ইট ছাড়া কি আজকের দিনে বাড়ি বানানো কল্পনা করা যায়? একজন স্থপতি হিসেবে আমি তো ভাবতেই পারি না। কোনোভাবেই না। একজন স্থপতি হিসেবে আমার কাজই হলো ইটের মাপে বাড়ির নকশা প্রণয়ন করা, যাতে একটা বাড়ি বানাতে কমসংখ্যক ইটের প্রয়োজন হয়। নকশা প্রণয়নে একজন স্থপতির কাজই হলো যত কম খরচে বাড়ির ডিজাইন শেষ করা যায় সেই চেষ্টা করা। এ ক্ষেত্রে আমিও অন্য সব স্থপতির মতোই ইটের মাপেই বিভিন্ন স্থাপনার ডিজাইন করে থাকি। একটা ইটের মাপ হয় সাধারণত ৪.৫”X ৯.৫X ২.৭৫” অথবা ২৫০ মিলিমিটার X ১২৫ মিলিমিটার X ৭৬ মিলিমিটার। আন্তর্জাতিক বা দেশীয় যেকোনো স্থাপনায় এই মাপ মেনে দেয়াল অথবা যেকোনো স্থাপনার ডিজাইন সংযোজন বিয়োজন করা হয়। স্থপতি যদি এটা মেনে ডিজাইন নাও করেন তবুও একজন মিস্ত্রি এটাকে ঠিক করে নেন নিজের মতো করে। তখন শিট বানাতে গিয়ে স্থপতিকে এটা ঠিক করতেই হয়। এই গ্রিড পদ্ধতি মেনে চলি বলেই ইটকে ভালোবাসি। ভালো লাগে। ইট নিয়ে কাজ করতে ইচ্ছে হয়। ইটের প্রকৃতি নিয়ে নানা চিন্তাভাবনা কাজ করে। নানা ডিটেইলিং চিন্তা মাথায় আসে, যা নান্দনিকতার কাজ করতে গেলে যেকোনো স্থপতিকেই করতে হয়।
কিন্তু এই ইট কি পরিবেশবান্ধব? মাটি পুড়িয়ে ইট বানাতে হয়। এই ইটের জন্য শত শত একর বনাঞ্চল মানুষ গ্রাস করছে প্রতিনিয়ত। মাটির উর্বর স্তর চলে যাচ্ছে বিল্ডিংয়ের শরীরে। এতে একদিকে যেমন মাটি নষ্ট হচ্ছে। উর্বর ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। আরেক দিকে বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অন্যদিকে আবার কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাসে ভরে যাচ্ছে পৃথিবী। ফলে ক্রমেই পৃথিবী ধ্বংস হচ্ছে ধীরে ধীরে। বাড়ছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা। এতে এন্টার্টিকা ও হিমালয়ের মতো বিরাট পাহাড়গুলোর বরফ গলছে ক্রমশঃ। বাড়ছে নিম্ন ভূমিগুলোর সামুদ্রিক জলসীমার উচ্চতা। একদিন হয়তো বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশি তলিয়ে যাবে এই কারণে। কিন্তু এটা আমরা থামাতে পারি। কিছুটা থামাতে তো অবশ্যই পারি। সেটা হলো ইটের বিকল্প কিছু ব্যবহারের মাধ্যমে। কিন্তু বিকল্প কী ব্যবহার করব? সেটা জানাতেই কলম ধরা।
ইকো ব্রিক
ইকো ব্রিক হলো সেই ইট, যা আমাদের দেখা ইটের মতো নয়। কিন্তু কাজ করে ইটের মতন। একই সঙ্গে এটা পরিবেশবান্ধব। এমনকি এটা পরিবেশকে রক্ষা করার কাজও করে অনেকাংশে। এমন কিছু ইকো ব্রিক সম্পর্কে আসুন জেনে নিই, যা দিয়ে সহজেই আপনি আপনার বাড়ি বানাতে পারবেন। এমনকি এগুলো গড়পড়তা ইটের চেয়ে দামেও অনেক সস্তা।
কংক্রিট হলো ব্লক
