কৃষকের দোরগোড়ায় আধুনিক স্থাপত্য
অবশ্যম্ভাবী ব্যস্ততম এই যুগের আগে সহজ-সরল উৎসবমুখর কৃষি আর ক্ষুদ্র বাণিজ্যের সম্ভার নিয়ে সমৃদ্ধ গ্রামজীবনের অস্তিত্ব ছিল। প্রতিটা ছোট শহর ও গ্রামে ছিল সাপ্তাহিক এক জীবন। কেনাবেচা, খাওয়াদাওয়া, সামাজিকতা, যোগাযোগসহ নানা প্রয়োজনে একটি নির্দিষ্ট দিনে সবাই একত্রিত হতো। স্থানীয় লোকের ভাষায় যেটা ‘হাটবার’। দিনবদলের সঙ্গে সঙ্গে নগরে সুপারশপ, বড় বড় শপিংমল, অনলাইনে হাজারো মার্কেটপ্লেস গড়ে উঠলেও সেই হাট কিংবা হাটবারের প্রয়োজন আজও ফুরায়নি। এখনো কৃষি বাঙালির জীবিকা ও আয়ের প্রধানতম উৎস। এ দেশটার অর্থনীতিও এখনো অনেকাংশে কৃষিনির্ভর। তবে ব্যাপক কৃষিনির্ভরতা সত্ত্বে¡ও কৃষিপণ্য বিপণনে ও কৃষকের কল্যাণে কার্যকর কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। তবে আশার কথা, অনেক দেরিতে হলেও দেশের কিছু প্রান্তে গড়ে উঠছে ‘ভিলেজ সুপার মার্কেট’ নামে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত কৃষি বাজার। এই বাজারে ন্যায্যমূল্যে সরাসরি কৃষিপণ্য কেনাবেচা করার সুযোগ মিলবে আর যার সুবিধাভোগী হবেন তৃণমূলের কৃষক।
প্রকৃত অর্থে অবকাঠামোগত উন্নয়নই কৃষি বা কৃষকের সঙ্গে স্থাপত্যচর্চার যোগসূত্র তৈরি করে। কৃষি অবকাঠামোতে স্থাপত্যের সংশ্লিষ্টতা সামঞ্জস্যহীন নয়। কৃষিদ্রব্য বিপণনের ইতিহাস কৃষির ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। উৎপাদনের পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্য ও কৃষি-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সামগ্রী উৎপাদক, ভোক্তা, মধ্যগসহ অভীষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর ব্যাপারটা সমানভাবে জরুরি। বিভিন্ন শস্যের বাজারমূল্যের হ্রাস-বৃদ্ধিতে কৃষকেরা অত্যন্ত সংবেদী বিধায় কোনো এলাকার শস্যচাষের ধরন শস্যগুলোর ক্রয়-বিক্রয়, প্রদর্শনী ও বাজারজাতকরণের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আজকের মতো যখন এত বেশি পণ্য পরিবহনের সুযোগ ছিল না, তখনো কৃষিভিত্তিক সমাজে পণ্য বিনিময় প্রথার প্রাধান্য ছিল এবং বিক্রয়ের প্রয়োজনে পণ্য সংরক্ষণ আর প্রদর্শনীর ব্যবস্থাও করতে হয়েছে।
কৃষকের জন্য কৃষিবাজার
কৃষিপণ্য বিপণন, সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় প্রদর্শনের ব্যবস্থা আজও খুব মানসম্মত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে কৃষিকে গুরুত্ব দিয়ে অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ সাম্প্রতিককালে বিবেচনায় এসেছে। ভিলেজ সুপার মার্কেট এই বাস্তবতায় একটি নতুন উদ্যোগ। কৃষি ও কৃষককে বিবেচনায় নিয়ে অবকাঠামো উন্নয়নে প্রয়োজন রয়েছে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, এক স্থানে জমা করা এবং ক্রেতার জন্য উপযুক্ত প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা। বাজার বা মার্কেট এই কাজের উপযুক্ত স্থান। দৈনন্দিন প্রয়োজনে ক্ষুদ্র পরিসরে আমরা বাজারের সঙ্গে পরিচিত। তবে বৃহৎ পরিসরে সেই ধরনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নেই বললেই চলে। শহরে সুপার মার্কেট ধারণাটি জনপ্রিয় হলেও কাঁচামাল বিক্রয় ও