অগ্নিঝুঁকিমুক্ত নিরাপদ স্থাপনা

ডিসেম্বর থেকে মে মাস, দেশে এ সময়ে প্রকৃতি থাকে অগ্নিকান্ডের অনুকূলে। কেননা এ সময়ে আবহাওয়া হয় শুষ্ক ও উষ্ণ। আর তাই আবাসন, বিপণিবিতান, শপিংমল, শিল্পকারখানাসহ সব ধরনের ভবন থাকে অগ্নিঝুঁকিতে। ভয়াবহ এসব অগ্নিকান্ডে ঘটছে প্রচুর প্রাণহানি; ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে অর্থ-সম্পদের। অপূরণীয় এসব ক্ষতি ও ভয়াবহতা অবর্ননীয়। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া গুলশানের ডিসিসি মার্কেট, বনানীর এফ আর টাওয়ার, চকবাজারের চুড়িহাট্টা, এরও আগে নিমতলী ও অন্যান্য অগ্নিকান্ডের ধ্বংসযজ্ঞ ও ভয়াবহতা-এর নির্মম উদাহরণ। দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে আগুনের প্রকৃতি; ছাড়িয়ে যাচ্ছে ভয়াবহতার মাত্রা। হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। নেপথ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক, গ্যাস ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থের ব্যাপক ব্যবহার। দ্রুতগতিতে শিল্পায়নের ফলে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিকের মজুত, বিক্রি ও ব্যবহার বাড়ছে। নগরায়ণ ও আধুনিকতার সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুৎ, প্রাকৃতিক ও বোতলজাত গ্যাসের ব্যবহার। প্রাকৃতিক কারণ ছাড়াও আমাদের অসচেতনতা, অজ্ঞতা ও কর্মতৎপরতার ফলে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অগ্নিকান্ডের ঘটনা। এ পরিস্থিতিতে আমাদের সচেতনতা, আগুন লাগলে করণীয় সম্পর্কে জানা থাকলে কমানো সম্ভব অগ্নিকান্ড, রক্ষা করা সম্ভব মহামূল্যবান প্রাণ ও সম্পদ। 

অগ্নিঝুঁকির নেপথ্যে

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত কয়েক বছরের অগ্নিকান্ডের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সর্বাধিক অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে। ইদানীং বহুতল ভবনে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক, গ্যাসীয় ও যান্ত্রিক অনুষঙ্গের ব্যবহার বাড়ায় বাড়ছে অগ্নিকান্ডের হার। এ ছাড়া ভবনের ভেতর ও বাইরে দাহ্য পদার্থ দিয়ে তৈরি উপকরণের ব্যবহার সমস্যাটিকে আরও প্রকট করে তুলেছে। ভবনের সৌন্দর্য বাড়াতে কাঠ, প্লাইউড, পিভিসি, ডিজিটাল ব্যানার ও কাচের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যেমন, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে প্রচুর কাপড় স্তূপ করে রাখা, রঙের কেমিক্যাল, অ্যাসিডিক উপাদান, যা কি না দাহ্য এবং সহজে আগুন ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে। 

গ্যাসলাইনের ত্রুটি থেকেও দুর্ঘটনার ঘটনা নেহাত কম নয়। রান্নায় গ্যাসের তীব্র সংকট নগরীর নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যা। কিছু কিছু এলাকায় গ্যাস থাকে না প্রায়ই। গ্যাসসংকট থেকে রেহাই পেতে অনেকেই ঝুঁকছেন এলপি (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম) গ্যাসের দিকে। এই এলপি গ্যাস সিলিন্ডার শুধু বাসাবাড়িতে কিংবা হোটেল-রেস্তোরাঁয় রান্নার কাজে নয়, ব্যবহৃত হচ্ছে যানবাহনেও। নিম্নমানের সিলিন্ডার ও অসাবধানতার কারণে হরহামেশাই ঘটছে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা। এসব সিলিন্ডারের বড় একটি অংশ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গইঞ্চিতে ৩২০০ পাউন্ড চাপে গ্যাস ভরা হয়, ওই সময় গাড়ি ভয়াবহ বোমা হয়ে বিস্ফোরণের সৃষ্টি করতে পারে। রাসায়নিক পদার্থ অত্যন্ত দাহ্য একই সাথে দ্রুত প্রজ্ব¡লনশীল। এতে উত্তাপের মাত্রা ও স্থায়িত্ব সাধারণ আগুনের তুলনায় অনেক বেশি। নির্গত ক্ষতিকর গ্যাস মানব স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ফায়ার সার্ভিসের সূত্রমতে, শর্টসার্কিট ছাড়াও অগ্নিকান্ডের জন্য দায়ী প্রধানতম কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে- 

