স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। আর সুস্বাস্থ্যের জন্য চাই স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ। বিশেষ করে সৌরালোক, বিশুদ্ধ বাতাস, সুপেয় ও ব্যবহারযোগ্য পানি, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, সবুজে ঘেরা বিনোদন পরিসরের মতো মৌলিক যত অনুষঙ্গ। আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নগর ছাড়া বিশে^র বিভিন্ন শহর-নগরে এসবের অভাব বেশ লক্ষণীয়, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য বিরাট হুমকি। একসময় নগরে নাগরিক বিড়ম্বনা হিসেবে বিবেচনা করা হতো যানজট, বায়ুদূষণ, নিরাপদ পানির অভাব, আবাসনসংকটকে। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর সঠিক নগর ব্যবস্থাপনার অভাবে যখন অস্বাস্থ্যকর ও ঘিঞ্জি পরিবেশ বেড়ে যায় তখনই বাসা বাঁধে নানা রকম ক্ষতিকর রোগ-জীবাণু, মশা-মাছি, পরজীবী, অনুজীব, কীট, ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস। আর এসবই হয়ে দাঁড়ায় মানবস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি, যার জ¦লন্ত উদাহরণ রাজধানী ঢাকা। নাগরিক বিড়ম্বনার এমন কিছুই অবশিষ্ট নেই, যা অনুপস্থিত এই নগরে। এমনিতেই বছরজুড়েই রোগ-ব্যাধিসহ নানা বিড়ম্বনায় ভোগে নগরবাসী, এর ওপর শুরু হয়েছে ভয়াবহ ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ। সম্প্রতি রাজধানীসহ সারা দেশে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ডেঙ্গু। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঘনবসতি, আবর্জনা ব্যবস্থাপনার অভাব, জলবায়ু পরিবর্তন, সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতা ও অদক্ষতাই মূলত দায়ী এই পরিস্থিতির জন্য। অপরিকল্পিত নগরায়ণে নগরে স্বাস্থ্যঝুঁকির আদ্যন্ত এবারের মূল রচনায়।
বর্তমানে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গু বাংলাদেশের অর্থনীতি, সামাজিক ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিস্থিতি অনেকটা মহামারি আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের ২৫ তারিখ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৬৫ হাজার ৭৬৫ জন। আক্রান্ত রোগীদের একটি বড় অংশ বাড়িতেই চিকিৎসা নেয় নতুবা রোগের উপস্থিতি জানতেও পারে না। সে হিসেবে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। অথচ গত বছর ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা ছিল মাত্র ৭ হাজার ৪৫০। বিগত বছরগুলোতে এ সংখ্যা ছিল আরও কম। ডেঙ্গু ছাড়াও ২০১৭-১৮ সালে মহানগরী ঢাকায় চিকুনগুনিয়ার প্রভাব ছিল আশঙ্কাজনক। এ ছাড়া ম্যালেরিয়া, ইয়োলো ফিভার, লেপ্টোসপাইরোসিস, টাইফয়েড ফিভার, মেনিনজোকোক্কাল ডিজিজ ও অন্যান্য রোগের সংক্রমণ বেশ লক্ষণীয়। এসব রোগে মৃত্যুর হারও কম নয়। আবার রোগী বেঁচে গেলেও ভোগান্তির যেন অন্ত থাকে না। বিভিন্ন ধরনের কীট, ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর আক্রমণের ফলে মানবদেহে নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়। বিশেষ করে বস্তির মতো ঘনবসতিতে বসবাসকারী গার্মেন্টস, ট্যানারি ও অন্যান্য কলকারখানার শ্রমিক, নিম্ন আয়ের মানুষ, শিশু ও ছোট বাচ্চাদের মধ্যে এ ধরনের রোগের প্রাবল্য বেশি। এ ছাড়া রয়েছে-
- প্রচণ্ড জ্বর
- মাথাব্যথা
- শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানি
- অ্যাজমা
- ডায়রিয়া
- আমাশয়
- পেটের পীড়া
- ত্বকের নানা সমস্যাসহ প্রভৃতি।
নগরের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য
বাংলাদেশের যাবতীয় কার্যক্রম রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় এখানে জনসংখ্যার চাপ অত্যধিক। এখানে আবাসন, সড়ক, অফিস-আদালত, বাজার, বিনোদনকেন্দ্র কোনো কিছুই পরিকল্পিত নয়। আয়তন অনুসারে ঢাকা নগরের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ ৫০ লাখ হওয়া উচিত। অথচ বর্তমানে এখানে প্রায় ২ কোটি লোকের বাস। যেখানে সেখানে গড়ে উঠছে ভবন-অবকাঠামো। ফলে বাড়ছে ঘনবসতি। তা ছাড়া কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও নাগরিকদের অসচেতনতার কারণে যত্রতত্র ময়লা ফেলার প্রবণতা লক্ষণীয়। সর্বত্রই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। নদী-খাল-বিল দখল ও দূষণের কারণে শহরে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতার। এই জলাবদ্ধতায় জন্ম নিচ্ছে রোগ-জীবাণু। শহরে ভবন নির্মাণে যতটুকু উন্মুক্ত স্থান রাখা প্রয়োজন, তা