প্রাচীন জলদুর্গের সন্ধানে (পর্ব ১)

শুরুর কথা

প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অন্যতম সাক্ষী প্রাচীন জলদুর্গ। ইট-পাথরের কাব্যে রচিত এই দুর্গ স্থাপনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় মুঘলদের পরাক্রমশীলতা, সাহসিকতা, সৃজনশীলতা ও মননশীলতার কথা। মুঘল আমলে যে জলদুর্গ স্থাপনা গড়ে উঠেছিল, তা আজও টিকে আছে এই বাংলার গহিনে-নির্জনে; কিছুটা অবহেলা-অনাদরে। এপার ও ওপার বাংলা একসময় এক থাকলেও দেশ, কাল, সময় ও পরিস্থিতির চাপে পড়ে পৃথক হয়। তবুও ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃৃতি ও ভাষা বৈচিত্র্যের দিক দিয়ে পৃথক নয়। যেমন মিল দেখা যায় তাদের আন্তরিকতায় তেমন স্থাপনায়। সমগ্র বাংলাজুড়ে বহু প্রাচীন নিদর্শন ও স্থাপনা রয়েছে, যা এখনো বহু মানুষের অন্তর্ধাম রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু। এখনো এসব স্থাপনা টিকে রয়েছে বহু কালের চড়াই-উতরাই পার হয়ে। মনুষ্যসৃষ্ট ও প্রকৃতিগত কারণ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তাই তো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এখনো সেই সব প্রাগৈতিহাসিক স্থাপনা। এসব স্থাপনাকে ঘিরে রয়েছে নানা কথকতা; বহুল জনশ্রুতি। কেউ কেউ ইতিহাস, ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দিচ্ছে, আবার কেউবা সামাজিকতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। আবার কেউ কেউ গল্পের ঝুলি থেকে গল্প বের করে জুড়ে দিচ্ছে তার ইতিহাসের সঙ্গে। আর সেই থেকে একেকটি ঐতিহাসিক স্থাপনাকে নিয়ে তৈরি হচ্ছে বহুল জনশ্রুতি। জনশ্রুতি থাকুক আর নাই থাকুক, তবুও এই একেকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা আমাদের সম্পদ। বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও চেতনাবোধ।

জলদুর্গ কী?

জলদুর্গ বলতে জল ও দুর্গের সম্পর্ক স্থাপন বা সমাহারকে বোঝায়। অর্থাৎ জল+দুর্গ = জলদুর্গ। দুর্গের অবস্থান সরাসরি জলের ওপরে; জলসংলগ্ন স্থানে; অথবা জলের নিকটবর্তী স্থানে বা তীরে অবস্থিত স্থাপনা। জল বলতে বিশাল পানির আধারকে বোঝায়। সে ক্ষেত্রে দেশ বিবেচনায় সে স্থান হবে নদী বা নদ। নদী বা নদসংলগ্ন স্থানে বা তীরে অবস্থিত দুর্গই জলদুর্গ। কোনো কোনো বিবেচনায় জলসংলগ্ন দ্বীপে অবস্থিত দুর্গই জলদুর্গ। সর্বোপরি, জলদুর্গসমেত এলাকা হবে একটি ‘নৌ-নিয়ন্ত্রণ এলাকা’ বা ‘নৌ-নিয়ন্ত্রণ ফাঁড়ি’। ঢাকার প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে এই জলদুর্গের উৎপত্তি ও সূচনা। সেই সময়ের পার্সপেকটিভে এ ধরনের পরিকল্পনা ও প্রয়োগ একটি আশ্চর্যজনক অধ্যায় ছাড়া কিছুই নয়।

জলদুর্গ বলার কারণ

  • সরাসরি জলের সঙ্গে সম্পর্কিত।
  • নৌ-নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
  • সরাসরি নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্থাপনা।
  • একটি সুদৃঢ় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা; যার জয় অনেকটাই নিশ্চিত। 
  • জ্যামিতিক সরলরৈখিক ব্যবস্থাপনা, যা ক্রমবর্ধমান।

জলদুর্গের ধারণা

প্রাচীনকালে জলপথে যোগাযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। মানুষ তখন নদীপথে বিভিন্ন জলযান ব্যবহার করত। এসব জলযানের মধ্যে রয়েছে- নৌকা, ছিপ, পানসি, ডিঙ্গি, সপ্তডিঙ্গা নৌবহর, ময়ূরপঙ্খি নাও, কাঠের মাস্তুলবিশিষ্ট জাহাজ, ছোট-বড় নৌবহর, পাতাম, নাইওরি, রপ্তানি, বাচারি, সাম্পান, লম্বা পদি, তালের নাও কোন্দা, ঘাসি, ইলশা, সওদাগরি, গয়না, কোষা প্রভৃতি। এক দেশের মানুষ আরেক দেশে যেত নৌপথে। মাঝেমধ্যে জলদস্যুরা জলপথে ডাকাতিও করত। হানা দিত এক দেশ থেকে আরেক দেশে। তাই দুর্গের মতো বিশাল একটা স্থাপনা যদি নদীসংলগ্ন স্থানে হয়, তবে তা বিশাল ও কার্যকরী ভূমিকা রাখে। তা ছাড়া একের অধিক দুর্গ যদি হয়, তবে বিষয়টা সপ্ত দরজার মতো হয়ে যায়। রূপকথার গল্পে যেমনটা দেখা যায়। সপ্তদরজা পাড়ি দিলে মণি মূল্যের আকর। তেমনি প্রতি ধাপে ধাপে একেকটি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। জলপথের এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করবে জলদুর্গ।

