কোনো ঘটনা ঘটে গেলে অবশ্যই তাৎক্ষণিক মোকাবিলার প্রয়োজন, কিন্তু পাশাপাশি এই ঘটনার কারিগরি বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি। কারণ, প্রতিটি দুর্ঘটনার ভেতর লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যৎ সমাধানের ইঙ্গিত। তাই আমি যেমন কাছ থেকে দেখেছি রানা প্লাজা দুর্ঘটনা, পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকান্ড তেমনি সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেছি বনানীর এফ আর (ফারুক-রূপায়ণ) টাওয়ারের অগ্নিকান্ডের ঘটনা। কারণ, খুব কাছ থেকে বুঝতে চেয়েছিলাম কেন এমন হচ্ছে, কোথায় ভুল হচ্ছে আমাদের! ৩ এপ্রিল বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপকবৃন্দ ড. এস এম নাজমুল ইমাম, ড. আশিক মোহাম্মদ জোয়ারদার ও আমাদের সহযোগী মুহাম্মদসহ অন্যদের নিয়ে ভবনটি পরিদর্শনে যাই। আমরা খুব কাছ থেকে কারিগরিক দৃষ্টিতে দুর্ঘটনা-পরবর্তী এফ আর টাওয়ার ভবনটি সরেজমিনে পর্যালোচনা করি। আমরা ঘুরে ঘুরে ভবনের দ্বিতীয় বেজমেন্ট থেকে ছাদ পর্যন্ত সর্বমোট ২৪টি ফ্লোরের কারিগরিক পর্যবেক্ষণ করি। পরে আমাদের একজন চৌকস সহকর্মী ড. আবু তাইয়েব মোহাম্মদ শাহজাহানের সহযোগিতায় কম্পিউটার মডেল-এর মাধ্যমে আগুনে উদ্ভূত পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করি। সম্ভবত বাংলাদেশে এই প্রথম কোন ভবনের অগ্নিকান্ড বিশ্লেষণে ফায়ার ডায়নামিক সিমুলেশনের সহযোগিতা নেওয়া হলো। আমরা জনস্বার্থে পুরো ঘটনাটির একটি কারিগরিক বিন্যাস করি এবং আমি মনে করি, জনসাধারণের কাছে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোসহ যা জানতে পারলাম তার কিছুটা হলেও ব্যক্ত করা প্রয়োজন। সামষ্টিক ও নিজ নিরাপত্তার স্বার্থে সবারই এ সম্পর্কে জানা দরকার। যেহেতু বিষয়টা কারিগরিক, সাধারণ জনগণের কাছে সহজবোধ্য করার জন্য প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো।
আগুন লাগল কেন? অগ্নিভার বা Fire Load কী?
প্রথমেই আগুন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া দরকার। আগুন সৃষ্টি হয় তিনটি উপাদান ওপর ভিত্তি করে- ক. দাহ্য পদার্থ খ. অক্সিজেন এবং গ. তাপ। একেই বলে অগ্নি-ত্রিভুজ (ঋরৎব ঞৎরধহমষব)। এই তিনটির কোনো একটি যদি উপস্থিত না থাকে, আগুন লাগবে না। কোনো একটি জায়গায় প্রতি বর্গমিটারে দাহ্য পদার্থের পরিমাণ হচ্ছে ওই জায়গার অগ্নি ভার বা ঋরৎব খড়ধফ। এফ আর টাওয়ারের অষ্টম তলায় ছিল অনেক পরিমাণে দাহ্য পদার্থ, যেমন কাগজ, প্লাস্টিক, আসবাব, দাহ্য ফলস সিলিং, কার্পেট, পর্দা ইত্যাদি। সব মিলেই সেখানে বিরাজ করছিল উচ্চমাত্রার অগ্নিভার, আর সেই সঙ্গে মারাত্মক আগুনের ঝুঁকিও। এই অবস্থা এফ আর টাওয়ারের অন্যান্য অফিসের বেলায়ও কমবেশি প্রযোজ্য ছিল। ঘটনার দিন কোনো এক উপায়ে তাপ সংযোজিত হয়ে অগ্নি-ত্রিভুজ সম্পন্ন হয়ে যায়। হতে পারে সেটা কোনো বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে অথবা তাপ উৎপন্নকারী কোনো যন্ত্র ব্যবহারের কারণে।
আগুন তো লাগল নিচের কয়েকটা তলায়, তা নেভানোও হলো কিন্তু ওপরের তলার অনেক লোক হতাহত হলো কেন?