রাখা হচ্ছে না। বিশেষ করে গায়ে গায়ে লাগোয়া ভবনগুলোর মধ্যকার প্যাসেজে প্রবেশ করতে পারছে না পর্যাপ্ত আলো-বাতাস। তা ছাড়া গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলে সেই প্যাসেজও ভরে যাচ্ছে আবর্জনায়। ফলে সেখানে জন্ম নিচ্ছে নানা রকম ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, জীবাণু, কীট-পতঙ্গ ও ফাঙ্গাস। বাসাবাড়ির ফুলের টবে, ফুলদানিতে, ফ্রিজে বা এয়ার কন্ডিশনারের ট্রে বা কৌটা, ডাবের খোসায় জমা পানিতে জন্ম নিচ্ছে এডিস ও অন্যান্য মশা। এ ছাড়া নগরের বিভিন্ন স্থান যেমন-কমলাপুর বিআরটিসি ডিপো, গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালের ৬০-৮০ শতাংশ পাত্রে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। ঢাকার রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার জরিপ বলছে, বাস ধোয়ার পানি, বৃষ্টির পানি জমে থাকা পানি ও ড্রেনে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মশার লার্ভা। শহরের বস্তি এলাকাগুলোতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জন্ম নেওয়া মশা, মাছি, ছারপোকা, ব্যাকটেরিয়াসহ বিভিন্ন জীবাণু থাকে, যা আশপাশের পরিবেশকে দূষিত করছে এবং প্রতিনিয়ত রোগ ছড়াচ্ছে। নগরে জীবাণুঘটিত রোগ-ব্যাধির মূলে রয়েছে-
- জনসংখ্যার আধিক্য ও ঘনবসতি
- আবর্জনা ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতা ও অদক্ষতা
- যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার স্তূপ
- দীর্ঘকালীন জলাবদ্ধতা
- ড্রেনেজ সমস্যা
- ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল
- নির্মাণাধীন ভবন ও উন্নয়ন প্রকল্প এলাকায় জমে থাকা পানি
- বাস টার্মিনাল ও ডিপোর অব্যবহৃত গাড়ি ও টায়ারের স্তূপে জমে থাকা পানি
- থানায় জব্দকৃত ভাঙাচোরা গাড়িতে জমে থাকা পানি
- পুরোনো টায়ার
- পরিত্যক্ত জুতা
- ডাবের খোসা
- পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যাতায়াতকালে অন্যের ঘাম থেকে ভাইরাস সংক্রমণ
- ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের হাঁচি, কাশির সঙ্গে রোগ-জীবাণুর বিস্তার
- হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণকালে রোগ-জীবাণুর সংক্রমণ
- অকার্যকর মশার ওষুধ।
বিশ্বে জীবাণুঘটিত নানা রোগে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গবেষণা মতে, মশা সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাণী। বিশে^ তিন হাজারেও বেশি মশার প্রজাতি রয়েছে। জীবাণু বহন ও ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও অনেক বেশি থাকায় বিশে^ মশার কামড়ে মারা যায় লাখ লাখ মানুষ। ২০১৫ সালে শুধু ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান ৪ লাখ মানুষ। এ ছাড়া জিকা, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইয়োলো ফিভারসহ নানা জীবাণুবাহিত রোগে প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছে। ভয়াবহ আরেকটি তথ্য, প্রতিবছর গোলকৃমিতে ২ হাজার ৫০০ এবং ফিতাকৃমিতে ১ হাজার মানুষ মারা যায় (সূত্র: স্ট্যাটিস্টা)। এ ছাড়া মশা, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী, ফাঙ্গাস ও অন্যান্য কীট-পতঙ্গ থেকে রোগাক্রান্ত হয়ে প্রতিবছর প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য মানুষ।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। উপকূলীয় এলাকায় এই প্রভাব বেশি হলেও শহর-নগরেও কম নয়। অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের ধারণাপত্রে উঠে এসেছে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের যেসব প্রভাব এ দেশে পড়েছে, তার মধ্যে অন্যতম অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত হ্রাস, অসময়ে বৃষ্টিপাত ও অতিবৃষ্টি। এর বাস্তব প্রমাণও মিলেছে। এ বছর দেশে বৃষ্টি শুরু হয়েছে বর্ষা মৌসুম আসার অনেক আগ থেকে, ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকে যা জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ইঙ্গিতবাহী। আগাম বৃষ্টির ফলেই বেড়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। কারণ, বিগত মৌসুমের এডিস মশার ডিম ছয় মাস পর্যন্ত টিকতে পারে এবং পানি ও উপযুক্ত পরিবেশ পেলে তা থেকে শুককীট জন্ম নেয়। এ ছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে কোনো কোনো কীট-পতঙ্গের স্বাভাবিক জীবনকাল দীর্ঘায়িত হয়। আর অনুকূল পরিবেশ পেয়ে এসব কীট-পতঙ্গ দ্বারা বাহিত রোগ-জীবাণুর সংক্রমণ আরও বেড়ে যায়। বর্তমানে সংক্রামক রোগ পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ঘাতক। যেসব অঞ্চলে মশা, মাছি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গের মাধ্যমে রোগ ছড়ায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেসব অঞ্চলে সংক্রামক রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে। ফলে বাড়বে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, কালাজ্বরের মতো মরণব্যাধি।
