কাট আউট উইজ
স্বপ্ন ও সাম্য যেখানে একাকার

‘ব্যস্ত শহরে,
ঠাস বুনটের ভিড়ে
আজও কিছু মানুষ
স্বপ্ন খুঁজে ফেরে।’

‘কাট আউট উইজ’, মূলত অফিস স্থাপনা। ঢাকার ব্যস্ততামুখর পান্থপথের নাভানা ডিএইচ টাওয়ারে গড়ে উঠেছে আধুনিক এই অফিসটি। অফিসটির পরিমণ্ডল ক্ষুদ্র হলেও পুরো অন্দরটাই যেন স্বপ্নময়। অফিসে প্রবেশপথ থেকে শুরু করে ভেতর-বাইরেও একদম শেষ অংশটুকুতেও নান্দনিকতার ছোঁয়া। সবকিছুকে ঘিরে যেন এক অমোঘ মোহ ও উজ্জ্বলতার বহ্নিঃপ্রকাশ। দেখে মনে হয়, আমুদে একটা ভাব আছে। অফিসের ভেতরের ও বাইরের পরিবেশের মধ্যে রয়েছে সৃষ্টিশীলতার খেলা। আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে যিনি এই পরিসরটি সাজিয়েছেন, তথা ডিজাইন করেছেন তিনি সাউথ ইস্ট ইউনিভার্সিটির প্রভাষক স্থপতি লতিফা সুলতানা।

‘কাট আউট উইজ’ ই-কমার্স সংস্থার চিত্র সম্পাদনার কাজে নিয়োজিত। এই কাজের পাশাপাশি ডিজিটাল সম্পদ পরিচালনা, বিক্রয়, বিপণন, ব্যবসার উন্নয়ন, প্রকল্প পরিচালনা, কাস্টমার সম্পর্কযুক্ত ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ ও প্রশিক্ষণ, এন্টারপ্রাইজ ব্যবসায় অ্যাপ্লিকেশন তৈরিসহ নানা ধরনের কাজ করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ রয়েছে। তাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রোডাক্টগুলো হোস্ট করতে হয়। ফটোগ্রাফি ও হোস্ট প্রোডাকশন কাজও করতে হয় তাদের। এখান থেকে প্রতিমাসে প্রায় ১১-১২ লাখ ইভেন্ট প্রসেসিং হয়। ৩৫০ জনের অধিক জনবল জড়িত এসব কাজে। ৩ শিফটে ২৪ ঘণ্টা কাজ হয় প্রতিষ্ঠানটিতে। এ ধরনের একটি জনবহুল কর্মমুখর অফিসের ইন্টেরিয়র ডিজাইন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। আর তা সফলভাবে করতে সক্ষম হয়েছেন স্থপতি লতিফা সুলতানা, তাও আবার এক মাসেরও কম সময়ে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে স্থপতির প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল স্বল্প পরিসরটাকে উত্তম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনেক মানুষের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা। তবে কিছুতেই যেন মনে না হয় অফিস পরিসরটি ছোট। সবাই যেন সুন্দর কর্মপরিবেশ পায় তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। তা ছাড়া অফিসে আগতরা যেন প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পায়, সেটাও বিবেচনায় রাখতে হবে। আর তাই ডিজাইনের ক্ষেত্রে রং, কাগজপত্র, বৈদ্যুতিক ডিভাইস, মালামাল, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, আলোক ব্যবস্থাপনা, ইনডোর প্ল্যান্টসসহ সব বিষয়ে সমান গুরুত্ব দিয়েছেন স্থপতি।

অফিসে প্রবেশ করলেই দেখা যাবে সৃষ্টির খেলা! দেয়ালে দেয়ালে ষড়্্ভুজাকার প্যানেলের কাজ নজর কাড়বে সবার। প্যানেলগুলো স্থাপত্য রীতি অনুযায়ী রচিত। এই প্যানেলের কাজ ছাদ ও দেয়াল উভয় জায়গাতেই রাখা হয়েছে। প্যানেলে সাদা বোর্ড ছাড়াও কোথাও কোথাও অ্যাক্রেলিক ব্যবহার করা হয়েছে, যা তার দিয়ে ঝোলানো। ষড়্্ভুজাকার প্যানেলগুলোতে দেয়ালের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাদা ও প্রকৃতির সজীবতার কথা মাথায় রেখে সবুজ রঙের ব্যবহার করা হয়েছে। আর তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যুক্ত করা হয়েছে স্পট লাইট। অফিস স্থাপনায় প্রাকৃতিক আলোর প্রাধান্য কম থাকে নিয়মের কারণে। কৃত্রিম আলোকসজ্জার ব্যবহার করতে হয় আর এই আলোকসজ্জা যদি প্রকৃতির সজীবতা ও কাঠামো মাথায় রেখে করা হয়, তবে তা আমাদের নিয়ে যেতে পারবে প্রকৃতির সংস্পর্শে। তখন তা যতই কৃত্রিম হোক। ‘কাট আউট উইজ’ অফিসটিতে এই বিষয়টাকে প্রাধান্য দিয়েই বেশ কিছু নান্দনিক কাজ সম্পাদিত হয়েছে। 

