রাজধানীর বুকে সাইকেল লেন

সাইক্লিস্টদের বহু কাক্সিক্ষত সাইকেল লেন বাস্তবায়ন হতে চলেছে রাজধানী ঢাকায়। প্রথমবারের মতো ঢাকার আগারগাঁওয়ে তৈরি হচ্ছে সাইকেল লেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উদ্যোগে এরই মধ্যে অনেকটাই এগিয়েছে এই লেন নির্মাণের কাজ। যানজটে নাকাল নগরবাসীর জন্য এটা নিঃসন্দেহে দারুণ এক সুখবর। বিশেষ করে সাইকেলপ্রিয় মানুষ বা সাইক্লিস্টদের জন্য। উন্নত দেশগুলোর মতোই ঢাকায় বাইসাইকেলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। রাজধানীর বিরক্তিকর যানজট নিরসনে সাইকেল পরিবেশবান্ধব চমৎকার সময়সাশ্রয়ী এক মাধ্যম। কিন্তু লেন না থাকায় এই সুবিধাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না যথাযথভাবে। আর সে উপলব্ধি থেকেই রাজধানীতে সাইকেল লেন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি ঢাকার আগারগাঁওয়ে মূল সড়কে ৯ কিলোমিটারব্যাপী লেন নির্মাণ করছে। আর এই প্রথম বাইসাইকেল লেনটি সাইক্লিস্টদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে আগামী বছর তথা ২০২০ সালের মার্চে। এ ছাড়া রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেও এক কিলোমিটারের আরও একটি সাইকেল লেন নির্মাণ করতে চায় ডিএনসিসি।

লেন রুট প্ল্যান

দীর্ঘ ৯ কিলোমিটার বিস্তৃত সাইকেল লেনটি আগারগাঁওয়ের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে এলজিইডি সড়ক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন পর্যন্ত নির্ধারিত। নির্মাণকাজও চলছে। এরই মধ্যে ৯ কিলোমিটার লেনের প্রায় ৩০০ মিটারের কাজ শেষ হয়েছে। ২০২০ সালের মার্চ মাসের মধ্যেই পুরো কাজ শেষ হবে বলে আশা ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষের। আগামী বছর স্বাধীনতার দিবস অর্থাৎ ২৬ মার্চ সাইকেল লেনটি পুরোপুরিভাবে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।

ডিজাইন বৈচিত্র্য

বিশে^র বিভিন্ন দেশে সড়কে সাইকেলের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ থাকে। সাধারণত এই লেন দেড় মিটার থেকে তিন মিটারের মধ্যে হয়ে থাকে। তবে আগারগাঁওয়ে সাইকেল লেনের জন্য মূল সড়কের দুই পাশে ছয় ফুট করে জায়গা রাখা হয়েছে। যদিও বাইসাইকেল লেন পাঁচ ফুট হলেও চলে কিন্তু ডিএনসিসি ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে লেনটি ছয় ফুট জায়গা নিয়ে তৈরি করছে। আর সাইকেল লেনের পাশে রোপণ করা হয়েছে বৈচিত্র্যময় সব বৃক্ষ।

রাজধানীতে সাইক্লিংয়ে যত প্রতিবন্ধকতা

সাইক্লিংয়ে তরুণদের উৎসাহ ব্যাপক। কিন্তু ঢাকার সড়কগুলো একেবারেই বাইসাইকেলবান্ধব নয়। যান্ত্রিক যানের সঙ্গে চলার ঝুঁকির পাশাপাশি ভাঙা রাস্তা, গর্ত, উন্মুক্ত ম্যানহোল যেন সাইক্লিস্টদের জন্য মরণফাঁদ। এসব ঝুঁকি উপেক্ষা করেও রাজধানীতে যেভাবে বাইসাইকেল বাড়ছে তাতে আশঙ্কা, সড়কে দেখা দিতে পারে নতুন বিশৃঙ্খলা। বাস, ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ইত্যাদি ভারী যানবাহনের সঙ্গে একই লেনে বাইসাইকেল চালাতে অনেকেই নিরাপদ বোধ করেন না। ফলে ইচ্ছে থাকলেও বাইসাইকেল ব্যবহারে আগ্রহী নন অনেকেই। তা ছাড়া গন্তব্যে পৌঁছানোর পর বাইসাইকেল রাখার স্ট্যান্ডও নেই খুব একটা। ফলে চুরির ভয় ও ঝামেলা মনে করে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন অনেকেই। তা ছাড়া ফুটপাত নানাভাবে দখলে থাকার কারণে পথচারীরাও রাস্তায় নেমে সাইক্লিংকে ব্যাহত করে। উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে ক্রমেই কমছে যানটির ব্যবহার। অথচ এ দেশের প্রায় সর্বত্রই আগে যাতায়াতে ব্যাপক হারে বাইসাইকেল ব্যবহারের প্রচলন ছিল।

