নব্বইয়ের দশকে ইন্টারনেটের ব্যাপক বিস্তৃতি তথ্য ও প্রযুক্তিকে এনেছে আমাদের হাতের মুঠোয়। খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসার পর ইন্টারনেট এখন নতুন মৌলিক চাহিদা। ইন্টারনেট, টেলিফোন, ডিশ সংযোগসহ বিভিন্ন পরিসেবা মানুষের ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে রংবেরঙের তারের মাধ্যমে। শহরে মানুষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে তারের বিস্তার। পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাবে বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর তার, ক্যাবলে এখন আর আকাশ দেখা যায় না। তারের জঞ্জাল শহরকে করছে শ্রীহীন; প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। বিদ্যুতের খুঁটিতে বিপজ্জনকভাবে ঝুলে থাকা এসব তার অপসারণ করা ছিল সময়ের দাবি। বিষয়টি আমলে নিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন যত্রতত্র বসানো এই তার অপসারণের উদ্যোগ নেয়।
পাইলট প্রকল্প হিসেবে উত্তরার একটি এলাকার কয়েকটি সড়কের ঝুলন্ত তার সড়কের নিচে করা ইউটিলিটি ডাক্টে নিয়ে যাওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। তবে ইন্টারনেট, ডিশ, জিটিসিএলসহ বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থার বাধার মুখে এই কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। ভবিষ্যতে কীভাবে ঝুলন্ত তারের ব্যবস্থাপনা হবে, সেই বিষয়ে বন্ধন কথা বলেছে নগর পরিকল্পনাবিদ, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ব বিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের সঙ্গে।
(ড. আদিল মুহাম্মদ খান পেশায় নগর পরিকল্পনাবিদ এবং বাংলাদেশে পরিকল্পনাবিদদের জাতীয় পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক। একই সঙ্গে অধ্যাপনা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগে। সেন্টার অব এক্সেলেন্স অন আরবান ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশ-এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন তিনি। পড়াশোনা করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ড. আদিল মুহাম্মদ খানের পরিকল্পনাসংক্রান্ত সমসাময়িক বিভিন্ন লেখা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গবেষণা জার্নাল, গ্রন্থ ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর আগ্রহের বিষয় নগর পরিকল্পনা, উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা এবং যোগাযোগ, আবাসন ও জনবসতি পরিকল্পনা)
০ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইফুল হক মিঠু
বন্ধন: রাজধানীর সৌন্দর্য ফেরাতে সব ঝুলন্ত তার অপসারণের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: ঝুলন্ত তার নিয়ে জটিলতা নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তার অপসারণের তাগাদা ছিল। সিটি করপোরেশন সম্প্রতি জোরালোভাবে উদ্যোগ নিয়েছিল ঝুলন্ত তার তারা অপসারণ করেই ছাড়বে। এত দিন তারা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু ডেডলাইন বা হুঁশিয়ারি দিয়েছে। কিন্তু এই পর্যায়ে কঠোর হয়নি। সেদিক থেকে বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সিটি করপোরেশন যে তারগুলো সরাবে, তার জন্য পরিকল্পনা থাকতে হবে। কেননা তাদের রোড নেটওয়ার্ক অনেক বিস্তৃত। প্রাথমিক রাস্তা, সেকেন্ডারি রাস্তা, লোকাল রাস্তা বা টারশিয়ারি নেটওয়ার্ক আছে। এগুলোর মাধ্যমেই বিভিন্ন সংস্থা পরিসেবাগুলো আদান-প্রদান করে থাকে।