  • সিগারেটের আগুন
  • রান্নার চুলা
  • গ্যাস লাইন লিকেজ ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণ
  • শিশুদের আগুন নিয়ে খেলা
  • যন্ত্রাংশের সংঘর্ষ। 

পরিসংখ্যানে অগ্নিকান্ডের ক্ষয়ক্ষতি

শুধু দেশেই নয়, সারা বিশ্বে অগ্নি দুর্ঘটনায় শীর্ষে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। যান্ত্রিক এই শহরের আনাচে-কানাচের প্রতিটি অংশই যেন মৃত্যুপুরী। কোন অংশই ঝুঁকির বাইরে নয়। ২০১৮ সালে সারাদেশে ৮ হাজার ৪৬১টি আবাসিক ভবনে আগুন লাগে। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৮টি দুর্ঘটনাই ছিল ঢাকায়। শিল্প কারখানায় ১ হাজার ১৩১টি অগ্নিকান্ডের ৫২৬টিই ঢাকায়। পরিবেশ আইনজীবি সমিতি ‘বেলা’র এক পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে ১৬ হাজার অগ্নিকান্ডে সারাদেশে মৃতের সংখ্যা প্রতি বছর গড়ে ১৫৯ জন। অথচ ২০১৮তেই ঢাকায় মৃতের সংখ্যা ১২১ জন। এ বছর ইতোমধ্যে প্রায় শত প্রাণ আগুনের বলি হয়েছে। ২০১৬ সালে ড্যাপ-এর করা জরিপে দেখা যায়, ঢাকা শহরে সাততলা বা তার চেয়ে উঁচু বহুতল ভবন রয়েছে ১৬ হাজার ৯৩০টি। নগরায়ন আর উন্নয়নের কারণে গত দুই বছরে এর সংখ্যা বেড়েছে ১০-১৫ ভাগ। আইন অনুযায়ী এসব ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, সারা দেশে ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মাত্র ৫ হাজার ২৪টি ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ছাড়পত্র নেয়া হয়েছে। দুই তৃতীয়াংশের বেশি বহুতল ভবনের ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নেই। আর ৮০ ভাগ ভবনই কোনো না কোনোভাবে নিয়ম ও আইনের লঙ্ঘন করে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিবছর সংঘটিত অগ্নিকান্ডে কী পরিমাণ হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি হয় তা রীতিমতো চমকে ওঠার মতো ঘটনা। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর এই তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে। সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১০ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত মোট অগ্নিকান্ডের সংখ্যা, আনুমানিক ক্ষতি, আহত ও নিহতের সংখ্যা:

আগুন নিয়ন্ত্রণে বাধা যেথায়

প্রায় প্রতিদিনই বাসাবাড়ি, অফিস, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, বস্তি, বহুতল বিপণিবিতান ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে। এই ঘটনা কমছে না বরং বাড়ছে। তা ছাড়া আমাদের অজ্ঞতা ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না; এর প্রধান কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও যথাযথ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অভাব। বহু কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবন, মার্কেট, গার্মেন্টসে ন্যূনতম রাখা হয় না অগ্নিনির্বাপণ-ব্যবস্থা। এ ছাড়া অন্যান্য কারণের মধ্যেও রয়েছে- 

  • ফায়ার স্টেশনের অপ্রতুলতা
  • যথাযথ নিয়ম না মেনে বহুতল ভবন নির্মাণ
  • ভবনে জরুরি নির্গমন-ব্যবস্থার অভাব
  • ভবনগুলোর আন্ডারগ্রাউন্ডে পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণেরও ব্যবস্থা না রাখা
  • ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছার মতো রাস্তার অভাব ও অসহনীয় যানজট
  • নগরে জলাধার না থাকা
  • এলাকা ও দাপ্তরিক ভিত্তিক প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব।

অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ২০০৩-এর ৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘(ফায়ার সার্ভিসের) মহাপরিচালকের ছাড়পত্র ছাড়া কোনো বহুতল বা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন বা অনুমোদিত নকশার সংশোধন করা যাবে না।’ বিল্ডিং কোড অনুযায়ী সাত তলার ওপরের ভবনগুলোকে বহুতল ভবন বলে বিবেচিত। এসব ভবনের অগ্নিনির্বাপণ করার জন্য ৫০ হাজার গ্যালন থেকে ১ লাখ গ্যালন পর্যন্ত পানির মজুত রাখার বিধান রয়েছে। অগ্নিনির্বাপণের সময় প্রতি ৩০ গ্যালন ব্যবহারের পর ২০ গ্যালন পানি পূর্ণ হবে এমন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পানির রিজার্ভ গড়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আদৌ এসব ব্যবস্থা অনুসরণ করেন না ভবনের মালিকেরা। এ ছাড়া ভবন নির্মাণের সময় বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড, ঢাকা মহানগরের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ঠিকমতো অনুসরণ করছেন না বহুতল ভবনের মালিকেরা। আইনে ভবনগুলোতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক, জরুরি নির্গমন-ব্যবস্থা, ফায়ার লিফট, ফায়ার অ্যালার্ম, দমকল বাহিনী সহজেই যেন আগুন নেভাতে পারে, সে রকম ব্যবস্থা রাখার কথা বলা আছে। কিন্তু ভবন নির্মাণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ শর্তগুলো মানছে না। এ জন্য একটু বড় ধরনের অগ্নিকান্ড হলেই তা সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।

আগুনঝুঁকি থেকে বাঁচতে করণীয়

যেকোনোকারণেই আগুন লাগতে পারে। সংকীর্ণ সড়ক, যানজটসহ নানা কারণে ঘটনাস্থলে আগুন নিয়ন্ত্রণের গাড়ি ও দমকল কর্মিবাহিনীর পৌঁছাতে দেরি হতে পারে। তাই সবারই সচেতন হতে হবে এবং নিজে উদ্যোগী নিতে হবে নানা ব্যবস্থা। কয়েক বছর আগেও প্রায়ই বিভিন্ন দেশীয় গার্মেন্টসে আগুন লাগত। সরকার, বিদেশি বায়ার, শ্রম সংগঠনসহ সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নানা ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে গার্মেন্টসশিল্পের আগুন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। এভাবে সব ক্ষেত্রে যদি কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায় তাহলে আগুনের ঝুঁকি থেকে অনেকাংশেই বাঁচা সম্ভব। নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থাপত্য নকশা এমনভাবে করতে হবে, যাতে আগুন লাগার ঝুঁকি কম থাকবে। আর আগুন লাগলেও দ্রুত যেন তা নিয়ন্ত্রণে আনা যায় ও ভবন থেকে বেরিয়ে আসা যায় সে ব্যবস্থাও রাখতে হবে। সে লক্ষ্যে ডিজাইনে গুরুত্ব দিতে হবে-

  • ভবনের পাশে যথেষ্ট পরিমাণে ফাঁকা জায়গা রাখা।
  • জরুরি বহির্গমন পথ হিসেবে করিডর, লবি, সিঁড়ি কিছুটা প্রশস্ত করা এবং ভবনের বিভিন্ন অংশে জরুরি নির্গমন পথ, সিঁড়ির নকশা নির্দেশনা রাখা।
  • সাধারণত ভবনে অগ্নিকান্ড ঘটলে ভবনের বাইরে একটি জরুরি সিঁড়ি দিয়ে সবাইকে নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু স্থান সংকুলানের কারণে অনেক সময় এ ধরনের সিঁড়ি রাখা সম্ভব হয় না। তবে জরুরি নির্গমনের জন্য উদ্ভাবিত হয়েছে নানা সহজ অথচ কার্যকরী উপায়। যেমন: ফায়ার এস্কেইপ স্যুট। ভবনে এ ধরনের এক্সিট সিস্টেম করতে তেমন কোনো ঝামেলা নেই, লাগবে না খুব বেশি পরিসর, ব্যয়সাশ্রয়ীও বটে। শুধু কয়েকটি কাপড়ের তৈরি বিশেষ ধরনের ফানেল বা পাইপের মতো স্যুট ভবনের বিভিন্ন তলায় স্থাপন করলে বা ঝুলিয়ে দিলেই আগুনে প্রাণহানি অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব।
  • ভবনে ফায়ার অ্যালার্ম, স্মোক ডিটেক্টর, হিট ডিটেক্টর ও ফায়ার এক্সিংগুইসার স্থাপন করা।
  • অগ্নিপ্রতিরোধক দরজা ও নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করা।
  • আগুন নেভানোর জন্য পানি সরবরাহের পৃথক সংযোগ রাখা। 
  • নির্মাণকালীনই সব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি আর্থিংয়ের ব্যবস্থা করা।
  • ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যেখানে সংকীর্ণ সড়কব্যবস্থা সেসব স্থানে ফায়ার হাইড্রেন্ট বা স্প্রিংকলার স্প্রে সিস্টেম থাকতে হবে। প্রয়োজনে নগর পরিকল্পনায় এগুলো নতুন করে সমন্বয় করতে হবে।