কোনো দাহ্য পদার্থ যখন আগুনে পোড়ে, তখন তা অনেক সময় সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায় না-যাকে বলে অসম্পূর্ণ দহন এবং ফলে ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। এই ধোঁয়া বাতাসের চেয়ে হালকা হওয়ায় ওপরের দিকে ধাবিত হয়-প্রথমে ঘরের ছাদের দিকে ধাবিত হয়, পরে অনুভূমিকভাবে কোনো খোলা জায়গা, যেমন জানালা, খোলা সিঁড়ি বা কোনো ফাঁকের দিকে যেতে থাকে। এফ আর টাওয়ারের খোলা সিঁড়ি দিয়ে ওই ধোঁয়া ওপরের দিকে যায়, তাই ওই সিঁড়ি ব্যবহারকারীরাও আক্রান্ত হন। একই পথে ওপরের তলাগুলোতে পৌঁছে যায়। দাহ্য গ্যাস কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস এবং জলীয় বাষ্প মিশ্রিত এই ধোঁয়া ওপরের খোলা কক্ষগুলোতে পৌঁছে যায়, ঘাটতি তৈরি হয় অক্সিজেনের। ধোঁয়া অন্তশ্বাসের কারণে এবং অক্সিজেনের অভাবেই শ্বাস ক্রিয়া বন্ধ হয়ে অনেকে মারা যান ওপরের তলাগুলোসহ সিঁড়িতে। তাই অগ্নিনিরাপদ ভবন ডিজাইনের আরেকটি একটি অন্যতম দিক হচ্ছে স্থাপত্য ডিজাইনের মাধ্যমে ধোঁয়া পরিবহনের বাধা সৃষ্টি করা বা বিস্তার সীমিত করা।
বহুতল ভবনে কি তাহলে খোলা সিঁড়ি থাকবে না?
বহুতল ভবনে ফ্লোরের আয়তন এবং ব্যবহারকারীর সংখ্যার নিরিখে এক বা একাধিক অগ্নিনিরাপদ সিঁড়িঘর রাখার বিধান আছে। কিন্তু অগ্নিনিরাপদ সিঁড়িঘর থাকলেও কোনোভাবেই বহুতল ভবনে খোলা সিঁড়ি বা দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ নয় এমন সিঁড়ি রাখা যাবে না। কারণ খোলা সিঁড়ি দিয়ে আগুন অথবা ধোঁয়া এক তলা থেকে আরেক তলায় চলে যেতে পারে। তবে, এফ আর টাওয়ারের আক্রান্ত অফিস ফ্লোরসমূহের মূল ফটকে কাচের দরজা না হয়ে পর্যাপ্ত অগ্নি মাত্রার দরজা (৬ নম্বর প্রশ্নের উত্তরে দ্রষ্টব্য) হতো তাহলে হয়তোবা আগুন বা ধোঁয়া এই খোলা সিঁড়িতেও আসত না এবং তা বেশ কিছু সময় ব্যবহার্য থাকত।
আমি জানব কীভাবে ভবনের আগ্নিনিরাপদ সিঁড়ি কোথায়?
