আহমেদাবাদ, ভারতের সেপ্ট বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়ায় স্থাপত্যবিদ্যা শিক্ষায় রেখে চলেছে অনন্য ভূমিকা। পড়াশোনাকে পাল্লা দিয়ে চলছে এর স্থাপত্যগুণ। কারণ, স্থপতি বালকৃষ্ণ দোশির ডিজাইন করা ভবন ও ক্যাম্পাস বলে কথা! ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সীমানা থাকতে পারে না’, এভাবেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা দেন স্থপতি দোশি।
বিশ্ববিদ্যালয় হলো সেই জায়গা, যেখানে একজন মানুষ তার নিজেকে চিনতে শেখে। এ জন্য তার চিন্তা-চেতনার সীমারেখাকে ম্লান করে দেওয়াটাই হলো মূল লক্ষ্য। মূলত একটা ধ্যানের স্থান-যেখানে পানি, বিস্তৃত সবুজ ও ভবনের প্রান্ত দেখা যায়। অল্প কথায় এটি সমস্ত মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু, তাই প্রতিনিয়ত চমৎকৃত করে দেওয়ার চাপ নেই। খেয়াল রাখতে হবে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ কোনো ‘শ্রেণিকক্ষ’ নয়। তাই এ রকম একটা জায়গা তৈরি করার কথা ভাবেন স্থপতি দোশি, যেখানে সবাই আসা-যাওয়ার পথে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চিন্তা-ভাবনার আদান-প্রদান করতে পারে। ফলস্বরূপ সার্কুলেশন স্পেস হয়ে গেল তাঁর কাজের মূল ক্ষেত্র। এই জায়গাটাকেই নানা মাত্রার সংলাপভিত্তিক স্পেসে রূপান্তর করে ফেললেন তিনি। তার ডিজাইন করা সিঁড়িঘরই তখন হয়ে দাঁড়াল একটা মাল্টিপল স্পেসের চমৎকার অ্যাকটিভিটি এরিয়া। একটা আবদ্ধ এসি রুমে বসে বসে আমরা আসলে এটাই বুঝি না যে বাইরে কী ঘটছে। আবদ্ধ ঘরে একটা পাখির ডাকও শোনা যায় না, অথচ স্থাপত্যচর্চায় আমাদের এর সবটাই জানা উচিত। এখান থেকেই জানার শুরুটা আর এরপরের পরিধি আরও বিস্তৃত।
কিন্তু শুরুটা তো চাই। সে জন্যই শ্রেণিকক্ষগুলোকে যতটা পারা যায় বাইরের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে সেপ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর এ সবকিছুর ফলে দেখা গেল ক্যাম্পাসের আসল নেতা বনে গেছে শিক্ষার্থীরাই! তারা হইচই করে কাজ করছে, নানা রকমের আড্ডা-আয়োজন করছে। শিল্পের এতগুলো শাখায় তারা বিচরণ করছে যে শেষমেশ এটাকে আর কেবলমাত্র স্থাপত্য বিভাগ বলেও ভাবা যায় না! এই ক্যাম্পাসের সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো যেকোনো বিভাগের যে কেউই এখানে আসতে পারে। আর দোশির মতে, ক্যাম্পাস সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। জায়গাটাকে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে তুলনা করেন দোশি। এই বৈচিত্রতাকে উদ্্যাপন করতে শিখতে বলেন তিনি, যা প্রকৃতিতে আছে অথচ আমাদের পেশাগত চর্চায় নেই। ভূ-প্রকৃতিকে ধরে, তাকে শ্রদ্ধা করে স্থাপত্য ভাবনা ভেবেছেন দোশি। কারণ, এই বিশাল ঐশ্বরিক কাব্য আমাদের বাইরের কিছু না, তারা অলংকরণের জন্য নয়। তাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই কোনো সীমানাপ্রাচীর। বিস্তৃত সবুজ প্রান্তরই হলো সীমানা!
এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের খুব কাছে রয়েছে স্থপতি দোশি ও খ্যাতনামা আঁকিয়ে মকবুল ফিদা হুসেইনের অমর সৃষ্টি ‘গুফা’ অর্থাৎ গুহা। হুসেইন ভারতের অত্যন্ত জনপ্রিয়, গুণী একজন চিত্রশিল্পী। ভীষণ সাহসী এবং প্রাণবন্ত রঙের ব্যবহারের জন্য তিনি জগৎজুড়ে সুপরিচিত। তাঁকে ‘ভারতের পিকাসো’ বলা হয়। কারণ, তিনি কিউবিস্ট স্টাইলকে তাঁর নিজের মতো করে ভারতে চর্চা করেছেন এবং মাধ্যমটিকে পরিচিত করেছেন প্রাচ্যে সবার কাছে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর নতুন ভারতের স্বরূপ গড়তে তিনি আধুনিক চিত্রকর্মকেই তাঁর হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন। তাঁর সরব প্রকাশভঙ্গির কারণে তাঁকে অনেক ভুগতে হয়েছে কিন্তু শিল্পের কাছে তিনি কোনো আপস করেননি।
স্থপতি দোশি এবং চিত্রশিল্পী হুসেইন ছিলেন একে অপরের খুব ভালো বন্ধু। হুসেইন প্রায়ই দোশিকে মজা করে বলতেন, স্থপতিরা কেমন বাসাবাড়ি বানায় খুবই গরম বোধ হয় সারা দিন। তখন দোশি বলেছিল, মাটির নিচেও ঘর করা সম্ভব, তাতে গরম কম লাগবে। হুসেইন এ কথা শুনে বেশ অবাক হতেন কিন্তু খুব একটা পাত্তা দেননি সে সময়।
গুহার ধারণার সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। পাহাড়ের গুহা বা মাটির নিচের গুহা সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। কিন্তু স্থপতি আর আঁকিয়ের যুগলবন্দিতে সৃষ্ট গুহা কেমন হতে পারে, সেটা কি জানি? চিত্রশিল্পী মকবুল ফিদা হুসেইনের ইচ্ছে ছিল তাঁর চিত্রকর্মগুলোকে তিনি স্থায়ীভাবে কোথাও রাখতে চান। তাঁর এই ইচ্ছের কথা শুনে বন্ধু স্থপতি দোশি তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে তিনি চিত্রকর্মের জন্য এমন একটি স্থাপনা নির্মাণ করবেন যে সেই উচ্চ স্তরের নন্দনের সঙ্গে হুসেইনের চিত্রকর্মগুলোকে পাল্লা দিতে হবে! ‘অজন্তা’ আর ‘ইলোরা’ গুহার শৈল্পিক ছোঁয়া বুঝি দোশিকে অনুপ্রাণিত করেছিল। আহমেদাবাদের উত্তপ্ত আবহাওয়ায় কী ধরনের স্থাপনা ভালো হতে পারে, সেই সমস্যার সমাধানের জন্য মাটির নিচে এই গ্যালারি বানানোর চিন্তাটা আরও পাকা হয়ে ওঠে।
দোশি জানান, চিত্রশিল্পী হুসেইন ঠিক গুফার মতো একটি গ্যালারি চাননি। তিনি একটা টিপিক্যাল বাড়িঘর টাইপ গ্যালারিই ভেবেছিলেন। যেখানে তিনি তাঁর আঁকা চিত্রকর্মের প্রদর্শনী করতে পারবেন; পারবেন বিক্রি করতেও। ফলে তিনি যখন দোশিকে জানান যে কোন জায়গায় এটা করা যায়। দোশি তৎক্ষণাৎ তাঁকে আহমেদাবাদের সেপ্ট বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এই জায়গাটির কথা বলেন। হুসেইনেরও জায়গাটা পছন্দ হয়। তাঁরা নিজেদের চ্যালেঞ্জ করেন যে দোশি এই গ্যালারি স্পেসকে টিপিক্যাল স্থাপত্যের নজরে দেখবেন না এবং হুসেইনও কোনো টিপিক্যাল চিত্রকর্ম এখানে ভাববেন না। তাঁরা সম্পূর্ণ নতুন কিছু করতে চেয়েছিলেন। কারণ, এই দুজন অসাধারণ যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ যদি এক হয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে না-ই পারে, তাহলে আর কী দরকার একসঙ্গে কাজ করার, এমনটিই ছিল তাঁদের ভাবনায়।
