জনবান্ধব রেল খাতের আধুনিকায়নে

গণমানুষের যাতায়াতের সমস্যা সমাধানে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার রেল। দূর-দূরান্তে যেতে স্বল্প খরচে অধিকসংখ্যক মানুষ অনেকটা নির্বিঘ্নেই চলাচল করতে পারে এই অতিকায় যানবাহনে। বৈশি^ক যাতায়াতব্যবস্থায় ট্রেন তাই অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ সেবা গ্রহণ করে থাকে রাষ্ট্রীয় এ পরিবহনে। বিগত কয়েক বছর ধরে সড়কপথে অসহনীয় যানজট, বাসভাড়া বৃদ্ধি, যাত্রাপথে সময় বেশি লাগার পাশাপাশি নিত্যদিনের ভয়াবহ সব দুর্ঘটনাসহ নানা কারণে রেলপথ হয়ে উঠেছে অত্যন্ত জনপ্রিয় যোগাযোগমাধ্যম। কিন্তু সীমাহীন দুর্নীতি, সঠিক কর্মপরিকল্পনা, অতিরিক্ত যাত্রী চাপ, আধুনিকায়নের অভাবসহ নানা কারণে সেবামূলক এই খাতটি রয়েছে পিছিয়ে। রেলসেবা বৃদ্ধি ও যুগোপযোগী করতে গতি বৃদ্ধি, আধুনিকায়নসহ নানা উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও রেললাইনের বিভিন্ন ত্রুটির কারণে সম্প্রতি বেড়েছে রেল দুর্ঘটনা যা হাল সময়ের অন্যতম আলোচিত বিষয়। জনগুরুত্বপূর্ণ এই রেল খাতের সমস্যা, পিছিয়ে থাকার কারণ, বর্তমান হালচাল, দুর্ঘটনারোধে করণীয় ও উন্নয়ন সম্ভাবনা এবারের মূল রচনায়।

ফিরে দেখা

বাংলাদেশে রেলওয়ের যাত্রা শুরু ব্রিটিশ শাসনামলে, ১৮৬২ সালে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন রেল কোম্পানি ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে ছোট ছোট রেলপথ চালু করে। সে ধারাবাহিকতায় ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি প্রথম বাংলাদেশে রেলপথ স্থাপন করে। দর্শনা থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেলপথ স্থাপনের মাধ্যমে রেল যুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। পরে বিভিন্ন অঞ্চলকে আনা হয় রেলসেবার আওতায়। পরিচালনার সুবিধার্থে রেলওয়েকে দুটি অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়। যমুনা নদীর পূর্বে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিম পাশে পশ্চিমাঞ্চল। ১৯৮৫ সালে চালু হয় আন্তঃনগর রেলসেবা। মৈত্রী এক্সপ্রেস নামে ঢাকা-কলকাতার মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হয় ২০০৮ সালে। রেলসেবাকে আরও যুগোপযোগী ও কার্যকর করতে ২০১১ সালে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ভেঙে গঠিত হয় রেল মন্ত্রণালয়। বর্তমানে দেশে রেলপথের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৯৫৫ কিলোমিটার।

রেলওয়ের যত অসংগতি

বাংলাদেশে রেলব্যবস্থা দেড় শ বছরের অধিককাল পেরোলেও এখনো জর্জরিত বহুমুখী সমস্যায়। ধীরগতি, শিডিউল বিপর্যয়, দুর্ঘটনা যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। পাশর্^বর্তী দেশ ভারতসহ বিশে^র অনেক দেশ রেলযোগাযোগে ব্যাপক উন্নয়ন করলেও বাংলাদেশ পড়ে রয়েছে এখনো মান্ধাতা আমলে। বেশ কিছু ট্রেন ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ু (২০ বছর) শেষ হয়ে গেছে। এমনকি দ্বিগুণ সময়ও পেরিয়েছে। তা ছাড়া দেশে মিটারগেজ, ব্রডগেজ ও মিশ্রগেজÑ এ তিন ধরনের লাইন ব্যবস্থা থাকায় পাওয়া যাচ্ছে না কাক্সিক্ষত গতি ও সেবা। কারণ, প্রতিটি লাইনের কারিগরি দিক ভিন্ন। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ এ খাতে দুর্নীতি। রেলওয়ে পিছিয়ে থাকার আরও যেসব কারণ রয়েছে-

