সিমেন্ট, বালু ও খোয়া মিশ্রিত কংক্রিট সুদৃঢ়ভাবে জমাট বাঁধা, কাঙ্ক্ষিত শক্তি সঞ্চার করা এবং এর দীর্ঘস্থায়িত্বতা নিশ্চিত করার জন্য পানির ভূমিকা অন্যতম। ফলে, কংক্রিটের গুণগত মান রক্ষাকল্পে পানির গুণাগুণ যাচাই করার পাশাপাশি ব্যবহৃতব্য পানির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টিও অত্যন্ত জরুরি। পানির গুণাগুণ যেমন কংক্রিটের গুণগত মান হ্রাস-বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে, তদ্রুপ পানির পরিমাণও কংক্রিটের শক্তি হ্রাস-বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রেখে থাকে।
তাই, প্রস্তাবিত কংক্রিট ঢালাই করার আগে মিক্স-ডিজাইন করে সিমেন্ট, বালু ও খোয়ার অনুপাত নির্ণয় করার মতো সিমেন্ট ও পানির অনুপাতও নির্ণয় করা হয়ে থাকে। যাকে ওয়াটার-সিমেন্ট রেশিও বলা হয়। এ ছাড়া কংক্রিটের কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করণার্থে বিভিন্ন ধরনের কংক্রিট তৈরি করার জন্য ন্যাশনাল ও ইন্টারন্যাশনাল কোডে ওয়াটার-সিমেন্ট রেশিও-সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া থাকে। সেই নির্দেশনা কিংবা মিক্স-ডিজাইনের মাধ্যমে নির্ণীত ওয়াটার-সিমেন্ট রেশিও অনুযায়ী পানি ব্যবহার করার মাধ্যমে কংক্রিট নির্মিত প্রকল্পসমূহের ভৌত কাজ বাস্তবায়ন করা হয়।
সিমেন্ট ও পানি একত্রে মিশে বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কংক্রিটের জমাট বাঁধা, কাঙ্ক্ষিত শক্তি সঞ্চার করা এবং দীর্ঘস্থায়িত্বতা বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। তাই, পুনরায় উল্লেখ্য যে জীব ও উদ্ভিদের মতো কংক্রিটের ক্ষেত্রেও পানির অপর নাম ‘জীবন’। জীব ও উদ্ভিদ যেমন পানির অভাবে মারা যায়, আবার পানিতে ডুবেও মারা যায়। তদ্রুপ, কংক্রিট তৈরিতে নির্দিষ্ট অনুপাতের চেয়ে পানি কম কিংবা বেশি দুটোই নির্মিতব্য কংক্রিটের জন্য চরম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সিমেন্ট কংক্রিট কিংবা রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট উভয়ই সময়ের ব্যবধানে আস্তে আস্তে শক্তি সঞ্চার করে থাকে। ফলে, কংক্রিটের গুণগত মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পানি ও সিমেন্টের মধ্যকার রাসায়নিক বিক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করণার্থে কংক্রিট তৈরি করতে পানির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি কংক্রিট ঢালাই করার পর নির্দিষ্ট মেয়াদ (সর্বনিম্ন ৭ দিন এবং ঊর্ধ্বে ২৮ দিন) পর্যন্ত ঢালাইকৃত কংক্রিট স্ট্রাকচারগুলো নিয়মিতভাবে কিউরিং করার বিষয়টিও নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
পুনশ্চ: কংক্রিট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ইট/পাথরের খোয়া, বালু, সিমেন্ট, পানি প্রতিটি উপাদানের সার্বিক গুণাগুণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আলোচিত ল্যাব টেস্টসমূহ করার আগে কিছু ফিল্ড টেস্ট আছে, যা প্রাথমিকভাবে সম্পাদনীয়। উল্লেখিত প্রতিটি উপাদানের মধ্যেই অন্যান্য মালামালসহ নানা ধরনের ময়লা-আবর্জনা মিশ্রিত থাকতে পারে যা ল্যাব টেস্ট ছাড়াই নিরূপণ করা সম্ভব। তাই ফিল্ড টেস্ট করার মাধ্যমে প্রতিটি মালামালের গুণগত মান সম্পর্কে প্রাইমারি একটা ধারণা নিয়ে মালামাল নির্বাচন করার পর সেখান থেকে স্যাম্পল কালেকশন করে ল্যাব টেস্টের জন্য পাঠানো হয়।