সাধারণত ভবনের প্রতি তলায় জরুরি নির্গমনের প্রয়োজনে একটি নকশা দেয়ালে সাঁটানো থাকে। ভবনের ব্যবহারকারীদের এই নকশার সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। সেখানে দেখানো থাকে অগ্নিনিরাপদ সিঁড়ি কোথায় বা কত দূরে। নিয়মিত ড্রিল হলে ব্যবহারকারীরা অগ্নিনিরাপদ সিঁড়ির অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকেন বা হতে পারেন। সেই সঙ্গে আরও থাকে দিকনির্দেশনা ও সহজবোধ্য ফলকসমূহ। এফ আর টাওয়ারের লিফট লবিতে পাথরে খচিত অস্পষ্ট নকশাসদৃশ ফলক দেখা যায়, এই ফলক থেকে দিক নির্ণয় করা একেবারেই কঠিন। অনেক মালিকেরা বা ভাড়াটেরা ফ্লোর লে-আউট পরিবর্তন করে অগ্নিনিরাপদ সিঁড়ি কমন স্পেস থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং মূল নকশার সঙ্গে কোনো মিল না থাকায় লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়।
এফ আর টাওয়ারে অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম কি ছিল? কিন্তু কাজে এল না যে?
এফ আর টাওয়ারে দেখা যায় অগ্নিঘণ্টা বা ফায়ার অ্যালার্ম, ফায়ার এক্সটিংগুইশার, প্রতি তলায় ছিল হোস পাইপ, গেট ভাল্ব ইত্যাদি। আবার বেজমেন্টের ওয়াটার রিজার্ভার বা আধারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পানির পাম্প, কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই সরঞ্জামাদি বন্ধ হয়েছিল একটি তালাবদ্ধ খাঁচার ভেতর। কার দায়িত্ব ছিল এই তালা খুলে পাম্প চালু করা কেউ জানে না আর কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় ছিল না। তাই শেষ পর্যন্ত কিছুই কাজে এল না। এমনকি প্রথম বেজমেন্টে ওয়াটার রিজার্ভারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা ছিল ফায়ার ব্রিগেডের ব্যবহার্য ওয়াটার পয়েন্ট। এটা সচল রাখা ভবন ব্যবস্থাপনা দলের দায়িত্বেই পড়ে। নিয়মিত ড্রিল হলে অব্যবস্থাপনা হয়তোবা দূর হতো। ফায়ার ব্রিগেডের কার্যক্রমে থাকতে হবে এই সংরক্ষিত পানির লাইন বা ওয়াটার পয়েন্টগুলোর অবস্থান, যা তাঁরা আগে থেকেই নথিভুক্ত করে আসছেন ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় এবং তা অন্তর্গত হতে হবে এলাকাভিত্তিক ইমার্জেন্সি রেসপন্স প্ল্যানে।
সিঁড়ি তো বুঝি কিন্তু আগ্নিনিরাপদ/জরুরি নির্গমন সিঁড়ি কী?