নগরে সাইকেল লেন যেসব সুবিধা দেবে

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, যানজটের কারণে ঢাকায় প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আর যানজটের কারণে বছরে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, অঙ্কের হিসাবে তা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। গত কয়েক বছরের বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে আর্থিক ক্ষতির এ আনুমানিক হিসাব পাওয়া যায়। বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা ১ কোটি ৮০ লাখ। ২০৩৫ সালে এই জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ৩ কোটি ৫০ লাখ হবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। যখন শহরে একটি চলমান গুপরিবহন-ব্যবস্থার অভাব থাকে, তখন গাড়ি কেনার প্রবণতা মানুষের মধ্যে বেড়ে যায়। আর সড়কে বাড়ে যানজট। সমস্যা সমাধানে শুরু হয় সড়ক ও ফ্লাইওভার নির্মাণ। কিন্তু গাড়িকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি ফ্লাইওভার নির্মাণের পরও ফ্লাইওভার থেকে নেমে প্রধান সড়কে যেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অথচ সাইকেল জনপ্রিয় হয়ে উঠলে যানজট নামক বিরক্তিকর বিড়ম্বনা থেকে অনেকাংশে রেহাই পাওয়া সম্ভব।

ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড ট্রান্সপোর্ট স্টাডিজ (ডিআইটিএস)-এর গবেষণামতে, ঢাকায় ৬০ শতাংশ যাতায়াত হয় হেঁটে। ৭৬ শতাংশ যাতায়াত পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে, যার অর্ধেক আবার দুই কিলোমিটারের বেশি নয়। এই স্বল্প দূরত্বে সাইকেল হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর যান। তবে সাইকেলের ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে একমাত্র নিরাপদ লেন-ব্যবস্থা। বর্তমানে প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্কুল বাসের অভাব লক্ষণীয়। হাতে গোনা কয়েকটিতে নিজস্ব পরিবহনব্যবস্থা থাকলেও তা সব শিক্ষার্থীকে সেবা প্রদান করতে পারছে না। তা ছাড়া অভিজাত স্কুলের শত শত শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেই স্কুলে আসা-যাওয়া করে। ফলে স্কুল শুরু আর শেষের সময়ে ওই এলাকায় লেগে যায় তীব্র যানজট। দেশের সব সড়কে সাইকেল লেন থাকলে যে যে সুবিধা পাওয়া যাবেÑ 

  • যানজট কমে যাবে অনেকাংশে
  • শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে স্কুল, কলেজ বা বিশ^বিদ্যালয়ে যেতে পারবে
  • পৃথক লেনে যান্ত্রিক যানের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি না থাকায় সাইকেল ব্যবহারে সবাই উৎসাহিত হবে
  • জালানিবিহীন পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা বিধায় জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তন রোধে সহায়ক হবে
  • সাইকেল ব্যবহারে যাতায়াত ব্যয় কমবে বিধায় জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে
  • সাইকেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দেশে অনেক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে
  • অযান্ত্রিক যান হওয়ায় দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার কমবে বহুলাংশে।  

ব্যস্ত সড়কে সাইকেল লেন ডিজাইন

ঢাকার সড়কের ধরন ও প্রকৃতি বিবেচনায় লেন নির্মাণ সহজ নয়। উন্নত বিশ্বে লেনভিত্তিক যান চলাচলব্যবস্থা থাকায় সেখানে লেন নির্মাণ সহজ। তবে ঢাকার ক্ষেত্রে শুধু আদর্শ ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়েই নিরাপদ লেন নির্মাণ করা সম্ভব। ঢাকার সড়কে মিশ্র যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা থাকায় এখানে সাইকেল লেনে শুধু বাইসাইকেল চলাচলে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না সেটা রীতিমতো এক চ্যালেঞ্জ। মোটরসাইকেল, রিকশা এমনকি পথচারীও চাইবে এই লেন ব্যবহার করতে। লেনটি শুধু বিশেষ কোনো রঙে সীমানা চিহ্নিত হলে যান্ত্রিক যানও ঢুকবে এমনকি পার্কিংয়েও দখল হতে পারে। এ জন্য বাইসাইকেল লেনকে নিরুপদ্রব রাখতে যেসব পরিকল্পনা নিতে হবেÑ

  • ঢাকার বাইসাইকেল লেন হওয়া প্রয়োজন সম্পূর্ণ আলাদা ও সীমানাঘেরা
  • এর বাঁক, সড়ক চিহ্ন ও জংশন ব্যবস্থাপনা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে হতে হবে
  • ম্যানহোল, ড্রেন, খোঁড়াখুঁড়ি ইত্যাদির কবলে যেন না পড়ে এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ডিজাইন করতে হবে
  • দীর্ঘস্থায়ী লেনের জন্য রিজিট বা কংক্রিট পেভমেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে
  • সড়ক ও এলিভেটেড দুই উপায়েই হতে পারে
  • আলাদা সিগন্যাল-ব্যবস্থা থাকবে
  • সবুজ রঙের লেন মার্ক থাকবে
  • সাইকেলের প্রতীকী চিহ্ন থাকতে হবে
  • জংশন ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধানে জেব্রা ক্রসিংয়ের মতো বাইসাইকেল ক্রসিং-ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