সিটি করপোরেশন রাজধানীজুড়ে আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারছে কি না তা আমাদের জানতে হবে। কেননা বিচ্ছিন্নভাবে কোনো এলাকায় এসব সার্ভিস দিতে গেলে বহুমুখী সমস্যা দেখা দেবে। তার বা ক্যাবল অপসারণের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে পুরো এলাকার ক্যাবল নেটওয়ার্কে আমরা আন্ডারগ্রাউন্ড সিস্টেমে নিতে পারছি কি না এবং এর বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনাগত পরিকল্পনা তৈরী করা হয়েছে কিনা- এই বিষয়সমূহে সমন্বয় প্রয়োজন। বাস্তবতা হচ্ছে, এটিটিএনের (ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক) মাধ্যমে আন্ডারগ্রাউন্ডে যে নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, সেটা আসলে শহরের প্রধান সড়কগুলোতে করা হয়েছে। কিন্তু ভেতরের রাস্তায় সম্ভব হয়নি। এমন বাস্তবতায় ঝুলন্ত তার সরিয়ে ফেলা আক্ষরিক অর্থে এখনই সম্ভব না। এটা নিয়ে সময় নির্ধারণ সাপেক্ষে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকা উচিত। কত দিনে সিটি করপোরেশন প্রধান সড়ক থেকে ঝুলন্ত তার সরাবে, কত দিনে সেকেন্ডারি সড়ক থেকে সরাবে বা কত দিনে অলিগলিতে পৌঁছাবে। ‘ঝুলন্ত তার সরিয়ে ফেলার পুরো প্রক্রিয়াটা সবার সঙ্গে বসে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে করতে হবে। এখানে যেহেতু অনেক স্টেক হোল্ডার আছে, সমন্বিত পরিকল্পনায় যদি এটা না হয়, তাহলে কিন্তু এই উদ্যোগ সফল হওয়ার কথা নয়। এখন যেমন ঝুলন্ত তার সরানোর প্রক্রিয়াটি এখন ঝুলে গেছে।
বন্ধন: ইতিমধ্যে উভয় সিটি করপোরেশনের কিছু এলাকা থেকে অপসারণ করা হয়েছে ঝুলন্ত তার, আবার বাধার মুখেও পড়েছে অভিযান। এ পরিস্থিতিতে এমন উদ্যোগ কি সফল হবে বলে মনে করেন? কিংবা না হলে এর কারণটা কী?
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: নানা কারণে এই উদ্যোগটা সফল হয়নি। প্রথমত, শহরব্যাপী ক্যাবল নেটওয়ার্ক ভ‚গর্ভ দিয়ে যাবার সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। এর কারণে নগরের প্রধান সড়কে হয়তো আমরা ক্যাবল তার ভ‚গর্ভে নিতে পারতাম, তবে অন্য সড়কে ঝুলন্ত তারগুলো থেকে যাবে। আর সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলো পরস্পর পরস্পরিক আলোচনা ও সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি থাকার ফলে সিটি করপোরেশনের বর্তমান উদ্যোগ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভবপর হয়নি। তবে এর মাধ্যমে সিটি করপোরেশন সংশ্লিষ্ট সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি একটা সুস্পষ্ট বার্তা দিতে পেরেছে বলে আমি মনে করি। এটাকে গুরুত্ব দিয়ে সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর এখন থেকে কাজ করা উচিত। ভবিষ্যতে এমন উদ্যোগ নেওয়ার আগে স্বল্প মেয়াদি, মধ্য মেয়াদি ও দীর্ঘ মেয়াদি কী কাজ করা দরকার, সেগুলো এখন থেকেই শুরু করা উচিত তাদের। তাহলে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগটা ভবিষ্যতে হয়তো বা পূর্ণতা পাবে।
বন্ধন: অভিযোগ রয়েছে অভিযান শুরুর আগে ক্যাবল অপরেটরদের যথাযথভাবে অভিহিত করা হয়নি, এমনকি বিকল্প ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। এ ধরনের একটি বৃহৎ কার্যক্রমের আগে আপনাদের মতো নগর পরিকল্পনাবিদ ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া হয়েছে কি?
