কয়লা এক প্রকারের জীবাশ্ম জ্বালানি। প্রাচীনকালের বৃক্ষ দীর্ঘদিন মাটির নিচে চাপা পড়ে ধীরে ধীরে কয়লায় রূপ নেয়। পেট্রোলিয়াম আবিষ্কারের পর কয়লার ব্যবহার কিছুটা লোপ পেলেও বর্তমানে এটি পৃথিবীব্যাপী শক্তির উৎস হিসেবে জোরদার ভূমিকা পালন করছে। কয়লা তৈরি হয় সাধারণ কার্বন থেকে। এ ছাড়া আরও অন্যান্য উপাদানের মধ্যে রয়েছে হাইড্রোজেন, সালফার, অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন। মৃত গাছপালা থেকেই কয়লা তৈরি হয়। শত শত বছর তাপ ও চাপে জীবাশ্ম কয়লায় পরিণত হয়। জীবাশ্ম জ্বালানি হিসেবে তাপের জন্য কয়লায় ব্যবহার হয়ে আসছে। প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে গোটা বিশ্বের দুই পঞ্চমাংশ বিদ্যুতের কাজে কয়লার ব্যবহৃত হয়।
এ ছাড়া লোহা, স্টিলসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক উৎপাদনের কাজে কয়লা ব্যবহৃত হয়। কয়লা উত্তোলন ও এর ব্যবহার নবজাতকের মৃত্যু, অসুস্থতাসহ পরিবেশের ক্ষতিসাধন করে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে কয়লা উত্তোলন ও এর ব্যবহার। কয়লার বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বের বহু দেশ কয়লার ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে। কোনো কোনো দেশ কয়লার ব্যবহার বন্ধও করেছে।
কয়লার ভোক্তা ও আমদানিকারকের দিক দিয়ে শীর্ষে রয়েছে চীন। শুধু চীনেই বিশ্বের প্রায় অর্ধেক কয়লা ব্যবহৃত হয়। ব্যবহারের ভিত্তিতে চীনের পরের সারিতে রয়েছে ভারত। বিশ্বে কয়লার রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে প্রথম সারিতে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া ও রাশিয়া। এরপর তৃতীয় স্থানে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ আফ্রিকায় কয়লার খনি রয়েছে। সাধারণত কয়লা কালো বর্ণের হয়ে থাকে। কয়লা কার্বনের একটি রূপ। কাঠকয়লা কাঠ থেকে এবং খনিজ কয়লা খনিতে পাওয়া যায়। জলমগ্ন পরিবেশে উদ্ভিদরাজির সুদীর্ঘকাল ধরে চাপা পড়ে থাকার ফলে উৎপন্ন কালো অথবা গাঢ় বাদামি বর্ণের খনিজ পদার্থই কয়লা।
দেশের উৎপাদন
বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন ও উন্নয়ন কার্যক্রম নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে চীনা প্রতিষ্ঠান সিএমসি-এক্সএমসি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ৮২.৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যমানের একটি ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড প্রোডাকশন (এমএন্ডপি) চুক্তি ৪ জুন ২০০৫ তারিখে স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী এমঅ্যান্ডপি ঠিকাদার ১০ সেপ্টেম্বর ২০০৫ তারিখ থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কয়লা উৎপাদন শুরু করে এবং চুক্তির মেয়াদ ১০ আগস্ট ২০১১ তারিখে উত্তীর্ণ হওয়ার পর সফলভাবে চুক্তি সমাপ্তিকরণের কাজ শেষ হয়।
এ চুক্তির আলোকে ৪৭.৫০ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৩৬.৫০ লাখ মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদিত হয়। কয়লা উৎপাদন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহŸানের মাধ্যমে চীনা ঠিকাদার এক্সএসমি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ‘ম্যানেজমেন্ট, প্রোডাকশন, মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড প্রভিসনিং সার্ভিসেস (এমপিএমএন্ডপি)’ চুক্তি গত ১০ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে স্বাক্ষরিত হয়, যা ১১ আগস্ট ২০১১ তারিখ থেকে কার্যকর হয়ে ১০ আগস্ট ২০১৭ তারিখে শেষ হয়। ৭২ মাস মেয়াদি এ চুক্তির অধীনে ৫৫ লাখ মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৫৫.০৪ লাখ মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদিত হয়।
