ঢাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণে…

এপ্রিল-মে মাসের তীব্র দাবদাহ থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি মেলে জুনে। অর্থাৎ জুন মাসে এ দেশে শুরু হয় আষাঢ়ে বৃষ্টি। ঋতুবৈচিত্র্যের কারণে অন্তত তেমনটাই হওয়ার কথা। কিন্তু গত কয়েক বছর বৃষ্টির আগমনকাল পিছিয়েছে অন্তত এক মাস। মানে আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে এ দেশে বর্ষা আসছে দেরিতে। বর্ষার এমন বিলম্বিত আগমনে গরমের যন্ত্রণা পোহাতে হচ্ছে খানিকটা বাড়তি সময় ধরে। তবে দেরিতে হলেও বৃষ্টি যেমন আসবে, তেমনি বাড়বে নগরবাসীর চিরায়ত বিড়ম্বনা জলজট ও জলাবদ্ধতার সমস্যা। বছরের পর বছর রাজধানীর বাসিন্দাদের পোহাতে হচ্ছে উটকো এই ঝামেলা। স্বল্প বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার নেওয়া বহুমূল্যের নানা প্রকল্পের মাধ্যমেও পাওয়া যাচ্ছে না কোনো সফলতা। জলজট ও জলাবদ্ধতা সমস্যার নেপথ্য কারণ ও সমাধানে করণীয় নিয়ে বন্ধন-এর এ আয়োজন।

যে কারণে নগরে জলাবদ্ধতা

ধলেশ্বরী-শীতলক্ষ্যা-বুড়িগঙ্গা-বালু-তুরাগ নদী পরিবেষ্টিত ঢাকাকে এককালে বলা হতো অন্তর্দ্বীপ। ঢাকার ওপর দিয়ে প্রবহমান ছিল অসংখ্য উপনদী ও খাল; ছিল অবারিত জলাধার। যেমন, ধোলাই খাল বুড়িগঙ্গা নদী ও মতিঝিল-রামপুরা হয়ে বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। পান্ডু নামে আরেকটি নদী ছিল, যা আরামবাগ-সেগুনবাগিচা খাল, রমনা-বেগুনবাড়ী ও পরিবাগ খাল দিয়ে এটি ধানমন্ডি-কলাবাগান-তেজগাঁও খালের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তেজগাঁও-বেগুনবাড়ী খাল ও হাতিরঝিলের সঙ্গে ভোলা খালের শাখা-প্রশাখার মাধ্যমে শাহজাদপুর-কুড়িল এলাকার বিস্তীর্ণ জলাভূমি দিয়ে বোয়ালিয়া খাল হয়ে বালু নদীর সংযোগ ছিল। এসব উপনদী ও খাল দিয়ে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় বৃষ্টির পানি, পয়ো ও বর্জ্য পানিনিষ্কাশন হতো। অথচ যুগে যুগে প্রায় সব উপনদী, খাল, জলাধার ও নিচু জমি ভরাট ও বেদখল করে গড়ে তোলা হয়েছে সড়ক, আবাসন ও অন্যান্য অবকাঠামো। এসব কখনো হয়েছে সরকারি পরিকল্পনায়, কখনো ভূমিদস্যুদের মাধ্যমে। যেমন, পাকিস্তান আমলে ধানক্ষেত ও নিচুজমিতে ‘ধানমন্ডি’ আবাসিক এলাকার পরিকল্পনা করা হয়। একইভাবে ভোলা খালের উপকণ্ঠে গুলশান-বনানী মডেল টাউন প্রতিষ্ঠা করা হয়। সব শেষে যোগ হয়েছে রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্প। এছাড়াও নগরের পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব দিকে ছিল বিস্তীর্ণ নিচুভূমি, খাল ও জলাশয় যেগুলো ভরাট করে বিভিন্ন সময়ে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত আবাসন প্রকল্প। ফলে নগরের পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা হয়েছে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত।

