সীমানাপ্রাচীরের ইতিহাস যেমন অনেক প্রাচীন, এর গাঠনিক প্রক্রিয়াও বেশ পুরোনো। তা কতটা পুরোনো এটা বোঝাতে একটা গল্প বলা যাক। বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারাকানায় প্রাচীন এক নগরীর সন্ধান মেলে, যে নগর গঠিত হয়েছিল যিশুখ্রিষ্টের জন্মেরও ২ হাজার ৬০০ বছর আগে। যেখানে ছিল ঘরবাড়ি, গোসলখানা, বাজার, পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় নালা আর সীমানাপ্রাচীর! পুরো মহেঞ্জোদারো সভ্যতাজুড়ে ছিল প্রতিটি বাড়ির সীমানাপ্রাচীর। এমনকি এসব প্রাচীরের দরজায় বিশালাকার তালাও লাগানো ছিল। তবে আজকালকার যুগটা একেবারেই ভিন্ন। এই একবিংশ শতকে কেউ প্রাচীন আমলের মতো করে ভাববেন না। তবে এখনো প্রাচীরের সংজ্ঞা যে বদলে যায়নি, সেটা হালের গুঁড়িয়ে যাওয়া বার্লিন প্রাচীর দেখলে সহজেই বোঝা যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন শেষ। কিন্তু সেখানে তখনো মিত্র বাহিনী রয়ে গেছে। এই মিত্রবাহিনীর ফলেই জার্মানি চার ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যুদ্ধ শেষে বার্লিন পড়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন জোনে। পরবর্তী সময়ে ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের অংশ মিলে গঠিত হয় পশ্চিম বার্লিন এবং সোভিয়েত অংশ পরিচিত হয় পূর্ব বার্লিন নামে। যুদ্ধোত্তর জার্মানিতে দুই পরাশক্তির স্নায়ুযুদ্ধ যখন চরমে, তখন জার্মানি ভেঙে যায়। দুটো স্বাধীন জার্মান রাষ্ট্র গঠিত হয়। ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি ও জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক।
এর মধ্যেই প্রায় প্রতিদিন লোকজন পালিয়ে যেতে থাকে এ শহর থেকে ও শহরে। বিশেষ করে পূর্ব জার্মানি থেকে পশ্চিম জার্মানিতে পালিয়ে যাওয়া লোকের হার বাড়তেই থাকে। এবং একটা কাঁটাতারের বেড়া হঠাৎ করেই গজিয়ে ওঠে। পুরো পশ্চিম বার্লিনকে ঘিরে ফেলা হয় কাঁটাতারে। আর এই কাঁটাতারের অংশই পরে কংক্রিটের শক্ত দেয়ালে রূপান্তরিত হতে খুব বেশি সময় নেয়নি। জার্মানি আক্ষরিক অর্থেই সীমানাপ্রাচীর দিয়ে বিভক্ত। যদিও একসময় এই সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়। দুই জার্মানি মিলে নতুন এক রাষ্ট্র গঠিত হয়। কিন্তু সেই প্রাচীর এখনো লাখো মানুষের অন্তরে গেঁথে আছে। এই সীমানাপ্রাচীরের ইতিহাস এভাবেই কালে কালে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে।
কিন্তু সীমানাপ্রাচীর কি কেবলই সীমানা নির্ধারণী নির্দেশক? তা কিন্তু নয়! সীমানাপ্রাচীর এখন ব্র্যান্ডিং ম্যাটেরিয়েল। যেনতেন কিছু করার উপায় নেই। কারণ, মানুষ এখন অনেক বেশিই বিজ্ঞাপনমুখী। কেউ কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর বিজ্ঞাপনের এই ধারা সীমানাপ্রাচীরেও প্রবেশ করেছে। এখন মানুষ সীমানাপ্রাচীরে ব্র্যান্ডিং করে। আর এই ব্র্যান্ডিং হয়ে উঠেছে নানা রকম। শৈল্পিক এসব ব্র্যান্ডিং-বৃত্তান্ত এবারের পর্বে।