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: এখানে নগর পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে ডায়লগ করা বা আলাপ-আলোচনা করা হয়নি। এই কারণে এমন প্ল্যান বাস্তবায়নে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে, সেটা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে আমরা দেখেছি সর্বশেষ উদ্যোগটা কিন্তু ভেস্তে গিয়েছে। পেশাজীবিদের সঙ্গে আলাপ অনেক সমস্যা আগে থেকেই চিহ্নিত করা যেত। আমরা আশা করি, যেহেতু এটা সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনার মধ্যে আছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগের আগে তারা পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে অগ্রসর হবে।
বন্ধন: আধুনিক নগরীতে তারের জঞ্জাল দৃষ্টিকটু, পাশাপাশি অনেক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। আবার এই তার না থাকলে বিঘ্নিত হবে স্যাটেলাইট, ইন্টারনেট ও টেলিফোন সেবা। সেই ক্ষেত্রে বিকল্প কী করা যেতে পারে?
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: এই তারগুলো সেবা প্রদান সংস্থাগুলোর প্রধান অবকাঠামো। এটার প্রয়োজন আছে বিধায় সেগুলো সড়কে আছে। এখন নগর নান্দনিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে তারগুলোকে বলা হচ্ছে নগরের সৌন্দর্যের অন্তরায়। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে বিশ্বের অনেক উন্নত শহরেও ওভারহেড পদ্ধতিতে টেলিকমিউনিকেশন ও বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক বিস্তৃত আছে। কিন্তু আমরা যেটা দেখি, আমাদের দেশে ওভারহেড পদ্ধতিতে কেব্ল নেটওয়ার্ক বিস্তারে কেউ কোনো শৃঙ্কলা মানছে না। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে তারের জঞ্জাল। এখন এটার পরিকল্পনাগত সমাধান দুইটা-ওভারহেড পদ্ধতিতে পরিকল্পনামাফিক সুশৃঙ্খল ও নান্দনিকভাবে দৃষ্টিনন্দন করে ওভারহেড পদ্ধতিতে কেব্ল নেটওয়ার্ক সাজাতে পারি। সব সেবা দানকারী কোম্পানি, সংস্থাগুলোর সঙ্গে পরিকল্পনা করে এই নেটওয়ার্ক করলে তারের জঞ্জাল হবার কথা না এবং সেটা নিরাপদ ও হবে।
আরেকটা হচ্ছে কেব্ল তারের পুরো বিতরণ ব্যবস্থাকে ভ‚গর্ভে নিয়ে আসা। বিশ্বের অনেক উন্নত শহরেই সামগ্রিক টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থাপনা আন্ডারগ্রাউন্ডে করা হয়েছে কিংবা পুরোটাই ওভারহেডই রাখা হয়েছে। কোথাও এলাকাভেদে আন্ডারগ্রাউন্ড বা ওভারহেড দুইটাই আছে। তবে এতে খরচের যোগসাজশ আছে। ওভারহেড থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড অনেক ব্যয়বহুল। প্রায় ১০ গুণ খরচ বেড়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ধরনের খরচ যখন বেড়ে যাবে, স্বাভাবিকভাবেই সেটার প্রভাবের কারণে গ্রাহককে বাড়তি টাকা দিতে হবে। আয়-ব্যয়ের পর্যালোচনা (কস্ট বেনিফিট অ্যানালাইসিস) করেই আমাদের দেখতে হবে কোন পদ্ধতিতে কী ধরণের সুবিধা-অসুবিধা আছে।
আবার ওভারহেড পদ্ধতিতে কিছু সুবিধা আছে। এটা আপেক্ষিকভাবে অনেক কম ব্যয়বহুল। ওভারহেড পদ্ধতিতে তার মেরামত দ্রুত ও কম খরচে করা যায়। কিন্তু ঝড়, বাতাস বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে তারগুলো ছিঁড়ে যায়; নষ্ট হয়ে যায়। এক্ষেত্রে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা বিঘ্নিত হয়।
