দৈত্যাকার ক্রিস্টাল গুহা
মেক্সিকোর স্থানীয় ভাষায় বলা হয়, “Cueva de los Cristales” । যার বাংলা অর্থ, ‘ক্রিস্টাল গুহা’। অবস্থান নাইকা খনি, চিহুয়াহুয়া, মেক্সিকো। এটিই পৃথিবীতে একমাত্র প্রাকৃতিকভাবে তৈরি একক সর্ববৃহৎ ক্রিস্টাল। ক্রিস্টালটির চূড়ার উচ্চতা ১৫ মিটার বা ৪৫ ফুট, আর ওজনে ৫০ হাজার কেজিরও বেশি।
মাটির নিচের ম্যাগমা (গলিত লাভা) চেম্বার থেকে ৫ কিলোমিটার উঁচুতে প্রাচীন খাঁচে অবস্থান গুহাটির। আর এখানেই জিপসামের (সেলেনাইটের) গাঁথুনিতে বেড়ে উঠেছে সর্ববৃহৎ এই ক্রিস্টালটি। গলিত লোহিত লাভার ওপর ফুটন্ত ভূগর্ভস্থ পানিতে সালফারের ঘনত্ব থাকে বেশি। এর মধ্যে অক্সিজেন মিশে সালফেট আয়ন তৈরি হয়। ৫ লাখ বছর ধরে এই আয়ন থেকে জিপসাম দানা বাঁধতে বাঁধতে রূপ নিয়েছে ক্রিস্টালে। ক্রিস্টালগুলো চারপাশে ছড়িয়ে না পড়ে গুহার মধ্যে ওপরের দিকে বেড়েছে। দেখে অনেকটা গীর্জা গীর্জা মনে হয়।
অতি ক্ষুদ্রাকৃতির জীবাণু যা বিজ্ঞানের নতুন এক ধারা, এই ক্রিস্টালের মধ্যে খুঁজে পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, জীবাণুগুলো জীবনধারণের অনুপযোগী সালফার মিশ্রিত ফুটন্ত গরম পানিতে বহাল তবিয়তেই বেঁচে ছিল এবং পরে ৫০ হাজার বছর ধরে গুহার ক্রিস্টালের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় আছে।
প্রকৃতির বিস্ময় এই গুহাতে ট্যুরিস্টদের প্রবেশের আগে অবশ্যই বোধগম্য কারণে বিশেষ ধরনের স্যুট পড়তে হয়। গুহার মধ্যে মধ্যে কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৫৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস উঠে যায়; আর বাতাসের আর্র্দ্রতা থাকে শতকরা ৯০-৯৯ ভাগ। এই গুহাটি মাইনাররা ২০০০ সালে খুঁজে পায়। গুহার ভেতরে বিরাজমান অসম্ভব বৈরী আবহাওয়ার কারণে কেউই ধারে-কাছে ভিড়তে চান না। অতি উৎসাহী কেউ কেউ গুহাতে ঢুকে ১০ মিনিটের মধ্যে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হন।
গ্রেট ব্লুহোল (The Great Blue Hole)
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অতুলনীয় গ্রেটব্লুহোল কিন্তু ভয়জাগানিয়াও বটে! এটা বেলিজের মূল ভূমি থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে লাইনহাউস রিফে অবস্থিত। এই প্রাকৃতিক গর্তটি একেবারে গোলাকার, গভীরতায় ১২৪ মিটার (৩৯১ ফুট) আর প্রস্থে ৩০০ মিটার (৯৪৫ ফুট)। ধারণা করা হয়, স্তরে স্তরে তৈরি হওয়া এইব্লুহোলটি বর্তমান অবস্থায় পৌঁছাতে ১৫ হাজার বছরের মতো সময় লেগেছে।
জলামগ্ন এই গর্ভে জটিল গঠনের পুরোটাই অন্ধকারে আচ্ছন্ন। এর ভেতরে অসংখ্য স্ট্যালাকটাইটগুলোর কারণে মনে করা হয়, এগুলো তৈরি হয়েছে সমদ্রপৃষ্ঠের ওপরে। পূর্বে গ্লেসিয়াল যুগের সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ বর্তমানের তুলনায় অনেক নিচে ছিল। বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে এই গুহাটি সমুদ্রের লোনা পানিতে তলিয়ে গেলে এর লাইমস্টোন কেভের ছাদ ধসে পড়ে।