কংক্রিট হলো ব্লক এই মুহূর্তে ব্যবহার হওয়া সব ইকো ব্রিকের মধ্যে এক নম্বর স্থান দখল করে আছে বিশ্বজুড়ে। এমনকি বাংলাদেশে হলো ব্লক দিয়ে কয়েক দিন আগে উদ্বোধন হওয়া ‘হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা’ অথবা হালের ‘রেডিশন বে ভিউ, চট্টগ্রাম’ হোটেল কিন্তু হলো ব্লক দিয়েই বানানো। একেবারেই সহজ এক পদ্ধতিতে এই ইট ব্যবহার করলে বাড়ি বানানোর খরচ ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এতে করে যেমন খরচ সাশ্রয় হয় অন্য দিকে ইটের বদলে এটি ব্যবহারের ফলে পরিবেশও রক্ষা পায়। যদিও এটি সিমেন্টের তৈরি, তাই পুরোপুরি ‘ইকো’ একে বলা যায় না। তবুও এটি ইটের মতো পরিবেশদূষণ করে না বললেই চলে। কংক্রিট হলো ব্লকের মূল ম্যাটেরিয়েলস হলো সিমেন্ট। সিমেন্ট, বালু ও পাথরকুচির মিশ্রণ একটি ডাইসে বসিয়ে খুব সহজেই এটি বানানো যায়। শুকিয়ে ব্যবহারযোগ্য করতে একদিনও সময় লাগে না। যেখানে ইট শুকিয়ে পোড়ানোর পর ব্যবহারের উপযোগী করতে তিন থেকে দশ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এই ইট বানানোও অনেক সহজ। শুধু প্রয়োজন একটি ডাইস মেশিন।
ডাইস মেশিন নানা রকমের হতে পারে। আপনি চাইলে নিজের মতো একটা ডাইস বানিয়ে কাজ শুরু করে দিতে পারেন। তবে একটা সর্বজনীন মাপ রাখার চেষ্টা করা হয় সব সময়। যেমন ওপরের ছবিতে দুটো ব্রিকের সাইজের মাপ দেওয়া আছে। এই মাপ অনুযায়ী প্রধানত ইটগুলো তৈরি। মাঝে খালি অংশ থাকে, যার ফলে এই ব্রিকগুলো একসঙ্গে তাপ ও শব্দ অপরিবাহী হিসেবে কাজ করে।
পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে এই হলো ব্লক বানানোর জন্য মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব অটোমেটেড মেশিনে একদিকে কংক্রিট মিক্সিং করা হয় আরেক দিকে একের পর এক ডাইস দিয়ে বানিয়ে ফেলা হয় কংক্রিট ব্রিক। মিনিটে ১০ বা তারও অধিক প্রোডাকশন দেওয়া যায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করে। দ্রুত শুকিয়ে ফেলার জন্য ড্রাই মেশিনের মাঝে প্রবেশ করিয়ে দ্রুত শুকিয়ে ফেলা হয় এগুলো। কিন্তু আমাদের দেশে এই কাজটিই মূলত হাতে করা হয়। কারণ, এই মেশিন পদ্ধতির চল আমাদের দেশে নেই। আমাদের দেশে যা করা হয় সচিত্রে তা হলো-
- প্রথমেই কংক্রিটের জন্য সিমেন্ট, বালু ও পাথরকুচি মিক্স করে পানি দিয়ে মিশ্রণ তৈরি করা হয়।
- এরপর ডাইসের অংশ দুটি ভালোমতো পরিষ্কার করে কাজ শুরু করা হয়। ভেতরের অংশটির ওপর ওপরের অংশটি বসিয়ে এর ভেতর মিশ্রণ ঢালা হয়।
- মিশ্রণ ভালোমতো চেপে দেওয়া হয় কাঠের টুকরো দিয়ে। এতে ডাইসের ভেতর কোনায় কোনায় গিয়ে জমা হয় সঠিক মাপের মিশ্রণ।
- ডাইস উল্টে দিয়ে ভালোমতো হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ডাইসের দেয়াল থেকে কংক্রিটকে আলগা করার কাজ শুরু করা হয় এবং ধীরে ধীরে উঠিয়ে ফেলা হয় ডাইসের অংশ দুটো। ফলে থেকে যায় সদ্য তৈরি হওয়া কংক্রিট হলো ব্লক।