আন্ডারগ্রাউন্ড পদ্ধতিরও অনেক সমস্যা আছে। প্রথম সমস্যা এটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আমাদের মতো স্বল্প আয়ের দেশের পক্ষে আন্ডারগ্রাউন্ডের খরচ জোগানো কঠিন। পুরো সিটি স্কেলে করা আরও কঠিন। বড় রাস্তায় এটা করতে গেলে একধরনের কস্টিং পড়বে। আবার পুরো শহরে নেটওয়ার্ক সাজাতে চাইলেও খরচটা বেড়ে যাবে। এই খরচ জোগানোর সক্ষমতা আমাদের আছে কি না কিংবা সেবা সংস্থাগুলো এটাতে ইচ্ছুক কি না সেটা বড় প্রশ্ন। আবার আমরা যারা ইউজার, তাদের দিক থেকেও খরচ বেড়ে যাবে, গ্রাহকেরা এফোর্ড করতে পারবে কি না সেটাও দেখতে হবে। কেননা আন্ডারগ্রাউন্ড দিয়ে গেলে সেটাতে সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ থাকবে আর এটার ইফেক্ট কাস্টমারের বিলের ওপর পড়বে। কাস্টমার সেই বিল দিতে আগ্রহী কি না এসব বিষয় মাথায় নিয়েই কাজ করতে হবে।
ইন্টারনেট, ডিশসহ অন্যান্য টেলিকমিউনিকেশনকে এখন মৌলিক সেবা বলে গণ্য করা হয়। এ ক্ষেত্রে কেউ যদি মনে কওে বাজার অর্থনীতির নীতি অনুযায়ী যারা কেবল অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম, তারাই এই সেবা নেবে বিষয়টা ন্যায্যতার বিবেচনায় গ্রহনযোগ্য হবে না। মৌলিক সেবা হিসেবে তাই অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনা যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্যতম বিবেচ্য হওয়া উচিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে; ভ‚গর্ভস্থ পরিসেবা সরবরাহ লাইনে বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইন্টারনেট প্রভৃতি যখন যাবে, তখন পুরো খরচটা সাধারণে সেবা প্রদানের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থাকে ভাগাভাগি করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা আছে। তারা এই ধরনের শেয়ারে না গিয়ে, আলাদা আলাদা প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহী। আবার এই ধরণের প্রকল্পের প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয়ের পাশাপাশি পরবর্তীতে ব্যবস্থাপনাগত খরচও আছে। এই ধরণের সরবরাহ লাইনে রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনাগত যদি কোনো গাফিলতি হয়, সেক্ষেত্রে গ্রাহকদের ব্যাপক ভোগান্তি হবার সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের দেশে অধিক বৃষ্টিপাত হওয়ায় অথবা আন্ডারগ্রাউন্ডে লিকেজের কারণে ভ‚গর্ভস্থ পরিসেবা সরবরাহ লাইনে সকল ধরণের পরিসেবাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলে, সারা বছর বিভিন্ন সেবা সংস্থার দ্বারা পর্যায়ক্রমে আমাদের রাস্তায় যে খোঁড়াখুঁড়ি হয়, সেটা কমে আসবার ফলে জনগণের করের টাকার অপচয় বন্ধ হবে।
এটা শুধু সিটি করপোরেশনের একার সিদ্ধান্তের বিষয় না। সব কিছু বিবেচনা করে, সবার সঙ্গে সমন্বয় করে যেটা আমাদের পক্ষে করা সম্ভব, সেটাই করতে হবে। এখানে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আছে কি না, ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল ক্যাপাসিটি-সব কিছু বিবেচনা করে পরিকল্পনা নিতে হবে। সেক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের উচিত হবে সবাইকে নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসা।
আরেকটা বিষয় হলো, বিভিন্ন সেবা সংস্থাগুলো যদি পৃথক পৃথক লাইন করে, তাহলে একদিকে যেমন খরচ বেড়ে যাবে, অন্য দিকে মানুষের ভোগান্তি বাড়বে। যেহেতু কংক্রিট কোনো পরিকল্পনা হয়নি, তাই অনেকেই আলাদা আলাদা ইউলিটি ডাক্ট তৈরি করার কথা বলছে। আমরা শুনছি বিদ্যুতের জন্য আলাদা ডাক্ট হবে; কেননা বিদ্যুৎ অনেক সেনসেটিভ। কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশেই ইউলিটি ডাক্টে বিদ্যুৎ লাইন থাকে। আমাদের এখানে যদি আলাদা আলাদা করি তাহলে খরচ অনেক বাড়বে। এভাবে সংস্থাগুলো আলাদা আলাদা প্ল্যান করলে গ্রাহকেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বন্ধন: বিকল্প পদ্ধতিতে তার নেওয়ার কারিগরি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কি আমাদের আছে?