স্থপতি অফিসের পরিবেশ শান্ত, নির্মল ও মনোরম করে তোলার জন্য এই দুই রঙের শেড ব্যবহার করেছেন। দেয়ালে দেয়ালে প্রাধান্য পেয়েছে গাঢ় ও হালকা ধূসর রঙের। দেয়ালের নিচের ও ওপরের অংশে গাঢ় ধূসর রং ও মধ্যবর্তী অংশে হালকা ধূসর রং। হালকা ধূসর রং এক ধরনের শুভ্রতা প্রকাশ করছে। অফিসের লোগোতেও এই সবুজ রঙের শেড ও ধূসর রঙের মাত্রা দেখা যায়। তা ছাড়া অফিসে যেহেতু গ্রাফিক্যাল কাজ বেশি করা হয়, সেহেতু দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিক্যাল আর্ট দেখা যায়।

এই অফিসটি যেহেতু অত্যন্ত প্রযুক্তিবান্ধব, তাই অফিসের সর্বত্র তারের ব্যবহার অনেক বেশি। তার ব্যবস্থাপনায় ফলস সিলিংয়ের মতো করে স্পেসিফিক স্টিল ট্রে ব্যবহার করেছেন, যাতে রাউটার থেকে শুরু করে সব ধরনের তারের সংযোগ ও ব্যবস্থা আড়াল করে রাখা যায়। এই ট্রে যেমন একদিকে তারগুলোকে ঢেকে রাখে অপর দিকে ট্রে ব্যবহারের কারণে সিলিংটাকে সুন্দর দেখা যায়। ট্রের ভেতরের তারগুলো সাধারণত হলুদ, কমলা ও উজ্জ্বল লাল রঙের হয়ে থাকে। কোনোভাবে ট্রেকে অতিক্রম করে তার বেরিয়ে এলে, তা দেখতে খারাপ লাগবে না; বরং সৌন্দর্য বাড়াবে।

হাতের কাছেই সবকিছু এমন একটা বিষয়কে মাথায় রেখে স্থপতি অফিস কর্মকর্তাদের জন্য বসার ব্যবস্থা করেছেন। এসব বসার ব্যবস্থাপনা এমনভাবে করা যাতে কয়েকজন মিলে দলীয়ভাবে কাজ করতে পারে। রাখা হয়েছে পর্যাপ্ত কেবিনেট। এসব কেবিনেটে যেমন অফিসের কাগজপত্র, ফাইল, নথি রাখা যাবে, তেমনি এর ভেতরেও থাকবে তারের সংযোগ, যা আপাতদৃষ্টিতে বাইরে থেকে দেখা যাবে না। প্রতিটা টেবিলের নিচে একটা করে কাঠের ট্রে রয়েছে। যেহেতু অফিস রুম, চারপাশে তারের ছড়াছড়ি থাকবে সেহেতু এই ট্রের ভেতরে তারের সংযোগ রাখা হয়েছে। বলা চলে, সম্পূর্ণ তার এই ট্রের ভেতরে রয়েছে। ট্রের অভ্যন্তরে তার ছাড়াও রয়েছে সুইচ বোর্ড, সুইচ সকেট ও তারের সংযোগ। প্রতিটা টেবিলে এ যে ল্যাপটপ বা কম্পিউটার থাকবে তার সংযোগও থাকবে এই ট্রেতে। তা ছাড়া, ইন্টারনেট সংযোগও এই ট্রে থেকে নেওয়া। ট্রে থেকে টেবিলের ভেতর পর্যন্ত এই সংযোগ পৌঁছেছে।

প্রকৃতি, পরিবেশ বিবেচনায় পরিসরে রাখা হয়েছে ইনডোর প্ল্যান্টস। এসব সবুজ গাছপালা কাঠের বাক্সের মধ্যে রেখে সাজানো হয়েছে। অফিসের রঙের সঙ্গে মিল রেখে কাঠের ওপরে সাদা রঙের ব্যবহার লক্ষণীয়। গাছের গোড়ায় ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন আকারের পাথর। গাছ বাক্সের পাশে বসার জন্য রাখা আসন। এই আসনে সবুজ রঙের বিন ব্যাগ ও ফোম ব্যবহার করা হয়েছে। এই বাক্সের ভেতর দিয়েও রয়েছে তারের সংযোগ, যা বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই।  গাছসমেত খণ্ড খণ্ড অনেক বাক্স দেখা যায়। বৈদ্যুতিক ত্রুটি ও সংযোগ দেখা গেলে এই খণ্ড বাক্স খুলে নিয়ে খুব সহজেই তা মেরামত করে নেওয়া যাবে। তা ছাড়া, অফিস দেয়ালের মধ্যে যে প্যানেল করা রয়েছে সেই প্যানেলের ভেতরকার তার প্রতিটি টেবিলের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে এই বাক্সের মধ্যকার প্রবহমান তার দিয়ে।