পুরো গ্যালারি স্পেসটা মাটির নিচে হলেও ওপরের ডোমগুলোর স্তর মাটির স্তরের সঙ্গেই মিল করে ডিজাইন করা। ফলে বাইরে থেকে গুফা দেখতে চমৎকার এক ভাস্কর্যের মতো। চকমক চায়না মার্বেলের ফিনিশিং আছে ডোমে। একটা কালো সর্পিলাকার আঁকিবুঁকি তাতে। এই সাপ আঁকার বুদ্ধিটা হুসেইনের। উনি চাইছিলেন এভাবে স্থাপনাটির সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে তুলতে। কারণ, এই ডোম আর আলো আনার জন্য যে চোঙা পথ আছে, সেটি নেয় স্তন ও স্তন বৃন্তের আকৃতি। ফলে সাপের ঘোরাফেরার মধ্য দিয়ে স্থাপনা এবং শৈল্পিক চিন্তার এক অপূর্ব মিলন ঘটিয়ে গুফা তার আবেদন জাগিয়ে তোলে! কোনো প্রকার সভ্যতার আড়ালে থেকে সৌন্দর্য নির্মাণের চেষ্টা হুসেইন বা দোশি কেউই করেননি। গুহা, আদিমতা, আদিম চিত্রশিল্প, আদিম স্থাপনাÑএর সবটাই মানব ইতিহাসের গোড়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ফলে আমাদের যে পুরাকথা, সেটারই একটা দৃশ্যগত রূপ আমরা দেখতে পাই গুফাতে।
মাটির নিচে জন্ম হয় গুফার আরেক অভিজ্ঞতার। এখানে কোনো সোজা দেয়াল নেই; এখানে কিছুক্ষণ থাকলেই বোঝা যায় স্পেসটা ডিজাইন করাই হয়েছে যেন দেয়ালে আঁকা চিত্রকর্মগুলো এখানে ফুটে উঠতে পারে। গুফা বানানো শেষ হলে হুসেইন তাঁর বাঁধানো চিত্রকর্ম নিয়ে হাজির হন। দোশি তাঁকে সতর্ক করেন যে এখানে এমনভাবে কোনো বাঁধানো ছবি ঝোলানো সম্ভব নয়। তবুও হুসেইন কয়েকবার চেষ্টা করেন ছবিগুলো ঝোলাতে কিন্তু এত সরলরৈখিক প্রক্রিয়ার জন্য গুফার দেয়ালগুলো তৈরি হয়নি বলে ছবিগুলো খসে পড়ে। এতে একপর্যায়ে তিনি বেশ ক্লান্ত হয়ে যান এবং হন কিছুটা মর্মাহত। তখন দোশি তাঁকে আবারও স্মরণ করান যে তাঁরা ঠিক করেছিলেন যে ধরনের কাজ এ যাবৎ করে এসেছেন তা গুফায় করবেন না। পুরো জায়গাটাই হুসেইনের ছবির জন্য একটা ক্যানভাস এখন হুসেইনকেই ভাবতে হবে এখানে তিনি কীভাবে আঁকবেন। কারণ, কেবল দেয়াল ও ছাদ নয়, মেঝেটাও নড়াচড়া করছে এখানে! যদি ইট দিয়ে তৈরি হতো তাহলে এটা খুব রিজিড একটা স্ট্রাকচার হতো, তাই এখানে ফেরোসিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে সেটি সাবানের বাবলের মতো কাজ করে যাতে তাকে নিয়ে নানাভাবে খেলা করা যায়। এবং এই দুই ম্যাটেরিয়াল এক হলে একটা নতুন মাত্রার অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। প্রথমে এই গুফার ভেতরের কলমাগুলো ভাবা হয়েছিল সোজা সোজা, কোনো প্রকার ফ্লুইডিটি ছিল না। পরে এই অভিনব ম্যাটেরিয়ালের গুণে পুরো ব্যাপারটা একটা ফ্রুট বাস্কেটের মতো ব্যাপারে পরিণত হয়। তা ছাড়া সোজা সোজা কলামের মডেলটাকে দোশি ঝাঁকিয়েছিলেন। তাতে করে যে অকৃত্রিম আকারটা এল, সেটাকেই নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন স্থপতি দোশি।