জলদুর্গ নির্মাণের সময়কাল

মুঘলরা যখন এ দেশ শাসন করে তখন এতদঞ্চলের সুবেদার ছিলেন মীর জুমলা (১৫৯১-১৬৬৩ খ্রিষ্টাব্দ)। তিনি ছিলেন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের (১৬১৮-৫৮ খ্রিষ্টাব্দ) একজন বিশেষ প্রতিনিধি। মীর জুমলা ঢাকার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সুদৃঢ় ও নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দুর্গ নির্মাণ করেন। যেহেতু মীর জুমলার শাসনকাল ছিল ১৬০০-০৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত, সেহেতু এই সময়েই দুর্গসমূহ নির্মাণ করা হয় বলে ধারণা করা হয়। দুর্গ নির্মাণের কাজ অতিশয় দ্রুততর ছিল। কেননা তা হবে সামরিক ফাঁড়ি ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। তবে কোনো দুর্গ থেকে শিলালিপি পাওয়া যায়নি, যা থেকে বিস্তারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত মেলে। দুর্গের বাইরের ও ভেতরের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে মুঘল আমলের স্থাপনা বলে ধরে নেওয়া হয়।

কোনো জলদুর্গই প্রাসাদদুর্গ নয়

মুঘলরা এই বাংলায় এতগুলো জলদুর্গ নির্মাণ করেন অথচ কোনো দুর্গই প্রাসাদদুর্গ নয়। ভারতে দেখা যায়, মুঘল নির্মিত জলদুর্গ যেন একেকটি প্রাসাদদুর্গ। যেমন- লালকেল্লা, পুরোনো কেল্লা, তুঘলকাবাদ দুর্গ, শিরি-ফরহাদের দুর্গ, আগ্রা দুর্গ ইত্যাদি। এসব দুর্গ নদী, খাল-বিল ও পরিখাসংলগ্ন। প্রতিটা দুর্গের অভ্যন্তরে বহু স্থাপনা রয়েছে। অথচ আমাদের দেশের দুর্গের অভ্যন্তরে কোনো স্থাপনা নেই। ইদ্রাকপুর ও হাজীগঞ্জ দুর্গের অভ্যন্তরে যে স্থাপনা দেখা যায়, তা ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি, মুঘল আমলের নয়। শুধু প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের দেশের এই জলদুর্গ, যা সরল রৈখিক পরিধি অনুসরণ করে একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে মিলিত হয়েছে আর তা হলো রাজধানী ঢাকা।

জলদুর্গের ইতিহাস

প্রাচীন বাংলার মুঘল আমলের সবচেয়ে আলোচিত স্থাপনা হলো জলদুর্গ স্থাপনা। এই জলদুর্গের কথা চিন্তা করলে সর্ব সম্মুখে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধুলোমাখা এক বিশাল প্রান্তর। ঘোড়া ছুটিয়ে, ঘোড়ার খুর দিয়ে বিশাল প্রান্তর দাপিয়ে বেড়ানোর মতো স্থান। একসময় এসব প্রাচীন স্থাপনা দাপিয়ে বেড়াত মুঘল রাজা-বাদশাহ, তাঁদের সৈন্য-সামন্ত, উজির-নাজিরগণ ও প্রজাবৃন্দ। একেকটা জলদুর্গকে ঘিরে রচিত হয়েছিল একেকটা ইতিহাস। ঠিক কল্পনার সেই জগৎ যেন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একটা সময় ছিল যাকে হার্মাদদের কাল (ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দী) বলা হতো। হার্মাদ বলতে, মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের বলা হতো। দুই বাংলাতেই তাদের আগমন ছিল আক্রমণাত্মক ও মারাত্মক। সুলতানি আমলের কিছুকাল আগেই তারা এই বাংলায় আগমন করে।

প্রথম দিকে বণিক হিসেবে তারা বাংলায় আগমন করে। শুরুতে শান্তিপূর্ণভাবে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করলেও পরে তারা জোর-জবরদস্তি শুরু করে। একটা সময়, এই বণিকেরা দস্যুরূপ ধারণ করে। তখন তাদের ত্রাসে সব জায়গায় একটা ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করত। ওপার বাংলার হুগলি, গোয়াতে তাদের আক্রমণের মাত্রা ভয়াবহ রূপ ধারণ করলে তাদের সেখান থেকে বিতাড়ন করা হয়। এপার বাংলার ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, যশোর, সুন্দরবনসহ বিভিন্ন স্থানে তারা আক্রমণ করে। সুলতানি আমলে তাদের আক্রমণের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয় তারা অনেক লুণ্ঠন চালায়। 

পরে মুঘল আমলে সোনারগাঁ থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করা হয়। সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামে ঢাকার নামকরণ করা হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর’। মুঘলদের ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তরের পর জলদস্যুরা ঢাকা আক্রমণ করত। তারা শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে উত্তরে ডেমরার কাছে চলে আসত। তখন শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে প্রাচীন দোলাই নদীর একটা সংযোগ ছিল। (বর্তমানে যা ধোলাই খাল সড়ক নামে পরিচিত) এই সংযোগস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা পর্যন্ত, যা শেষ পর্যন্ত, বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। সে সময় বাংলার সুবেদার ছিলেন মীর জুমলা। তিনি জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। আর সেই পরিকল্পনার ফলপ্রসূ হচ্ছে ‘জলদুর্গ’।

জলদুর্গ পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য

প্রাচীন এই জলদুর্গ নির্মাণে সুবেদার মীর জুমলার পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি এমনভাবে সাজানো হয় যে জলদস্যুরা নৌকাযোগে মেঘনা নদী অতিক্রম করে ধলেশ্বরী নদীর মোহনায় এসে পৌঁছাবে। সে সময় তারা প্রাচীন বিক্রমপুর অতিক্রম করবে। বিক্রমপুরের ইদ্রাকপুর থেকে ধলেশ্বরী নদী অতিক্রমের প্রথম ধাপ থাকবে ‘ইদ্রাকপুর দুর্গ’। সেই দুর্গ থেকে কামানের গোলা ছাড়া হবে জলদস্যুদের প্রতিহত করার জন্য। ইদ্রাকপুর দুর্গসমেত এলাকা যদি তারা অতিক্রম করতে পারে, তখন তারা প্রবেশ করবে শীতলক্ষ্যা নদীতে। এ অবস্থায় শীতলক্ষ্যা নদীসমেত ‘সোনাকান্দা দুর্গ’ থেকে কামানের গোলা ছাড়া হবে।