গ্রেটব্লুহোল সেরা স্কুবা ডাইভিং স্পটগুলোর মধ্যে একটি। এটির স্বচ্ছ পরিষ্কার জলরাশিতে প্যারাটফিশ এবং রিফ হাঙ্গরসহ বিভিন্ন ধরনের মাছের আনাগোনা। এ ছাড়া বদ্ধ এ জলরাশি ছোট অন্য মাছদেরও অভয়ারণ্য।
ফিংগালের গুহা
ষষ্ঠ কোণবিশিষ্ট ব্যাসাল্টের কলাম আকৃতির দেয়ালের জন্য জগদ্বিখ্যাত ফিংগালের এই গুহা। পুরোটাই সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত এই গুহাটির অবস্থান স্কটল্যান্ডের স্টাফা দ্বীপে। এটির মালিকানা স্কটল্যান্ডের ন্যাশনাল ট্রাস্টের। গুহাটির অনন্য বৈশিষ্ট্যের একটি হলো, উদ্ভট আকৃতির এ গুহার অভ্যন্তরে প্রতিনিয়ত মনোমুগ্ধকর শব্দ তৈরি হয়। এ কারণে এর স্থানীয় নাম Uamh- Bi–, বাংলায় যার মানে ‘সুরের গুহা’।
অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি এই গুহার অদ্ভুত পিলারগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো, উত্তপ্ত লাভা শীতল হয়ে এগুলোর সৃষ্টি হয়েছে। আজ থেকে ৬০ মিলিয়ন বছরে আগে একইভাবে তৈরি হয়েছিল আয়ারল্যান্ডের জায়ান্ট কজওয়ে। মজার ব্যাপার হলো, এই দুটো সাইটই এক উপাদানে তৈরি একটি ব্রিজ দ্বারা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
১৭৭২ সালে এই গুহাটি আবিষ্কৃত হয় এবং সমকালীন স্থানীয় জনপ্রিয় একটি কবিতার নামানুসারে এটির নামকরণ করা হয়। তাই এ গুহাটি অনেকের প্রবল আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময়ই। ফিংগালের গুহাটি এতটাই নয়নাভিরাম যে ইংরেজ রক সংগীতশিল্পী পিংক ফ্লয়েডের গানের কলিতে এটির উল্লেখ সুরের ছন্দে আজও ভেসে বেড়ায় বিশ্বময়। এমনকি এই গুহা ভ্রমণ করে গেছেন স্বয়ং ইংল্যান্ডের রাণী ভিক্টোরিয়া। স্টাফা দ্বীপে পৌঁছাতে হলে দুরন্ত সাগরের ঢেউ পেরিয়ে যেতে হয়। এই দ্বীপটি বাসযোগ্য নয়। শুধু গুহাটি দেখার জন্য কালেভদ্রে পর্যটকদের আনাগোনা দেখা যায়।
হ্যাং সন ডুং গুহা
বিশ্বের বৃহত্তম গুহাগুলোর মধ্যে অন্যতম গুহা হ্যাং সন ডুং। ভিয়েতনামের কুয়াং বিন প্রদেশে যার অবস্থান। ২০০ মিটার গভীর, ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১৫০ মিটার প্রশস্ত এই গুহাটি। ভূ-অভ্যন্তরের একটি নদীর মাধ্যমে এই গুহাটি তৈরি হয়, যা বিভিন্ন প্যাসেজের মধ্য দিয়ে এখনো প্রবহমান। ধারণা করা হয়, প্রায় ৩০ লাখ বছর আগে এই গুহার সৃষ্টি। গুহার ভেতরটা এতটাই বিশাল যে একেকটি প্রকোষ্ঠে রয়েছে নিজস্ব আবহাওয়া। ভেতরে জমে থাকা ঘন কুয়াশা এবং গাঢ় মেঘের কারণে এটির ছাদ পর্যন্ত প্রায়ই ঢাকা পড়ে। গুল্ম ও গাছগাছালির ঘন সন্নিবেশ-এর জমিনকে ঢেকে রেখেছে, ঠিক যেন সবুজ কার্পেটে।
এটি এমন একটা আবহ তৈরি করে যেন আমরা বাইরেই বেড়ে ওঠা কোনো বনের মধ্যে আছি। এই গুহার ছাদ দিয়ে ঘন মেঘরাশি বেরিয়ে পড়ার ফলে এ গুহার ব্যাপারটা পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়। ১৯৯১ সালে স্থানীয়দের একজন পাহাড়ের খাড়া দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠে আচমকাই এ গুহাটি দেখতে পান। এ গুহার কোনো একটি চেম্বার থেকে বেরিয়ে পড়া সাদা মেঘ তাঁর নজরে পড়ে।