প্রদর্শনীর জন্য ভিলেজ সুপার মার্কেট এখন সময়ের দাবি। ভিলেজ সুপার মার্কেট প্রকল্পের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এতে কৃষি ও মৎস্যজাত পণ্যের বিক্রয় এবং প্রদর্শনের পাশাপাশি সংরক্ষণ এবং পণ্য স্থানান্তরের সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে একটি পরিপূর্ণ প্রকল্প তৈরি হবে। কাঁচা পণ্যের আড়তের পাশাপাশি শীতল সংরক্ষণাগার, মান পরীক্ষণ কেন্দ্র, বরফকল, দাপ্তরিক কার্যক্রম ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যথাযথ বৈদ্যুতিক এবং যান্ত্রিক সুবিধা, ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য বিশ্রামাগার ও পরিচ্ছন্নতা কেন্দ্র, প্রার্থনা কক্ষ, পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান, যান্ত্রিক বাহন, ছোট যান ব্যবহারের জন্য চলাচলের পথ ইত্যাদি সবকিছুকে পরিকল্পনায় আনতে হবে। উপযোগিতার পাশাপাশি আধুনিক স্থাপত্যশৈলী আর নান্দনিকতা নিয়ে প্রকল্পগুলো সজ্জিত হবে।
নব উদ্যোগ
আমাদের গ্রামীণ কি উপশহরীয় এলাকায় এখনো সাপ্তাহিক হাটের গুরুত্ব অপরিসীম। একসময় গ্রামের মানুষ নিজেদের মধ্যে কেনাবেচা করে একে অপরের জীবিকা নির্বাহ করত। কর্মসংস্থানের ধরন ও পরিবেশ পরিবর্তন হওয়ার কারণে গ্রামের আঙিনা ছেড়ে মানুষ চলে এসেছে শহর কাঠামোয়। গ্রাম শূন্য হয়ে গেছে। আবার শহরের মানুষ নির্ভর হয়ে পড়েছে খাদ্য আমদানির ওপর। আবার আমাদের দেশে ধান, পাট, তুলা, আখ ও অন্যান্য ফসলের বিপণন পরিচালনার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পর্যাপ্ত নয়। অধিকাংশ কৃষিদ্রব্য আজও বিভিন্ন ধরনের মধ্যগদের মাধ্যমে ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। এসব খামারজাত দ্রব্যাদি যথাসময়ে বিক্রির জন্য সুষ্ঠু বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া তাই সময়ের দাবি। একই সঙ্গে দরকার কৃষিপণ্যের ওপর দালাল-ফড়িয়াদের নিয়ন্ত্রণ হ্রাস এবং উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ের জন্য ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ। সাম্প্রতিক গবেষণা আশাবাদী করছে, আগামী ১২-১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষিতে গুণগত পরিবর্তন ঘটবে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা নিজেদের প্রচেষ্টায় বিভিন্ন ফসলের জিন আবিষ্কার করবে, যা দ্বারা ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে একই সঙ্গে মানুষের চাহিদা অনুসারে ফসলের গুণগত পরিবর্তন ঘটবে। বাংলাদেশের কৃষি অঙ্গনের এমন সন্ধিক্ষণে ভিলেজ সুপার মার্কেটের এ উদ্যোগে সহযাত্রী হিসেবে এগিয়ে এসেছে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া। সংস্থাটি বহুদিন ধরেই কাজ করছে বাংলাদেশের কৃষি আঙিনায়। সাসটেইনেবল অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ফুড সিকিউরিটি লিংক সংক্ষেপে ‘সফল’ (ঝঅঋধখ) প্রকল্পের আওতায় কৃষকের কাছ থেকে কৃষিপণ্য ক্রয় ও বাজারজাত করে আসছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। সফল প্রকল্পের অভিজ্ঞতাকে নিয়ে এবার তারা কৃষকদের জন্য সুপার মার্কেট প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে খুলনা এবং যশোরকে এই প্রকল্পের জন্য বেছে নেওয়া হলেও পর্যায়ক্রমে এই প্রকল্প ছড়িয়ে যাবে বাংলাদেশের সব কৃষিপ্রধান অঞ্চলে।