এই ধাপও যদি মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুরা অতিক্রম করতে পারে, তবে তারা দোলাই নদীতে প্রবেশের প্রাক্কালে ‘খিজিরপুর দুর্গ’ থেকে কামানের গোলা ছাড়া হবে। অনেক ইতিহাসবেত্তা এটিকে শেষ প্রতিরোধব্যবস্থা বলে গ্রহণ করেন। মীরজুমলা ফতুল্লার পুরোনো দাপাতে আরেকটি দুর্গ নির্মাণ করেন। দাপা থেকে অদূরে ছিল তাঁর নির্মিত আরেকটি দুর্গ। এই দুর্গ দুটিতেও পর্যায়ক্রমিক মোকাবিলা করে জলদস্যুদের সামনের দিকে অগ্রসর হতে হতো। এখানে একটা মজার বিষয় হলো যে অনেকটা গেম খেলার মতো, শত্রু পক্ষকে ঘায়েল করার কতগুলো ধাপ। একটা ধাপ পার হলে আরেক ধাপ। কোনো ধাপই নিরাপদ নয় শত্রুপক্ষের জন্য। প্রথম ধাপ থেকে কেউ কেউ বেঁচে ফিরলেও দ্বিতীয় ধাপে সে ধরাশায়ী হবেই। তাও যদি না হয় তবে শেষ প্রতিরোধব্যবস্থা থাকছে, যেখানে শত্রুপক্ষ ধরাশায়ী।

তিনটা দুর্গ এখনো বেঁচে রয়েছে। ইদ্রাকপুর দুর্গ, সোনাকান্দা দুর্গ, খিজিরপুর দুর্গ (বর্তমান, হাজীগঞ্জ দুর্গ), তাই অনেকেই এই তিনটা দুর্গকে ঘিরেই ধাপগুলো নির্ধারণ করে থাকেন। ঢাকাকে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করার নিমিত্তে সুবেদার মীর জুমলা টঙ্গী জামালপুরেও আরেকটি দুর্গ নির্মাণ করেন। যেটা উত্তরাঞ্চলের দিক থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করত।

ট্রায়াঙ্গল ওয়াটার ফোর্ট

অনেক ব্যক্তিবর্গ সবকটা প্রাচীন জলদুর্গের কথা স্বীকার করেন না। তাঁরা তিনটা জলদুর্গকে প্রাধান্য দেন। এই তিনটা দুর্গকে একত্রে ‘ট্রায়াঙ্গল ওয়াটার ফোর্ট’ বা, ‘ত্রিভুজ জলদুর্গ’ বলেন। এই তিনটি জলদুর্গের একটি হচ্ছে ‘হাজীগঞ্জ দুর্গ’ বা ‘খিজিরপুর দুর্গ’। অপর দুটি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দা জলদুর্গ ও মুন্সিগঞ্জের ইদ্রাকপুর জলদুর্গ। যদিও প্রাচীন রেনেলের ম্যাপ বলছে অন্য কথা। মহাসমুদ্রাবিদ্যার জনক জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দ) পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ জাহাজে করে ঘুরে বেড়িয়েছেন। উনার জীবনযাত্রা ছিল অনেকটা ‘আরব্য রজনী’র ‘সিন্দবাদ’-এর মতো। তিনি নদীয়া জেলার উত্তর সীমান্তবর্তী জলঙ্গি নদীর মাথা থেকে পূর্বদিকে ঢাকা পর্যন্ত গঙ্গা ও পদ্মার দক্ষিণ তীর তথা অববাহিকাবর্তী নদীনালা জরিপের লক্ষ্যে আমিন হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন।

রেনেলের ম্যাপ অনুযায়ী প্রাপ্ত দুর্গের একটা সরলরৈখিক পথ তৈরি হয়। যেটা ইদ্রাকপুর দুর্গ থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে বেগ মুরাদের দুর্গ হয়ে ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতিটা দুর্গে কামানের ব্যবস্থা থাকবে। সেই ড্রাম থেকে কামানের গোলা ছোড়া হবে। এতগুলো প্রতিরক্ষা প্রাচীরের ধাপ পেরিয়ে ঢাকা পৌঁছানো একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। মুঘলদের এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সত্যিই চমকপ্রদ ও সুদৃঢ় এক ব্যবস্থা।

রেনেলের ম্যাপ অনুযায়ী দুর্গসমূহের নাম

  • সোনাকান্দা দুর্গ (সুবর্ণকান্দি দুর্গ), সোনাকান্দা (প্রাচীন সুবর্ণকান্দি), বন্দর, নারায়ণগঞ্জ
  • হাজীগঞ্জ দুর্গ, হাজীগঞ্জ (প্রাচীন খিজিরপুর), নারায়ণগঞ্জ
  • দাপা দুর্গ, দাপা, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ
  • বেগ মুরাদের দুর্গ, পাগলা, নারায়ণগঞ্জ

রেনেলের ম্যাপ অনুযায়ী, স্বল্পসংখ্যক দুর্গের নাম ও অবস্থান উঠে এলেও বাস্তবে আরও দুর্গের নাম ও অবস্থান ছিল। সেসব দুর্গ স্থাপনা সম্পর্কে অনেক নথি, দলিল-দস্তাবেজ, পুস্তক ও পুঁথিতে লেখা আছে কমবেশি। সামগ্রিক দিক বিবেচনায় প্রাপ্ত দুর্গের তালিকা-

  • ইদ্রাকপুর দুর্গ, ইদ্রাকপুর, মুন্সিগঞ্জ সদর (প্রাচীন বিক্রমপুর)
  • কলাগাছিয়া দুর্গ, মদনগঞ্জ, বন্দর, নারায়ণগঞ্জ
  • সোনাকান্দা দুর্গ (সুবর্ণকান্দি দুর্গ), সোনাকান্দা (প্রাচীন সুবর্ণকান্দি), বন্দর, নারায়ণগঞ্জ
  • হাজীগঞ্জ দুর্গ (খিজিরপুর দুর্গ), হাজীগঞ্জ (প্রাচীন খিজিরপুর) নারায়ণগঞ্জ
  • দাপা দুর্গ, দাপা, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ
  • ফতুল্লা দুর্গ (অনেকের মতে, নাম নেই), ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ
  • বেগ মুরাদের দুর্গ, পাগলা, নারায়ণগঞ্জ 
  • নাম না-জানা দুর্গ, গেন্ডারিয়া, ঢাকা (প্রাচীন জাহাঙ্গীরনগর)
  • জিঞ্জিরার দুর্গ, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা (প্রাচীন জাহাঙ্গীরনগর)
  • সর্বশেষ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, লালবাগ দুর্গসমেত

জলদুর্গের সীমানা

প্রথমত, ইদ্রাকপুর দুর্গ, ইদ্রাকপুর, মুন্সিগঞ্জ (প্রাচীন বিক্রমপুর)

চট্টগ্রাম থেকে জলদস্যুদের নৌযোগে মেঘনা নদীতে আগমন। মেঘনা নদী অতিক্রম করে ধলেশ্বরী নদীর মোহনায় এসে পৌঁছানোর প্রাক্কালে বিক্রমপুরের ইদ্রাকপুরে অবস্থিত ইদ্রাকপুর দুর্গ থেকে কামানের গোলাবর্ষণ ও জলদস্যু নিপাত। যদি এই পথ অতিক্রম করা হয়।

দ্বিতীয়ত, কলাগাছিয়া দুর্গ, মদনগঞ্জ, বন্দর, নারায়ণগঞ্জ

ধলেশ্বরী নদী অতিক্রম করে শীতলক্ষ্যা নদীর মোহনায় এসে পৌঁছানোর প্রাক্কালে কলাগাছিয়াতে অবস্থিত কলাগাছিয়া দুর্গ থেকে কামানের গোলাবর্ষণ ও জলদস্যু নিপাত। যদি এই পথ অতিক্রম করা হয়।

তৃতীয়ত, সোনাকান্দা দুর্গ (সুবর্ণকান্দি দুর্গ) সোনাকান্দা (প্রাচীন সুবর্ণকান্দি), বন্দর, নারায়ণগঞ্জ

শীতলক্ষ্যা নদী অতিক্রমকালে মধ্যভাগে সোনাকান্দায় অবস্থিত সোনাকান্দা দুর্গ থেকে কামানের গোলাবর্ষণ ও জলদস্যু নিপাত। যদি এই পথ অতিক্রম করা হয়।

চতুর্থত, হাজীগঞ্জ দুর্গ (খিজিরপুর দুর্গ), হাজীগঞ্জ (প্রাচীন খিজিরপুর) নারায়ণগঞ্জ

শীতলক্ষ্যা নদী অতিক্রম করে দোলাই নদীর মোহনায় এসে পৌঁছানোর প্রাক্কালে খিজিরপুরে (বর্তমান হাজীগঞ্জ) অবস্থিত খিজিরপুর দুর্গ বা, হাজীগঞ্জ দুর্গ থেকে কামানের গোলাবর্ষণ ও জলদস্যু নিপাত। যদি এই পথ অতিক্রম করা হয়।

পঞ্চমত, দাপা দুর্গ, দাপা, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ

দোলাই নদী অতিক্রমকালে মধ্যভাগে ফতুল্লায় অবস্থিত দাপা দুর্গ থেকে কামানের গোলাবর্ষণ ও জলদস্যু নিপাত। যদি এই পথ অতিক্রম করা হয়।

ষষ্ঠত, ফতুল্লা দুর্গ (অনেকের মতে নাম নেই), ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ

দাপা দুর্গের পশ্চিম দিকে নাম না-জানা দুর্গটিও একই সময়ে একই ভূমিকা রাখত।

সপ্তমত, বেগ মুরাদের দুর্গ, পাগলা, নারায়ণগঞ্জ 

দোলাই নদী অতিক্রম করে বুড়িগঙ্গা নদীর মোহনায় এসে পৌঁছানোর প্রাক্কালে পাগলাতে অবস্থিত ‘বেগ মুরাদের দুর্গ’ থেকে কামানের গোলাবর্ষণ ও জলদস্যু নিপাত। যদি এই পথ অতিক্রম করা হয়।

অষ্টমত, নাম না-জানা দুর্গ গেন্ডারিয়া, ঢাকা (প্রাচীন জাহাঙ্গীরনগর)

‘বেগ মুরাদের দুর্গে’র পাশাপাশি নাম না-জানা দুর্গটিও একই সময়ে একই ভূমিকা রাখত।

নবমত, জিঞ্জিরার দুর্গ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা (প্রাচীন জাহাঙ্গীরনগর)

বুড়িগঙ্গা নদী অতিক্রমকালে মধ্যভাগে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ‘জিঞ্জিরার দুর্গ’ থেকে কামানের গোলাবর্ষণ ও জলদস্যু নিপাত। যদি এই পথ অতিক্রম করা হয়, তবেই ঢাকা। জিঞ্জিরার দুর্গ কেন্দ্রীয় কারাগারসংলগ্ন স্থাপনা। এটিকে রাজধানী ঢাকার সর্বশেষ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বলে ধরা হয়।