ব্যবহৃতব্য মালামালের ফিল্ড টেস্ট করার উদাহরণ
ইট
ইট তৈরি করার পর বেশ কিছু বিষয়ের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন শ্রেণিতে তা বিভক্ত করা হয়। যেমন- ফার্স্ট ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস. থার্ড ক্লাস, পিক্ড ঝামা (ওভার বার্নড) ইত্যাদি। এই শ্রেণি বিভাগ অনুসারে প্রতিটি ইটের বাহ্যিক গুণাগুণ কী হবে তা বিভিন্ন বই-পুস্তকে সবিস্তারে লেখা থাকে। যেমন-
ফার্স্ট ক্লাস ইটের ক্ষেত্রে;
- সর্বত্র সমানভাবে পোড়া হতে হবে।
- একটা ইটের সঙ্গে আর একটা ইট বাড়ি দিলে মেটালিক আওয়াজ করবে।
- ইট ভাঙলে ভেতরে বালু-মাটির মিশ্রণ ও কম্পেকশন সর্বসম দেখা যাবে।
- চারদিকের মাপ সঠিক থাকবে।
- সাইজ ও শেইপ সুন্দর হবে ইত্যাদি।
অতএব, ফার্স্ট ক্লাস ইট নির্বাচন করার ক্ষেত্রে উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো সরেজমিনে দেখার পর এর অন্তর্নিহিত গুণাগুণ (যেমন- কম্প্রেসিভ স্ট্রেইন্থ, স্যালাইনিটি, ওয়াটার অ্যাবজর্বশন ইত্যাদির পরিমাণ/ক্ষমতা) যাচাই করার লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ইটের মধ্য থেকে কয়েকটি ইট নিয়ে ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করার জন্য পাঠানো হয়।
এ ছাড়া রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট তৈরির জন্য যদি ইটের খোয়া ব্যবহার করা হয়, সে ক্ষেত্রে খোয়া তৈরি করতে পিক্ড ঝামা (ওভার বার্নড) ইট ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যা সাধারণত শুধু ফিল্ড টেস্টের মাধ্যমেই নির্বাচন করা হয়। এই পিক্ড ঝামা (ওভার বার্নড) ইট নির্বাচনের ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার-অতিরিক্ত পোড়ার কারণে ইটের মাটি গলে মৌচাকের মতো রূপ ধারণ করা ইট কোনোভাবেই ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয় নয়।
এভাবে সিমেন্ট কংক্রিট কিংবা রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট তৈরির লক্ষ্যে ব্যবহৃতব্য প্রতিটি মালামাল বাহ্যিক গুণাগুণের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করার পর সেখান থেকে কিছু স্যাম্পল নিয়ে তার অন্তর্নিহিত গুণগত মান যাচাই করার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়ে থাকে। এই ল্যাব টেস্ট করার জন্য প্রতিটি মালামালের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা নির্দেশনা আছে, যা আগেই আলোচনা করা হয়েছে। তদ্নুযায়ী সব উপাদানের সার্বিক গুণাগুণ যথাযথভাবে যাচাই করার পর তা কাজে লাগানো অত্যাবশ্যক।
সর্বোপরি, যেকোনো কাজে শুধু কাঁচামালের গুণাগুণ যাচাই করাই শেষ নয়। সংশ্লিষ্ট সব কাজ সম্পাদন করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত বিষয়েরও মান নিশ্চিত করা জরুরি। ফলে যে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নকল্পে সর্বত্র যথাযথ নিয়ম মেনে কাজ সম্পাদন করা এবং তা সার্বক্ষণিক সুনিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা অত্যাবশ্যক। এ লক্ষ্যে দক্ষ লোকবল এবং অভিজ্ঞ সুপারভাইজার ও প্রকৌশলী নিয়োগ দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
(চলবে)
ডি.জি.এম (কিউ.এ) অ্যান্ড এমআর,
দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লি.
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৮তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৯