খুলনার ডুমুরিয়ার টিপনা গ্রামে ২ একর ১০ শতক জমির ওপর নির্মিত হয়েছে ‘ভিলেজ সুপার মার্কেট’। প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ইতিমধ্যে বাস্তব রূপ লাভ করেছে ভিলেজ সুপার মার্কেট, খুলনা। একইভাবে ভবদহ অঞ্চলের প্রান্তিক চাষিদের কল্যাণে যশোরের মণিরামপুরে ভিলেজ সুপার মার্কেট স্থাপিত হয়েছে। সংস্থাটির তত্ত¡াবধানে ও অর্থায়নে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে উপজেলার পাঁচাকড়ি-নয়াবাজার প্রধান সড়কসংলগ্ন ১ একর ৫৪ শতক জমি কিনে ভিলেজ মার্কেটটি নির্মিত হচ্ছে। শিগগিরই এটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে।
ভিলেজ সুপার মার্কেট, খুলনা
দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবনের সবুজবিধৌত জনপদ খুলনা। শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের পাশে ডুমুরিয়ার টিপনা গ্রামের অবস্থান। চারপাশে বিস্তৃত রঙিন ফসলের আবহ। মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে দুই একর জমির ওপর ভিলেজ সুপার মার্কেটের অবস্থান। সুপার মার্কেট বলতে ভবনের সঙ্গে সবাই পরিচিত, তবে ভিলেজ সুপার মার্কেটের বিশেষত্ব হচ্ছে যে এটি মূলত প্রান্তিক চাষিদের পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্র। সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া খুলনা অঞ্চলের কৃষি ও কৃষকদের জন্য পরিকল্পিত অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসংবলিত প্রকল্পের মহাপরিকল্পনার জন্য স্বনামধন্য স্থাপত্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বাস্তুকল্প আর্কিটেক্টসকে আমন্ত্রণ জানায়। সঙ্গে যোগ দেয় ডাচ ডিজাইন ফার্ম জেপ (ঞলবঢ়)। স্থপতি নাজিমউদ্দিন আহমেদ নিযুক্ত হন এর প্রধান পরামর্শক হিসেবে।
নাজিমউদ্দীন আহমেদ পায়েল খুলনার মাটি ও মানুষের আশ্রয়ে বেড়ে ওঠা শিকড়সন্ধানী স্থপতি। গ্রামীণ গণমানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত এই প্রকল্প শুরুর আগে তিনি বেশ কিছু কর্মশালার পাশাপাশি গবেষণামূলক কাজ করেন। দক্ষিণাঞ্চলের আবহাওয়া, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, কৃষি ও কৃষকের পছন্দ, নির্মাণ উপকরণের সহজলভ্যতা ইত্যাদি বিষয়কে সামনে রেখে ডাচ ফার্ম জেপ এবং স্থানীয় অন্য পরামর্শকদের সঙ্গে নিয়ে প্রকল্পের রূপরেখা তৈরি করেন। ‘প্রযুক্তির ছায়ায় আপন পরিসর’ স্লোগান নিয়ে শুরু হয় ভিলেজ সুপার মার্কেটের মহাপরিকল্পনা।
প্রযুক্তির ছায়ায় আপন পরিসর
ভিলেজ সুপার মার্কেট মোটা দাগে ‘আড়ত এলাকা’ ও টেক ভিলেজ বা ‘প্রযুক্তি ঘর’ সমন্বয়ে সাজিয়ে তোলা একটি কমপ্লেক্স। প্রকল্পের কেন্দ্রীয় অবস্থানে সবচেয়ে বড় স্থাপনাটি কাঁচা পণ্যের আড়ত হিসেবে ব্যবহৃত হবে। মাঝখানে একটি প্রশস্ত করিডর, দুই পাশে সারি বেঁধে বিক্রয়কেন্দ্র্। ঠিক যেন গ্রামীণ পটভূমিতে সরু রাস্তার পাশে গায়ে গায়ে লেগে থাকা দোকানঘর। রোদ-বৃষ্টির ঝাপটা থেকে করিডরকে নিরাপদ রাখার জন্য ওপরে আচ্ছাদন দেওয়া হয়েছে। আচ্ছাদন দেখতে গ্রামীণ হাটের অস্থায়ী তাঁবুর মতো। মাঝখানে দ্বিগুণ উচ্চতার প্রধান লবি এবং লাউঞ্জ। একটি সিঁড়ি উঠে গেছে এর মধ্য দিয়ে। ভবনটির আড়ত অংশটি একতলা এবং কেন্দ্রিয় অংশটি দোতলা, যেখানে রয়েছে অভ্যর্থনা বুথ, পরীক্ষাগার, চিকিৎসাকেন্দ্র, ব্যাংক ও প্রশিক্ষণ কক্ষ। আড়ত এলাকার পেছনে রয়েছে প্রযুক্তি ঘরের অবস্থান। আয়তাকার এ এলাকায় আরো রয়েছে অতিরিক্ত সংরক্ষণাগার, শীতলাগার, বরফ কল, মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষণ কেন্দ্র, সবজি ও মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র, নামাজের ঘর, বৈদ্যুতিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। আছে মহিলাদের জন্য বিশ্রামকেন্দ্রও। আলাদা আলাদা ভবনে স্থান সংকুলান করা হলেও একটি ছাদঢাকা পায়ে চলা পথ এগুলোকে সংযুক্ত করেছে।
পরিসর বিন্যাসের পাশাপাশি বাধামুক্ত চলাচল এই প্রকল্পের প্রয়োজনীয় এক শর্ত। পণ্য সংগ্রহ, জমা করা, ওঠানো-নামানো, নিলাম কাজ, বিতরণ করার জন্য দোকানঘরের পাশাপাশি বেশ বড় আয়তনের একটি মুক্ত পরিসর দরকার। আড়ত ভবনের ভেতরে এবং চতুর্দিকে সেই জায়গাটিকে সন্নিবেশ করা হয়েছে। চতুর্দিকে ৩০ ফুট প্রশস্ত চলাচল পথ তৈরি করা হয়েছে, যাতে পণ্যবাহী পরিবহন চলাফেরা এবং প্রয়োজনমতো পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ করতে পারে। অতিরিক্ত বাহন পার্ক করার জন্য আরও বেশ কিছু স্থান নির্দিষ্ট করা আছে। রক্ষণাবেক্ষণকাজে সুবিধার বিবেচনায় পুরো চত্বরকে কংক্রিট ঢালাই দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে।
টেকসই সংস্কৃতির রূপায়ণ
উন্নত বিশ্বের কৃষি বাজারের ধারণা নিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো গড়ে ওঠা ভিলেজ সুপার মার্কেটকে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সুবিধাসংবলিত কৃষিপণ্যের বাজার হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এই বাজারে পণ্যের গুণগত মান সুরক্ষা, বাছাই, সংরক্ষণ, উন্নত প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থাগুলো রাখা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। ভিলেজ সুপার মার্কেট একটি অত্যাধুনিক ও বৈশিষ্ট্যমন্ডিত স্থাপত্যকর্ম হলেও এর নির্মাণশৈলী ও বহিঃসজ্জা স্থানীয় রীতিনীতি আর ব্যবহারকারীদের জীবন ও সংস্কৃতির মূল ভাবনাকে দূরে ঠেলে দেয়নি। স্থপতি নাজিমউদ্দীন আহমেদ পায়েল পারিপাস পারিপার্শ্বিকতার সাপেক্ষে ভবনের নকশা ও পরিকল্পনার ওপর যত্নবান। ভবনকে তিনি বিবেচনা করেন একটি ভাস্কর্যের সঙ্গে, যা কিনা ভেতর ও বাইরের সার্থক সংযোগে জীবন্ত হয়ে ওঠে। প্রকল্পের পারিপার্শ্বিকতা তার ভবনের অন্তঃপরিসরের মধ্য দিয়ে অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হয়েছে। একটি গ্রামীণ বাজারের যে খোলামেলা বাধাহীন প্রকৃতি, তাকে অক্ষুণ্ন রেখেই আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে মৈত্রী তৈরি করেছেন। ভবনের উচ্চতা ক্রমান্বয়ে একাত্ন হয়েছে ভূমিরেখার সঙ্গে।