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: খুব বেশি সক্ষমতা না থাকলেও কাজ করার জায়গা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ভূগর্ভে বিদ্যুতের তার নেওয়ার উদ্যোগ চলমান এবং বিদ্যুত বিভাগের উদ্যোগে ইতিমধ্যে দেশের অনেক জেলাতেই এ ধরনের নেটওয়ার্ক তৈরি করাও হয়েছে।
দেশে প্রথম বারের মতো মাটির নিচ দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রম চালু হয়েছে সিলেটে। সড়কের ওপরে থাকা বিদ্যুতের খুঁটি সরিয়ে মাটির নিচ দিয়ে সংযোগ চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সিলেট শহরে তারের জঞ্জাল কমাতে টেলিফোন, ইন্টারনেট, ক্যাবল লাইনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সব তার ভূগর্ভে নেবার উদ্যোগ চলমান আছে।
নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শহরাঞ্চলের সব বিদ্যুত বিতরণ লাইন ভূগর্ভে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। শুরুতেই দেশের চারটি অঞ্চল সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকাসহ আশপাশের এলাকার বিদ্যুতের বিতরণ লাইন মাটির নিচে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সার্বিক বিচারে এ ধরণের অবকাঠামো নির্মাণ করবার সক্ষমতা আমাদের দিন দিন বাড়ছে।
বন্ধন: ঝুলন্ত তার সিটি করপোরেশন-আইএসপিআর পারস্পরিক দোষারোপ করছে। সমন্বয় হচ্ছে না কেন?
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: আমাদের দেশে মন্দ ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এখানে কেউ কারও সঙ্গে সমন্বয় করতে চায় না। প্রতিটা প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্নভাবে তাদের মতো করে কাজ করতে চায়। আন্তঃসংস্থা ও আন্তঃমন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করার জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ে নির্দেশনা ও নজরদারির অভাব রয়েছে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আলাদা করে প্রকল্প প্রণয়ন করলে প্রতিটা সংস্থার পক্ষে আলাদা আলাদা প্রকল্প নেওয়া সম্ভব। তারা মনে করে, সমন্বিতভাবে প্রকল্প নেয়া হলে সেই ধরনের আর্থিক সুবিধা পাবে না, ফলে তারা এতে খুব একটা আগ্রহ দেখায় না। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন সংস্থার জন্য পৃথক পৃথক পরসেবা লাইনের পরিবর্তে সমন্বিত ভাবে ভূগর্ভস্থ পরিসেবা লাইন তৈরি করা হলে অনেক খরচ কমানো সম্ভব।
বিদ্যমান বাস্তবতায় আন্তঃসংস্থা ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় নিশ্চিত করবার জন্য সংসদীয় কমিটিগুলো কাজ করতে পারে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কাজ করতে পারে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কাজ করতে পারে। সব মিলিয়ে সমন্বয়ের এই উদ্যোগটা নেওয়া অতি জরুরি।
বন্ধন: ইউটিলিটি ডাক্ট বসিয়ে মাটির নিচ দিয়ে তার আনা-নেওয়া কতটা নিরাপদ? এতে কী ধরনের ঝুঁকি থাকে?
