ডিজিটাল দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। ডিজিটাল হওয়ার অন্যতম শর্ত সর্বত্র তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধার সহজপ্রাপ্যতা। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, টেলিফোন, ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট চ্যানেল ও অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তি সেবা পৌঁছে দিতে হবে সহজেই। আর এসব সেবা সংযোগ নিশ্চিত করতেই এ দেশের শহর-নগরজুড়ে ছেয়ে আছে অগণিত ঝুলন্ত তারের জঞ্জাল। সড়ক ও অলিগলির বিদ্যুতের খুঁটিতে বছরের পর বছর জালের মতো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েছে তার আর তার। অতিরিক্ত তারের ভারে ঝুলে পড়া তারগুলো যেন ফুটপাত দিয়ে হাঁটা পথচারীদের মাথা ছুঁয়ে যায়! এতে নিরাপত্তাহীন পথচারী ও আশপাশের মানুষেরা। নগরজুড়ে থাকা এসব তারের জঞ্জালের কারণে যেমন নষ্ট হচ্ছে নগরের সৌন্দর্য, তেমনি ঘটছে নানা দুর্ঘটনা। নগরের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা ফেরাতে এবার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আবশ্যকীয় তার ছাড়া নগরের সবার ঝুলন্ত তার অপসারণে কার্যক্রম শুরু করেছে তারা। এই উদ্যোগ যদি সফল হয় তাহলে পূরণ হবে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষা; কমবে দুর্ঘটনার শঙ্কা; সৌন্দর্য ফিরে পাবে নগর ঢাকা; মিলবে বাঁধাহীন মুক্ত আকাশ।
ঝুলন্ত তারের বিড়ম্বনা
এ কথা অনস্বীকার্য বিদ্যুৎ ও অন্যান্য তথ্য যোগাযোগ সেবা আমরা পাই সংযোগকৃত বিভিন্ন তার থেকেই। এসব সুযোগ-সুবিধা ছাড়া নগরজীবন কল্পনাই করা যায় না। সে দিক থেকে চিন্তা করলে এসব সংযোগকারী তারে নানাভাবে উপকৃত হচ্ছি আমরা। কিন্তু অসুবিধা যে করছে না তা কিন্তু নয়! সবচেয়ে বড় সমস্যা অনেক সংযোগ প্রতিষ্ঠানের তার রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে নেই নূন্যতম শৃঙ্খলা। সড়কের ওপর বৈদ্যুতিক খুঁটি, তাতে তারের কুন্ডলি, বড় বড় ট্রান্সফরমার। যে যেভাবে পেরেছে, সে সেভাবে তারগুলো টানিয়েছে। দেখে বোঝার উপায় নেই কোন তার কোন সংস্থার। একই মহল্লায় দেখা যায় অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেট ও ডিশ সংযোগ। তারগুলোতে আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ঝোলাতেও দেখা যায়। অথচ দিনে দিনে এসবের পরিসর বাড়ছেই; ছেয়ে যাচ্ছে পুরো শহর, গ্রাম ও জনপদ। এসব বৈদ্যুতিক তারের খুঁটিতে প্রায়ই হালকা শটসার্কিটে আগুন লেগে যায়। ঝোড়ো বাতাসে গাছ পড়ে ছিঁড়ে যায় তার। পিলার উপড়েও ঘটে দুর্ঘটনা। মারা যায় অসংখ্য মানুষ; নষ্ট হয় কোটি কোটি টাকার সম্পদ। তাই বিশৃঙ্খল, দৃষ্টিকটু ও বিপজ্জনক এসব সংযোগ তারের শৃঙ্খলা আনা প্রয়োজন আমাদের পরিবেশ, অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে।
তার অপসারণে যত ক্ষতি ও প্রতিবন্ধকতা
রাজধানী থেকে ঝুলন্ত তার অপসারণ অভিযান শুরু হয় জোরালোভাবে। সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কর্তাব্যক্তিদের উপস্থিতিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে চলে এই কার্যক্রম। এরই মধ্যে উভয় সিটি করপোরেশনের বেশ কিছু এলাকায় ঝুলন্ত তার কাটা হয়েছে। কিছু এলাকায় তার সরানোর জন্য কয়েক দিনের সময়ও দেওয়া হয়। তবে অনুমোদনহীন এসব তার অপসারণ সিদ্ধান্তকে পরিবেশকর্মী ও নগরবাসীরা স্বাগত জানালেও বিকল্প ব্যবস্থা না করে তার কাটার কারণে বেশ বিপাকে সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান ও