সময়ের পরিক্রমায় অপরিকল্পিত উন্নয়নের নামে অধিকাংশ খালের অস্তিত্ব যেমন বিলীন অবশিষ্টগুলোর অবস্থাও সংকটাপন্ন। দখল ও ভরাট ছাড়াও চওড়া ও গভীর খালগুলোকে পরিণত করা হয়েছে কংক্রিটের ড্রেনে। ঢাকা সিটি করপোরেশন মূল সড়কের নিচ দিয়ে ওয়াসার প্রবহমান পাইপের বাইরে ফুটপাতের তলা বা তার পেছন দিয়ে আরেকটি সারফেস ড্রেন বা খোলা ড্রেন তৈরি করেছে। ১ হাজার ৫২৮ কিলোমিটারের রাজধানীতে পানিনিষ্কাশন নালা বা ড্রেন রয়েছে মাত্র ২৬৪ কিলোমিটার (বর্তমানে এই আয়তন কিছুটা বাড়তে পারে)। খালগুলো সরু নালায় পরিণত করায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাষিত হয়ে জমা হওয়ার জায়গা পাচ্ছে না। ড্রেনসমূহ ঘণ্টায় মাত্র ১০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি ধারণে সক্ষম। ময়লা জমে এই ধারণক্ষমতা আরও কমে যায়। অথচ ঢাকায় বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি হয় সর্বোচ্চ ৮৫ মিলিমিটার। শহরে যতটুকু ড্রেনেজ ব্যবস্থা আছে, সেটা পরিপূর্ণভাবে কাজ করছে না। ফলে বর্ষাকালে খুব সহজেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

প্রতিবছর লাখো কোটি টাকা বাজেটে বরাদ্দ থাকলেও জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো বাস্তব সমাধান মেলেনি। এখনো উপযোগী ও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। যদিও উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়রের চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না, তা সত্ত্বেও কোনোভাবেই মুক্তি মিলছে না ফিবছরের এই বিড়ম্বনা থেকে। খাল ও জলাধার কমে যাওয়া ছাড়াও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। এ ছাড়া ডিসিসির পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়মিত রাস্তা ও পানি পরিবহনকারী ড্রেন বা নালা পরিষ্কার করে রাখার দায়িত্ব থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা লক্ষণীয় নয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাস্তা ও ড্রেন পরিষ্কার করলেও ড্রেনের আবর্জনা রাস্তা বা ড্রেনের পাশে স্তূপ করে রেখে দেয়, যা বৃষ্টির পানির সঙ্গে আবারও ড্রেনে গিয়ে মিশে। এতে পানি চলাচলের রাস্তা বন্ধ বা সংকীর্ণ হয়ে পড়ায় বৃষ্টির পানি সহজে সরে যেতে না পারায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। এ ছাড়া বিভিন্ন কারণ রয়েছে জলাবদ্ধতার নেপথ্যে। যার মধ্যে অন্যতম-

  • অপরিকল্পিত নগরায়ণ।
  • ঢাকার নদী-খাল-ডোবা-পুকুর-জলাশয় ভরাট করে অবকাঠামো নির্মাণ।
  • অবশিষ্ট নদী-খাল পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া।
  • পানি পরিবহনকারী ড্রেনের সঠিক ও উপযুক্ত নকশার অভাব।
  • পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ পাম্পের অভাব।
  • স্থাপনা, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ ও কংক্রিটে শহরের উন্মুক্ত স্থান ঢেকে ফেলায় ভূগর্ভে বৃষ্টির পানি প্রবেশে বাধা।
  • ডিসিসি কর্তৃক নিয়োজিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা।
  • জনসচেতনতার অভাবে ড্রেনসহ যত্রতত্র ময়লা ফেলা।
  • নগরের বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে বর্ষা মৌসুমে খোঁড়াখুঁড়ি।
  • পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত অবকাঠামোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব।
  • লেকগুলো নিয়মিত খনন করে পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা না থাকা।
  • স্বতন্ত্র ড্রেনেজ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা।
  • অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট পানি বেরোনোর স্লুইসগেটের অধিকাংশই অকেজো হয়ে পড়া।
  • বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে রেইন হার্ভেস্টিং-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তির প্রতি গুরুত্বারোপ না করা। 

প্রতিকারে যা করণীয়

রাজধানীর জলাবদ্ধতা নির্মূল অত্যন্ত কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। আর এজন্য নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। সবচেয়ে বড় কথা বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি যেন দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে সে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য খাল উদ্ধার ও খনন, ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কার, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কারসহ অন্যান্য অবকাঠামোও উন্নত করতে হবে। তবে সবকিছুই হতে হবে রাজধানীর সব সংস্থার সমন¦য়ের ভিত্তিতে। কারণ, নগরে উন্নয়নকাজের মধ্যে কোনো ধরনের সমন্বয় নেই। ড্রেনেজ ব্যবস্থায় কাজ করে সিটি করপোরেশন। একই কাজ করে ঢাকা ওয়াসা। রাজউকও করে। করে ওয়াটার বোর্ডও। এ রকম আরও অনেক সরকারি সংস্থা আছে, যারা একই কাজের সঙ্গে যুক্ত। আর এ ধরনের সমন্বয়হীনতা আমাদের সমগ্র ব্যবস্থাপনাকেই দুর্বল করে তুলছে। বছরের পর বছর চলে আসা অনিয়ম আর বিশাল জনসংখ্যার এ নগরীতে জলাবদ্ধতা দূর করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। আর তা সঠিকভাবে বাস্তবায়নে যে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন-