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: নিরাপত্তার দিক থেকে এটা ওভারহেডের চেয়ে নিরাপদ বেশি। কেননা ওভারহেডে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে লাইনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা বেশি। মাটির নিচ দিয়ে নিলে প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে কিংবা নগর বন্যার ফলে ভূগর্ভে পানির লিকেজের কারণে বিভিন্ন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ ছাড়া বারবার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িসহ নানা কারণে গ্যাস লাইন লিকেজের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। সয়েল কোয়ালিটি ভালো না থাকলে আমাদের আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন নষ্ট হবার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। ভূগর্ভস্থ পরিসেবা লাইনে একধরনের এয়ার ফ্লো থাকলে সেই লাইনগুলো ভাল কাজ করে। কিন্তু সেই ধরনের সিস্টেম তৈরি করা, সেই ধরনের প্রযুক্তি ও নিজস্ব বিশেষজ্ঞ আমাদের তুলনামূলকভাবে অনেক কম, ফলে এ ধরনের পরিসেবা লাইনের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষন করার জন্য আমাদের কারিগরি দক্ষতা দিনে দিনে বাড়াতে হবে।
ভূগর্ভে পরিসেবা লাইন নেবার সিদ্ধান্ত নেবার সময় আমাদের আয়-সুবিধা বিশ্লেষণ করা দরকার। আবার কারিগরিভাবে আমরা কতটা প্রস্তুত, সেই বিষয়ে আগেই ভাবতে হবে। বিশেষ করে আমাদের দেশে ফায়ার সেইফটি একটা বড় ইস্যু। একই সাথে সেবা সংস্থাগুলোর কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ জন্য সেবা সংস্থাগুলোর ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যাপাসিটি, ফাইন্যানশিয়াল ক্যাপাসিটি, মনিটরিং ক্যাপাসিটি যদি আমরা বাড়াতে না পারি, শুধু আমরা লাইনগুলো টেনে দিলাম, টানার পরে মেইনটেন্যান্স ও সেইফটি স্ট্যান্ডার্ডে যাওয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের আছে কি না সেই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে নানা ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এতে দীর্ঘসময়ের জন্য আমাদের পরিসেবাগুলো বন্ধ থাকতে পারে।
বন্ধন: নিজস্ব ড্রেন বা সড়কের নিচ দিয়ে নিজেরাই ফাইবার অপটিক ক্যাবল স্থাপন করে তার আদান-প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে ডিএনসিসি। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: জিনিসটা সার্বিক পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত। শুধু ফাইবার অপটিক ক্যাবল ভূগর্ভে স্থাপনের পরিকল্পনা না করে অন্যান্য পরিসেবাগুলোকে নিয়ে সমন্বিতভাবে ভূগর্ভস্থ পরিসেবা লাইন তৈরি করা যায় কিনা সে ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। তার মানে বিচ্ছিন্নভাবে একটা পরিসেবা নিয়ে কাজ করলে নগরবাসী এর সুবিধা পাবে না। যে সকল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সরকারের পক্ষ থেকে প্রকল্প নিয়ে এনটিটিএন (ভূগর্ভস্থ কেবল লাইন) স্থাপন করেছে, তারা স্বভাবতঃই ব্যয় তুলে আনতে চাইবে। ফলে করপোরেশন পৃথক লাইন তৈরি করুক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তা চায়না। বড় সড়কের বাইরে সেকেন্ডারি এবং অভ্যন্তরীণ অনেক সড়কে ভূগর্ভস্থ কেবল লাইন তৈরি করা হয়নি। ফলে সকল অংশীজনদের সাথে নিয়েই সিটি করপোরশনকে এ বিষয়ে সার্বিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কে কোন ধরনের কাজ বাস্তবায়ন করবে তা ঠিক করে নিতে হবে যেন জনভোগান্ত কম হয় ও জনস্বার্থ রক্ষা পায়।
বন্ধন: চলছে মাটির নিচ দিয়ে ক্যাবল নেওয়ার পাইলট প্রকল্পও। মাটির নিচ দিয়েই তার টানার মতো কোনো উপযুক্ত অবকাঠামো আছে কি?