কমপ্লেক্সের উত্তর-পূর্ব পাশ দিয়ে চলে যাওয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক থেকে দর্শনার্থী পথ দিয়ে পায়ে হেঁটে ভেতরে ঢুকলেই শুরুতে স্বাগত জানাতে রয়েছে এর প্রধান প্রবেশদ্বার। স্থানিক বৈশিষ্ট্যের বেশ চমৎকার প্রদর্শনী ফুটে উঠেছে এই প্রবেশদ্বারে। দুই পাশে লাল ইটের দেয়ালে নকশিকাঁথার আবহ আর তার মাঝে স্থানীয় বাঁশের পরিচ্ছেদ। বাঁশ দিয়ে জালিসদৃশ দেয়াল তৈরি করেছেন, যা একই সঙ্গে দৃশ্য সংযোগ তৈরি করছে আবার কৃষকের উঠোনে থাকা অকৃত্রিম উপাদানকে বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করছে। টেকসই, পরিবেশবান্ধব, সহজলভ্য ও স্থানীয় উপাদানের ব্যবহার এই প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। নির্দিষ্ট কিছু এলাকা ব্যতীত পুরো কমপ্লেক্সের কাঠামো ইটের দেয়ালে তৈরি। স্থানীয়ভাবে তৈরি ইটের অবিকল অবয়ব দৃশ্যমান। দেয়াল ও মেঝেতে ব্যবহার করা সিমেন্ট টাইলসও পুরোপুরি স্থানীয়ভাবে প্রস্তুতকৃত। বিভিন্ন পরিসরের বৈচিত্র্যকে ফুটিয়ে তুলতে টাইলসের অবস্থানভেদে নীলাভ, সবুজাভ ও ধূসর রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে।
ভিলেজ সুপার মার্কেটে সচেতনভাবে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এবং আরামদায়ক কর্মপরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। ভবনের প্রাথমিক বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে কোনোভাবেই বাতাসের চলাচল ব্যাহত না হয়। পূর্ব-পশ্চিমে প্রলম্বিত ভবন খোলামেলা গ্রামীণ বাতাসের মুক্ত প্রবাহে বিধৌত হয়ে থাকছে সব সময়। আড়তের দেয়াল এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন তা কোনোভাবেই পরিসরকে আবদ্ধ না করে। প্রতিটি পাশর্^দেয়ালে একই অবস্থানে বৃত্তাকার জানালা কমপ্লেক্সের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তকে নাটকীয়ভাবে সংযুক্ত করেছে। আড়ত ভবনের ওপরে তাঁবুর নান্দনিক ছাদ তৈরি করা হয়েছে, যা ভেতরে পর্যাপ্ত আলো প্রবেশের সুযোগ তৈরি করছে কিন্তু অব্যাহতি দিচ্ছে তাপ বৃদ্ধি থেকে।
সম্ভাবনার নতুন দুয়ার
একটি ভবন শুধুই একটি আকর্ষণীয় স্থাপত্যকর্ম নয় বরং এর বহুমুখী প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে। ভিলেজ সুপার মার্কেটের স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী সাড়া জাগিয়েছে। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি পত্রিকা ও সাময়িকীতে এ সম্পর্কিত নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি যাঁদের জন্য এ প্রকল্প, তাঁরাও সম্মানিত বোধ করছেন এমন একটি প্রকল্পের ব্যবহারকারী হিসেবে। তবে একটি স্থাপত্যকর্মের আসল সার্থকতা হচ্ছে সমাজ, অর্থনীতি ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে উপযোগিতা প্রমাণ করা। ব্যবহারকারীর জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এবং টেকসই কর্মপরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা তৈরি এর প্রধান শর্ত। ভিলেজ সুপার মার্কেট খুলনা অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। আমাদের বাস্তবতায় এটা সবার কাছে পরিষ্কার যে কৃষক কষ্ট করে ফসল ফলালেও প্রায় সময়ই বঞ্চিত হন। যুগ যুগ ধরে কৃষকের ফসল ফলানোর স্বপ্নগুলো হোঁচট খেয়েছে বাজারের কাছে এসে। মধ্যস্বত্বভোগীর দীর্ঘদৌরাত্ম্য আর বঞ্চনার এই পথে দাঁড়িয়ে