সিমেন্ট কংক্রিট রোড
মজবুত ও টেকসই রাস্তা তৈরির জন্য ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডম রোডের পরেই সিমেন্ট কংক্রিট রোডের অবস্থান। প্রকৃতিস্থ মাটি কেটে কিংবা ভরাট করে মেকানিক্যাল পদ্ধতিতে কম্প্যাকশন করার মাধ্যমে শক্ত একটি সাব-গ্রেড তৈরি করার পর তার ওপর পর্যায়ক্রমিকভাবে সাব-বেইজ/বেইজ তৈরি করা হয়। এরপর সিমেন্ট, বালু ও খোয়ার মিশ্রণে স্ল্যাব ঢালাই দিয়ে যে রোড নির্মাণ করা হয়, তাকে সিমেন্ট কংক্রিট রোড বলা হয়।
স্থায়ী ও মজবুত সিমেন্ট কংক্রিট রোড নির্মাণকল্পে কাজের বিভিন্ন স্তরগুলো ওপরে বর্ণিত ড্রইং মোতাবেক হয়ে থাকে, যার কর্মপদ্ধতি ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হলো:
প্রস্তাবিত রোডের অ্যালাইনমেন্ট নির্ধারণ করার পর ‘সাব-গ্রেড’ তৈরির লক্ষ্যে উঁচু মাটির ঢিবি বা টিলা কেটে রাস্তার জন্য নির্ধারিত লেভেল অনুযায়ী সমান করে নেওয়া হয়। অথবা, রাস্তা ভরাটের কাজের জন্য মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণপূর্বক নির্ধারণ করা কোনো বরোপিট থেকে ট্রাকে করে মাটি এনে প্রস্তাবিত রাস্তাটি স্তরে স্তরে ভরাট করে নির্দিষ্ট লেভেল পর্যন্ত ওঠানো হয়ে থাকে।
কাজের নিয়মানুযায়ী প্রতিটি স্তরের জন্য নির্দিষ্ট এলাকাব্যাপী মাটি ভরাট করার পর ভরাটকৃত মাটির ওপর বুলডোজার চালিয়ে প্রথমে সমান করে নেওয়া। তারপর ট্রাক্টর চালিয়ে আলগা করে নেওয়া হয়। এরপর, মাটির মধ্যে কোনো ময়লা-আবর্জনা থাকলে তা বেছে সরিয়ে ফেলা হয়ে থাকে।
প্রতিটি স্তরে ভরাটকৃত মাটি আলগা করে ঘাস-পাতা এবং অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা সরিয়ে ফেলে সঠিকভাবে কম্প্যাকশন করা জরুরি। অতএব, মাটি সঠিকভাবে কম্প্যাকশন হওয়া নিশ্চিত করণার্থে মাটির আর্দ্রতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্প্রেয়িং ওয়াটার ট্যাঙ্কের সাহায্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণে পানি আলগাকৃত মাটির ওপর স্প্রে করা হয়। এরপর মেশিনের সাহায্যে পানি ও মাটি সমানভাবে মিশিয়ে নিয়ে প্রথমে কয়েকবার ‘শিপ ফুটেড’ রোলার চালিয়ে ভালোমতো কম্প্যাকশন করার পর স্টিল রোলারের সাহায্যে কম্প্যাকশন করার কাজটি সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।
কম্প্যাকশনের কাজ সম্পন্ন করার পর ‘গ্রেডার’ মেশিনের সাহায্যে মাটি কেটে লেভেল করা হয়। তারপর মাটির কম্প্যাকশন নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করার জন্য ল্যাবরেটরি টেস্ট করা হয়ে থাকে। টেস্টের ফলাফল আশানুরূপ না হলে কম্প্যাকশনকৃত মাটি পুনরায় ‘ট্রাক্টর’-এর সাহায্যে আলগা করে আগের মতো একই নিয়মে পর্যায়ক্রমিকভাবে কম্প্যাকশন করার পর ল্যাবরেটরি টেস্ট করতে হয়।