নগরে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিরসনে
একটি নগর যেমন গড়ে ওঠে দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায়, তেমনি নগরটির হুট করেই এত বড় সমস্যা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। এ জন্য সমস্যা সমাধানে আমাদের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। নিতে হবে কার্যকর উদ্যোগ। অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধ করে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। বসবাসের উপযোগী নগরী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনায় যে বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে; তা হচ্ছেÑ
পরিবেশবান্ধব বা ইকো নগরায়ণ
নাগরিকদের সুস্থতা বিবেচনায় বিশ^ব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব বা ইকো নগরায়ণ। গণমুখী ইকো নগরায়ণের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ নগরের পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাবে এটাই স্বাভাবিক। বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, বার্ষিক বৈশি^ক সামগ্রিক মৃত্যুর ৬৩ শতাংশ মানুষ মারা যায় ক্রনিক ডিজিসের কারণে। আর এর পেছনে অন্যতম দায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ। মানুষের অকাল মৃত্যুরোধে নগরের সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হওয়া উচিত পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কল-কারখানায় বর্জ্য পরিশোধনে ইটিপি স্থাপন, ধোঁয়াবিহীন ইটভাটা নির্মাণ, ধোঁয়াবিহীন যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো প্রভৃতি। তবে সবচেয়ে বড় বিষয়, নগরে সঠিক জৈবপরিবেশ বজায় রাখতে প্রচুর গাছপালা লাগাতে হবে। এ ছাড়া নগরবাসীর সুস্থ, সুন্দর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, বিনোদনকেন্দ্র, পার্ক স্থাপন জরুরি। জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায়ও ইকো নগরায়ণ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র খুবই নাজুক। এ নগরের মানুষের সচেতনতা একেবারেই কম। যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা এখানকার মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। ময়লা-আবর্জনা ফেলতে রাষ্ট্রীয় কোনো নিষেধাজ্ঞাও নেই। ফলে নগরে যে পরিমাণ বর্জ্য জমা হয়, তা আধুনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার কোনো কার্যক্রম নেই সিটি করপোরেশনের। তা ছাড়া যেখানে সেখানে বর্জ্য ফেলার কারণে ও তা সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে না নেওয়ার কারণে ঘটছে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়। ফলে জন্ম নেয় নানা ক্ষতিকারক জীবাণু। অথচ উন্নত দেশগুলো বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করেছে। এই মুহূর্তে আমাদেরও উচিত সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নগরীকে রোগ-জীবাণুমুক্ত রাখা। তাতে নগরবাসী রক্ষা পাবে ভয়াবহ সব ব্যাধি থেকে।
বিকেন্দ্রীকরণ
রাজধানী ঢাকাসহ প্রায় প্রতিটি শহরই অপরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে। চাকরি বা নানা কারণে যাঁরা শহরমুখী, তাঁদের বড় একটি অংশই শেষ পর্যন্ত শহরের বাসিন্দা হয়ে যান। এর ফলে নগরে বাড়ছে আবাসন চাহিদা। গড়ে উঠছে অসংখ্য ভবন। এভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে নগরায়ণ প্রক্রিয়া। এতে নগরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রামপর্যায়ে বাড়িয়ে রোধ করতে হবে শহরমুখিতা।
জলাবদ্ধতা রোধ
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেও সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। আর এ পানি অপসারিত হতে সময় লাগে কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত। ফলে জন্ম নেয় নানারকম রোগ-জীবাণু। অতি দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসনে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। এ জন্য নদী-খাল খনন ও দখলমুক্ত করাসহ পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে নিতে হবে কার্যকর ভূমিকা। প্রয়োজনে জলাবদ্ধতা নিরসনে ‘রিটেনসন পন্ড’ রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