অগ্নিনিরাপদ সিঁড়ি এমন একটি সিঁড়ি, যা কি না বহুতল ভবনের যেকোনো এক বা একাধিক তলায় আগুন লাগলেও ভবনের সব ব্যবহারকারী নির্বিঘেœ ওই সিঁড়ি ব্যবহার করে ভবন থেকে বেরিয়ে জীবন রক্ষা করতে পারবে। এটা ইট বা কংক্রিটের দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ, সাধারণ নির্মাণসামগ্রী দিয়েই তৈরি একটি সিঁড়ি ঘর, তবে ঢোকার দরজা হতে হবে অগ্নিনিরোধক, অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা অগ্নিমাত্রা বা আগুন সহনীয়। এর উদ্দেশ্য, অন্তত ওই সময় অবধি দরজাটি আগুনে পুড়ে নষ্ট হবে না এবং এই সময়ের মধ্যেই সবাই এই ভবন থেকে বের হয়ে যেতে পারবেন। এই দরজার পাল্লা, চৌকাঠ, হ্যান্ডেল বা প্যানিক বার, দরজার কবজা এবং দরজার স্বয়ংক্রিয় ডোর ক্লোজার একই অগ্নিমাত্রার হতে হবে। এ দরজার পাল্লার চারিদিকে অগ্নি প্রতিরোধী গ্যাসকেটও থাকে, যা ধোঁয়া নিরোধক। এই সিঁড়ি ঘরের ওপরে সংযোজিত বিদ্যুতায়িত ফ্যান দ্বারা পুরো সিঁড়ি ঘরেই বাতাসের চাপ রাখা হয়, যাতে ওই দরজা খুলে সিঁড়িঘরে ঢোকার সময়ও আগুন বা ধোঁয়া প্রবেশ করতে না পারে। এমন সিঁড়িঘর স্থপতিরা ঢাকা শহরের অনেক ভবনে ডিজাইন করে সংযোজন করেছেন এবং ওই সব সরঞ্জাম এখন দেশেই পাওয়া যায়। তবে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, কখনোই এই দরজায় তালা ঝোলানো যাবে না।
এই রকম বহুতল ভবনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য মৃত্যু ছাড়া কি কিছুই নেই?
নিশ্চয়ই আছে! ভবনে প্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীরা জরুরি অবস্থায় অগ্নিনিরাপদ সিঁড়ি দিয়ে অন্যের সাহায্যে একটি বিশেষ ধরনের চেয়ার ব্যবহার করে নেমে যেতে পারেন। এই বিশেষ চেয়ারকে বলা হয় ‘সিঁড়ি অবতরণ চেয়ার’ । জরুরি প্রয়োজনের জন্য, অগ্নিনিরাপদ সিঁড়ির পাশেই এমন চেয়ার ভাঁজ করে রেখে দেওয়া যায়। এই চেয়ারের মূল্য একটি অফিস এক্সিকিউটিভ চেয়ারের চেয়েও অনেক কম। আজকাল অবশ্য পশ্চিমা বিশ্বে প্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীদের জন্য অগ্নিনিরোধক লিফট সংযোজন করছেন, যাতে করে নিজেই অনায়াসে নিচে নেমে যেতে পারেন।
বহুতল ভবনগুলোতে দেখা যায় একাধিক মালিক বা ভাড়াটে, এই অবস্থায় কেই-বা দায়িত্ব নেবে সম্পূর্ণ ভবনের বা সব ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা? কীভাবে সম্ভব?
যেহেতু ভবন ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি কারিগরিক, তাই সব উন্নত দেশে ভবনের সার্বিক দায়িত্বে থাকে ভবন ব্যবস্থাপনা কোম্পানি বা বিভাগ। এই কোম্পানিগুলো মালিক পক্ষের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে দায়িত্বভার নিয়ে থাকে। তারাই ঠিক করেন কখন ফায়ার ড্রিল করতে হবে, কখন যন্ত্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে, বিল্ডিং কোড মোতাবেক সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না বা পরিচালিত হচ্ছে কি না ইত্যাদি। আমাদের দেশে এখনো এরূপ কোম্পানির চালু হয়নি বটে, তবে হওয়ার অনেক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে এই নিয়ে ভাবছেন। এমন কোনো কোম্পানির দায়িত্বে এফ আর টাওয়ারের রক্ষণাবেক্ষণ থাকলে সব যন্ত্রপাতি সচল থাকত, নকশার ব্যত্যয় করে ভবন ব্যবহার হতো না বা মালিকপক্ষের টানাপোড়েনে পড়ে ভবন ব্যবস্থাপনায় অচলাবস্থারও সৃষ্টি হতো না।
সব কিছু নিয়ম-কানুন মেনে করলেই কি আগুন লাগবে না?
