ম ও স্থানীয় মিস্ত্রিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও সংগ্রহ করতে পারেন নির্মাণের এ উপকরণটি।  

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৩তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০২০

কাজী গোলাম মোর্শেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top