সাব-গ্রেডের কম্প্যাকশন টেস্টে কাক্সিক্ষত ফলাফল নিশ্চিত করার পর এর ওপর ইট-পাথরের খোয়া ও বালুর মিশ্রণ (যা সাধারণত মিক্সিং ইয়ার্ড থেকে মিক্স করে আনা হয়) বিছিয়ে দেওয়া হয়। এরপর পানি স্প্রে করে স্টিল রোলারের সাহায্যে কম্প্যাকশন করা হয়ে থাকে। কয়েকবার রোলার চালানোর পর কম্প্যাকশনের সঠিকতা নিরূপণ করার জন্য পুনরায় ল্যাব টেস্ট করে শক্ত ও মজবুত একটি সাব-বেইজ/বেইজ কোর্স তৈরি করা হয়। এই সাব-বেইজ/বেইজ কোর্স কয়েকটি লেয়ারের মাধ্যমে তৈরি হতে পারে, যা রোডের ডিজাইন এবং স্পেসিফিকেশনের ওপর নির্ভরশীল।
প্রস্তুতকৃত সাব-বেইজ/বেইজ কোর্সের ওপর সিমেন্ট কংক্রিট স্ল্যাব তৈরি কওে এই রোড নির্মাণ করা হয়ে থাকে। রোড নির্মাণকল্পে কংক্রিট স্ল্যাব ঢালাই করার নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি আছে, যা মেনে চলা অত্যাবশ্যক। প্রথমত, কংক্রিট স্ল্যাব ঢালাইকল্পে সমগ্র এলাকাকে প্যানেলিং করে নেওয়া হয়। কারণ, নিরবচ্ছিন্নভাবে ঢালাই করা হলে তাতে বিভিন্ন প্রকার ফাটল দেখা দিতে পারে, যা রোডের স্থায়িত্ব নষ্ট করে। এসব ফাটল এড়িয়ে রোডের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে নির্দিষ্ট আকারের প্যানেল তৈরি করে একটা বাদ দিয়ে অন্যটা ঢালাই করার মধ্য দিয়ে অত্র কাজটি সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।
প্যানেলিংয়ের কাজ করা শেষে স্ল্যাব ঢালাইয়ের জন্য কংক্রিট ঢালার আগে সাব-বেইজ/বেইজ কোর্সেও সারফেসটি পানি স্প্রে করে ভিজিয়ে নেওয়া হয়। সিমেন্ট কংক্রিট স্ল্যাবের পুরুত্ব কত হবে তা সাধারণত ড্রইংয়ে দেখানো থাকে এবং তদ্নুযায়ী স্ল্যাব ঢালাই করা হয়। এই পুরুত্ব অনুযায়ী সঠিকভাবে স্ল্যাব ঢালাই করার জন্য রোডের সেন্টার এবং দুই পাশে লেভেলমার্ক করে খুঁটি দেওয়া হয় কিংবা শুধু সেন্টারে খুঁটি দিয়ে দুই পাশে ইট বিছিয়ে দেওয়া হয়।
কংক্রিট স্ল্যাবের নির্দিষ্ট পুরুত্ব (কম্প্যাকটেড অবস্থায়) নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণে কংক্রিট সমানভাবে বিছিয়ে ভাইব্রেশন মেশিন কিংবা পাট্টার সাহায্যে কম্প্যাকশন করে ট্রাওয়েল (কর্নি) ফিনিশিং দেওয়া হয়। ফিনিশিং দেওয়ার পর ওপরের সারফেস যাতে স্লিপারি (পিচ্ছিল) না হয় কিংবা আবহাওয়াজনিত কারণে সারফেস ক্র্যাক প্রতীয়মান না হয় সে লক্ষ্যে ট্রাওয়েল (কর্নি) ফিনিশিং দেওয়া শেষে ব্রুমিং করা (ঝাড়– দেওয়া) কিংবা চট টেনে দেওয়া হয়ে থাকে।
অত্র কংক্রিটিংয়ের কাজ শুরু করার আগে ঢালইয়ের জন্য ব্যবহৃতব্য প্রয়োজনীয় মালামালের (সিমেন্ট, বালু, খোয়া, পানি ইত্যাদি) গুণাগুণ যাচাই করে নেওয়া একটি মুখ্য বিষয়। এসব মালামালের নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী মালামাল জোগাড় করা নিশ্চিত করণার্থে প্রয়োজনে প্রতিটি আইটেমের স্যাম্পল নিয়ে ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে এবং তা বাস্তবায়ন করা অত্যাবশ্যক।
(চলবে)
ডিজিএম (কিউএ) অ্যান্ড এমআর,
দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লি.
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৪তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৮