সকল নিয়ম-কানুন মেনে চললেও আগুন লাগতে পারে। অগ্নি ত্রিভুজ সম্পন্ন হলেই আগুন লেগে যেতে পারে। তাই সব সময় সজাগ থাকতে হবে যেন ত্রিভুজ সম্পূর্ণ না হয়, আর প্রতি তলার অগ্নি-ভার ও বাসিন্দার ঘনত্ব যেন পরিমিতির মধ্যে থাকে এবং পাশাপাশি অন্যান্য নিয়মও যেন মানা হয়।
ছাদে তালা, নিচে তালা আবার জানালায়েও গ্রিল! তখন করণীয় কী?
পারতপক্ষে তালা বা গ্রিল ব্যবহার না করতে পারলেই ভালো। যদি করতেই হয়, তাহলে ওই তালার একটি চাবি আপৎকালীন ব্যবহারের জন্য, ভেতরের দিকে দরজার পাশেই একটি কাচের ছোট বাক্সে ঝুলিয়ে রাখা যায়। একইভাবে এক বা একাধিক জানালার গ্রিল তালাবদ্ধ করে রাখা যায়, আপৎকালীন খুলে বের হওয়ার জন্য। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে তালা যদি ব্যবহার বা রক্ষণাবেক্ষণ না করা হয়, সেই তালার চাবি থাকলেও জরুরি অবস্থায় আটকে যেতে পারে বা নাও খুলতে পারে। তাই সচল রাখার স্বার্থে মাঝেমধ্যে তালাগুলোর যত্ন নেওয়া দরকার।
চারদিকে উড়ন্ত কাচ ধেয়ে আসছে নিচে, ভবনের কাচের দেয়াল যেন আরেক ঝুঁকি! এমনটাই কী হবে?
বহুতল ভবনে সাধারণত সেফটি লেমিনেটেড কাচ ব্যবহার করা হয়ে থাকে, যা ভেঙে গেলেও খুলে পড়ে না এবং অতি ছোট ছোট টুকরোতে বিভক্ত হয়ে যায়। আমাদের দেশে এ ব্যাপারে কোনো ধরনের নীতিমালা না থাকায় প্রায় সব ভবনেই সাধারণ কাচ ব্যবহার হয়ে আসছে। বিপত্তিতে হচ্ছে যখন এসব কাচ সহজেই ভেঙে যায় আগুনের তাপে অথবা ভূকম্পনে, তখন কাজগুলো বড় বড় টুকরো হয়ে ওপর থেকে মাটির দিকে ধেয়ে আসে মাধ্যাকর্ষণ বলের আকর্ষণে এবং অত্যন্ত ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কারণ কারও মাথায় বা শরীরে পড়লে মারাত্মকভাবে কেটে যেতে পারে বা হতাহত হতে পারে। তাই বহুতল ভবনের বাইরের দিকের কাচের ব্যাপারে এখনই নির্দেশনা বা আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। আজকাল ভবনে কাচের দেয়ালে বড় বড় বিজ্ঞাপনের স্টিকার লাগিয়ে ভবনগুলোকে অসুন্দর করার পাশাপাশি ভবনের অগ্নিঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভবনে অগ্নিকান্ডের সময় কাচের দেয়ালের গা বেয়ে আগুন ওপরের দিকে প্রবাহিত হতে পারে। এ ব্যাপারটি কর্তৃপক্ষ এখনই নজরে নিতে পারে।
বহুতল ভবনে আগুন লাগলে নেভানোর দায়িত্ব কার? জরুরি নির্গমন নিশ্চিত করবে কে? কোথায় বা যাব আমরা?