এরপর রইল ঘরের দেয়াল বানানো। সেটাও বেশ সহজ। ইটের পাশে ইট দিয়ে যেভাবে ব্রিটিশ বন্ড সিস্টেমে পোড়া ইটে ঘর বানানো হয়, ঠিক সেভাবেই বানানো হয় ইকো ব্রিক দিয়েও। আর এইভাবেই তৈরি হয় ইকো ব্রিক বিল্ডিং। এই ইকো ব্রিক বিল্ডিং তৈরিতে একটা বাড়ি নির্মাণে খরচ ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে ফেলা যায়। কারণ, এই ব্রিক বানাতে খরচ হয় সর্বোচ্চ ৪৫-৫৫ টাকা। আর এই ইটের সমপরিমাণ স্কয়ারফিটে ইট লাগে প্রায় ছয়টি। কিন্তু ছয়টি ইট লাগাতে যে পরিমাণ মসলা দরকার হয়, তার অর্ধেকও একটি ইকো ব্রিকে প্রয়োজন হয় না। ফলাফল হিসেবে খরচ কমে যায়। আর সাধারণ ব্রিকের মতো পরিবহন খরচও লাগে না। একেবারে সাইটে বসেই বানিয়ে ফেলা যায়। ফলে খরচ কমে আরও। খরচ কমে যায় মিস্ত্রিরও। কারণ, সময় লাগে কম। সব দিক বিবেচনা করে ইকো ব্রিক এখন সাশ্রয়ী এক বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালসের অপর নাম।
প্লাস্টিক ব্রিক
মজা করে বলা হয়, প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়াম আবিষ্কৃত না হলে পৃথিবী এখনো প্রস্তর যুগেই পড়ে থাকত। হ্যাঁ, ঘটনা আসলেই তাই। আমাদের প্রতিনিয়ত ব্যবহারের প্রতিটি জিনিসে রয়েছে প্লাস্টিক। এই প্লাস্টিক একদিকে অপচনশীল। অন্যদিকে এর কেরামতিও অনন্য। এটি তাপ ছাড়া গলে না। আবার গলে গেলেও খানিক পরে আবার একই ফর্মে ফেরত আসতে পারে। এ কারণেই ইকো ব্রিক হিসেবে প্লাস্টিকের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। আসুন জেনে নিই কীভাবে প্লাস্টিকের ইকো ব্রিক তৈরি করা যায়।
- প্লাস্টিকের বোতলে প্লাস্টিকের জঞ্জাল সিল করে।
- প্লাস্টিক গলিয়ে এর নতুন ফর্মে মানে ব্রিক ফর্মে নিয়ে গিয়ে।
প্লাস্টিকের বোতল আমাদের আশপাশে প্রতিনিয়ত জমা হচ্ছে। আপনি বা আমি বা আমরা সবাই এদিক-সেদিক যেসব প্লাস্টিকের বোতল ফেলে দিই, এগুলোতেই সিল করে ঢোকানো হয় প্লাস্টিকের ময়লা। বোতলের ভেতর প্লাস্টিক ঠেসে দিলে এর কঠিন রূপ পাওয়া যায়, যা সিমেন্ট দিয়ে একটার সঙ্গে একটা জোড়া দিয়ে তৈরি করে ফেলা যায় আস্ত একটা ঘর। এটা যেহেতু লোড বিয়ারিং কোনো ম্যাটেরিয়াল না, তাই এটি দেয়াল হিসেবে বেশ কার্যকর। পাশ্চাত্যে এখন অনেক বাড়িতে এই প্লাস্টিক ব্রিক ব্যবহার করা হয়। আসুন দেখে নিই এর কিছু নমুনা।
এটি সিমেন্টের ভেতর থাকে বলে তাপ ও শব্দ প্রতিরোধী। আগুনে প্রায় ঘণ্টাখানেক প্রতিরোধ তৈরিতে সক্ষম। তাই এটি বিশ্বজুড়ে ধীরে ধীরে প্রচলিত হচ্ছে। খুব কম খরচে এটি দিয়ে তৈরি করে ফেলা সম্ভব বিশাল কোন ওয়্যারহাউস কিংবা বাড়ি। কিন্তু এটিও কোনো লোড বিয়ারিং দেয়াল হিসেবে ব্যবহার হওয়া সম্ভব নয় বলে এটি শুধু পার্টিশন হিসেবে থাইল্যান্ড, চীন ও জাপানের বিভিন্ন স্থানে ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্লাস্টিক গলিয়ে ব্রিক ফর্মে তৈরি করা ইকো ব্রিক