  • পুরোনো রেল ব্যবস্থাপনা
  • রেলওয়েতে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব
  • ভুল নীতি ও পরিচালনা পদ্ধতি
  • রেলপথ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা
  • স্টোর থেকে মালামাল চুরি ও অপর্যাপ্ততা
  • জনবলসংকট
  • দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতি
  • ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি
  • যাত্রী হয়রানি
  • ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ
  • নিরাপত্তাহীনতা (চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা)
  • অবৈধ লেভেল ক্রসিং
  • স্লিপার, নাট-বোল্ট ও পাথর চুরি
  • রেলপথের আশপাশে অবৈধ বসতি
  • পরিবহন ব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্র ও অন্যান্য।

রেল দুর্ঘটনার নেপথ্যে

দেশে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। সে তুলনায় রেল দুর্ঘটনা অনেকটাই কম। কিন্তু সম্প্রতি দেশে রেল দুর্ঘটনা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। এ বছরের জুন মাসে মৌলভীবাজারের কুলাউড়াতে রেলসেতু ভেঙে ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একটি ট্রেন। এতে চারজন নিহত ও তিন শতাধিক যাত্রী আহত হয়। এই ঘটনায় রেলনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তদন্তে উঠে আসে রেললাইনের নানা ত্রুটিসহ ভয়াবহ কিছু অসংগতি। চাপের মুখে ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতুসহ লাইনের নানা অংশ করা হয় সংস্কার। তা সত্ত্বে¡ও কয়েক দিন পরেই একই লাইনে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়ে ঘটে আরও বেশ কটি দুর্ঘটনা। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দুর্ঘটনার সংখ্যা দাঁড়ায় ৫-এ। এমন চিত্র শুধু ঢাকা-সিলেট রুটেই নয়, বরং সারা দেশেই। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে চলতি (২০১৯) বছরের জুন মাস পর্যন্ত দেশে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে ৮৬৮টি। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১১১ জন, আহত হয়েছেন অগণিত। এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা। প্রকৃতপক্ষে রেল বিভাগ নতুন প্রকল্পের প্রতি মনোযোগী হলেও পুরোনো লাইন রক্ষণাবেক্ষণে নিদারুণ অবহেলা লক্ষণীয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রেললাইনকে সব সময় নজরদারিতে রাখতে হয়। কোনো ত্রুটি দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে তা সারিয়ে তোলা বাঞ্ছনীয়। কারণ, একটি ট্রেনের সম্পূর্ণ ওজন ন্যস্ত থাকে চাকায়। সেখান থেকে এই ভার পড়ে রেললাইনের নিচে থাকা স্লিপারে। ট্রেনের সঙ্গে স্লিপারের ভারসাম্য রাখতে রেললাইনে পাথর বা ব্যালাসড বসানো হয়। ট্রেন চলাচলে প্রতিবছর ১০ শতাংশ পাথর মাটির সঙ্গে মিশে যায়। তখন ওই লাইনে নতুন করে পাথর স্থাপন করতে হয়। আবার অনেক জায়গায় স্লিপার, নাট-বোল্ট ও পাথর চুরি হয়। এগুলো তাৎক্ষণিকভাবে পুনঃস্থাপন না করলে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ায়। রেল দুর্ঘটনার মূলে রয়েছে-

  • রেললাইনে ত্রুটি
  • পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতু
  • রেললাইন নিয়মিতভাবে দেখভাল না করা
  • স্লিপার, পাথর, নাট-বোল্ট না থাকা
  • ধারণক্ষমতার অধিক যাত্রী পরিবহন
  • অবৈধ ক্রসিং
  • রেললাইনের ওপর দিয়ে অসচেতনতভাবে মানুষের চলাচল
  • ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে হতাহতের ঘটনা
  • ভুল সিগন্যালের ফলে দুই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ।