পরিকল্পিত নগরায়ণ

রাজধানীতে গড়ে ওঠা অধিকাংশ অবকাঠামোই গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। এখনো ঢাকার মধ্যে ও আশপাশে যেসব উন্নয়ন হচ্ছে তাতে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) নকশা সঠিকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে প্রথমে সম্পূর্ণ এরিয়ার পয়ো ও পানিনিষ্কাশনব্যবস্থার সুপরিকল্পিত নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করে নগর বিস্তারের অনুমোদন বা ছাড়পত্র দিতে হবে। এ ছাড়া ওসব স্থানে পানিনিষ্কাশনের জন্য জলাশয় সংরক্ষণ করা হচ্ছে কি না সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।

আধুনিক ও পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা

ড্রেনেজ ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো যখন বৃষ্টি হবে তখন যত দ্রুত সম্ভব তা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। আধুনিক ও সঠিক ড্রেনেজ ব্যবস্থাই পারে কাজটি সঠিকভাবে করতে। এ জন্য ড্রেন ডিজাইনে গুরুত্ব দিতে হবে। যেহেতু প্রয়োজনের তুলনায় ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা অপ্রতুল, সেহেতু নতুন ড্রেন তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া এসব ড্রেনে যেন কঠিন বর্জ্য প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে সহজেই যেন পরিষ্কার করা যায়, সে জন্য পর্যাপ্ত ম্যানহোল রাখতে হবে। উল্লেখ্য, ঢাকার খালগুলোকে বক্স কালভার্টে পরিণত করে পানি ও বর্জ্য নিষ্কাশনব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। অথচ খালের সঙ্গে বক্স কালভার্টের পার্থক্য হলো, খালের একটা প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ আছে; রয়েছে ইকো সিস্টেমও। খালের তলা অনাবৃত বিধায় পানি মাটির গভীরেও প্রবেশ করবে। বক্স কালভার্ট করতে গিয়ে খালের প্রস্থ কমিয়ে ফেলা হয়েছে। কংক্রিট দিয়ে ঢালাই করে খালের তলদেশটা সিল করে দেওয়া হয়েছে। পানি আর এখন মাটির নিচে প্রবেশ করতে পারে না। এ ছাড়া অনবরত কঠিন বর্জ্য এতে প্রবেশ করে সুয়েজ পচন ক্রিয়ার মাধ্যমে তলায় জমায় তা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে গেছে। এতে বক্স কালভার্ট হয়ে পড়েছে একেবারে সংকুচিত। ফলে বক্স কালভার্ট হারিয়েছে পানিপ্রবাহের সক্ষমতা। এভাবে ঢাকা শহরে বক্স কালভার্ট ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে একেবারে ধ্বংসের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্বের অনেক শহরের পাইপ ড্রেনেজ ব্যবস্থা বদলে প্রাকৃতিক কাঁচা ড্রেন করার পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ। আমাদেরও উচিত এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া।

খাল-জলাশয় পুনর্খনন, পুনরুদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণ

আগে ঢাকায় মোট খাল ছিল ৪৭টি, যার মধ্যে ১২-১৩টি খাল কোনো রকমে এখনো তাদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। ফলে জলাবদ্ধতার সমস্যা হয়েছে প্রকট। সম্প্রতি ঢাকার নদীতীরের অবৈধ দখল উচ্ছেদে সরকার যেমন সচেষ্ট, তেমনিভাবেই সব খাল ও জলাধার দখলমুক্ত করে পুনরায় উদ্ধার করতে হবে। এ ছাড়া অবশিষ্ট খালগুলোকে পুনরায় খনন করে তাদের স্বাভাবিক নাব্যতা ও পানি ধারণক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি খুব সহজেই খালগুলো বেয়ে নামতে পারে। এসব খাল যেন কেউ দখল করতে না পারে সে জন্যও পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম জলাধার সৃষ্টি