প্ল্যানে দেখা যায় বেশ কতগুলো বৃত্ত আর উপবৃত্ত একসঙ্গে, একে অন্যের সঙ্গে মিশে রয়েছে। গ্যালারির ভেতরে ম্যাটেরিয়ালগুলো মাটির টেক্সচারের আভাস দেয়। আর ডোম থেকে ডিফিউস হয়ে আসা আলো ভেতরে একটা আধ্যাত্মিক ভাবের জন্ম দেয়। দিনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সূর্যের আলো ও উপস্থিতির পরিবর্তনের কারণে গ্যালারির ভেতরের আবহাওয়া ও আলোর ভাবও সদাই পরিবর্তনশীল। সাধারণ গ্যালারিতে মানুষ কিছু দেখতে আসে। কিন্তু দোশি ও হুসেইনের মেলবন্ধনে জায়গাটা ধ্যানের স্থানে পরিণত হয়। রহস্যের মোড়ক খুলতে খুলতে দর্শকও তখন শিল্পী বনে যান।
দোশি জানান, এই গ্যালারির ডিজাইন ও নির্মাণপ্রক্রিয়া তাঁর জন্য ছিল খুবই কঠিন। এবং হুসেইনের জন্যও। হুসেইন দীর্ঘদিন এখানে কিছু আঁকতেই পারেননি। এরপর একদিন তিনি বেশ কিছু কাট-আউট নিয়ে আসেন। কালো মেটাল দিয়ে বানানো নারী শরীরের এই কাট-আউটগুলো গুফায় প্রাণ দিল। গুফা হয়ে উঠল আরও রহস্যময়। কিন্তু এখানে হুসেইন কী আঁকবেন কীভাবে আঁকবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। তাঁর মৃত্যুর ১০ বছর আগে তাঁকে দোশি গুফার একটা বিশাল মডেল পাঠান। সে মডেল পর্যবেক্ষণ করে সেখানে কী আঁকবেন ঠিক করেন হুসেইন। এরপরে সেই আঁকানোটাই হুবহু আঁকানো হয় গুফার ভেতরে। পুরো পৃথিবীতে এটিই হুসেইনের আঁকা সব থেকে বিশাল ছবি। পুরো গুফাটাই হুসেইনের ক্যানভাস। এখানে তিনি কড়া রং ব্যবহার করে মানুষ ও প্রাণীর শরীরী কাঠামো আঁকেন ঠিক প্রাচীন গুহার চিত্রকর্মের মতো। ফলে আধুনিক পরিবেশে এই প্রাচীন চিন্তার নয়া রূপ নিজ শিকড় এবং সমসাময়িক প্রেরণাকে চোখের পলকে এক করে দেয়।
পুরো নির্মাণপ্রক্রিয়া দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়েছিল। প্রথম পর্যায়ে গুফার ভেতরের ও ডোমের কাঠামো নির্মাণ করা হয় এবং পরবর্তী ধাপে গুফাকে ঘিরে সিঁড়ি, বসার জায়গা, একটি ক্যাফে ও আরও একটি গ্যালারি নির্মাণ করা হয় চিত্রকর্ম প্রদর্শনীর জন্য।
দোশি বলেন, তিনি এবং হুসেইন দুজনেই ভারতীয় দর্শন দ্বারা ভীষণভাবে অনুপ্রানিত। এ জন্য গুফা বানানো শেষ হলে কেমন দেখতে হলো তার থেকেও তাঁদের কাছে বেশি প্রাধান্য পায় নির্মাণপ্রস্তুতি আর এর প্রক্রিয়া। যদিও আমরা শেষটাই শুধু দেখতে চাই, সারাংশ জানতে চাই কিন্তু পুরো গল্পটা শুনতে চাই না।
গুফা এমন কোনো গ্যালারি নয়, যেখানে কেবল সময় কাটাতে যাওয়া যায়। এখানে এসে কাউকে বসতে হয়, সময়ের ব্যবধানে এর রহস্যময়তায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতে হয়। একজন সৃষ্টিশীল সত্ত¡াকে গুফার মাতাল আলো নতুন উৎসাহ জোগাতে পারে বারবার। দোশির কথায়, যা আমাদের আনন্দ দেয়, হাসায় তা অর্থ-টাকাকড়ি ও ব্যবহারের দিক দিয়ে পরিমাপের অযোগ্য। তাই জীবনকে অবশ্যই উপভোগ্য করে তুলতে হবে; নিয়ে যেতে হবে আনন্দের শিখরে। ঠিক এই কারণে স্থাপত্যের কোনো নির্দিষ্ট ফাংশন থাকতেই হবে এমন কোনো কথাই নেই।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২২তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০২০