সাইকেল উৎসাহিত করায় আরও যত সুবিধা

সাইকেল লেন-ব্যবস্থা চালু হলে সাইকেল ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে যাবে কয়েক গুণ, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু কত দিন সাইক্লিস্টরা তাদের আগ্রহ ধরে রাখবে, এ প্রশ্ন আসতেই পারে। কারণ, শুধু লেন করলেই হবে না আরও আনুষঙ্গিক সুবিধা প্রদান করতে হবে সাইক্লিস্টদের উৎসাহিত করতে। যেমন,

  • নিরাপদ বাইসাইকেলস্ট্যান্ড
  • চোরের উপদ্রবমুক্ত পার্কিং-সুবিধা
  • সিগন্যাল সিস্টেম
  • ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাঁচতে আচ্ছাদিত স্থান বা বিশ্রাম স্থান
  • বাইক শেয়ারিং
  • বিনা মূল্যে বাইসাইকেল চালানোর সুবিধাসহ নানা প্রণোদনা।

সাইকেল লেনের দেখভাল

একটি অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, তা রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। হয়তো নির্মাণ সম্পন্ন পর্যন্ত সংস্থাগুলো দায়িত্ব নেবে কিন্তু ব্যবহারের উপযোগী রাখার দায়িত্ব কেউ নেবে না। যেহেতু ডিএনসিটি লেন নির্মাণ করছে, সেহেতু প্রতিষ্ঠানটির উচিত সাইকেল লেনের যথাযথ দেখভাল করা। সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির করণীয়-

  • সবাই যেন আইন মেনে লেন ব্যবহার করে, সে জন্য সচেতনতা বাড়াতে হবে, চালাতে হবে প্রচারণা
  • লেনের জায়গা যেন কোনোভাবেই বেদখল না হয়
  • লেনগুলো যেন খোঁড়াখুঁড়ির কবলে না পড়ে
  • বর্ষার যেন পানি জমে না যায় সে জন্য ড্রেনেজ সমস্যার সমাধান করতে হবে
  • লেনে মোটরসাইকেল ও রিকশার মতো যান যেন ঢুকে না পড়ে সেই ব্যবস্থা নেওয়া, প্রয়োজনে জরিমানার ব্যবস্থা করা
  • হকার যেন কোনোভাবে দখল করতে না পারে
  • লেনে যেন স্ট্রিট ফুডের দোকান না বসে
  • পথচারীদের চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করা।

সারা দেশেই চাই সাইকেল লেন

যানজট এখন শুধু ঢাকতেই নয়, ছড়িয়ে পড়ছে দেশব্যাপী। ভুল পরিকল্পনা, অবহেলা, ভুল চাপ, অত্যাচারে আমরা শহরকে নষ্ট করছি। আরও ভুল করলে এ শহর পরিত্যক্ত শহরে পরিণত হবে। তাই এখনই এখানে লেনভিত্তিক সড়ক বাস্তবায়ন করা উচিত। বিশেষ করে যেখানে নতুন শহর গড়ে উঠছে। যেমন-পূর্বাচল প্রকল্প, উত্তরা তৃতীয় ফেইজের মতো জায়গায়। এ ছাড়া যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেশি যেমন, শাহবাগ, নিউমার্কেট, আজিমপুর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও অন্যান্য স্থানে ছোট আয়তনের হলেও লেন গড়ে তুলতে হবে। যেখানেই খোলা জায়গা মিলবে অর্থাৎ সড়ক, ফুটপাত, গলিপথ, পার্ক, মাঠ ইত্যাদি তা-ই যতটা সম্ভব কাজে লাগাতে হবে। তা ছাড়া ঢাকার বাইরে প্রতিটি নতুন সড়কে পৃথক লেন রাখার এখনো অনেক সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ দ্রুততার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।

পরিশেষে

দেশব্যাপী সাইকেলের প্রসার ঘটলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব রোধ করা সম্ভব হবে সহজেই। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করতে হয় না বলে পরিবেশ থাকে দূষণমুক্ত। প্রতিবছর আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয় যান্ত্রিক যানের জন্য। ফলে ব্যয় হয় প্রচুর অর্থের। বাইসাইকেল ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহী করতে পারলে অনেকাংশে এই ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। তা ছাড়া যান্ত্রিক যানের বিরক্তিকর শব্দ ও হাইড্রোলিক হর্ন শব্দদূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। শব্দদূষণ কমিয়ে শহরকে শান্ত রাখতে বাইসাইকেল হতে পারে অনন্য বাহন। তা ছাড়া সাইক্লিং একটি উৎকৃষ্ট ব্যায়াম। নিয়মিত বাইসাইকেল চালালে শরীর সুস্থ ও নীরোগ থাকে। আর তাই সাইকেলকে জনপ্রিয় করতে দেশের সকল ব্যস্ত সড়কে পৃথক লেন নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৫তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৯।

মঈন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top