বহুতল ভবনে আগুন লাগলে প্রথম পর্যায়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগুন নেভানোর দায়িত্ব ভবনের নিজেরই এবং ভবনে নিয়োজিত ফায়ার ওয়ার্ডেন ও তার দলের। জরুরি নির্গমনের ব্যাপারে নির্দেশনা পাওয়া যাবে ভবনের ফায়ার কমান্ড রুম থেকে এবং ব্যবহারকারীরা সজাগ হবেন অগ্নি ঘণ্টার শব্দ শুনেই। পরবর্তী পর্যায়ে ফায়ার ব্রিগেডের লোকেরা এসে আগুন নেভাবেন এবং জরুরি উদ্ধারকাজ সম্পন্ন করবেন। এই সময় ভবনের সবাই নির্গমন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে পূর্বনির্ধারিত একটি খোলা স্থানে বা এসেম্বলি পয়েন্টে সমবেত হবেন এবং পরবর্তী নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করবেন।
দেখা যায় ফায়ার ব্রিগেডের সিঁড়িগুলো ১৫-১৬ তলা পর্যন্তই যাচ্ছে, তাহলে সুউচ্চ বহুতল ভবনগুলোর কী হবে?
ঢাকা শহরের বেশির ভাগ ভবনকে হাইরাইজ বলা যায় না, মিডরাইজ বলা চলে। ৫০ থেকে ১০০ তলা বা তারও অধিক তলায় আগুন লাগলে ফায়ার ব্রিগেডের মই দিয়ে আগুন ফাইট করা যায় না। ভবনে নিয়োজিত স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র অগ্নিনির্বাপণের কাজে ব্যবহৃত হয় যেমন হিট সেন্সর, স্মোক ডিটেক্টর, গ্যাস সেন্সর, ওয়াটার স্প্রিংলার, ফোম, স্বয়ংক্রিয় স্মোক ভেন্ট, ফায়ার স্ক্রিন, ওয়েট রাইজার, ফায়ার হস, ফায়ারম্যানস লেফট ইত্যাদি। এসব নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাপনা বাদ দিয়ে নিছক জমির মূল্য বা জমির সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করার স্বার্থে বহুতল ভবন নির্মাণ করা একেবারেই উচিত নয় বা অন্যায় বলা চলে, তা সেটা দেশের যেখানেই হোক।
পুরোনো আইনে নির্মিত ভবনে নতুন আইন কীভাবে কার্যকর হবে? আদৌ কি প্রযোজ্য হবে? ভবনে নিরাপত্তাসংক্রান্ত নতুন আইন হলে আমরা জানব কীভাবে বা কেই-বা কাকে জানাবে?
ভবন যতই পুরোনো হোক, নতুন আইন প্রবর্তন হলে জননিরাপত্তার স্বার্থে ওই আইন বলবত হয়ে যায়। তাই পুরোনো ভবনগুলোকে রেট্রোফিটিংয়ের মাধ্যমে যথাসম্ভব পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করে নিরাপদ ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে হবে। যেমন ভবনে খোলা সিঁড়ি থাকলে দেয়াল দিয়ে ঘিরে অগ্নিনিরাপদ দরজা লাগিয়ে ঠিক করতে হবে। কিংবা অগ্নিনিরাপত্তা সিঁড়ি না থাকলে সেই সিঁড়ি স্থাপন করা। এ রকম কাজ দেশের স্থপতিরা সহজে করতে পারেন, প্রয়োজনে তাঁরা সম্পৃক্ত করবেন তবে এই প্রশ্নের উত্তর শুরুর আগে অন্যান্য প্রকৌশলীর। তবে শেষ পর্যন্ত যদি নিরাপদ না-ই করা যায় তাহলে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটিকে ভেঙে ফেলতে হবে। তাই যখন কোনো নতুন আইন ও নীতিমালা প্রবর্তন হবে প্রবর্তনকারী সংস্থার দায়িত্ব হলো সব ভবন মালিকদের অবগত করে নির্দেশনা দেওয়া, প্রয়োজনে পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি দেওয়া। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, স্থপতি প্রণীত অগ্নিনিরাপদ ডিজাইন, যন্ত্র প্রকৌশলী প্রণীত অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা, যথাযথ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণই জীবন রক্ষা নিশ্চিত করে। যেমনটা করেছিল দুবাইয়ের ৭৯ তলাবিশিষ্ট ‘টর্চ টাওয়ারে’ ২০১৫ সালের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে, যা নেভাতে সময় লেগেছিল দীর্ঘ ৬ থেকে ৭ ঘন্টা, কিন্তু সেখানে ঘটেনি কোনো প্রাণহানি।
যাঁরা বেচে গেলেন তাঁদের বেলায় কি কিছু করণীয় আছে?