বিশ^ব্যাপী ডেঙ্গু মোকাবিলা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীতে ডেঙ্গু একটি বৈশ্বিক আপদে পরিণত হয়। এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও অন্যান্য মহাদেশের ১১০টির অধিক দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ ডেঙ্গুতে সংক্রমিত হয়ে অনেকেই মৃত্যুবরণ করে। ফিলিপাইনে এ বছর ৪৫৬ জন মারা যাওয়ার পর রোগটিকে মহামারি হিসেবে রাষ্ট্রীয় সতর্কতা জারি করা হয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ২০টি অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগের একটি হিসেবে ডেঙ্গুকে চিহ্নিত করেছে। বর্তমানে ইউরোপ ছাড়া বাকি সব মহাদেশের বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপক হারে। বিশেষ করে মৌসুমি বায়ুপ্রধান অঞ্চলে এর প্রাদুর্ভাব বেশি। তবে ডেঙ্গু রোগ ও তা ছড়িয়ে পড়ার কাতারে এগিয়ে রয়েছে অধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত অপরিকল্পিত শহরাঞ্চল, যেখানে সুষ্ঠু পানি, পয়ঃ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই বলেই চলে।
ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন মালয়েশিয়া। ছিমছাম মালয়েশিয়া পর্যটকদের নজর কাড়ে। মালয়েশিয়া ডেঙ্গুপ্রধান দেশ। কারণ, এটি এক ঋতুর দেশ ও সারা বছর বৃষ্টিপাত হয়। ফলে দেশটিতে এডিস মশাও প্রচুর। তবে দেশটি সফলতার সঙ্গে সমস্যাটি মোকাবিলা করেছে। সরকার সারা বছর মশা নিয়ন্ত্রণে ওষুধ ছিটায়। তারপরও কোনো রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে বা ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে কর্তৃপক্ষ রোগীর অবস্থান জেনে ওই এলাকা এবং এর আশপাশে আধা কিলোমিটার মশার ওষুধ ছিটায়। এ হলো ওদের মশারোধের অন্যতম ব্যবস্থা। বিশে^র বিভিন্ন দেশ সাধারণত মশার লার্ভা ধ্বংস করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
পিছিয়ে নেয় পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গও। বিশেষ করে কলকাতা রোগটি নিয়ন্ত্রণে দারুণ সফল। যেহেতু, ডেঙ্গু মশা পরিষ্কার পানিতে জন্মায়। অর্থাৎ তিন দিন ধরে যে পানি এক জায়গায় জমা থাকে, তাতেই মশা ডিম পাড়ে। তাই নালা-নর্দমা পরিষ্কার করার থেকে জমাট পানি পরিষ্কারে গুরুত্ব দিয়েছে তারা। এডিস মশা ধ্বংসে এবং নিয়ন্ত্রণে সরকার, পৌরসভা, স্বাস্থ্যদপ্তর, অর্থদপ্তর সবাই যৌথভাবে কাজ করছে। এই কাজটাকে ওয়ার্ডভিত্তিক কয়েক ভাগে ভাগ করেছে। একটি টিমের কাজ সচেতনতা বৃদ্ধি, অপর টিমের কাজ মশা ধ্বংস করা। অরেকটি টিমের কাজ ওয়ার্ডপ্রতি প্যাথলজি ঘুরে ডেঙ্গু রোগীর তথ্য সংগ্রহ করা। সেই ডেটাবেইসের মাধ্যমে কোন অঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে তা জেনে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ। আগে বর্ষা শুরু হলে কলকাতা করপোরেশন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে নামত। কিন্তু তত দিনে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ত শহরের নানা প্রান্তে। এ জন্য এখন করপোরেশন সারা বছর ধরে নিবিড় নজরদারি চালায়, যাতে কোথাও পানি জমে না থাকে। তা ছাড়া ডেঙ্গু দমনে সরকার অত্যন্ত কঠোর। ময়লা জমিয়ে রাখা বা নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া আবর্জনা ফেললে আগে যেখানে জরিমানা করা হতো ৫০০ রুপি। এখন অপরাধ বুঝে এক লাখ রুপি পর্যন্ত জরিমানা করা হচ্ছে। এ ছাড়া অন্যায় বুঝে বাড়ির ট্যাক্সের বিলের সঙ্গে মোটা অঙ্কের জরিমানাও যোগ করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ফলে রোগটি নিয়ন্ত্রণে কলকাতা করপোরেশন দেখিয়েছে অভাবনীয় সাফল্য।
এখন যা করণীয়