দুর্ঘটনা রোধে করণীয়

যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা রোধে রেলওয়ের আইনে রেল চলাচলের জন্য পূর্ণ দিকনির্দেশনা রয়েছে। সব ধরনের নিরাপত্তার জন্য রেলওয়ের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীও (রেল পুলিশ) রয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে রেললাইনের আশপাশে কোনো ধরনের অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলা যাবে না। দুই পাশে অন্তত ১০ ফুট করে জায়গা খালি রাখতে হবে। অথচ সেটা কাগজ-কলমেই। সাধারণত শহরের মধ্যে বাজার, বস্তি ও অন্যান্য অবকাঠামো রেললাইনের দুপাশে হরহামেশাই চোখে পড়ে। এ ছাড়া দেশব্যাপী গড়ে উঠেছে অসংখ্য বৈধ-অবৈধ রেলক্রসিং। বুয়েটের এআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, রেল দুর্ঘটনায় যত প্রাণহানি হয় তার ৮৯ শতাংশই ঘটে ক্রসিংয়ে। বাস বা অন্য যানের সঙ্গে সংঘর্ষে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। ক্রসিংয়ে নিরাপত্তার বিষয়টি একেবারেই অবহেলিত। রেল দুর্ঘটনা রোধে পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে রয়েছে কতিপয় সুপারিশ। এগুলোর মধ্যে অন্যতম- 

  • শহর ও শহরের বাইরের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভিন্ন ভিন্নভাবে গ্রহণ করতে হবে।
  • সড়ক থেকে রেলপথ হতে হবে আলাদা।
  • রেলক্রসিংয়ে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে উড়াল রেলপথ নির্মাণ করা যেতে পারে।
  • ক্রসিংয়ে গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
  • নিয়মিত তদারকি করতে হবে। 
  • পুরোনো রেললাইন যথাযথভাবে সংস্কার করতে হবে।
  • অতিরিক্ত যাত্রী বা পণ্য পরিবহন করা যাবে না।
  • আধুনিক ও প্রযুক্তিসম্পন্ন সিগন্যাল সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে।
  • ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রেললাইনের দুই পাশে বেষ্টনী নির্মাণ করা যেতে পারে।
  • রেললাইনের সীমানার মধ্যে জনসাধারণ এমনকি গবাদিপশু যেন আসতে না পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। 

ট্রেনের ধীরগতি

বাংলাদেশ রেলওয়ে বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখনো গতিশীল হয়ে উঠতে পারেনি। এখন চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। রেলওয়ের হিসাব মতে, ব্রডগেজ লাইনে সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার এবং মিটারগেজে ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ঘণ্টায় চলাচলের গতি নির্ধারিত করা রেলপথ কর্তৃপক্ষের। কিন্তু ঘন ঘন বৈধ-অবৈধ লেভেল ক্রসিং, ত্রুটিপূর্ণ রেললাইন ও সেতুর কারণে ৬০ থেকে ৬৫ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলতে পারছে না ট্রেন। ঢাকার মধ্যে এই গতি দাঁড়ায় ২৫-৩০ কিলোমিটার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬ সালে রেলওয়ে মাস্টারপ্ল্যানের নথির ভিত্তিতে ‘রেল কানেকটিভিটি ইন বাংলাদেশ: প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার’ শীর্ষক এক গবেষণায় প্রকাশ পায়, রেলের গড় গতি ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটারের নিচে। তবে রেল মন্ত্রণালয়ের কতিপয় পদক্ষেপের ফলে বর্তমানে এই গতি কিছুটা বেড়েছে। বিশেষ করে সোনার বাংলা, সুবর্ণ ও বনলতা এক্সপ্রেস বিরতিহীনভাবে ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার গতিতে চলছে। এ ছাড়া মহানগর গোধূলি, সুন্দরবন, চিত্রা, সিল্কসিটিসহ আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর গতিও বেড়েছে আগের তুলনায়। তবে বিশে^র অন্যান্য দেশের তুলনায় এই গতি নিতান্তই কম। পার্শ্ববর্তী ভারতে যাত্রীবাহী ট্রেনের গড় গতি ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার।