নিরবচ্ছিন্নভাবে কয়লা উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহŸানের মাধ্যমে চীনা ঠিকাদার এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে নতুন এমপিএমঅ্যান্ডপি-২০১৭ চুক্তি গত ৮ জুলাই ২০১৭ তারিখে স্বাক্ষরিত হয়। ১১ আগস্ট ২০১৭ তারিখ থেকে কার্যকর করে পরবর্তী ৪৮ মাসের জন্য এ চুক্তি বলবৎ থাকবে। এ সময়ের মধ্যে ঠিকাদার ৩.২০৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদন করে। ঠিকাদার চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে তাদের কাজ শুরু করেছে। প্রথম চুক্তি বছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ০.৮১৯ মিলিয়ন মেট্রিক টনের বিপরীতে মার্চ ২০১৮ পর্যন্ত তারা ০.৬৪৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদন করেছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৭৯ শতাংশ। খনির শুরু থেকে মার্চ ২০১৮ পর্যন্ত মোট ১০.০২ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদিত হয়েছে।
অপর দিকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ০.৮২ মিলিয়ন মেট্রিক টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মার্চ ২০১৮ পর্যন্ত ০.৭৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদিত হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এ ছাড়া ২,৫০০ মিটার রোডওয়ের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মার্চ ২০১৮ পর্যন্ত ২,৮৮৮.২০ মিটার উন্নয়নকাজ শেষ হয়েছে; যা লক্ষ্যমাত্রা অপেক্ষা ১৫.৫ শতাংশ বেশি। বর্তমানে ১২১০ ডি ফেইস থেকে কয়লা উৎপাদিত হচ্ছে। এ ফেইস থেকে ৪.৩০ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৪.৭০ লাখ মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদিত হয়েছে। ১৫মে ২০১৯ তারিখের মধ্যে এ ফেইস থেকে কয়লা উৎপাদন শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
আমদানি
বাংলাদেশি বণিকেরা ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানি করে থাকেন। ভারত থেকে আমদানি করা কয়লা প্রতি টন বিক্রি হয় ১৪ হাজার টাকা ধরে। ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা কয়লা বিক্রি হয় ১৩ হাজার থেকে ১৩ হাজার ৫০০ টাকায়। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আমদানি করা কয়লা বিক্রি হয় ১২,০০০-১২,৫০০ টাকায়।
কয়লার প্রধান প্রধান ব্যবহার
কয়লার প্রধান ব্যবহার জ্বালানি হিসেবে। রাসায়নিক শিল্পেও এর ব্যবহার গুরুত্বপূর্র্ণ। উনিশ শ শতাব্দী পর্যন্ত কয়লাই ছিল শক্তির বাণিজ্যিক উৎসসমূহের মধ্যে সর্বাধিক ব্যবহৃত ও গুরুত্বপূর্ণ। পেট্রোলিয়াম আবিষ্কারের পর এর ব্যবহার কিছুটা লোপ পেলেও বর্তমানে এটি পৃথিবীব্যাপী শক্তির উৎস হিসেবে জোরদার ভূমিকা পালন করছে। শিল্প-কারখানা, চুল্লি, জাহাজের জ্বালানি, স্টিমারের জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে, ভারতের কিছু কিছু রাজ্যে স্বাভাবিক রান্নাবান্নার কাজে, ফায়ার প্লেসে, ব্রিক ফিল্ডে, স্টিল, গ্লাস ও লোহার কারখানা। ব্রিক ফিল্ড (ইটের ভাটা) এর জ্বালানি হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া গ্যাস উত্তোলনের কাজে ও রোলিং মেইলে কয়লা ব্যবহার করা হয়।
ধরন
পাথর কয়লা ও কাঠ কয়লা এ দুই ধরনের কয়লা রয়েছে। কাঠ কয়লা শুধু স্বাভাবিক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় কামার, স্বর্ণকারসহ হালকা শিল্পের কাজে।