সেবাগ্রহীতারা। কোটি কোটি টাকার তার কেটে ফেলায় চরম বিপাকে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেবাদানকারীরা। প্রথমে তারা তার অপসারণ কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধ করে। তাতে সাড়া না মেলার প্রতিবাদে ধর্মঘটের ঘোষণা দেয় ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) ও ক্যাবল অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)। কয়েক দিন কিছু সময়ের জন্য ইন্টারনেট সেবা বন্ধও রাখা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে তার না কাটার আশ্বাস পেয়ে ওই দুটি সংগঠন প্রতিবাদ কর্মসূচি স্থগিত করে। কিন্তু এর ফলে সমস্যাটির কোনো সমাধান না হয়ে বরং তা বরাবরের মতো ঝুলেই রয়।
অথচ রাজধানীর সড়কগুলোর সৌন্দর্য বাড়াতে প্রায় ২০০৯ সালে ঝুলন্ত তার অপসারণের উদ্যোগ নিয়েছিল টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা-বিটিআরসি। ২০১০ সালে উদ্যোগও নেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। সে সময় সব পক্ষকে নিয়ে সমনি¦তভাবে বৈঠক হলেও কোনো ফল আসেনি। বাংলাদেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগের বিস্তার ঘটাতে ২০১১ সালে ভূগর্ভস্থ ক্যাবল সেবা প্রদানের জন্য ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) বেসরকারি দুটি প্রতিষ্ঠান ফাইবার অ্যাট হোম এবং সামিট কমিউনিকেশনস লিমিডেটকে লাইসেন্স দেওয়া হয়। তবে এখনো দেশের সর্বত্র অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপন করতে পারেনি এসব কোম্পানি। ঝুলন্ত তার অপসারণে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন (আইএসপিএবি) ও ডিশ সংযোগ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ক্যাবল অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশকে (কোয়াব) আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে বারবার। কমিটি গঠন করে বিভিন্ন সময় একেকটি সড়কের ঝুলন্ত তারও কাটা হয়েছে। তবে তার কেটে দেওয়ার পরপরই আবারও তার ঝুলিয়ে সড়ককে পুরোনো রূপে ফিরিয়ে নেয় তারা।
বিভিন্ন সেবা সংযোগ কেটে দেওয়ায় ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে চরম বিপাকে পড়ে প্রায় ১ লাখ ইন্টারনেট গ্রাহক। করোনাভাইরাসের এই সময়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন যাঁরা অনলাইনে কাজ করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের অনলাইনেই ক্লাস, ফ্রিল্যান্সিং, ভার্চুয়াল মিটিং, টেলিমেডিসিন, ই-কমার্স, ই-লার্নিং সবকিছুই চলছে এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ফলে সেবাদানকারী সংস্থার পাশাপাশি চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে অসংখ্য গ্রাহকও।
ঝুলন্ত তারের ভবিষ্যৎ
তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ চলতি বছরের মধ্যেই ইন্টারনেট ও ক্যাবল টিভি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর তার মাটির নিচে নেওয়ার ব্যাপারে বেশ আশাবাদী। সরকার উন্নত বিশ্বের মতো ভূগর্ভস্থ কমন নেটওয়ার্ক অর্থাৎ নেশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) তৈরি করেছে, যাতে মাথার ওপরে ঝুলে থাকা তার বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে নামিয়ে ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থাপনায় সংযুক্ত করা হয়। ইন্টারনেট সচল রেখে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার নামিয়ে ভূগর্ভস্থ করা সম্ভব। সিটি করপোরেশন চাইছে ফুটপাতের নিচে অথবা ড্রেনের নিচ থেকে ডাক্টিং পাইপ বসিয়ে, সেখান দিয়ে তার নিতে। এ জন্য তাদের মাসিক বা বার্ষিক নির্দিষ্ট হারে ফি দিতে হবে।