মিটিংরুমের দেয়ালে দেয়ালে পেইন্টিং ঝোলানো হয়েছে। যাতে কাজের মধ্যে থেকে থেকে বিতৃষ্ণা লাগলেও এই ছবি দেখে যেন এক মুহূর্তের জন্য হলেও মন ভালো হয়ে যায়। কর্নারে একটি কাঠের বক্সে কিছু ইনডোর প্লান্ট রাখা হয়েছে। এসব রুমের মতো এই মিটিংরুমেও ওমনি লাইট ও স্পট লাইটের ব্যবহার করা হয়েছে।

অবসর সময়টা উপভোগ করা ও আড্ডার জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থানে সবুজ কার্পেটে মোড়ানো। যাতে প্রকৃতির সবুজের সঙ্গে একটা সংযোগ মেলে। এই স্থানটিতে বিন ব্যাগের তৈরি হরেক রঙের অর্থাৎ, লাল ও সবুজ রঙের সিটিংয়ের দেখা মেলে। একপাশে গর্জন কাঠের দেয়াল দেখা যায়, যা স্থানটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। 

সারা দিনের অফিসের কর্মমুখর পরিবেশ একসময় নিয়ে আসবে ক্লান্তি। এই ক্লান্তি ও পরিশ্রান্ত পরিবেশ দূর করার জন্যে অফিসের এক পাশে রয়েছে একটি ছোট আড্ডা দেওয়ার স্থান। স্থপতি এই স্থানটিকে ম্যাটেরিয়াল, ফার্নিচার ও আলোকসজ্জা দিয়ে চমকপ্রদ ও মনোরমভাবে সজ্জিত করেছেন।

এই স্থানটিতে দেয়ালের সঙ্গে সংযুক্ত রেখে একটি বসার জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যার দেয়াল পুরোটাই ওক কাঠের তৈরি। দেয়ালের দুই পাশের কাঠের কাজের মধ্যে রয়েছে থাই গ্লাসের কাজ। উপরিভাগে স্পট লাইট ব্যবহার করা হয়েছে। গ্লাসের ওপরে স্পট লাইটের প্রতিবিম্ব পড়াতে এই স্থানটিকে মোহনীয় করে তুলেছে। বসার স্থানে ব্যবহার করা হয়েছে বিন ব্যাগের ফোম। তা ছাড়া দুই পাশে ব্যবহার করা হয়েছে আকাশি ও হলুদ রঙের দুইটি কুশন। সবকিছুই বসার স্থানকে আরামদায়ক করে তোলে। মূল বসার ব্যবস্থার সামনে রয়েছে আরও চারটি একক আসন। এই আসনও বিন ব্যাগের তৈরি। এই আসনগুলোতে আবার হরেক রঙের বৈচিত্র্য দেখা যায়। আসনগুলো আকাশি, হলুদ ও কমলা রঙের। একটি আসনে বিন ব্যাগের ওপরে মোটা পুরুত্বের গ্লাস ব্যবহার করা হয়েছে। ফ্লোরে টালির ব্যবহার, এক পাশের দেয়ালে সাদা ও ধূসর রঙের কম্বিনেশন। তার সঙ্গে মিলে আছে ওক কাঠ, গ্লাস ও বিন ব্যাগের কাজ। 

এই অফিসের আরেকটা রুম হলো প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস রুম। এই রুমের ডেস্ক ও সিটিংয়ে পার্টিকেল ওক বোর্ড ব্যবহৃত হয়েছে। ডেস্কের পেছনের কেবিনেট সাদা বোর্ডে তৈরি। তাতে ডকু পেইন্ট (ব্ল্যাক) ব্যবহার করা হয়েছে। রুমের ওপরে অমনি লাইট ও স্পট লাইট ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া রুমের ফ্লোর এ ধূসর কার্পেট ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া অফিস রুমের সর্বত্র হরেক রকমের ইন্টেরিয়র লাইট ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানভেদে ডাউন লাইট, স্ট্রিপ লাইট, স্পট লাইট ও পেন্ডেন্ট লাইটের ব্যবহার সর্বাধিক। এভাবে সমগ্র অফিস স্থাপনাটিকে দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক উপকরণে সাজানো হয়েছে, যা অফিসের কর্মরত জনবল ও আগতদের জন্য একটি মনোরম দৃষ্টিনন্দন স্থান হিসেবেই বিবেচিত। 

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৮তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০২০।

স্থপতি মৃধা রাতুল
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top