দ্রুতগতির রেল

বিশে^র অধিকাংশ উন্নত দেশের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ট্রেন। অত্যন্ত দ্রুতগতির এসব ট্রেনে শত শত কিলোমিটার পথ খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যেই পাড়ি দেওয়া যায়। দ্রুতগতির রেল (High-speed rail) সাধারণত কমপক্ষে ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার বা ১৫৫ মাইল গতিতে চলে। পুরোনো লাইনে প্রতি ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার বা ১২০ মাইল গতিতে চললেও সেগুলোকেও উচ্চগতির রেল বলে গণ্য করা হয়। তবে অনেক দেশেই এই গতি এখনো নিম্নগতি বলে বিবেচিত। প্রকৃতপক্ষে সর্বনিম্ন কোনো গতিকে চললে উচ্চগতির রেল বলা হবে তার কোনো বিশ্বজনীন মান নেই। প্রথম উচ্চগতির রেল ১৯৬৪ সালে জাপানে চলাচল শুরু, যা ‘বুলেট ট্রেন’ নামে পরিচিত। গতিবেগ বর্তমানে ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার। পরবর্তী সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ প্রধান শহরগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে উচ্চগতির রেল তৈরি করেছে। চীনের রেলট্রাকগুলো ২৫০-৩৫০ কিলোমিটার বেগে চলতে সক্ষম। বর্তমানে চীনে ২২ হাজার কিলোমিটারের বেশি উচ্চগতির রেলপথ রয়েছে। ভারত উচ্চগতির রেলব্যবস্থা চালুর জন্য জাপানকে চুক্তি দেওয়া হয়েছিল। ২০২২ সালে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই লাইনে ট্রেনের গতিবেগ হবে ৩২০ কিলোমিটার/ঘণ্টা। বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে দ্রুতগামী ট্রেন গতিমান এক্সপ্রেস (সর্বোচ্চ গতিবেগ-১৬০ কিলোমিটার/ঘণ্টা) যা উচ্চগতির ট্রেনের শ্রেণিতে নেই, যদিও ট্রেনের ইঞ্জিনটি তাত্ত্বিকভাবে ২০০ কিলোমিটার/ঘণ্টার গতি অতিক্রম করতে সক্ষম।

ক্রমিকগতি (কি.মি)দেশউদ্বোধন কাল
৬০৩জাপান২০১৫
৫৯০জাপান২০১৫
৫৮১জাপান২০০৩
৫৭৪.৮ফ্রান্স২০০৭
৫৫২জাপান১৯৯৯
৫৫০জাপান১৯৯৭
৫১৭জাপান১৯৭৯
৫১৫.৩ফ্রান্স১৯৯০
৫০৪জাপান১৯৭৯
১০৫০১চীন২০০৩

উল্লেখিত এসব ট্রেন পরিচালিত হয় বিদ্যুৎ অথবা চৌম্বক শক্তিতে। তবে জ¦ালানিভিত্তিক ট্রেনের মধ্যে গতির দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে-

ক্রমিকগতি (কি.মি)দেশউদ্বোধন কাল
২৭৫যুক্তরাষ্ট্র১৯৬৭
২৩০স্পেন১৯৭৪
২১৫জার্মানি১৯৩৯

দেশীয় রেলের ধীরগতির নেপথ্যে

রেল চলাচলে ধীরগতির কারণে গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগছে অনেক বেশি। এতে রেলের ওপর মানুষের আস্থা কমছে। অনেকটা নিরূপায় হয়েই মানুষ যাতায়াত করছে রেলে। সম্প্রতি সময়ে গতি বাড়লেও তা প্রত্যাশিত নয়। রেলের ধীরগতির নেপথ্যে রয়েছে- 

  • অতিরিক্ত লেভেল ক্রসিং
  • রেললাইনে ত্রুটি
  • ব্রডগেজ লাইনের স্বল্পতা ও মিশ্র রেলট্রাকব্যবস্থা
  • ধারণক্ষমতার অধিক যাত্রী পরিবহন
  • মেয়াদোত্তীর্ণ ও আয়ুষ্কাল শেষ হওয়া ইঞ্জিন