সব সময় কৃষক চেয়েছেন একটি বাজার, যেখানে তাঁর সিদ্ধান্তের মূল্য থাকবে। ‘ভিলেজ সুপার মার্কেট’ কৃষকের বাজার। মার্কেটটি থেকে খুলনা ও সাতক্ষীরা এলাকার তৃণমূল কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে সরাসরি কৃষিপণ্য (ফলমূল, শাকসবজি, দুধ, মাছ ইত্যাদি) কিনে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সুপার শপে বিক্রির উদ্দেশ্য রয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসকল পণ্য বিদেশেও রপ্তানি করা হবে।
এই মার্কেটের মাধ্যমে সুবিধা পেতে যাচ্ছেন ২ হাজার ৫০০ জন প্রান্তিক চাষি। অত্যাধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রের মাধ্যমে কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ ও মান অক্ষুণ্ন রেখেই সারা দেশে পাঠাতে পারছে। প্রান্তিক চাষিরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান কৃষকদের থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহের জন্য উদ্যোগী হবে। ফলে কমবে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য। গ্রামীণ পণ্যের বাজারমূল্য থেকে কৃষকেরা অধিক লাভবান হবে। এই ভিলেজ সুপার মার্কেট মনিটরিং করেন বিভিন্ন এনজিওর প্রতিনিধি ও স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বরের সমন্বয়ে গঠিত ট্রাস্টি বোর্ড।
বাংলাদেশের কৃষিতে একক বা ক্ষুদ্র কৃষকের স্থলে যৌথ বা সাংগঠনিকভাবে একত্র হওয়া বৃহৎ কৃষকের সৃষ্টি হবে। ফলে তাঁরা যৌথভাবে একটি এলাকার কৃষির নিয়ন্ত্রণ ও উন্নতিতে ভূমিকা রাখবেন এবং যার অংশীদার হবেন তাঁরা নিজেরাই। পাশাপাশি কৃষকেরা নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আধুনিক পদ্ধতিতে স্বাস্থ্য সচেতন মানসম্মত চাষাবাদের উপযোগী হয়ে গড়ে উঠবে। ফলে প্রকৃতপক্ষে কৃষকেরাই লাভবান হবে এমন প্রত্যাশা করাই যায়। তাঁরা নিজেরাই নিজেদের ফসলের বীজ, উন্নত জাতের মাছের বীজ ও মাছ উৎপাদন করে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বাকিটা বিক্রি করতে পারবে।
অদুর ভবিষ্যতে কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা তৈরি হবে গ্রামীণ অঞ্চলেই। গ্রামীণ ফসল, ফল, সবজি এসব কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে। ফলে একদিকে পণ্যের পচন কমবে অপর দিকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বাড়বে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অবকাঠামো তৈরি হবে যা মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে। সারা বছরই পণ্য নিয়মিতভাবে মানুষের সীমানার মধ্যে থাকবে, ফলে দামের স্থিতিশীলতা তৈরি হবে। চাহিদা আর উৎপাদনের মধ্যে যে একটি দূরত্ব থাকে, কমে আসবে সেটাও যা জীবনযাপনকেও প্রভাবিত করবে। সমাজে বেকার সমস্যা কমে গেলে অপরাধ আর অনৈতিক কর্ম কমবে। শহর ও গ্রামের উন্নয়নের যে বৈষম্য, তা কমে যাবে। কৃষকের দোরগোড়ায় আধুনিক স্থাপত্য-সুবিধা ও প্রযুক্তির সেবা বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নকেই করবে ত্বরান্বিত।
একনজরে ভিলেজ সুপার মার্কেট-
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৫তম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৯