দীর্ঘদিন পর ২০০৯ সালে একদল ব্রিটিশ পরিব্রাজক এই গুহাটিতে অভিযান চালিয়ে গুহাটির অস্তিত্ব আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করান। বিশ্ববাসী জানতে পারে এই গুহার ভেতরকার বিস্ময়কর আবহাওয়াব্যবস্থা, এতে থাকা ৬০ মিটার উঁচু ক্যালসাইট ওয়ালের কথা। এর নাম দেওয়া হয় ঞযব এৎবধঃ ডধষষ ড়ভ ঠরবঃহধস। এ ছাড়া গুহার মধ্যে রয়েছে ৮০ মিটার লম্বা স্ট্যালাগমাইট এবং ‘কেভ পার্ল’। দীর্ঘদিন ধরে ক্যালসিয়াম সল্টের জলীয় দ্রবণ একটি কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র বস্তুর ওপরে ফোঁটা ফোঁটা পড়ার ফলে এই পার্লটি তৈরি হয়েছে।
এ গুহার ভেতরের চেম্বারগুলো খুব দুর্গম হওয়ায় এর অনেকাংশ এখনো অনাবিষ্কৃত রয়েছে। এই গুহার অভ্যন্তর এতটাই দুর্গম যে এ গুহাতে যত মানুষের পদচারণা হয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি মানুষের পদচারণা রয়েছে চাঁদের বুকে। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষের কাছে এই গুহাটি অদম্য কৌতূহলের অপর নাম। হয়তোবা তাই প্রতিবছর মাত্র ৫০০ জন সৌভাগ্যবান ব্যক্তিকে এই গুহায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। এই গুহায় প্রবেশের অপেক্ষমাণ তালিকায় আগামী দুই বছরের জন্য ‘নো ভ্যাকেনসি’ সাইনবোর্ড ঝুলছে!
অ্যাকতুন টিউনিচিল মুকনাল
প্রাচীন মায়ান সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক বিস্ময়ে ভরপুর এই গুহার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে হয়তো অ্যাডভেঞ্চার সিনেমার নায়ক ইন্ডিয়ানা জোন্সের মতো ভাবতে পারেন আপনি। স্থানীয় ভাষা থেকে অনুবাদ করলে নামটি দাঁড়ায়, ‘স্ফটিক সেপালচারের গুহা’। যেমন নাম, তেমনিই এর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে এই গুহায়। ভৌগোলিক অবস্থান কায়ো, বেলিজে।
এই গুহার আরেক নাম, ‘স্ফটিক মানবী’। এই নামকরণের কারণ হলো, এ গুহায় শুয়ে আছে আনুমানিক ১৮ বছরের বয়সী একজন তরুণীর মমির দেহাবশেষ নিয়ে। এর আশপাশে রয়েছে আরও কয়েকটি মমি। ধারণা করা হয়, এই হতভাগ্যদের বলি দেওয়া হয়েছিল। গুহার স্যাঁতসেঁতে মাটিতে মেয়েটির দেহাবশেষ হাড়ের ওপরে ক্যালসিয়ামের আস্তর পড়ে স্ফটিক হয়ে ঢেকে রয়েছে, যার ওপরে আলো পড়লে আলো বিচ্ছুরণ ঘটে।
গুহার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর কারণে গুহার ভেতরে সৃষ্টি হয়েছে বাঁকের, যার ওপরের দিকে সৃষ্ট গর্ত দিয়ে এর ভেতরে প্রবেশ করা যায় সহজেই। গুহার ভেতরে মায়ানদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র দেখতে পাওয়া যায়। এ ছাড়া গুহার ওপরের দিকে ভেতরের ছাদ দিয়ে চুঁইয়ে পড়া পানির খনিজ থেকে তৈরি হয়েছে স্ট্যালাকটাইট। ছাদের চুঁইয়ের পড়া পানি নিচে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ে গুহার মেঝেতে তৈরি করেছে নান্দনিক সৌন্দর্যের স্ট্যালাগমাইট।
(তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট)
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৯তম সংখ্যা, মে ২০১৯