যাঁরা এই রকম এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তাঁদের মানসিক আঘাত পাওয়া খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। তাই তাঁদের দিকে নজর দেওয়া খুবই জরুরি। তাঁদের পরিবারবর্গ, সহকর্মী ও বন্ধুবান্ধবদের এখন তাঁদের পাশে থাকা বা তাঁদের সঙ্গে সময় কাটানো প্রয়োজন। জনস্বার্থে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে পারে, যেমন বিনা খরচে নিয়মিত মনস্তাত্তি¡ক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করে।
শুনেছি ভবনের আগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামাদি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাহলে কি করা যায়?
এখন কিছু কিছু অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামাদি দেশেই তৈরি হয়, তবে তার পরেও অনেক যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় বলে অনেকটা ব্যয়বহুল, বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় ফায়ার ফাইটিং ব্যবস্থাপনার সরঞ্জামাদি। অর্থ মন্ত্রণালয় তথা সরকার এখানে রেয়াতের ব্যবস্থা করে বা আমদানি কর লাঘব করে অনেকটা সহজলভ্য করতে পারেন। এতে করে রাষ্ট্রের খানিকটা রাজস্ব ঘাটতি হলেও, এমন দুর্ঘটনা থেকে অনেক প্রাণ রক্ষা করা যাবে।
আহত মানুষদের দুর্ঘটনাকবলিত স্থান থেকে হাসপাতালে নিতে নিতে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়, কী করা যায়?
এমন ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে স্থানান্তরের আগেই জায়গায় রেখে তাৎক্ষণিক ফার্স্ট এইডের ব্যবস্থা করতে হয়। শুধু স্ট্রেচারে করে ঘটনাস্থল থেকে অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে হাসপাতালে স্থানান্তর করা বাঞ্ছনীয়, সবাই মিলে হাত-পা ধরে চ্যাংদোলা করে নয়। অন্যথায় ভালো করতে গিয়ে স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিসহ অন্য কোনো আঘাত আরও গুরুতর হয়ে যেতে পারে। তাই এ কাজটি করে থাকেন প্রশিক্ষিত প্যারামেডিকসগণ। এই রকম ঘটনা তাৎক্ষণিক মোকাবিলার জন্য আমাদের দেশে ফায়ার ব্রিগেডের পাশাপাশি দক্ষ প্যারামেডিক টিম গঠন করা দরকার, তাদের থাকবে আইসিইউ সাপোর্টসহ সুসজ্জিত অ্যাম্বুলেন্স। তারাও ফায়ার ব্রিগেডের পাশাপাশি ছুটে আসবে ঘটনাস্থলে। তারা প্রথম থেকেই জানবে দুর্ঘটনার অবস্থানের নিরিখে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে রোগীকে কোন হাসপাতালে নিতে হবে, আগাম প্রস্তুত হয়ে থাকবে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ডাক্তার এবং নার্সবৃন্দ। পুরো ব্যাপারটাই সমন্বয় করা যেতে পারে আমাদের দেশে প্রচলিত ৯৯৯ সার্ভিসের মাধ্যমে। তবে ব্যবস্থাটি প্রবর্তন করতে সাহায্য প্রয়োজন হবে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের। পাশাপাশি সব হাসপাতালে গড়ে তুলতে হবে নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে পারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহ।
দুর্ঘটনা মোকাবিলায় অনেক বাহিনী যুক্ত হতে দেখা যায়, অনেকটা বিছিন্ন বা সমন্বয়হীনভাবে। এমন দুর্ঘটনা মোকাবিলায় আরও কী করার আছে?