এই ব্র্যান্ডিংয়ের শুরু যখন কোনো একটি বাড়ি মাত্র কনস্ট্রাকশনে যায়। এ সময় দুটো ব্যাপার ঘটে। যে কোম্পানি এই বাড়ি বানাচ্ছে, তারা চায় তাদের প্রোডাক্ট মানে এই বাড়ির ফ্লোর স্পেস বা ফ্ল্যাট বিক্রি করতে। অগ্রিম বিক্রির লক্ষ্যেই এই ব্র্যান্ডিং শুরু হয় ২০০০ সালের দিকে। এই সময় শুধু বাড়ির ছবি দিয়েই ক্ষ্যান্ত হলেও ধীরে ধীরে এর ব্যাপ্তি বাড়তে থাকে। বাজেট বৃদ্ধি পায়। প্রথম দিকে ইটের দেয়াল তৈরি করে তাতে ব্র্যান্ডিং শুরু হলেও ধীরে ধীরে এর পদ্ধতিগত পরিবর্তন আসে। ইটের দেয়াল না তুলে কেবল গ্রেট বিম তৈরি করে তাতে মাইল্ড স্টিল ফ্রেম করে তার ওপর স্টিলের পাত বসিয়ে শক্ত সারফেস তৈরি করেই ব্র্যান্ডিং শুরু হয়। এর মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে রাতের বেলা সেই বাড়িটিকে দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্র্যান্ডিংয়ের জন্যই বিভিন্ন রকমের সাইনেজ তৈরি শুরু হয়। মানুষ রাতের বেলাও বাড়িটিকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছে। ফলস্বরূপ বাড়ি বা স্পেস বিক্রি বাড়ে। এখন বাড়ির ডিজাইন পুঙ্খানুপুঙ্খ না জেনে কেউ ফ্ল্যাট কেনেন না বা কিনতে চান না। তাই এতে শুরু হয় আরও নিখুঁত কাজ করা। বিদেশি বিভিন্ন মেশিনারিজ দেশে আমদানি করতে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তাই এই ক্ষেত্রটা এখন একটা উল্লেখযোগ্য সেক্টরে পরিণত হয়েছে। এখন সবাই জানতে পারেন তিনি যে বাড়িটি কিনবেন, সেটা দেখতে কেমন হবে, কী কী ফিচার আছে এতে।
সীমানাপ্রাচীর বানানোর বৈচিত্র্যময়তার শুরু অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেলের সহজলভ্যতার ফলে। অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেল (এসিপি) হলো এমনই এক ম্যাটেরিয়েল, যা ইচ্ছেমতো কাটা যায়, বাঁকানো যায়, ভাঁজ করা যায়। ভেতরে লাইট বসিয়ে সাইনেজ বানিয়ে ফেলা যায়। বাইরের আউটডোরের ম্যাটেরিয়েল হিসেবে এর জুড়ি মেলা ভার। একসময় ৪ ফুট বাই ৮ ফুটের বোর্ড ছাড়া পাওয়া যেত না। এখন পাওয়া যায় ১২ ফুট লম্বা বোর্ড। ফলে কাজ করা আরও অনেক বেশি সহজলভ্য হয়ে গেছে। কাজের প্রসেসও বেশ সহজ।
এসিপির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি মাল্টি কালারের। একই রকমের বিভিন্ন শেডে পাওয়া যায়। সহজে বহনযোগ্যতা এটির জনপ্রিয়তার মূল কারণ। বিভিন্ন ভবনের সঙ্গে সঙ্গে সীমানাপ্রাচীরে ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে নানা রকমের বাহারি সাইনেজ। এসব সাইনেজ তৈরি হচ্ছে অ্যাক্রেলিক থেকে শুরু করে স্টেইনলেস স্টিলসহ নানা রকমের ম্যাটেরিয়েল দিয়ে। এসব সাইনেজ ম্যাটেরিয়েলস যেমন দীর্ঘস্থায়ী, তেমনই চিত্তাকর্ষক।
ডিজিটাল প্রিন্ট মিডিয়াগুলোও এসব সীমানাপ্রাচীর স্থাপত্যে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। একসময় ছিল যখন একটা প্রিন্ট দেওয়ার পর তাকিয়ে থাকতে হতো প্রকৃতির দিকে। কারণ, কখন বৃষ্টি হবে কেউ জানে না। আবার কখন ঝড় হবে আর সেই প্রিন্ট ছিঁড়ে যাবে বাতাসের ধাক্কায়, এটাও কেউ জানে না। কিন্তু দিন বদলেছে। বাংলাদেশের প্রিন্ট মিডিয়া এখন বিশ্বমানের। প্রিন্ট হচ্ছে নানা রকমের ম্যাটেরিয়েল দিয়ে। যেমন, এককালে মিডিয়া প্রিন্ট বলতে কেবল পিভিসি ম্যাটেরিয়েল প্রিন্ট বোঝাত। তবে আজকের দিন একেবারেই ভিন্ন। এখন প্রিন্ট হয় মোটা ইঙ্কজেট মিডিয়াতে। কিংবা বিভিন্ন প্লেইন মিডিয়াতে। ডিজিটাল প্রিন্ট হওয়ার পর সেই প্রিন্ট বিভিন্ন ম্যাটেরিয়েল যেমন, পিভিসি বা অ্যাক্রেলিক ইত্যাদির ওপর পেস্ট করে এরপর এটিকে ব্র্যান্ডিং ম্যাটেরিয়েল হিসেবে চালানো হয়। অনেক সময় ফেন্সজুড়েই এই প্রিন্ট পেস্ট করে দেওয়া হয়। এসব প্রিন্ট মিডিয়ার ওপর লেমিনেশন করা থাকে বলে এটা অনেক দিন ধরে একই রকম থেকে যায়।