এটি তৈরি করা বেশ সহজ। প্লাস্টিক গলিয়ে ফেলা হয় মেটাল কোনো বাক্সে। একেবারেই সাধারণ গ্রামীণ পদ্ধতিতে তৈরি করা যায়। টিনের বাক্সে প্লাস্টিক গলে যায় নিমেষেই। এরপর সেটা কাঠের তৈরি ডিজাইন্ড ছাঁচে জমাট বাঁধতে দেওয়া হয়। জমাট বাঁধার পর এটির আকার ইটের মতোই হয়ে যায়। সহজেই এটিকে পেভমেন্ট, টাইলস অথবা ব্রিকের মতো করে ব্যবহার করা যায়। এতে বিভিন্ন রং মিশিয়ে টেক্সচার আনা যায়, যা দেখতে আসলেই দারুন নান্দনিক।
কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্রিক তৈরি করার জন্য এই একই প্রসেসটা একটু আলাদা। প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে আসার পর সেটাকে কেটে ছোট ছোট টুকরোয় পরিণত করা হয়। এরপর সেটাকে বয়লার কম্পেক্টরের মাঝ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এই চেম্বারের ভেতর প্লাস্টিক গলে যায়। এবং ছাঁচের ভেতর ফেলে এটাকে ইটের টুকরোয় পরিণত করা হয় এবং একে প্রেশার দিয়ে শক্ত পাথুরে ব্লকে রূপান্তর করা হয়। কিন্তু এরপর এটাকে পানির ট্যাঙ্কের পানির ধারার ওপর দিয়ে প্রবাহিত করা যায়। পানির সংস্পর্শে এসে এটি আরও শুকিয়ে শক্ত আকার ধারণ করে।
কিন্তু এই ব্রিক ব্যবহার করার জন্য একটু ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। সেটা হলো এই ব্রিকের মাঝে ফুটো থাকে। সেই ফুটোর মাঝ দিয়ে লোহার রিইনফোর্সমেন্ট প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়। এতে এর লোড বিয়ারিং ক্যাপাসিটি বাড়ে। সিমেন্ট দিয়ে জোড়া লাগানোর পর এর ওপর তারজালি বিছিয়ে দেওয়া হয়, যা এটির কাঠিন্য প্রদানে সহায়তা করে। এরপর আধ ইঞ্চি মোটা সিমেন্ট প্লাস্টার করে এর ওপর নিট সিমেন্ট ফিনিশ দেওয়া হয়। ইটের মাথায় পরিয়ে দেওয়া হয় মেটাল প্লেট ও টেপ কার্ভিং, যা এই দেয়ালকে রক্ষা করে অনেক বছর। অনেকে বলেন, এই দেয়ালের স্থায়িত্ব মানুষের জীবনের চেয়েও বেশি।
এভাবেই দিন দিন মানুষের হাতের কাছে আসছে প্রযুক্তি। প্রয়োজন আবিষ্কারের জননী। এই মুহূর্তে পৃথিবীকে রক্ষা ও গৃহায়ণের খরচ কমানোর লক্ষ্যে পুরো দুনিয়া একযোগে কাজ করছে। দ্রুত নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হচ্ছে। আমাদের উচিত সনাতন পদ্ধতি ছেড়ে নতুনকে নিজেদের কাজে লাগানো। কারণ, এই পৃথিবীকে বাস যোগ্য করতে হলে আমাদেরই একে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। নইলে একদিন বসবাসযোগ্যতা হারাবে আমাদের প্রিয় স্বদেশ বাংলাদেশও।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৪তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৮