সর্বশেষ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা

সর্বশেষ দুর্গ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সবকটা দুর্গ পার হলে আমরা পাই ‘লালবাগ দুর্গ’। যুবরাজ মুহম্মদ আজম তাঁর শাসনামলে ১৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে এই দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু করেন। এই দুর্গের  নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁকে দিল্লিতে ডেকে পাঠান। পরবর্তী সময়ে সুবেদার শায়েস্তা খান (১৬০০-৯৪ খ্রিষ্টাব্দ) ১৬৮৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করলেও দুর্গের কাজ শেষ করতে পারেননি। ১৬৮৪ খ্রিষ্টাব্দে শায়েস্তা খানের কন্যা বিবি পরী এখানে মারা গেলে দুর্গটিকে তিনি অপয়া হিসেবে বিবেচনা করে এর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন। এই দুর্গের অভ্যন্তরেই তাঁর কন্যাকে সমাধিস্থ করা হয়। সুবেদার শায়েস্তা খানের অপর কন্যা ‘বিবি মরিয়ম’কে (তুরান দখত) নারায়ণঞ্জের খিজিরপুরে বিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁকে খিজিরপুর দুর্গসংলগ্ন স্থানে সমাহিত করেন। যেটি বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে, বিবি মরিয়মের সমাধি ও মসজিদ নামে সমধিক পরিচিত। সতেরো শতকের শেষ দিকে, সুবা বাংলার রাজধানী ঢাকায় প্রাসাদদুর্গ হিসেবে লালবাগে আরও একটি দুর্গ নির্মাণের কাজ আরম্ভ হলেও সে দুর্গের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। অচিরেই পরিত্যক্ত ভিটায় রূপান্তরিত হয় এই দুর্গ। নচেৎ এই দুর্গটি সম্পূর্ণরূপে তৈরি হলে, মুঘল ঢাকার প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সুদৃঢ় কাঠামোর এক ভিত্তি হতো।

প্রাচীন জলদুর্গের ব্যবহার

প্রাচীন এই জলদুর্গ বহুমুখী কাজে ব্যবহৃত হতো। দেখা গেছে, এই মুঘল স্থাপনা মুঘল রাজা-বাদশাহদের রাজ্য পরিচালনার কাজে ব্যবহার করতেন। আবার এই আমুদে স্থাপনা তাঁদের মনোরঞ্জনের কাজেও ব্যবহার করা হতো। জলদুর্গ মূলত যুদ্ধক্ষেত্র। এখান থেকে রাজা-বাদশাহরা যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। আবার মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের প্রতিহত করার জন্য কামানের গোলাবর্ষণ করতেন। একেকটি রাজ্য সুরক্ষার জন্য এই জলদুর্গ। প্রতিটা জলদুর্গকে ঘিরে রয়েছে একেকটি মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক ঘটনা বা কাহিনি। তবে এই মর্মন্তুদ কাহিনিগুলোকে এড়ানো সম্ভব নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একেকটি জনশ্রুতি বা মিথ বলিষ্ঠ উদাহরণ। জনশ্রুতিতে উল্লেখিত, ঘটনা রাজি, রাজা-রানি, বাদশাহ-সম্রাজ্ঞী, রাজপুত্র-রাজবধূ, রাজকন্যা-রাজ জামাতা একেকটা জীবন্ত চরিত্র ও দৃষ্টান্ত। তাঁদের সবাইকে কেন্দ্র করে যে গল্প বা উপাখ্যান, তা সত্যিকার অর্থেই বাস্তবিক ও প্রাণবন্ত।

বর্তমানে এই জলদুর্গের অবস্থা

বর্তমানে তিনটি মাত্র জলদুর্গ টিকে রয়েছে। দুর্গগুলো হলো ইদ্রাকপুর দুর্গ, সোনাকান্দা দুর্গ ও হাজীগঞ্জ দুর্গ। জলদুর্গ স্থাপনার বেশ কয়েটা কালের করালগ্রাসে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে চিরতরে হারিয়ে গেছে। আবার কোনো কোনোটি নদীভাঙনের শিকার। যেমন- কলাগাছিয়া দুর্গ। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ-পরবর্তী সময় পর্যন্ত ও এই কলাগাছিয়া দুর্গের ধ্বংসাবশেষ টিকে ছিল, যা স্থানীয় লোকজনের মুখে মুখে এখনো গল্প আকারে রয়ে গেছে। যাঁরা স্বচক্ষে দেখেছেন, তাঁদের অনেকেই এখনো বেঁচে আছেন। তাঁদের মুখে মুখে শোনা যায়, এই জলদুর্গের গল্প। বর্তমানে এই জলদুর্গের অবশেষ চিহ্নটুকুও নেই।

আবার নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সময় চিরকালের জন্য হারিয়ে যায় দাপা দুর্গ ও পাগলা দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। তিনটি দুর্গ ভঙ্গুর ও জীর্ণ-শীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও কোথাও এক-আধটু ভেঙে পড়েছে আবার কোথাও বা পলেস্তারা খসে পড়েছে। দুর্গের উপরিভাগের মার্লনের অবস্থা বড়ই নাজুক অবস্থায় রয়েছে দুর্গের প্রধান তোরণদ্বারে একসময় বহু অলংকরণের দেখা মিলত। সেসবের বালাই এখন আর নেই। একেকটি জলদুর্গ যেন পরিত্যক্ত ভিটে। এসব স্থাপনা টিকে রয়েছে কালের স্রোতের গা ভাসিয়ে। প্রাকৃতিক বৈরীর হাত থেকে এসব স্থাপনা কোনোভাবে রক্ষা পেলেও কতিপয় স্থাপনার শেষ রক্ষা হয় না মানুষের হাত থেকে। সময়ের এফোঁড়-ওফোঁড় পেরিয়ে প্রাকৃতিক বৈরী জলবায়ু ও আর্দ্র আবহাওয়ায় বেশ কটা দুর্গ টিকে থাকলেও নিষ্কৃতি মেলেনি মানুষের বিচিত্র মনের খেয়াল থেকে। মানুষের মনমানসিকতা, নিদারুণ চাওয়া-পাওয়া ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারণের কারণে এই দুর্গ স্থাপনার অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। মানুষ নিজে প্রকৃতির মূল্যবোধ দিতে জানে না বলে প্রকৃতি মানুষের সঙ্গে বৈরী আচরণ করে তার বিদ্রোহ প্রকাশ করে নিরন্তর!

