ভবন ‘নির্মাণ’ এবং মান নিয়ন্ত্রণ (পর্ব ২)

……পূর্ব প্রকাশের পর

টেকসই ও গুণগত মানসম্মত একটি ভবন নির্মাণে মান নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কাজটি বাস্তবায়নকালে যে প্রধান চারটি বিষয় (মালামাল, যন্ত্রপাতি, লোকবল ও কাজের পদ্ধতি) এর উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়, তা ধারাবাহিকভাবে আলোচিত হলো-

মালামাল

একটি ভবনের স্ট্রাক্চার বা কাঠামো নির্মাণকল্পে ব্যবহৃতব্য মালামাল (ইট, পাথর, রড, সিমেন্ট, বালু ইত্যাদি) অবশ্যই গুণগত মান সম্পন্ন হতে হবে। বর্তমানে প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে নির্মাণসামগ্রীর সার্বিক চাহিদা বিবেচনা করে বিভিন্ন মান ও দামের নানা ধরণের মালামাল বাজারে বিদ্যমান। সাথে আছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, যারা নিজেদের ফায়দার কথা চিন্তা করে অনভিজ্ঞ ও নিরীহ জনসাধারণকে ঠকানোর জন্য সদা উম্মুখ থাকে। চটক্দার কিছু কথাবার্তা বলে বেশি দামে নিম্নমানের মালামাল গছিয়ে দিয়ে অধিক মুনাফা লুটতে চায় নির্মাণপণ্য এই ব্যবসায়ীরা। যার ভবিষ্যত কুফল ভোগ করতে হয় ক্রেতা বা ভোক্তা সাধারণকে। আমাদের দেশে অবস্থাভেদে ৫০ থেকে ১০০ বছর লাইফ টাইম ধরে একটি ভবনের ডিজাইন করা হয় এবং ভবনের এই লাইফ টাইম সার্বিকভাবে নির্ভর করে প্রকল্পটি বাস্তবায়কালে ব্যবহৃত মালামালের গুণগত মান ও কাজের পদ্ধতির উপর।

সুতারাং যে কোনো ভবন নির্মাণকল্পে মালামাল সংগ্রহ করতে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ জনবল, যে কিনা চোখে দেখেই অত্র মালামালের গুণগত মান ৭০-৮০% পর্যন্ত নিশ্চিত করতে সক্ষম। আর বাকি ২০% অর্থাৎ ১০০% নিশ্চিত করণার্থে নির্বাচিত মালামালের স্যাম্পল কালেক্শন করে ল্যাব টেষ্টে পাঠাতে হবে। উল্লেখিত প্রতিটি মালের গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু প্যারামিটার আছে, যার সাথে ল্যাব টেষ্টের ফলাফল মিলিয়ে নিতে হবে।

এছাড়া, মালামাল সংগ্রহের পর নির্মাণ পূর্ববর্তী সময়ে তার সুষ্ঠু সংরক্ষণও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রসংগতঃ ইট, পাথর, বালি ইত্যাদি মালামালগুলো যাতে কাদা-মাটি কিংবা তৈল-ময়লা জাতীয় পদার্থের সাথে মিশ্রিত হতে না পারে সে বিষয়ে যথেষ্ট সচেতনতা সঙ্গে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী। রড ও সিমেন্ট উন্মুক্ত আবহাওয়ায় অধিক সময় রাখা বাঞ্ছনীয় নয়, এক্ষেত্রে রডে মরিচা ধরা এবং সিমেন্ট জমাট বেঁধে যাওয়ার মত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

মনে রাখা দরকার, ইট, পাথর ও বালুর সাথে কাদা-মাটি কিংবা তৈল-ময়লা জাতীয় পদার্থের সংমিশ্রণ, রডে মরিচা ধরা এবং সিমেন্ট জমাট বেঁধে যাওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো নির্মিতব্য ভবনের গুণগত মান রক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অন্তরায় সৃষ্টি করে। ফলশ্রুতিতে ভবনের অন্তর্নিহিত শক্তি ও স্থায়িত্বতা লোপ পেয়ে সময়ের পরিক্রমা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়াসহ ভবনটি ধসে পড়ার মত বিপর্যয়ও নেমে আসতে পারে।

অতএব, একটি ভবন নির্মাণকল্পে উল্লেখিত মালামালগুলো সংগ্রহ করার সময় অবশ্যই সর্বাধিক মান সম্পন্ন মালামাল সংগ্রহ করা নিশ্চিত করতে হবে। সেইসাথে নিশ্চিত করতে হবে নির্মাণ পূর্ববর্তী সময়ের জন্য উল্লেখিত মালামালগুলোর সুষ্ঠু সংরক্ষণ ব্যবস্থাও। তাহলেই মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী একটি স্ট্রাক্চার বা কাঠামো নির্মাণ নিশ্চিত করা যাবে এবং নির্ভয় ও নিশ্চিন্তে থাকা যাবে নির্মিত স্ট্রাক্চার বা কাঠামোটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে টিকে থাকার ব্যাপারে।     

এছাড়া, স্ট্রাক্চার বা কাঠামো নির্মাণ পরবর্তী অভ্যন্তরীণ সার্ভিস কানেক্শনসমূহ যথা-বিদ্যুৎ সঞ্চালন, পানি সরবরাহ, পয়ঃ নিস্কাশন ইত্যাদি কাজের জন্য ব্যবহৃতব্য মালামাল যেমন-বৈদ্যুতিক তার, পাইপ প্রতিটি জিনিসের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। সর্বপোরি, ফিনিশিং আইটেম-প্লাষ্টার, ফ্লোর ফিনিশ, গ্রীল, অ্যালুমিনিয়াম, গ্লাস, পেইন্ট, পলিশ ফিটিং-ফিক্সাচারস্ (ইলেকট্রিক ও স্যানিটারী) সবকিছুরই গুণগত মান নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।