এই বাউন্ডারি ওয়াল বা সীমানাপ্রাচীরের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি অঙ্গ হলো এর প্রবেশপথ। প্রবেশপথ না থাকলে এটি দিয়ে সীমানার ভেতর প্রবেশ বা বের হওয়া সম্ভব নয়। তাই এই প্রবেশপথের গেট নিয়েও এ পর্যন্ত হাজার রকমের চিন্তা করা হয়েছে এবং এটিকে লাখো রকম করে বানানো হয়েছে। তবে মূল যে তিনটি বিষয় গেটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা হলো-
১. গেট ততটা প্রশস্থ হতে হবে, যতটা একটা বা দুইটা গাড়ি প্রবেশে সক্ষম।
২. গেট খোলা বা বন্ধ করার জন্য যথাযথ জায়গা রাখতে হবে।
৩. গেট যথেষ্ট শক্ত ও এর লক সুবিধাসহ মজবুত হতে হবে, যেন এটি সঠিক সময়ে সুরক্ষা দিতে পারে।
সুরক্ষা প্রাচীরের মতোই এই গেটের ডিজাইন ও ম্যাটেরিয়েলে এসেছে যুগান্তকারী সব পরিবর্তন। প্রাচীনকালে কাঠের সেই গেট এখন আর ব্যবহৃত হয় না। এমনকি ১০ বছর আগে যে এমএসের গেট বানানো হতো, সেটাও এখন আর ব্যবহৃত হয় না। এখন ব্যবহার করা হয় এসএস, এখন ব্যবহার হয় কাচসহ নানা রকম ম্যাটেরিয়েল।
সীমানাপ্রাচীরের উচ্চতা স্থানভেদে একেক স্থানে একেক রকম। কেউ যখন সবাইকে তাঁর বাড়ি দেখাতে চান, তখন তিনি সীমানাপ্রাচীর খুব একটা বড় করেন না। উচ্চতায় থাকে নগণ্য। এর ভেতর বিভিন্নভাবে ছিদ্র বা পাঞ্চ রাখার চেষ্টা করেন। তাই সবাই গেটের ভেতর দিয়েই স্থাপত্যকে দেখতে পায়। কিন্তু সবাই তা চান না। রেজিমেন্টাল আর্কিটেকচার বা প্রাচীন রাজরাজড়াদের স্থাপত্যে সীমানাপ্রাচীর হতো বেশ বড়। নিজেদের জাত্যভিমান হোক বা নিজেদের বড়ত্ব জাহির করাই হোক, সবাই উঁচু প্রাচীর ব্যবহার করতেন। তখন ইটের প্রাচীর ব্যবহার করা হতো। বাইরের দেশের শত্রুরা এসে সেই দেয়াল ভাঙতে শুরু করত। আজকে বাইরের দেশের শত্রু নেই। নিজেদের দেশের দুষ্কৃতকারীদের ভয়েই অনেকেই বিশাল প্রাচীর বানান। সীমানাপ্রাচীর যত বড় ও উচ্চতায় বড় হবে, ততই এতে ক্ষতিসাধন করা কঠিন হবে। এটি টপকে প্রবেশও কষ্টসাধ্য হবে। অনেকেই সীমানাপ্রাচীরের সুরক্ষায় কাচ বা পেরেক ব্যবহার করেন। চোর বা দুষ্কৃতকারীরা প্রথমেই এগুলো সরিয়ে নিজের দাঁড়ানোর জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করে। আবার এই উঁচু প্রাচীরই প্রয়োজন হয় কারাগারের চারপাশে যেন বন্দীরা পালাতে না পারে। একই সীমানাপ্রাচীর এলাকাভেদে ও ব্যবহারভেদে একেক রকমের হয়ে থাকে। মূল বিষয় ঠিক রেখে হয় এর গঠনগত পরিবর্তন। মূল বিষয় ঠিক রেখে এর কাঠামোগত পরিবর্তনও ঘটে। এটাই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। যত দিন পৃথিবী থাকবে, তত দিন সীমানাপ্রাচীরের চাহিদা ফুরোবে না। হয়তো ধ্বংস বা নষ্ট হবে। এরপর সৃষ্টি হবে আরেক সীমানাপ্রাচীর। নতুন কোনো ইতিহাস। নতুন কোনো সভ্যতা উঁকি দেবে পৃথিবীর বুকে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৯।