দরদাম
কয়লা টন হিসেবে ক্রয়-বিক্রি হয়। ট্রাকে করে এক জেলা থেকে অন্য জেলা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আসা-নেওয়া করা হয়। প্রতি ট্রাকে ৪, ৫ ও ৬ টন কয়লা ধারণক্ষমতা রয়েছে। ৪ থেকে ৬ টন ওজনের কয়লাই ট্রাকে করে বেশি এক স্থান থেকে আরেক স্থানে নেওয়া হয়। দিনাজপুর বড় পুকুরিয়ায় তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাংলাদেশে উৎপাদিত কয়লা ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের কয়লার দাম বেশি হওয়ায় ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে না পারায় আমদানির ওপরই সবায় নির্ভর করে। দেশে উৎপাদিত কয়লা টনপ্রতি ২০০০ থেকে ৩০০০ হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হয়।
বাংলাদেশে এযাবৎকাল পাঁচটি প্রধান সাব-সারফেস বা অন্তর্ভূপৃষ্ঠীয় কয়লা ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৮৫৭ সাল থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত সময়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভূতত্ত¡বিদ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ভূভাগের নিচে বিরাট আকারের কয়লাখনির অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা জানান। ভূতাত্তি¡কগণের উপরিউক্ত মতামতের ভিত্তি ছিল পশ্চিমবঙ্গের রাণীগঞ্জের কয়লাসমৃদ্ধ অঞ্চল এবং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ভূগর্ভের ভূতাত্তি¡ক সামঞ্জস্যতা। সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে কয়লা আসে বাংলাদেশে। এ ছাড়া সুনামগঞ্জ দিয়েও চোরাইপথে কয়লা আসে বাংলাদেশে। বিভিন্ন দেশ থেকে আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা কয়লা এনে জমা রাখেন নিজের স্থানে। এরপর দেশের বিভিন্ন পার্টির কাছে বিক্রি করেন তাঁরা। তামাবিল স্থলবন্দরের কয়লা কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, ল²ীপুর, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়।
বাংলাদেশে কয়লার মজুত
রকমফের
কয়লা সাধারণ দুই ধরনের হয়। উন্নত ও অনুন্নত মানের। উন্নত মানের কয়লার ওজন বেশি থাকে। চাকচিক্য থাকে বেশি। জ্বলেও বেশিক্ষণ। অনুন্নত মানের কয়লার বৈশিষ্ট্য ঠিক তার বিপরীতমুখী। উন্নত ও অনুন্নত মানের কয়লার দামের পার্থক্য টনপ্রতি ২০০০ টাকা কমবেশি। উন্নত মানের কয়লা টনপ্রতি ১৫ হাজার হলে অনুন্নত মানেরটা ১৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
গুণাগুণের ভিত্তিতে উন্নত ও অনুন্নত এ দুই ধরনের কয়লা হয়। দুই ধরনের কয়লার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো-
উন্নত মানের কয়লার বৈশিষ্ট্য
- কম পরিমাণে দিলেও বেশি জ্বলে
- ওজনে ভারী হয়
- তেলজাতীয় পদার্থ কম থাকে
- মান অত্যন্ত ভালো
- দেখতে বেশ চকচকে ও পরিষ্কার হয়।
অনুন্নত মানের কয়লার বৈশিষ্ট্য
- বেশি পরিমাণে দিলেও কম জ্বলে
- তেলজাতীয় পদার্থ বেশি
- মানহীন জাতীয় তেল থাকে
- কয়লায় অধিক পরিমাণে ময়লা থাকে
- ওজনে হালকা হয়
- দেখতে বেশি কালো ও ফ্যাকাশে হয়।
প্রাপ্তিস্থান
কুমিল্লার দাউদকান্দি, নারায়ণগঞ্জের কাঞ্চন, পাবনার নগরবাড়ী, হবিগঞ্জের নোয়াপাড়া, ঢাকার গাবতলী, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, চাঁদপুর সদরে, চট্টগ্রাম কর্ণফুলীতে, সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী ঘাটে কয়লা বেচাকেনা হয়। এ ছাড়া সিলেটের তামাবিলে কয়লার লোডিং-আনলোডিং করা হয়।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৮তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৯