বিশে^র যেসব দেশ ও নগর ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন জীবাণুঘটিত রোগ ও সংক্রমণ মোকাবিলায় সফল হয়েছে তা অনুসরণ করে আমাদেরও উচিত অতিদ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। প্রয়োজনে গবেষণা করে আরও উপযোগী পন্থা উদ্ভাবন করা এখন সময়ের দাবি। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ‘স্বাস্থ্য’ কেবল রোগ বা দুর্বলতার অনুপস্থিতিই নয়; শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকাকেও বোঝায়। এ জন্য রোগ-জীবাণু প্রতিরোধ করতে হবে। এ জন্য বাড়াতে হবে সচেতনতা। শুধু মশক নিধনে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জন্য বরাদ্দ ৪৭ কোটি টাকা। অথচ এই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ সত্ত্বে¡ও মশা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এ জন্য সিটি করপোরেশনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে যার যার পক্ষে যতটুকু সম্ভব তা-ই করতে হবে। গ্রহণ করতে হবে প্রতিকার ও প্রতিরোধের ব্যবস্থা। এ ছাড়া সামগ্রিকভাবে যা যা করণীয় তা হচ্ছে-
- সবচেয়ে জরুরি ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা।
- বাড়াতে হবে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা এবং বিভিন্ন সংস্থার সম্পৃক্ততা।
- সিটি করপোরেশনের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে হবে, পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে জবাবদিহি।
- জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ থেকে সারা বছর নিয়মিত মনিটরিং অব্যাহত রাখা।
- কঠোর আইন তৈরি করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যথাযথ প্রয়োগ। প্রয়োজনে জেল-জরিমানাসহ শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে।
- ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস মশাসহ অন্যান্য মশা নির্মূল ও বংশবিস্তার রোধে বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতের চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
- রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও সব উন্নয়নমূলক কাজ যথাযথ নিয়ম মেনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে।
- মশাসহ সব ধরনের জীবাণু ও কীট দমনে ক্ষতিকর রাসায়নিকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব উপায় বের করতে হবে।
- জমা পানিতে গাপ্পি (চড়বপরষরধ জবঃরপঁষধঃধ) মাছ, ব্যাঙ ও অন্যান্য পতঙ্গভুক জলজ প্রাণী ছাড়া যেতে পারে, যা মশার লার্ভাসহ নানা ক্ষতিকারক পতঙ্গ খেয়ে পরিবেশ বাঁচাবে। পাশাপাশি রোধ করা যাবে রাসায়নিকের ব্যাপক ব্যবহার।
- এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে মশা ও অন্যান্য রোগ-জীবাণুর বংশ বিস্তার রোধ করা যেতে পারে।
- সঠিক পানি সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে সুপেয় ও নিরাপদ ব্যবহারযোগ্য পানির সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
- মাঠ, পার্ক ও লেকের দুপাশ নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
- ফুলের টব, ফুলদানি ও ফ্রিজের ট্রেতে জমা পানি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিবর্তন করতে হবে।
- সঠিক জৈবপরিবেশ নিশ্চিত করতে নগরে উপযোগী গাছ লাগাতে হবে।
- প্রতিটি ভবনের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফাঁকা জায়গা রাখতে হবে (বিএনবিসি কোড অনুযায়ী) যেন আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে।
- এ ছাড়া সুস্বাস্থ্যের জন্য ঘরের ভেতরের পরিবেশও রাখতে হবে জীবাণুমুক্ত। এ জন্য নিজের বাড়ির আশপাশ নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাটা জরুরি।
বিশেষজ্ঞ মত
‘স্বাস্থ্যঝুঁকিমুক্ত নগর পরিকল্পনায় অবশ্যই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে’
অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার
কীটতত্ত্ববিদ ও গবেষক
প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ড. কবিরুল বাশার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক। দোহারের সন্তান বাশার জাপানের কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর পিএইচডির বিষয় ছিল ‘মশার বাস্তুবিদ্যা ও রোগ ছড়ানোর সক্ষমতা’। বর্তমানে সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন দেশের প্রথম কীটতত্ত্ব গবেষণাগার আইআরইএস (ইনসেক্ট রেয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশন)-এর। তাঁর ৩০টির বেশি গবেষণাপত্র দেশি-বিদেশি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি ডেঙ্গু পরিস্থিতির নানা দিক সম্পর্কে পাঠককে জানাতে তাঁর মুখোমুখি হয়েছিল বন্ধন। বন্ধন-এর পক্ষে একান্ত এ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সাইফুল হক মিঠু।
রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু অনেকটা মহামারি আকার ধারণ করেছে, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। হঠাৎ পরিস্থিতির এমন অবনতির কারণ কী?