এ ছাড়া ‘বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা স¤প্রসারণ এবং শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ ক্যাবল নেটওয়ার্ক তৈরি করে রাজধানীর একটি বড় অংশের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। এ জন্য মাটির নিচে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন নির্মাণ করার নকশা তৈরি করেছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)। মাটির নিচ দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের নেটওয়ার্ক গড়তে আরও কয়েকটি বড় প্রকল্পে নিচ্ছে ডিপিডিসি ও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) লিমিটেড। চলতি অর্থবছরেই এসব প্রকল্পের অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে রাজধানীর সব এলাকার বিদ্যুতের তার মাটির নিচে চলে যাবে আশা করছে প্রতিষ্ঠান দুটি। শুধু বিদ্যুতের তার নয়, কিছু সাবস্টেশনও নেওয়া হবে মাটির নিচে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে যত অন্তরায়
টেলিফোন, ইন্টারনেট ও ডিশ সংযোগ প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো না কোনোভাবে ব্যবহার করছে বিদ্যুতের খুঁটি। অথচ এটা ব্যবহারের জন্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কারও নেই চুক্তিপত্র। ক্যাবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬-এর ২৫ নম্বর ধারায় বলা আছে, কোনো সার্ভিস প্রোভাইডারের যদি সংযোগ স্থানান্তরের জন্য সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত স্থাপনা ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়; তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান থেকে লিখিত অনুমোদন নিতে হবে। অনুমোদন ছাড়া ক্যাবল সংযোগের কাজে তারা কারও স্থাপনা ব্যবহার করতে পারবে না। আইনের উপধারা ২৮ (২) অনুসারে, যদি কোনো ব্যক্তি এই আইন লঙ্ঘন করে তাহলে তাকে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদন্ড, ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে। এ ছাড়া অপরাধ পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদন্ড অথবা ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করার বিধান আছে।
অন্যদিকে আইএসপিএবি বলছে, নিয়ম অনুযায়ী এনটিটিএনের কাছ থেকে সংযোগ বা তার ভাড়া নিয়েই তাদের ব্যবসা পরিচালনা করা হয়। তবে তাদের লোকাল ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্ট (এলডিপি) গ্রাহক অবস্থানের খুব কাছাকাছি নেওয়া যায়নি বলে বাধ্য হয়েই তার টেনে সংযোগ দিতে হয়। ঢাকায় প্রায় ৪৫ লাখ ব্রডব্যান্ড সংযোগ রয়েছে। যথাযথ সুবিধা তৈরি না হওয়ায় সেবাদাতা বিভিন্ন খুঁটি ব্যবহার করছে। তা ছাড়া এনটিটিএনের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এলডিপি ব্যবহারের জন্য অস্বাভাবিক বার্ষিক ফি দাবি করে, যা আইএসপিগুলোর পক্ষে প্রদান সম্ভব না। তা ছাড়া এই ফি প্রদানের ফলে গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ প্রায় ৪ থেকে ৫ গুণ বেড়ে যাবে। ফলে বিদ্যুতের তার ভূগর্ভে গেলেও অন্যান্য তারের জঞ্জাল থেকেই যাচ্ছে।
তারবিহীন শহরের তালিকায়