জলদুর্গের গঠন

একেকটি জলদুর্গের আকার একেক রকম। যে তিনটি দুর্গ স্থাপনা টিকে রয়েছে, তার তিনটার আকার ও ভিন্ন। জ্যামিতিক কনফিগারেশন অনুযায়ী একটি আরেকটির চেয়ে ছোট বা বড়। এ বিষয় থেকে একটা বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা নেওয়া যায় যে প্রতিটা দুর্গ বিভিন্ন আকারের। কারও সঙ্গে কারও মিল নেই।

জলদুর্গের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যসমূহ

তিনটি জলদুর্গ নিয়ে গবেষণা ও বিস্তর আলোচনা সাপেক্ষে যে স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যগুলো পাওয়া যায় তা হলো-

  • প্রধান তোরণদ্বার (Arcade Gate)
  • প্রতিরক্ষা প্রাচীর (Fortification Wall)
  • কেন্দ্রীয় অঙ্গন (Central Courtyard)
  • কোণের বুরুজ (Corner Bastions)
  • কামান স্থাপনের বেদি (The Altar of the Cannon)
  • কামান স্থাপনের বেদির প্লাজা (The Altar Plaza for the Cannon)

প্রধান তোরণদ্বার

প্রতিটা জলদুর্গে প্রধান তোরণদ্বার রয়েছে। এই তোরণদ্বারের ভেতরের ও বাইরের দিকের স্থাপত্যশৈলী ও অলংকরণশৈলী দেখে মুঘল আমলের স্থাপনা বলে খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায়। প্রতিটা দুর্গের তোরণদ্বারে যেসব স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়

  • প্রবেশ তোরণদ্বার খিলানবিশিষ্ট, যা অর্ধগম্বুজ দ্বারা সৃষ্ট। প্রতিটা তোরণদ্বার আয়তাকার কাঠামোর মধ্যে অবস্থিত। আয়তাকার কাঠামোর বাইরের প্রবিষ্ট ও ভেতরের প্রবিষ্টতে ছোট ও মাঝারি আকৃতির প্যানেল রয়েছে। প্রতি প্যানেল আবার আলাদা আলাদা অলংকরণসমৃদ্ধ। প্যানেল ছাড়াও প্রতি দুর্গে ছোট ছোট খোপ দেখা যায়।
  • তোরণশীর্ষে যে প্যারাপেট থাকে, তাতে ছোট ছোট মার্লন শোভিত। প্রতিটা মারলন ফোকড়বিশিষ্ট। এই ফোকড়গুলো কামানের গোলা নিক্ষেপের জন্য ব্যবহার করা হতো। আবার কোথাও কোথাও তোরণ শীর্ষে পদ্ম পাপড়ির নকশার অস্তিত্ব দেখা যায়। কোথাও কোথাও প্রবেশ তোরণদ্বারের বাইরে ও ভেতরে ক্রম উচ্চতাসম্পন্ন সিঁড়ি দেখা যায়। যেমন- খিজিরপুর দুর্গ। যেখানে ক্রম উচ্চতাসম্পন্ন সিঁড়ি দেখা যায়, সেখানে সিঁড়ির দুই পাশে ঢালু দেয়াল দেখা যায়।
  • এই প্রাচীর ঘন ও পুরুত্ববিশিষ্ট। প্রাচীরের উপরিভাগে অসংখ্য মার্লন রয়েছে, তবে সব মার্লনের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ এক মাপের না হলেও উচ্চতা এক মাপবিশিষ্ট। প্রতিটা মার্লন সমআকৃতির ফোকরযুক্ত। প্রতি দুই মার্লনের সংযোগস্থলে যে লম্বাটে বর্গীয় প্যানেল দেখা যায়, তাতে একটিমাত্র ফোকর রয়েছে।

কেন্দ্রীয় অঙ্গন

প্রতিটা দুর্গের অভ্যন্তরভাগে কেন্দ্রীয় অঙ্গন (কোর্ট ইয়ার্ড) রয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু ইদ্রাকপুর দুর্গ। ইদ্রাকপুর দুর্গের অভ্যন্তরে একটি পুষ্করিণী দেখা যায়। এর চারপাশে রয়েছে ঘাট। দুর্গের কেন্দ্রীয় অঙ্গন একেকটা একেক পরিমাপের। সোনাকান্দা জলদুর্গের অঙ্গন খিজিরপুর দুর্গ (হাজীগঞ্জ দুর্গ) ও ইদ্রাকপুর দুর্গ থেকে আকারে অনেক বড়। প্রতিটা দুর্গের অঙ্গনে সবুজ ঘাসের সমারোহ দেখা যায়। আবার বড় বড় গাছপালার দেখাও মেলে। মুঘল আমলে এই দুর্গের অঙ্গন যুদ্ধের সমরক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সৈনিকেরা এখানে তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করত। প্রতিটি দুটি দুর্গের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের চার বাহু বিদ্যমান। প্রতি দুই বাহুর অন্তর্বর্তী স্থানে বুরুজ বিদ্যমান।