রাজধানীতে অসংখ্য খালের পাশাপাশি ছিল বিস্তীর্ণ জলাভূমি, ডোবা-নালা ও পুকুর। এসবই হয়েছে অপরিকল্পিত উন্নয়নের বলি। যদিও এখন জলাধার; পুকুর পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তবে ঢাকার আশপাশে যেসব স্থান এখনো উন্মুক্ত রয়েছে, সেসব স্থানে লেক (হাতিরঝিলের আদলে), জলাধার, পুকুর খনন করা যেতে পারে। এ ছাড়া বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণে ভূগর্ভস্থ ওয়াটার রিজারভার গড়ে তোলা যেতে পারে। উল্লেখ্য, বন্যার পানি যেন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য জাপান নির্মাণ করেছে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ডিসচার্জ চ্যানেল’ যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২০০ ঘনমিটার পানি নিষ্কাশন করতে পারে। এই ট্যানেলটি ভূমির উপরিভাগ থেকে প্রায় ৫০ মিটার গভীরে নির্মিত, যা প্রায় ৬ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ।

বর্ষা মৌসুমে বন্ধ করতে হবে খোঁড়াখুঁড়ি

বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই শুরু হয় খোঁড়াখুঁড়ি। এ কাজের সঙ্গে অনেক সংস্থা জড়িত থাকলেও কারও মধ্যে নেই কোনো সমন¦য়। তা ছাড়া সঠিক পদ্ধতিতে খোঁড়াখুঁড়ি না করলে আশপাশের বেশ কিছু স্থানের ড্রেনেজ ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে। জোড়াতালি মার্কা কাজ করার ফলে প্রতিবছরই কিছু নির্দিষ্ট স্থানে ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য খোঁড়াখুঁড়ি বা সংস্কারকাজ করতে হয়। তা ছাড়া অদক্ষ জনবল দিয়ে ড্রেনেজ ব্যবস্থার নির্মাণকাজ সম্পন্ন করায় সম্পূর্ণ ড্রেনেজ সিস্টেম তার ক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করতে না পারায় বৃষ্টির পানি সরাতে দীর্ঘ সময় লাগে। এতে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। নগরের পানিনিষ্কাশন বা পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার সংস্কার বা নির্মাণ করার প্রয়োজন হলে আগে থেকেই কর্মপরিকল্পনা ঠিক করে বর্ষা মৌসুমের অনেক আগেই কাজ শুরু করা উচিত।

ডিসিসি বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থাপনা

নগরে প্রতিদিন যে পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়, তা সংগ্রহের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই ডিসিসির। অসংগৃহীত এসব বর্জ্য বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনে মিশে পানিনিষ্কাশনব্যবস্থাকে ব্যাহত করে চরমভাবে। ফলে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। আর তাই জলাবদ্ধতা নিরসনে নিয়মিত ময়লা সংগ্রহ, ড্রেন পরিষ্কার এবং পরিষ্কারকৃত বর্জ্য যেন সড়কে ফেলে না রাখা হয় সে ব্যাপারে ডিসিসির পক্ষ থেকে সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে আরও কিছু সুপারিশ

  • ঢাকা ও এর আশপাশের নদীনালা, খাল-বিল, পুকুরসহ সব ধরনের জলাশয় রক্ষা ও পুনরুদ্ধারে প্রচলিত আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করে দোষী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা সংশোধন ও তার বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • খাল ও নদীর মধ্যে সৃষ্ট বাধা দূর করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
  • ডিসিসি ও ওয়াসার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
  • খাল, নদীসহ সব জলাশয়ে ময়লা ও আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত রাখতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ঢাকার চারদিকের নদীগুলোর বেদখল হওয়া জায়গা উদ্ধার ও ড্রেজিং করে বৃত্তাকার নৌপথটি সক্রিয় করতে হবে।
  • নগর অভ্যন্তরে হাতিরঝিলের মতো আরও অনেক জলাধার সৃষ্টি করতে হবে।
  • বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহারে ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং’-এর মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে প্রতিটি ভবনে। প্রয়োজনে তা রাজধানীর ভবনসমূহের জন্য বাধ্যতামূলক করতে হবে। 

দিন দিন যেমন রাজধানীর জনসংখ্যা বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে এর পরিধি। অধিকাংশ স্থানেই কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই যত্রতত্র গড়ে উঠছে অবকাঠামো। তবে সবচেয়ে অবহেলিত থাকছে ড্রেনেজ বা বৃষ্টির পানি নির্গমনব্যবস্থা। এতে নগরবাসীর দুর্ভোগ কমছে না বরং বাড়ছে। প্রতিবছরের জন দুর্ভোগ কমাতে উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানে দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে আধুনিক বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১২তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৯।

মঈন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top