রেললাইনের পাথর, স্লিপার, নাট-বোল্ট প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকা

  • পুরোনো রেলসেতু
  • রেললাইনের ওপর দিয়ে মানুষের চলাচল
  • দুই পাশে অবৈধ স্থাপনা ও বাজার
  • বিভিন্ন স্থানে পাথর নিক্ষেপ
  • ভারী বৃষ্টিতে রেললাইনে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা
  • জলাবদ্ধতার ফলে মাটি নরম হয়ে রেললাইন বসে যাওয়ার আশঙ্কা
  • বিভিন্ন পয়েন্টের পথ বক্রাকার হওয়ার পাশাপাশি লুপ লাইন
  • ডাবল লাইন থেকে সিঙ্গেল লাইনে প্রবেশের মুখে গতি নিয়ন্ত্রক
  • রুটের অধিকাংশ অংশে কম্পিউটার বেইজড ইন্টারলকিং না থাকা প্রভৃতি।

ট্রেনের গতি বাড়াতে করণীয়

প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে রেলের গতি। কিন্তু ৭০ থেকে ৯০ কিলোমিটার গতিতে চলা ট্রেনব্যবস্থা থেকে ২০০ থেকে ৫০০ কিলোমিটারের অধিক গতিতে রূপান্তর কোনো সহজ বিষয় নয়। আর কঠিন এ কাজটি করা বিশেষ করে সাধারণ গতির রেললাইনে দ্রুতগতির ট্রেনব্যবস্থা চালু প্রকৌশলীদের জন্য ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। দ্রুতগতির ট্রেনের জন্য সাধারণত নতুন ট্রাক বসানো হয়। তবে কিছু পুরোনো লাইন সংস্কার ও উপযোগী করেও কাজ চালানো হয়। দেখা দেয় নানা প্রতিবদ্ধকতা। রেললাইনের আশপাশের মানুষজন এই গতিতে অভ্যস্ত না হওয়ার কারণে নানা রকম আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটেছিল। রেলের লাইনচ্যুতি, একক লাইনে মুখোমুখি সংঘর্ষ, সড়কপথের সংযোগস্থলে সংঘর্ষও ছিল নিত্যঘটনা। যদিও সচেতনতা বৃদ্ধি ও কার্যকর পদক্ষেপের জন্য তা খুব দ্রুতই কমে আসে। সম্প্রতি রেল মন্ত্রণালয় থেকে রেলের গতি বাড়াতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা দিচ্ছেন। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রত্যাশিত গতি অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। রেলের গতি বাড়াতে বা দ্রুতগতির রেলব্যবস্থা চালু করতে যা যা প্রয়োজন-

  • আধুনিক ব্রডগেজ লাইন স্থাপন
  • রেললাইনে দীর্ঘস্থায়ী, অধিক শক এবং কম্পন সহ্যকারী স্টিল রিইনফোর্সড কংক্রিট স্লিপার স্থাপন
  • সব ট্রেনকে বিদ্যুতায়নের আওতায় আনা
  • বড় ব্যাসার্ধের বাঁক সংযোজন
  • রেলক্রসিংয়ে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা
  • আধুনিক ও প্রযুক্তিসম্পন্ন সিগন্যাল সিস্টেম গড়ে তোলা
  • ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রেললাইনের দুই পাশে বেষ্টনী নির্মাণ করা
  • কম্পিউটার বেইজড ইন্টারলকিং সিস্টেম চালু করা প্রভৃতি
  • রেললাইনের সীমানার মধ্যে জনসাধারণ এমনকি গবাদিপশু যেন আসতে না পারে সে ব্যবস্থা নেওয়া।