ঝুলন্ত তার ও বিদ্যুতের লাইন ভূগর্ভে নিয়ে দেশের প্রথম তারবিহীন শহরে নাম লেখায় সিলেট। নগরের শাহজালাল (রহ.) দরগাহ সড়কটির বিদ্যুতের তারের সব জঞ্জাল টানা হয়েছে মাটির নিচ দিয়ে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিশেষ উদ্যোগে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ‘বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প, সিলেট বিভাগ’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে সিলেট শহরে পাইলট ভিত্তিতে বৈদ্যুতিক লাইন আন্ডারগ্রাউন্ড বা ভূগর্ভস্থে রূপান্তরের কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা। চট্টগ্রামেও মাটির নিচ দিয়ে বিদ্যুতের তার নেওয়ার কাজ শুরু হচ্ছে শিগগিরই। নগরের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তিন হাজার কিলোমিটার বিদ্যুৎ-সংযোগের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৫০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মাটির নিচ দিয়ে নেওয়া হবে বৈদ্যুতিক তার। খুলনা মহানগরীর সব বৈদ্যুতিক লাইনও মাটির নিচ দিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)। এ লক্ষ্যে শিগগিরই ফিজিবিলিটি স্টাডি শুরু হচ্ছে। তবে দুঃখের বিষয়, সিলেট নগরে ‘পাতাল বিদ্যুৎ’ প্রকল্প থমকে গেছে পিডিবি, ডিশ-ইন্টারনেট প্রোভাইডার ও সিসিকের ত্রি-পক্ষীয় সমন্বয়হীনতার কারণে। ফলে তারের জঞ্জাল থেকে সহজে মুক্ত হচ্ছে না সিলেট নগরী।
সমস্যা সমাধানে করণীয়
বৈদ্যুতিক তারকে বলা হয় বিদ্যুৎ সিস্টেমের নার্ভ। অন্যান্য পরিসেবা সংযোগগুলোও তথ্যপ্রযুক্তি নিশ্চিত করতে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। পরিকল্পনাহীনতা, সমন¦য়হীনতা, উদ্যোগ ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে বিভিন্ন তারের সংযোগ আজ পরিণত হয়েছে জঞ্জালে। নগর হারিয়েছে সৌন্দর্য। অথচ নগরের আয়তন বাড়ছে প্রতিনিয়ত। তারের সঠিক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন সুপরিকল্পিত বুদ্ধিদীপ্ত নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা। জিআইএস (এবড়মৎধঢ়যরপধষ ওহভড়ৎসধঃরড়হ ঝুংঃবস)-এর ভিত্তিতে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় তার ব্যবস্থাপনা করা উচিত। তা ছাড়া যেহেতু এটা দীর্ঘদিনের সমস্যা, তাই সমাধানেও সময় নিয়ে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে করা উচিত। এই কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, স্থপতি, গবেষক ও সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোকে। তারের শৃঙ্খলা আনতে ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় যেসব উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে তা হলো-
ভূগর্ভস্থ ক্যাবলিং অথবা টানেল পদ্ধতি
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বহুমুখী চাহিদা মেটাতে সুষম উন্নয়ন ও আধুনিকতার সঙ্গে তাল মেলাতে ভূমির বৈজ্ঞানিক ব্যবহার জরুরি। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে ভূমির উপরিভাগের পাশাপাশি অভ্যন্তরেও অবকাঠামো নির্মাণ করে। যেমন, জাপানের এক-চতুর্থাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। ইউরোপের অধিকাংশ দেশের শহরগুলোতে ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক দিয়ে বাসাবাড়িতে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আগরতলা শহরে প্রায় ৭৭ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইন মাটির নিচ দিয়ে করা হয়েছে। বাংলাদেশের মতো ঘন বসতিপূর্ণ দেশে অনেক আগেই টানেল সিস্টেম চালুর প্রয়োজনীয়তা থাকলেও অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও পারিপার্শ্বিক সমস্যার কারণে তা আর আলোর মুখ দেখেনি।