নইলে, নির্মিত ভবনটি চিরতরের জন্য ত্রুটিপূর্ণ হয়ে থাকবে এবং অত্র ভবনে বসবাসকারী ব্যক্তিবর্গের জন্য কখন কোন বিড়ম্বনা নেমে আসবে তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। আত্ম সচেতন কোনো ব্যক্তির জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। যদিও আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষই এত সব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায় না বা ঘামাতে চায় না। তারপরও আমি বলতে চাই, অত্র বিষয়গুলো নিয়ে প্রত্যেকেরই মাথা ঘামানো উচিত। 

তাই, বর্তমান বাজারে বিভিন্ন মালামাল কেনার ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করলে সংশ্লিষ্ট সকলে অনুধাবন করতে পারবেন আমাদের সমস্যাটা কোথায়? যেহেতু সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে আমার এতদ্সংক্রান্ত মালামালের মান সম্পর্কে সম্যক কিছু ধারণা আছে। ফলে অনেক সময় বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে গিয়ে অনভিজ্ঞ ও অসাধু ব্যবসায়ীদের সাথে ভাল-মন্দ বাছ-বিচার করার সময় প্রায়শঃ তিক্ততার সৃষ্টি হয়।

কোনো কোনো ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে এমনটি হয় যে, তাদের কাছে যেটা থাকে সেটাই সর্বোৎকৃষ্ট, এর থেকে ভালো জিনিস বাজারে নেই মতন নানা ধরণের কথা বলে ক্রেতাকে আটকানোর চেষ্টা করে। অথচ, আপনি ওখান থেকে বেরিয়ে পাশের দোকানে গেলেই হয়তো ওর থেকে ভালোমানের জিনিস তুলনামূলক কম দামেও ক্রয় করতে পারেন। ফলে, যে কোনো মালামাল ভাল-মন্দ যাচাই করে নেয়ার মত অভিজ্ঞতা ও মানসিকতা থাকতে হবে সংশ্লিষ্ট সকলের।   

ভবন নির্মাণে মান নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে-‘ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধীরাম সরদার’, অর্থাৎ যুদ্ধ জয় করতে হলে ঢাল, তলোয়ারের প্রয়োজন পড়ে। তদ্রƒপ, নির্মাণ কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য যন্ত্রপাতি দরকার হয়। যদিও আমাদের দেশে এক সময় কোনো যন্ত্রপাতি ছাড়াই নির্মাণ কাজ পরিচালিত হয়ে এসেছে। যেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো ইঞ্জিনিয়ার বা আর্কিটেক্টের প্রয়োজন হতো না। একজন ভালো রাজমিস্ত্রী একাই নির্মাণ সংক্রান্ত সকল কাজ পরিচালনা করতো। ভবন নির্মাণকল্পে সকল মালামাল ও কাজ সম্পর্কে তারা যেটা বলতো সেটাই হতো। এমনকি ভবনের নক্শাও অনেক ক্ষেত্রে তারাই সরেজমিনে করে দিতো। 

বর্তমানে, আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা, কারিগরী সুযোগ-সুবিধা অনেক কিছুই বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে যে কোনো ভবন নির্মাণ কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করণার্থে প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী যোগাড় করার পাশাপাশি এতদ্সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি যোগাড় করার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরী। মনে রাখা দরকার, নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি কাজের গুণগত মান বৃদ্ধি করার পাশাপাশি কাজকে সহজ করে দেয় এবং সময় ও খরচ সাশ্রয় করে।

ফলে, একটি ভবনের স্ট্রাক্াচার বা কাঠামো নির্মাণ করতে কংক্রিট মেশানো এবং কম্প্যাক্শন করার জন্য ১. মিক্সার মেশিন ও ২. ভাইব্রেটর মেশিন থাকা অত্যাবশ্যকীয়। নইলে, নির্মিতব্য কংক্রিটের যথার্থ মান রক্ষা করা কঠিন হতে পারে। উল্লেখ্য যে, কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজে কংক্রিট মেশানোর সময় এর প্রধান উপাদান সিমেন্ট, বালি ও খোঁয়া, এগুলো সর্বতো সমানভাবে মিশানো এবং নিয়মমাফিক ভাইব্রেটর চালিয়ে সমান ও সুষ্ঠুভাবে কম্প্যাক্শন করার বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরী, অন্যথায় নির্মিত স্ট্রাক্চার বা কাঠামোটি দুর্বল হয়ে পড়বে।

এছাড়া, নির্মিত কংক্রিটের গুণাগুণ বিশ্লেষেণকল্পে স্লাম্প কোণ এবং ল্যাবরেটরী টেষ্টের স্যাম্পল নেয়ার জন্য কংক্রিট মোল্ড থাকা অত্যাবশ্যক। একটি ভবনের মেইন স্ট্রাকচার বা কাঠামো নির্মাণে অন্যতম কাজ কংক্রিট ঢালাই করা, যেখানে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী। এলক্ষ্যে, বালি-খোয়ার পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য মিজারিং বক্স, পানি মাপার জন্য বালতি, ভাল মানের শাটারিং মালামাল ইত্যাদি থাকা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

চলবে…..

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১২০তম সংখ্যা, এপ্রিল-আগস্ট ২০২০।

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top