এই বুরুজের উচ্চতা প্রতিরক্ষা প্রাচীরের চেয়ে বেশি। বুরুজের আকার একেক দুর্গে একেক রকম। সোনাকান্দা দুর্গে অষ্টভুজাকার বুরুজ দেখা যায়। আবার ইদ্রাকপুর দুর্গে গোলীয় আকারের বুরুজ দেখা যায়। এই দুর্গের দেয়ালে অর্থাৎ মার্লনের নিচের দিকে বিশাল আকৃতির ফোকর, যা জানালাসদৃশ দেখা যায়। হাজীগঞ্জ বা খিজিরপুর দুর্গে বুরুজ নেই। সেখানে বুরুজের পরিবর্তে গোলীয় আকারের বেদি দেখা যায়, যা ভূমি থেকে উচ্চতাসম্পন্ন ও কয়েক ধাপ সিঁড়ি ডিঙিয়ে ওপরে উঠতে হয়। বুরুজের উপরিভাগে মার্লন বিদ্যমান। প্রতিটা মার্লন ফোকরযুক্ত।

জলদুর্গের প্রধান ফাংশন হলো কামান গোলা স্থাপনের বেদি। সমগ্র দুর্গের মধ্যে এই অংশটা সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক ও দেখার মতো এক স্থাপনা। তিনটি দুর্গের মধ্যে সোনাকান্দা ও ইদ্রাকপুর দূরে একটি করে এই বেদি অবস্থিত। অপর দিকে হাজীগঞ্জ দুর্গে এই বেদির সংখ্যা ছয়টি। এই দুর্গের দুইটা বেদি সর্বাপেক্ষা বড় আকৃতির, মাঝারি আকৃতির একটি ও ছোট আকৃতির তিনটা বেদি বিদ্যমান। কামান স্থাপনের এই বেদিগুলো দুর্গের ভূমি থেকে অনেকটা উঁচুতে। বেশ কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হয়। বেদিগুলোর আকার বৃত্তাকার। প্রতিটা বেদি নদীমুখী করে তৈরি। যাতে কামান স্থাপনা করে নদী অভিমুখে নিশানা ঠিক রাখা যায়। বেদির দেয়ালের উচ্চতা প্রতিরক্ষা প্রাচীরের উচ্চতা থেকে অনেক বেশি। আবার পুরুত্ব ও অনেক। বৃত্তাকার বেদির প্রতি দেয়ালের ওপরে মার্লন যুক্ত করা। এই মারলনগুলো ফোকরযুক্ত।

কামান স্থাপনের বেদির প্লাজা

প্রতিটা দুর্গে কামান স্থাপনার বেদিতে উঠতে বহু সিঁড়ির ধাপ পার হতে হয়। এ ক্ষেত্রে, সোনাকান্দা দুর্গ ও ইদ্রাকপুর দুর্গের বেদিতে উঠতে হলে সর্বাপেক্ষা বেশি সিঁড়ির ধাপ পার হতে হয়। সিঁড়ির ধাপের দুই পাশে পুরুত্ববিশিষ্ট দেয়ালের দেখা মেলে। এই দেয়ালের ওপরেও মার্লন ও ফোকর রয়েছে।

প্রাচীন জলদুর্গের বর্তমান ব্যবহার

প্রাচীন এই জলদুর্গসমূহ যুদ্ধ পরিচালনা ও জলদস্যু প্রতিহত করার জন্য প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমান এই দুর্গ অনেকটা অবহেলিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কয়েক দশক ধরে দুর্গের অভ্যন্তরের সবুজ মাঠ স্থানীয় জনগণের খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উদাহরণস্বরূপ, হাজীগঞ্জ দুর্গ ও সোনাকান্দা দুর্গ। দুর্গের অভ্যন্তরে খেলাধুলা করা হয় বিধায় ছেলে-ছোকরাদের কারণে দুর্গের অনেক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ইদ্রাকপুর দুর্গের অভ্যন্তরে ঔপনিবেশিক আমলের একটি পুষ্করিণী রয়েছে বিধায় এই স্থান খেলাধুলা থেকে বিরত আছে। কিন্তু এই পুষ্করিণীতে স্থানীয় লোকজন গোসলের কাজ করে। যেটা মেনে নেওয়াও একটা দুরূহ ব্যাপার।

খেলাধুলার পরিবেশ হিসেবে ব্যবহার করা হয় বিধায় দুর্গের বুরুজ ও কামান স্থাপনার বেদি শৌচকার্যের জন্য ব্যবহৃত হয়। তা ছাড়া, প্রতিটা জলদুর্গের আশপাশে গড়ে ওঠা এক একটা নতুন স্থাপনা যেমন থাকার বাসস্থান, বিদ্যালয়, মসজিদ, ফ্যাক্টরি- সবকিছুই প্রাচীন জলদুর্গের সেটব্যাক নষ্ট করেছে। দুর্গের অভ্যন্তরভাগ যেন গবাদিপশু চারণভূমি। অনেকেই তাদের পোষা গরু, ছাগল, ভেড়া দুর্গের অভ্যন্তরে সারা দিনের জন্য ছেড়ে চলে যায়। পশুপাখির শৌচকার্যের আধার এই দুর্গ। কোথাও কোথাও দুর্গের দেয়ালে নানা আঁকিবুঁকির অস্তিত্ব দেখা যায়। যে যা খুশি দেয়ালের গায়ে লিখে রাখছে অশ্রাব্য সব কথাবার্তা। তা ছাড়া কামান স্থাপনার বেদি, প্লাজা, মার্লনÑ এসব কিছুর ভঙ্গুরতা ও বিবর্ণ দুর্গের অবস্থা আমাদের এই দুর্গসমূহ যে অবহেলিত সে কথা মনে করিয়ে দেয়।