ডেঙ্গু জ্বর বাংলাদেশে নতুন নয়। ১৯৬৪ সালে ঢাকাতে প্রথম ডেঙ্গু দেখা দেয়। সে সময় ডেঙ্গুকে বলা হতো ঢাকা ফিভার। ১৯৬৭ সালে একটি জার্নালে বাংলাদেশের ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়। ২০০০ সালে বাংলাদেশে আবার ডেঙ্গু ব্যাপক আকারে দেখা দেয়। এরপর প্রতিবছরই কমবেশি ডেঙ্গু দেখা দিয়েছে। গত বছরও ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব ছিল। তবে এ বছর প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে বছরের শুরুতে। ১৯৫৩ সালের পর এ বছরই ফেব্রুয়ারিতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর ফলে কী হয়েছে, যেখানে শুকনো অবস্থায় এডিস মশার ডিম ছয় মাস থাকে, সেখানে বৃষ্টির পানি পেয়ে তা আগেই বিস্তার ঘটিয়েছে। পরে মার্চ-এপ্রিলে হওয়া থেমে থেমে বৃষ্টির প্রভাব আরও বেড়েছে। বেশি ঘনত্বের এডিস মশাই ডেঙ্গুকে ছড়িয়ে দিয়েছে ব্যাপকভাবে। যার ফলে এখন সহজেই যা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
ডেঙ্গু এডিস মশার কামড়ে হয়। এডিস মশার দুটি প্রজাতি রয়েছে। একটি হচ্ছে এডিস এলবোপিকটাস আর একটা এডিস ইজিপটাই। এই ইজিপটাই মশাই হচ্ছে ৯৫ শতাংশ ডেঙ্গু রোগের বাহক। ঢাকায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার কারণ এই এডিস ইজিপটাই।
মশাবাহিত রোগ ছাড়াও আর কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে নগরবাসী?
তেলাপোকা, ছারপোকা, উইপোকা কিংবা মাছি এগুলো রোগবাহী। এরা নগরের একটা বড় পেস্ট (ক্ষতিকর পোকা)। বিশেষ করে তেলাপোকা, ছারপোকা, টিক (উকুনের মতো পরজীবী) মানবস্বাস্থের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব আরবান পেস্ট (নগরের ক্ষতিকর পোকামাকড়) ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস-জাতীয় রোগ ছড়ায়।
মশা ছাড়াও নগরে আর কোনো ধরনের ক্ষতিকর কীট-পতঙ্গ, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ও অনুজীব রয়েছে বলে আপনারা প্রমাণ পেয়েছেন বা মনে করেন?
মশা ছাড়াও তেলাপোকা, ছারপোকা, মাছি, টিক, মাইট (ছারপোকা জাতীয়) নগরীতে আছে। এসব অত্যন্ত ক্ষতিকর।
বিভিন্ন রোগ-ব্যাধির সঙ্গে এসব ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ও অনুজীবের ভূমিকা সম্পর্কে বলুন?
রোগ-জীবাণু ছড়ানোর জন্য ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ফাঙ্গাস এই তিনটি অনুজীব দায়ী। এই তিনটি জীব বহন করে বিভিন্ন রকমের পোকামাকড়। এ ছাড়া পানির মাধ্যমেও ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ফাঙ্গাসবাহিত হতে পারে। রোগ-জীবাণু পানির মাধ্যমে বেশি ছড়ায়। নগরীতে পানির উৎস যেহেতু একটি কিংবা দুটি। সেহেতু এসব উৎসে যদি জীবাণুতে কন্টিমিনিটেড (দূষিত) হয়ে যায়, তাহলে রোগ-ব্যাধি কিন্তু ছড়াতেই পারে। আবার পরিবেশদূষণের মাধ্যমে অনেক ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস কিন্তু ট্রান্সমিশন (সংক্রমণ) হয়। মানে দূষিত বাতাসের মাধ্যমে জীবাণু মানুষের দেহে প্রবেশ করে।
রাজধানীর বাতাসে এখন প্রচুর পরিমাণে ধুলাবালু। এর ফলে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে নগরীর মানুষ ভুগছে। খাবার পানিটা যদি আমরা ঠিক রাখতে পারি আর বায়ুকে যদি নির্মল রাখা যায়, তবে মানুষের অসুখবিসুখ কিন্তু অনেক কমে যাবে।
এসব কীট-পতঙ্গ, পরজীবী, অনুজীব নিয়ে কী ধরনের গবেষণা হচ্ছে, কারাই-বা এসব গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত?
প্রতিটি কীট-পতঙ্গ নিয়ে আলাদা আলাদা গবেষণা আছে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কীট-পতঙ্গ নিয়ে সীমিত আকারে গবেষণা হচ্ছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা অত্যন্ত অপ্রতুল। আমাদের দেশে গবেষণা সেক্টরটা অন্যান্য দেশের তুলনায় অত্যন্ত দুর্বল। গবেষণার জন্য যে পরিমাণ অর্থ দেওয়া প্রয়োজন, সে পরিমাণ অর্থ দেশে মেলে না। সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে গবেষণায় পর্যাপ্ত ইনভেস্টমেন্ট (বিনিয়োগ) করা হয় না।
মশা নিধনে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার হচ্ছে কিন্তু তাতে মিলছে না কাক্সিক্ষত ফল। ওষুধের কার্যকারিতা কম নাকি মশা দিনে দিনে রাসায়নিক প্রতিরোধক্ষম হয়ে ওঠছে?
ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশা স্বচ্ছ পানিতে জন্মায়। বলা যায়, বাসাবাড়ির বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানিতে জন্মায়। কিন্তু সিটি করপোরেশন মশা নিধন করছে ময়লা-নর্দমা, ডোবা, ড্রেন, রাস্তা, টার্মিনালে। ঘরে মশা রেখে রাস্তায় নিধন কর্মসূচি পরিচালনা করলে মশা নিয়ন্ত্রণ করাটা কঠিন।
মশার ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে বলা হচ্ছে, ওষুধের আয়ু শেষ হয়ে গেছে। এটা একটা ভুল তথ্য। কারণ সায়েন্টিফিক্যালি (বৈজ্ঞানিকভাবে) রাজধানীর দুই সিটির তিনটি অংশে ইনসেক্টিসাইড (কীটনাশক) একটা কম্বিনেশন ব্যবহার করে। টেট্রামেট্রিন, পেলেথ্রিন ও পারমাথ্রিন। তিনটা ইনসেকটিসাইডের একটা কম্বিনেশন ব্যবহার করে। এই তিনটা ইনসেকটিসাইডের তিন ধরনের কার্যকারিতা আছে। একটা হচ্ছে নগডাউন এজেন্ট, যেটা মশাকে ফেলে দেবে; আরেকটা হচ্ছে কিলিং এজেন্ট, যেটা মশাকে মেরে ফেলবে; আরেকটা অ্যাকটিভিজিং মশা, যেটা মশাকে অ্যাকটিভ করবে। অ্যাকটিভেট করলে ইনসেকটিসাইডটা সহজে মশার শরীরে ঢোকে। তিনটির তিন ধরনের কার্যকারিতা। এই তিনটা অস্ত্র একসঙ্গে সিটি করপোরেশন ব্যবহার করছে। এটা কাজ করার কথা।
মশার ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে আইসিসিডিআরবি একটা গবেষণা আছে। সেই গবেষণার ম্যাথেডোলজিটা ভিন্ন। তারা এই তিনটা উপাদানের মধ্যে একটা উপাদান কিলিং এজেন্ট নিয়ে টেস্ট করেছে, যেটা মশাকে মেরে ফেলে। সেটাকে তারা অকার্যকর দেখতে পেয়েছে। এবং তারা ঘোষণা দিয়েছে, সিটি করপোরেশনের মশা মারার যে ওষুধ, সেটা অকার্যকর। কিন্তু তিনটির মধ্যে দুইটি তো কার্যকর হতে পারে। তিনটি ইনসেকটিসাইডের যে ককটেল (মিশ্রণ) সিটি করপোরেশন ব্যবহার করে, সেই তিনটাকে একসঙ্গে করা হয়নি। তিনটা উপাদান একসঙ্গে দিলে কাজ করবে বেশি। এ জন্য উচিত ছিল তিনটা উপাদানের সম্মিলিত কীটনাশককে টেস্ট করা।
মশা নিধনে যেসব রাসায়নিক ব্যবহৃত হচ্ছে, তা মানবস্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর?
এসব রাসায়নিক ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি একটু তো আছেই। কিন্তু এ সময়ে অন্য কোনো বিকল্প নেই। এখন যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তাতে ডেঙ্গুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মশা মারতেই হবে। সেটা মশার কয়েল, অ্যারোসল বা মশা মারা ব্যাট বা হাত দিয়েই হোক না কেন। সমস্যা থেকে আগে রক্ষা পেতে হবে। তারপরই আমরা অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা করব। তবে কিছু প্রিকারশন (সতর্কতা) নেওয়া যেতে পারে। যেমন: ওষুধ স্প্রে করার সময় মাস্ক (মুখবন্ধনী) ব্যবহার করা। ওষুধ দেওয়ার পর দরজা-জানলা খুলে দেওয়া ইত্যাদি।
মশা নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রাকৃতিক উপায় আছে কি?
মশা নিয়ন্ত্রণে প্রাকৃতিক উপায় একটাই, নিজের বসতবাড়ি ও চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। টব, টায়ার, চৌবাচ্চায় জমা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে রোগ-ব্যাধি বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক সম্পর্কে কিছু বলুন?
জলবায়ুর সঙ্গে রোগ-ব্যাধির সম্পর্ক অনেক গভীর। এ বছর ডেঙ্গু এত বেড়ে যাওয়ার কারণ কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন। এবার বছরের শুরুতে বৃষ্টি হয়েছে প্রচুর। আবার মার্চ-এপ্রিলে থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। পানি নামার সুযোগ খুব কম পেয়েছে। এর ফলে এডিস মশার বিস্তার সহজ হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা, হিউমিডিটি (শুষ্কতা) কমে যায় কিংবা বেড়ে যায়। এগুলো যখন হঠাৎ কমে যায় কিংবা বেড়ে যায়, তখন কিন্তু নতুন ধরনের রোগ-জীবাণুর জন্ম নেয়। নতুন নতুন রোগ দেখা দেয়।
সম্প্রতি নগরের অনেক বাসাবাড়িতে শখের বাগান গড়ে তোলা হচ্ছে। এসব গাছ থেকে কোনো ক্ষতিকর কীট-পতঙ্গ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে কি?