টানেল মূলত মাটির বা পানির নিচ দিয়ে নির্মিত বিশেষ ধরনের প্যাসেজওয়ে, যা মূলত চারপাশে পরিবেষ্টিত মাটি ও পাথরের মধ্য দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে খননকাজ পরিচালনার মাধ্যমে নির্মিত। ইউটিলিটি টানেল মূলত গ্যাস, টেলিফোন, বৈদ্যুতিক সংযোগ সৃষ্টির জন্য ব্যবহৃত হয়। তার ব্যবস্থাপনা ছাড়াও বাংলাদেশের বড় শহরগুলোর প্রধান দুটি সমস্যা জলাবদ্ধতা ও যানজটও রোধ করা সম্ভব সুপরিকল্পিতভাবে টানেল নির্মাণের মাধ্যমে। টানেল দিয়ে অন্যান্য নাগরিক সুবিধা যেমন-গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া যাবে এবং যে কোনো ধরনের সমস্যায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ছাড়াই তা রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ টানেল নির্মাণের ফলে শহরগুলোর ড্রেনেজ-ব্যবস্থাকে একটি ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের আওতায় আনা সম্ভব। যার ফলে বৃষ্টির পানি খুব দ্রুত সরে গিয়ে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলবে নগরবাসীর। ব্যয়সহ নানা কারণে যদি টানেল নির্মাণ সম্ভব না হয় তবে ভূগর্ভস্থ ক্যাবলিংয়ের মাধ্যমে ভাসমান তারের ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। ফলে সরকারি অর্থের অপচয় কমে আসবে অনেকটাই।
সুবিধাসমূহ
- নগরীর সৌন্দর্য ফিরবে
- বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে
- বৈদ্যুতিক অগ্নিকান্ডের ঘটনা কমবে
- ঝড়, বজ্রপাত, গাছের ডাল পড়ে তার ছেঁড়া বা নষ্ট হবে না
- রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমবে
- ভোল্টেজ স্বাভাবিক থাকবে
- হাইভোল্টেজ থেকেও মিলে সুরক্ষা
- জায়গা কম লাগবে
- তার চুরির ঝুঁকি কমবে
- অবৈধ সংযোগ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
যেসব এলাকার জন্য উপযোগী
- জনবহুল শহর
- আবাসিক এলাকা
- বাণিজ্যিক এলাকা
- ইপিজেড
- আইটি ভ্যালি
- মেট্রোরেল প্রভৃতি।
যেসব উপযোগিতা পাওয়া যাবে
- রাজনৈতিক
- সামাজিক
- অর্থনৈতিক
- পর্যটন
- পরিবেশগত।
ওভারহেড ব্যবস্থাপনা
প্রচলিত ব্যবস্থায় সুপরিকল্পনার মাধ্যমে ওভারহেড পদ্ধতিতে বিশৃঙ্খল তারের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চালু রয়েছে এ পদ্ধতি। বিশেষ ধরনের ট্র্রে, পাইপ অথবা একত্রে তারগুলোকে সংযুক্ত করেও ওভারহেড পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এটা কঠিন কিছু নয়, অগোছালো তারগুলোকে গুছিয়ে একত্রিত করা। তার ছিঁড়ে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সহজেই মেরামত করা সম্ভব। অনেক কম খরচে এ কাজটি করা যায়। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই পদ্ধতি বেশ কার্যকর। তবে এ জন্য সব সেবদানকারী সংস্থাগুলোকে পরিকল্পিত ও সমনি¦তভাবে কাজটি করতে হবে।
তারবিহীন ব্রডব্যান্ড/ওয়াইম্যাক্স ইন্টারনেট
উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটকে সুলভ ও সহজে ব্যবহারের উপযোগী করার জন্য তারবিহীন দ্রুতগতির ইন্টারনেট প্রযুক্তি ‘ওয়াইম্যাক্স’। সোজা কথায়, ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তি ওয়াই-ফাইয়ের বর্ধিত রূপ। আর ওয়াইম্যাক্সের মাধ্যমে সারা দেশে একই ধরনের নেটওয়ার্ক গড়া সম্ভব, সম্ভব বড় শহরে নেটওয়ার্ক করা। ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে কম ব্যান্ডউইথড ফ্রিকুয়েন্সির মাধ্যমে ব্যবহার করা যায়। একটি টাওয়ার দিয়ে ৪ থেকে ৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় তারবিহীন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া সম্ভব। মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ কম্পিউটারে ক্ষুদ্র একটি চিপ যুক্ত করে ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র মানুষ বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সহজে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবে। আর মোবাইল ফোন ব্যবহারের মতোই সহজ এই প্রযুক্তিটি।