উন্নয়নে গৃহীত যত প্রকল্প

বিগত কয়েক বছর ধরে সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর অন্যতম রেল। রেলের উন্নয়নে ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প চলমান। রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে নেওয়া হয়েছে নানান প্রকল্প। ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আনা হচ্ছে (কিছু আনা হয়েছে) ১৪০ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম দ্রুতগতির রেল কোচ। সম্প্রসারণ করা হচ্ছে রেলের পরিসর। এ ছাড়া আধুনিক রেলব্যবস্থা গড়ে তুলতে নেওয়া হচ্ছে নানা ধরনের পদক্ষেপ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হাইস্পিড ট্রেন চালু ও ট্র্যাক স্থাপন
  • মিটারগেজ বদলে ব্রডগেজ স্থাপন
  • ট্রেনের গতি বাড়াতে বিভিন্ন রুটে চার লেন স্থাপন
  • প্রথমবারের মতো আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন লিঙ্কে হফম্যান বুশ (Linke Hofmann Busch) ব্রডগেজ কোচ সংযোজন
  • রেললাইনের দুপাশে বস্তি, মার্কেটসহ সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ
  • মানুষের চলাচল বন্ধে রেললাইনের দুপাশে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ
  • ক্রসিং ও জনসাধারণের চলাচল সুবিধার্থে ঢাকার মধ্যে রেললাইন সংলগ্ন ১০টি এলাকায় ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ
  • রাজধানীর যানজট কমাতে শহরের চারপাশে বৃত্তাকার রেললাইন স্থাপন
  • রেল কোচে ওয়াই-ফাই সংযোগ প্রভৃতি।

রেল খাত উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র

রেলের উন্নয়নে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ সত্ত্বেও রেলের উন্নয়ন প্রতাশিত নয়। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ৫৪ হাজার ২০১ কোটি টাকা। অবকাঠামো খাতে অত্যধিক ব্যয় সত্ত্বেও শুধু প্রকল্প পরিকল্পনা সুষম না হওয়ায় কাক্সিক্ষত ফল মিলছে না বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এত বিনিয়োগ সত্ত্বেও বাড়ছে না সেবা; বাড়ছে লোকসান। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আধুনিক রেলকোচ কিনলেই হবে না, অত্যাধুনিক ইঞ্জিন ও সে অনুযায়ী রেল ট্রাকও স্থাপন করতে হবে। রেলের জন্য যেসব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, তার সবই অবকাঠামোগত উন্নয়ন। তবে গতি বাড়াতে প্রয়োজন পরিচালনাগত উন্নয়ন। বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে না। অথচ রেলকে জনপ্রিয় করে তুলতে এটিকে আগে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। তা ছাড়া পরিচালনগত উন্নয়নের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয়ও তুলনামূলক কম। এ ছাড়া রেল খাতে লাভের মুখ দেখতে কার্যকর প্রকল্প নেওয়া হয়নি। অথচ রেলখাতে রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা। রেলের আয় ও সেবা বাড়াতে যেসব পদক্ষেপ প্রয়োজন সেগুলো হচ্ছে-

  • রেলের সংখ্যা বাড়ানো।
  • গতি বৃদ্ধি করা ও দ্রুতগতির ট্রেনব্যবস্থা চালু করা।
  • শিডিউল বিপর্যয় রোধ এবং সময়সীমা মেনে ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা করা।
  • শুধু যাত্রী পরিবহন করে আয় বাড়ানো সম্ভব নয়। এ জন্য পণ্য পরিবহন ব্যাপক হারে বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে সবাই যেন রেলে মালামাল পরিবহনে উৎসাহী হয় সে জন্য কিছু সুবিধা প্রদান করতে হবে।
  • দুর্র্নীতি কঠোরভাবে দমনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।

দেশে রেল খাত উন্নয়নে বিনিয়োগকৃত অর্থের সিংহভাগের জোগান এসেছে বিদেশি ঋণ সহায়তায়। এগুলো সুদে-আসলে ফেরত দিতে হবে। যখন ঋণের কিস্তি বেড়ে যাবে, তখন দেখা যাবে রেলের আয়ের চেয়ে ঋণের কিস্তির পরিমাণ বেশি। বিগত কয়েক বছরে রেলের ভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি বাড়লেও, বাড়েনি কাক্সিক্ষত সেবা। রেলব্যবস্থাকে গতিশীল, আধুনিক, দুর্ঘটনা ও ঝামেলামুক্ত করতে না পারলে খাতটি মানুষের আস্থা হারাবে। আর তা রেল খাত তথা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেই ব্যহত করবে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১২তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৯।

আশিক মাহমুদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top