কোনো ঘটনা মোকাবিলার জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয় হচ্ছে সমন্বিত উদ্যোগ, গভীর পর্যালোচনা ও প্রায়োগিক মূল্যায়ন। এ কাজটি শুধু করতে পারেন একটি আন্তঃবিভাগীয় কুশলী দল বা ট্যাকটিক্যাল টিম (ঞধপঃরপধষ ঞবধস), যাঁরা সরাসরি অগ্নিনির্বাপণ করবেন না বা উদ্ধারকাজ করবেন না, অনেকটা দূরে অবস্থান করেই সম্পূর্ণ ঘটনার পর্যালোচনা করবেন, তথ্য সংগ্রহ করবেন, প্ল্যানিং করবেন এবং দিকনির্দেশনা দেবেন। মনে রাখতে হবে, প্রতিটা দুর্ঘটনাই কিন্তু ইউনিক বা অতুলনীয়, অনেক অনুশীলন করেও অজানা বা নতুন পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে। তাই সেখানে সাহস, নিষ্ঠা আর প্রযুক্তির পাশাপাশি অধিকতর মেধা প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনেই এমন দক্ষ ট্যাকটিক্যাল টিম গঠন করা যেতে পারে। এই দল দেশের সব ধরনের দুর্ঘটনা বা অঘটন মোকাবিলায়ও সহায়ক হবে। এ দল তৈরি করতে খুব একটা বড় আকারের অর্থ লগ্নির ব্যাপার নেই, শুধু দরকার নীতিমালা, পূর্বপরিকল্পনা ও সমন্বয়ের।
কোনো দুর্ঘটনা থেকে শেখার বিষয়টা কীভাবে কার্যকর করা যাবে?
কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেলে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি, প্রয়োজন ‘ফরেনসিক স্টাডি’ বা প্রামাণিক তথ্য পর্যালোচনার। এর জন্য দরকার একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি প্রায়োগিক দলের। কেবল তখনই খুঁজে পাওয়া যায় কী কারণে, কেন, কোথায়, কখন ঘটনাটি ঘটল। ফলে, বের হয়ে আসে ভবিষ্যতে এ রকম ঘটনা এড়ানোর স্বার্থে, বর্তমান নীতিমালায় কী পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংযোজন করা দরকার কিংবা নতুন কোন নীতিমালা প্রণয়ন করার প্রয়োজনীয়তা। গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক কমিটির কাঠামো পরিবর্তন করে জনস্বার্থে পদক্ষেপ নিতে হবে ভবিষ্যৎ মোকাবিলার জন্য। পশ্চিমা বিশ্ব ধীরে ধীরে এভাবেই এগিয়ে গেছে, যত ভুল আর দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নতুন নতুন নীতিমালা ও আইন প্রবর্তন করে।
দুর্ঘটনা ঘটলেই, আমরা খুঁজতে থাকি চটজলদি সমাধান। এখানেই বিপত্তি। আমরা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিন্যাসের আগেই কার্যকারণকে ব্যক্তিত্ব আরোপ করি। তারপর খুঁজে বের করার চেষ্টা করি কে সেই ব্যক্তি, তারপর ধর-পাকড় এবং পরিশেষে শাস্তি। তারপর ভুলে যেতে থাকি ঘটনাটিকে। কিন্তু প্রতিনিয়ত উপেক্ষা করি, ঘটনাগুলোর মধ্যে নিহিত সমাধানের ইঙ্গিত, অবকাশ থেকে যায় আরও জানার, আরও বোঝার, কিছু করার। তাই ঘটনাগুলো থেকে আমাদের শিখতে হবে, পরিবর্তন আনার জন্য। এগিয়ে চলার জন্য।
অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১১০তম সংখ্যা, জুন ২০১৯