তবে ওয়াইম্যাক্স সেবা এখনো আসেনি বাংলাদেশে। কারণ, দেশে শক্তিশালী ক্যাবল নেটওয়ার্ক-ব্যবস্থা নেই। তবে শিগগিরই চালু করার প্রচেষ্টা রয়েছে। ওয়াইম্যাক্স সেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন হবে লাইসেন্সের। ইতিমধ্যে তিনটি লাইসেন্স দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-বিটিআরসি। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এ লাইসেন্স দেওয়া হবে এবং এ জন্য করা হবে নিলামের আয়োজন। দরপত্রে অংশগ্রহণের প্রাথমিক ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। এত বেশি টাকা দিয়ে লাইসেন্স নেওয়া অনেকটাই অসম্ভব বলে দাবি ইন্টারনেট সেবাদাতাদের সংগঠন আইএসপিএবির।
বাংলাদেশে ওয়াইম্যাক্স ইন্টারনেট চালু যখন অনেকটাই ‘উচ্চাভিলাষী প্রকল্প’ তখন আশার আলো হতে পারে দেশীয় এক তরুণ প্রযুক্তিবিদ ফজলে রাব্বি রবিনের আবিষ্কার। তিনি তারবিহীন দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট উদ্ভাবন ও সেবা প্রদান করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। নিজ এলাকায় সুউচ্চ একটি টাওয়ার বসিয়ে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর, ভৈরব, বাজিতপুর ও কটিয়াদী উপজেলার প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় তারবিহীন উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা প্রদান করছেন তিনি। জাতীয়ভাবে এই প্রযুক্তি কাজে লাগানো গেলে দেশের সর্বত্রই অনেক কম করচে ও সহজেই তারবিহীন দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে।
ডিটিএইচ প্রযুক্তি
তারযুক্ত ডিশ ব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে ডিটিএইচ (ডিরেক্ট টু হোম) প্রযুক্তি। এই ব্যবস্থায় উচ্চ ক্ষমতাধর জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টেলিভিশন সিগন্যালকে গ্রাহকের টেলিভিশনে পৌঁছে দেয় ছোট অ্যান্টেনা ও একটি স্যাটেলাইট রিসিভার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ব্যবস্থা চালু আছে। এক্ষেত্রে গ্রাহকদের অ্যান্টেনা ও স্যাটেলাইট রিসিভার স্থাপন করতে হয়। বাংলাদেশে এই প্রযুক্তি সেবা দিচ্ছে বেক্সিমকো কমিউনিকেশন ও বায়ার মিডিয়া লিমিটেড-আকাশ ডিটিএইচ ‘রিয়েল ভিউ’ নামে। এই সংযোগ পেতে গ্রাহককে একটি রিয়েল ভিউ সেট-টপ বক্স ও ডিশ অ্যান্টেনা কেনার প্রয়োজন হয়। এই সেট-টপ বক্স ও অন্যান্য সেবা পেতে গ্রাহককে দিতে হয় ৪,০০০-৫,০০০ টাকা। এ ছাড়া মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফিবাবদ প্যাকেজভেদে দিতে হয় ২৫০-৪০০ টাকা।
গৃহীত এ সব ব্যবস্থাপনায় পুরো নগর বদলে যাবে দৃষ্টিনন্দন রূপে। নগর ঢাকা থেকে তার আর খুঁটি সরানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎসহ যাবতীয় পরিষেবার লাইন মাটির নিচ দিয়ে নিলেই বদলে যাবে চিরচেনা ঢাকার আকাশ; নবরূপে ফিরবে জঞ্জালমুক্ত তারবিহীন ঢাকা।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৩তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০২০