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: আমাদের দেশে বর্তমানে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাতে দেশি প্রতিষ্ঠানের বাইরে বিদেশী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও কাজ করে থাকে। বিদেশিদের দিয়ে কাজ করালে স্বভাবতঃই খরচ বাড়ে। প্রযুক্তিগত কিংবা অবকাঠামোগত সক্ষমতা হয়তো আমাদের আছে; কিন্তু পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় নিয়েই আমাদের এগোতে হবে। গ্রাহকদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাশাপাশি পরিচালনা ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, প্রকল্পের কস্ট-রিকভারি সময়কাল মাথায় নিয়েই আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বন্ধন: উন্নত দেশে কীভাবে ঝুলন্ত তারের ব্যবস্থাপনা হচ্ছে?
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শহরে এই পদ্ধতির ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। কোথাও ওভারহেড পদ্ধতিতে কেবল ও টেলিকমিউনিকেশন সেবা প্রদান চালু আছে আবার কোথাও আন্ডারগ্রাউন্ড পদ্ধতি চালু আছে। আবার কোথাও এলাকাভেদে একই সঙ্গে দুটোই চালু আছে। একেক দেশ তাদের কারিগরী ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা, স্থানীয় এলাকার প্রেক্ষিত বিবেচনা করে ঝুলন্ত তারের ব্যবস্থাপনা করছে। তারা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও গবেষণা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। ভূগর্ভস্থ পরিসেবা লাইন তৈরি করা যেহেতু ব্যয়সাপেক্ষ বিষয়, তাই অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ যেমন ইংল্যান্ড, জার্মানি, আমেরিকার মত দেশগুলো এ ধরনের পরিসেবা লাইন তৈরি করতে পেরেছে। আবার জাপানের টোকিওর মত বড় শহরের মাত্র ৭ ভাগ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পরিসেবা লাইন আছে, শহরের বাকি অঞ্চলগুলোতে ওভারহেড পদ্ধতিতে সরবরাহ ব্যবস্থা বিদ্যমান।
বন্ধন: পূর্বাচলের মতো যেসব নতুন শহর গড়ে উঠছে, সেখানে বৈদ্যুতিক ও অন্যান্য সেবা সংযোগব্যবস্থা মাটির নিচ দিয়ে নেওয়ার মতো বিষয় পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে কি? যদি না হয়, তবে সমস্যা কোথায়?
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: এখন নতুন যে শহরগুলো গড়ে উঠছে, সেখানে কম খরচে এ ধরনের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সহজ। পূর্বাচলে ইতিমধ্যে বিদ্যুতের লাইন টানা হয়েছে। এখন আন্ডারগ্রাউন্ডে দিয়ে তার টানার কথা ভাবছে সরকার। এই নিয়ে সরকার এখন সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। আমরা কিন্তু সেখানে ইতিমধ্যে তার টানার একটা খরচ দিয়েছি। যখন পূর্বাচলে প্রথমে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন নেবার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল, তখন বিদ্যুৎ বিভাগ আন্ডারগ্রউন্ড দিয়ে তার টানার প্রস্তাব দিয়েছিল রাজউকের কাছে। কিন্তু রাজউককে তার ব্যয়ের অংশ বহন করতে সম্মত হয় নি। আন্তঃসংস্থার সমন্বয়ের অভাবে আমরা দেখছি এমন জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
তবে পূর্বাচলে শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ নয়, পুরো ইউটিলিটি আমরা ভূগর্ভস্থ পরিসেবা লাইনের মাধ্যমে নিতে পারি কি না সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা করা দরকার। সেটা পূর্বাচল প্রকল্পের উন্নয়ন কর্মকান্ড শেষ হবার আগেই যদি পরিকল্পনামাফিক আমরা ভূগর্ভস্থ পরিসেবা লইন তৈরী করতে পারি, তাহলে আমাদের খরচ তুলনামূলকভাবে কম হবে। মানুষের বসবাস শুরু করার আগেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে আমাদের ব্যয়সাশ্রয় হবে এবং জনস্বার্থ নিশ্চিত হবে।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৩তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০২০