গ্যাসীয় আগুনের ক্ষেত্রে করণীয়

ভবনের অনিরাপদ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, গ্যাস সংযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের ত্রুটি থেকেই মূলত দুর্ঘটনা ঘটে বেশি। বিশেষ করে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের সময় সতর্ক থাকা খুব জরুরি। গ্যাসীয় পদার্থের দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে যা যা করণীয়-

  • দীর্ঘদিনের পুরোনো সিলিন্ডার ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। 
  • গ্যাস সিলিন্ডার নেওয়ার আগে সিলিন্ডারের মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ দেখে নিন।  
  • গ্যাস সিলিন্ডার সোজা করে সঠিকভাবে সমতল স্থানে রাখুন যেন পড়ে না যায়। উঁচু-নিচু জায়গায় রাখবেন না। 
  • গ্যাস সিলিন্ডার বহনকালে কখনোই ফেলে দেওয়া, ঘষা বা টানা উচিত নয়।
  • রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হলে সেখানে বাতাস চলাচলের যথেষ্ট ব্যবস্থা রাখুন। গ্যাস ব্যবহার করার সময় জানালা খুলে রাখুন। 
  • গ্যাস সিলিন্ডার সরাসরি সূর্যের আলোয় ও চুলার পাশে দাহ্য বস্তু একেবারেই রাখা উচিত নয়। 
  • সিলিন্ডারের গ্যাস লিকেজ দুর্ঘটনার মূল কারণ। তাই সিলিন্ডার লিক হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করুন। পরীক্ষার জন্য পানিতে সাবানের ফেনা তৈরি করে হোস পাইপ, রেগুলেটর, ভাল্ব ইত্যাদিতে লাগান। যদি দেখেন সাবান-পানির ফোঁটা বড় হচ্ছে বা বুদবুদ উঠছে, তাহলে বুঝবেন লিক হচ্ছে গ্যাস। দ্রুতব্যবস্থা নিন।
  • গ্যাসের পাইপের দৈর্ঘ্য বেশি লম্বা না হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
  • গ্যাসের পাইপে ইঁদুরের কামড়ের দাগ দেখতে পেলে অতিসত্বর বদলে নিন। জোড়াতালি দিয়ে ব্যবহার না করাই ভালো। ত্রুটিপূর্ণ পাইপ দ্রুত বদলে উন্নতমানের ওয়েদারপ্রæফ, ওয়্যারমেশবেষ্টিত পাইপ ব্যবহার করুন। 
  • গ্যাস বদলের সময় রেগুলেটরটি সঠিকভাবে লাগানো হয়েছে কি না দেখে নিন। 
  • অনেকেই বাড়িতে একটি বাড়তি গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার রাখেন। একটি শেষ হলেই যাতে অন্যটি হাতের কাছে পাওয়া যায়। গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার কখনোই ঘরের মধ্যে রাখবেন না। খোলামেলা জায়গায় রাখুন, যেখানে ছায়া আছে। তাপ থেকে গ্যাস সিলিন্ডারকে দূরে রাখাই ভালো।
  • অনেকেই বাড়িতে বড় গ্যাস থেকে ছোট গ্যাস ভর্তি করেন। এমনটা বাড়িতে করা একেবারেই অনুচিত। এতে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। যদিও কেউ কেউ এটা করে থাকেন। সাবধান থাকাটা খুব জরুরি।
  • সিলিন্ডারটি যদি বাইরে রাখতেই হয়, তাহলে চারপাশ নেট দিয়ে ঘিরে সমান পাটাতনের ওপর রাখুন।
  • সিলিন্ডারে কোন অংশ দেবে গিয়ে গর্ত থাকলে, মরিচা বা জং ধরলে তা বদলে ফেলুন। 
  • গ্যাসের পুরোনো পাইপলাইনে ক্ষয়, পুরোনো কিংবা নতুন পাইপলাইনে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকলে তা পরিষ্কার করতে হবে।
  • দীর্ঘদিন ব্যবহার না করলে সিলিন্ডারের ভাল্ব বা রেগুলেটর সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখুন। 
  • রান্নার পর অবশ্যই গ্যাসের চুলা বন্ধ রাখতে হবে। একটি ম্যাচের কাঠির জন্য দীর্ঘ সময় চুলা জ্বালিয়ে রাখা মোটেও উচিত নয়। এতে যেমন গ্যাসের অপচয় হয়, তেমনি রান্নাঘরের জানালা বন্ধ থাকলে সারা ঘরে গ্যাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। হতে পারে গ্যাস বিস্ফোরণ।

সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হঠাৎ করেই হতে পারে। তবে বিস্ফোরণের আগে সিলিন্ডার থেকে গ্যাসের কটু গন্ধ পাওয়া যায়। অর্থাৎ লিক হলে খুব উৎকট গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়বে। তাই এমন উৎকট গন্ধ পেলেই তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে-

  • কোনোভাবেই আগুন জ্বালাবেন না।
  • ঘরে আলো জ্বালানোর দরকার হলেও দেয়াশলাই, মোমবাতি বা আগুন সম্পৃক্ত অন্য কিছু ব্যবহার করা যাবে না। প্রয়োজনে চার্জার বা টর্চ লাইট ব্যবহার করতে পারেন। 
  • বাসার সব বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ করে দিন।
  • প্রয়োজনে মেইন সুইচ বন্ধ করুন।
  • ঘরের দরজা-জানালা খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন।
  • সিলিন্ডারের রেগুলেটর বন্ধ করুন।
  • সিলিন্ডারে সেফটি ক্যাপ লাগান।

বহুতল ভবনে আগুন লাগলে করণীয়

  • জরুরীভিত্তিতে জরুরী নির্গমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
  • পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
  • অগ্নিকান্ডের সময় পানির সাহায্যে অগ্নি নির্বাপনে যেসব হুজ পাইপ ব্যবহার করা হবে সেগুলো এমন স্থানে রাখা যাতে অতি সহজেই ব্যবহার করা যায়। এছাড়াও পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা রেখে প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলা।
  • ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ জরুরী সেবা প্রদানকারী বিভিন্ন সংস্থার টেলিফোন নম্বর ভবনের বিভিন্ন তলায় বড় করে লিখে রাখার ব্যবস্থা করা।
  • ভূ-গর্ভস্থ পানি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা এবং ট্যাংকে বড় ঢাকনি দিয়ে তা সংরক্ষন করা।
  • অগ্নিকান্ডের সময় অগ্নিকান্ড কবলিত সকলকেই আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য্য সহকারে মোকাবেলা করা।
  • লাফ দেয়া ও ভবন বেয়ে নিচে নামা আত্মহুতির সমান তাই তা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করা।
  • সম্ভব হলে ছাদে চলে যাওয়া। সম্ভব না হলে দরজা জানালা ভালো করে বন্ধ করা যাতে ধোঁয়া প্রবেশ করতে না পারে। পরবর্তিতে উদ্ধারকর্মীদের সাহায্য নেয়া।
  • অগ্নিকান্ডের সময় অগ্নিকান্ড কবলিত জনগনসহ স্থানীয় জনগনের করণীয় বিষয়ে গনমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণার ব্যবস্থা করা।

অগ্নিকান্ড রোধে সচেতনতা

দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। অগ্নিকান্ডের পর আগুন নেভানো বা উদ্ধারকাজের চেয়ে অগ্নিকান্ড, যাতে না ঘটে সেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়াই বেশি জরুরি। অগ্নিকান্ড নিরসনে যেসব পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা থাকা দরকার তা হলো-