শীতলক্ষ্যার পূর্ব তীরে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার ঐতিহাসিক সোনাকান্দা দুর্গ এখন আর কামান-গোলার শব্দে প্রকম্পিত হয় না। অনুরণিত হয় না এক একটি অন্তর। সোনাকান্দা এখন সরগরম মাইকের শব্দে। লাকি কুপনের টিকিট বিক্রি আর পুতুলনাচের জন্য এই প্রচার-প্রচারণা। প্রতিবছর বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এই দুর্গে বৈশাখী মেলা বসে। স্থানীয় বনানী চারুকারু শিল্পীগোষ্ঠী ১৯৯৮ সাল থেকে এই দুর্গের মাঠে মেলা বসিয়ে আসছে। তাদের দাবি, জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই চলছে এ মেলা। তবে জেলা প্রশাসক বলছেন, তিনি এমন অনুমতি দেননি।

তিনটি দুর্গের মধ্যে হাজীগঞ্জ দুর্গ সর্বাপেক্ষা বহুবার সংস্কার করা হয়েছে। ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত ‘List of Ancients Monuments In Bengali’ বইয়ের অধ্যায় অনুযায়ী এই দুর্গ ধ্বংস অবস্থায় ছিল। সেই সময় বেষ্টনী প্রাচীর এবং একটি বুরুজ থাকার কথা বইয়ে উল্লেখ পাওয়া  গেছে। ১৯৫০ সালে এই দুর্গের আবারও সংস্কার হয়। প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর অধিদপ্তরের আওতায় এই সংস্কার হয়। ইদ্রাকপুর দুর্গকে ১৯০৯ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

বহুল জনশ্রুতি, প্রতিটা জলদুর্গকে ঘিরে হরেক রকম কল্পকাহিনি প্রচলিত রয়েছে। এসব কল্পকাহিনি অবাস্তব মনে হলেও দুর্গসংলগ্ন স্থানীয় জনগণের কাছে এসব গল্প বিশ্বাসের মূর্ত প্রতীক। যুগ যুগ ধরে এসব গল্পকে লালিত করে চলে আসছে লোকজন। সবচেয়ে প্রচলিত জনশ্রুতিটি হচ্ছে, বারো ভূঁইয়াদের অধিপতি ঈশা খাঁ বিক্রমপুরের জমিদার কেদার রায়ের বিধবা কন্যা সোনা বিবিকে জোরপূর্বক বিয়ে করে এ দুর্গে নিয়ে আসেন। দুর্গে বন্দিজীবন হয় সোনা বিবির। সোনা বিবি সেই কষ্টে দুর্গে বসে রাত-দিন কাঁদতে থাকেন। সেই থেকে দুর্গের নাম হয়ে যায় সোনাকান্দা।

সোনাকান্দা দুর্গ নিয়ে প্রচলিত রয়েছে মর্মস্পর্শী আরও একটি কাহিনি। সোনাকান্দা ছিল ঈশা খাঁর কেল্লা। রাজা কেদার রায়ের কন্যা স্বর্ণময়ী এসেছিলেন লাঙ্গলবন্দে পুণ্যস্নান করতে। একদল ডাকাত স্বর্ণময়ীর বজরায় হানা দেয়। প্রচুর স্বর্ণালংকারসহ স্বর্ণময়ীকে অপহরণ করে। পরে ঈশা খাঁ তাঁকে উদ্ধার করে কেদার রায়ের কাছে ফেরত পাঠাতে চান। কিন্তু মুসলমানের তাঁবুতে রাত কাটানোয় জাত গেছে এ অভিযোগে কেদার রায় স্বর্ণময়ীকে আর ফেরত নেননি। এ খবর শুনে স্বর্ণময়ী কেল্লার তাঁবুতে দিনের পর দিন কেঁদে কেঁদে কাটিয়েছেন। আর তাই এর নাম হয় সোনার কান্দা বা সোনাকান্দা।

সোনাকান্দা দুর্গের সঙ্গে সুড়ঙ্গপথে ঢাকার লালবাগ ও সোনারগাঁয়ের সংযোগ ছিল এমন জনশ্রুতি আছে। ইদ্রাকপুর দুর্গের সঙ্গে সুড়ঙ্গপথে ঢাকার লালবাগ দুর্গের সঙ্গে সংযোগ ছিল এমনটাও শোনা যায়।

শেষের আগে

একেকটি জলদুর্গ নির্মাণ মানে এক একটি ইতিহাস রচনা। মুঘল আমলে ওপার বাংলার মতো এপার বাংলাতেও এই নান্দনিক স্থাপনা তৈরি হয়েছিল। রচিত হয়েছিল ইতিহাস। অথচ আজ এই জলদুর্গসমূহের অবস্থা বড়ই নাজুক ও অবহেলিত। প্রশাসন ও অধিদপ্তরের অন্তর্ভুক্ত থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশ, এহেন কর্মকাণ্ড ও দুর্ব্যবহারের শিকার এই দুর্গ স্থাপনাসমূহ। কালের করালগ্রাসে ক্ষয়প্রাপ্ত আজকের এই ঐতিহাসিক স্থাপনা। জলদুর্গসমূহকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ যেমন জরুরি, তেমনি সাধারণ মানুষের সচেতনতাবোধও দরকার। সাধারণ মানুষের জলদুর্গের প্রতি ভ্রƒক্ষেপ নেই। মানুষ নিজে ইতিহাস বিষয়ে সচেতন নয় বলে আজকের এই অবস্থা। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে ও স্থানীয় প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগ ও সিদ্ধান্ত বাঁচিয়ে দিতে পারে এই জলদুর্গসমূহকে। এসব ইতিহাস খুব দ্রুত সংরক্ষণ জরুরি। কেননা আমাদের নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে এই ইতিহাসকে। কোনো জাতিই তার ইতিহাসকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে আগ্রসর হতে পারে না।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৭তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০।

স্থপতি মৃধা রাতুল
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top