শখের বাগান থেকে অন্যান্য যে কীট-পতঙ্গ ছড়ায় তার মধ্যে এখন সবচেয়ে ভয়ংকর এই ডেঙ্গু। কারণ, ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশা টবে জমে থাকা পানিতে জন্মায়। যাঁরা ছাদে বাগান করেন, তাঁদের প্রতি পরামর্শ হলো, টবে যেন পানি জমতে না পারে এই দিকে খেয়াল রাখা।
বাসাবাড়িতে জীবাণুঘটিত কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। কীভাবে তা রোধ করা যায়?
বাসাবাড়িতে অনেক কীট স্বাস্থ্যঝুঁকির জন্য দায়ী। যেমন মাছি। এই মাছি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। মাছি খাবারের ওপর বসে। এদের পায়ে ও ডানায় অনেক রোগের জীবাণু থাকে। যেগুলো খাবারের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে খাবার দূষিত হয়। এই মাছি কিন্তু কিচেন (রান্নাঘরের) ওয়েস্ট (উচ্ছিষ্ট) থেকে তৈরি হয়। এই মাছি প্রচুর পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়। এ ছাড়া তেলাপোকাগুলো স্যুয়ারেজ লাইন/ট্যাংকি থেকে আসে। এরা বিভিন্ন খাবারদাবারে রোগ-জীবাণু ছড়ায়। এ ছাড়া ইঁদুরও কিন্তু অনেক রোগের বাহক। পেস্ট (ক্ষতিকর পোকা) কন্ট্রোলের (নিয়ন্ত্রণের) মাধ্যমে এসব নিধন করতে হবে। এ ছাড়া ছারপোকা মানুষের দেহে বিভিন্ন রোগ ছড়ায়। গৃহস্থালি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, খোলামেলা রাখলে এসব পোকামাকড়ের উৎপাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া ছাড়াও ভবিষ্যতে অন্য কোনো রোগের প্রার্দুভাবের আশঙ্কা কতটা? আর তা রোধে কোনো ধরনের প্রস্তুতি আমাদের আছে কি?
বিভিন্ন দেশে জিকা কিন্তু মহামারি আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশেও এ রোগ আগমনের আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া আশঙ্কা রয়েছে ছারপোকার প্রাদুর্ভাবের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছারপোকা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা হলেই ছারপোকার ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। আমাদের প্রস্তুতি বলতে, আমরা জানছি। প্রস্তুতি বলতেই এটুকুই।
নগর পরিকল্পনায় মানবস্বাস্থ্যের বিষয়টি কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়? আর যদি তা গুরুত্ব না পায় তাহলে করণীয় কী?
নগর পরিকল্পনায় জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ এটা অত্যন্ত জরুরি। নগরের পরিকল্পনায় পাবলিক হেলথ (জনস্বাস্থ্য) স্পেশালিস্টের (বিশেষজ্ঞ) অন্তর্ভুক্তি থাকা উচিত। পাবলিক হেলথ বিবেচনা করে কিন্তু নগর তৈরি করতে হবে। যেমন পাশাপাশি একটি বাড়ি থেকে অপর একটি বাড়ির দূরত্ব কমপক্ষে পাঁচ ফুট রাখা উচিত। তাতে ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস না পেলে বাড়িটা কিন্তু স্যাঁতসেঁতে হয়। আর স্যাঁতসেঁতে ঘরে প্রচুর পরিমাণে ফাঙ্গাস, ব্যাকটেরিয়া জন্মে। এসব থেকে মানবদেহে রোগ-জীবাণু প্রবেশ করে। দেখবেন, রাস্তায় প্রচুর পরিমাণে কফ, থুতু ফেলে। এর কারণ প্রায় প্রতিটা মানুষের গলায় ইনফেকশন। এই ইনফেকশনের প্রধান কারণ কিন্তু এই স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বসবাস। এই কথাগুলো একজন পাবলিক হেলথ স্পেশালিস্ট বলবেন। কী নকশায় একটা বাড়ি, পার্ক কিংবা সিটি করলে নগরের মানুষ সুস্থ থাকবে, সেই পরামর্শ দেবেন।
জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি যদি গুরুত্ব না পায় তাহলে নগরীতে অসুখ কিন্তু বাড়বে। তাই বলতে চাই, স্বাস্থ্যঝুঁকিমুক্ত নগর পরিকল্পনায় অবশ্যই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৩তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৯।