  • বাড়িতে, ভবনে বা আশপাশে অতিসংবেদশীল দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ থেকে বিরত থাকুন, অন্যকেও তা করা থেকে বিরত রাখুন। 
  • স্টোররুমে অপ্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখবেন না। এমনকি কারখানায় ও অফিসের অপ্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট/কাগজপত্র নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে সরিয়ে ফেলুন।
  • আগুন লাগলে করণীয় সম্পর্কে পোস্টার আকারে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখুন ও ভবনের সদস্যদের করণীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিন ও নির্দিষ্ট সময় পরপর মোহড়ার ব্যবস্থা করুন।
  • কারখানায় রাসায়নিক এবং জ্বালানি পদার্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ লোক নিয়োজিত রাখুন।
  • বৈদ্যুতিক ফিটিংস ছয় মাস পর পর পরীক্ষা করুন, প্রয়োজনে পুরোনো ফিটিংস পরিবর্তন করতে হবে।
  • গ্যাস পাইপে মরিচা বা জং ধরলে তা বদলে ফেলুন। 
  • প্রতিবছর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগের অভিজ্ঞ অফিসার দ্বারা অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র পরীক্ষা করিয়ে নিতে পারেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ বিস্ফোরক পরিদপ্তরের মাধ্যমে শিল্পকারখানার অগ্নিঝুঁকি নির্ণয় করিয়ে নিতে পারেন। উল্লেখ্য, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর সরেজমিনে অগ্নিকান্ডের ঝুঁকি নিরূপণ ও পরামর্শ প্রদানে পরিদর্শন করে থাকে। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ফি দিয়ে আপনিও নিতে পারেন এই সেবা। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি অগ্নি প্রতিরোধ, নির্বাপণ, উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসাবিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে। এসব সেবা নিতে যোগাযোগ করতে হবে উপসহকারী পরিচালকের সঙ্গে। যোগাযোগের উপায়- ফোন (অফিস)- ০২-৯৫৫৫৫৫৫/এক্স-২২৬, মোবাইল- ০১৭১২০২৬১৯১

নতুবা জরুরি প্রয়োজনে ফায়ার সার্ভিসকে জানাতে ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করা। 

আগুন লাগলে তার ধরন বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে। আগুন নেভাতে সাধারণত পানি ব্যবহার করা হলেও রাসায়নিক আগুনের ক্ষেত্রে তা কাজ করবে না। এ জন্য ভবনে ধরন বুঝে আগুন নেভানোর জন্য উপযোগী ফায়ার এক্সটিংগুইসার ব্যবহার করতে হবে। সাধারনত কাপড়, পাট, কাঠ এবং শুকনো কঠিন পদার্থের আগুন নেভানোর জন্য ডিসিপি (ড্রাই কেমিক্যাল পাউডার)। বৈদ্যুতিক আগুন, দামিূক্ষ্ম মেশিনারিজের আগুন নেভানোর জন্য কার্বন-ডাই-অক্সাইড। রাসায়নিক পদার্থ ও গ্যাসের আগুন নেভাতে ফোম জাতীয় এক্সটিংগুইসার ব্যবহৃত হয়। 

প্রতিটি ভবনেই এমনকি নিজের সংগ্রহে রাখুন নিকটস্থ ফায়ার ব্রিগেডের যোগাযোগ নাম্বার। প্রয়োজনে আপনার স্মার্টফোন বা ট্যাবে ফায়ার স্টেশনসমূহের জিপিএস লোকেশন নির্ণয়ের অ্যাপটি ইনস্টল করতে পারেন। এতে সহজেই আপনি ফোন থেকেই জানতে পারবেন ফায়ার সার্ভিসের নানা তথ্য সেবা। কোথাও আগুন লাগলে দেরি না করে নিকটস্থ ফায়ার স্টেশনে অথবা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষকে (০২-৯৫৫৫৫৫৫/০১৭৩০৩৩৬৬৯৯) অবহিত করুন। 

তথ্যসূত্র:

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর

বাংলাদেশ বিস্ফোরক পরিদপ্তর।

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৮তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৯

মঈন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top