নির্মাণে আগামীর অনুষঙ্গ

বিল্ডিং তৈরির ক্ষেত্রে সব থেকে ভালো উপাদান কোনটি? কংক্রিট? ইট-বালু-সিমেন্ট? স্টিল? কাঠ? নাকি অন্য কিছু? এ বিষয়ে একমত হওয়া বোধ হয় একটু কঠিনই। প্রতিনিয়ত মানুষ নিত্যনতুন উপাদান আর উপায় আবিষ্কার করছে। আজ যেটা সব থেকে উন্নত প্রযুক্তি, কালই হয়তো সেটা পুরোনো হয়ে যাচ্ছে। তাই সব থেকে সেরা উপাদান কোনটি, সেটি বলার সময় হয়তো এখনো আসেনি। তবে এটা বলাই যায় যে স্থাপত্যশিল্পে নিত্যনতুন আবিষ্কারের ফলেই স্থপতিগণ নতুন নতুন সাহসী প্রজেক্টে কাজ করার অনুপ্রেরণা পাচ্ছে। নমনীয়তা, স্থায়িত্ব, অভিনবত্ব, ব্যয় আর পরিবেশ সচেতনতা সবদিক বিবেচনা করেই একজন স্থপতি তাঁর প্রকল্পের জন্য  উপাদান নির্ধারণ করেন। এবার আসুন দেখি নির্মাণশিল্পে ভবিষ্যতে নতুন কী উপকরণ যুক্ত হতে যাচ্ছে।

গ্রাফিন 

গ্রাফিন নতুন কোনো আবিষ্কার নয়। তবে নির্মাণশিল্পে গ্রাফিন ব্যবহারের উপযোগী ছিল না। তাত্তি¡কভাবে গ্রাফিন কার্বন ফাইবার ও স্টিলের থেকেও দৃঢ় আর ওজনে খুবই হালকা। তাই ট্র্যাডিশনাল উপাদানের সঙ্গে গ্রাফিনের ব্যবহারে চমৎকার এক মিশ্রণ হওয়ার কথা, যেটি দিয়ে খুবই দৃঢ় আর স্থায়ী বিম, কলাম তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। গ্রাফিনের উৎপাদন বেশ কঠিন আর তা বিল্ডিংয়ে ব্যবহার করারও উপযুক্ত কোনো উপায় নেই। তবে আশার কথা হচ্ছে, আমেরিকার ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি গ্রাফিনের জন্য নতুন এক পন্থা উদ্ভাবন করেছে, যেটির নাম কেমিক্যাল ভ্যাপার ডিসপোজিশন। তাঁদের ভাষ্যমতে, অচিরেই গ্রাফিন বিভিন্ন ব্যবহার উপযোগিতায় রূপ নেবে। বর্তমানে কীভাবে এর খরচ কমানো যায় আর সহজে বাজারজাত করা যায়, কাজ চলছে সেটি নিয়েই। তাই বলা যেতে পারে, গ্রাফিন নির্মাণশিল্পের উপাদান লিস্টে যুক্ত হতে যাচ্ছে সহসাই।

রোমান কংক্রিট

প্রাচীন রোমের স্থাপত্যের দীর্ঘস্থায়িত্ব এখনো মানুষকে চমৎকৃত করে। এত দীর্ঘ সময় ধরে রোমান স্থাপত্যের টিকে থাকার পেছনে অবশ্যই এর নির্মাণ উপাদানের অবদান অন্যতম। আর এটি বিবেচনা নিয়েই রোমানদের স্থাপনা তৈরির উপাদান নিয়ে চলছে ব্যপক গবেষণা। আমেরিকার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে ল্যাবে গবেষকগণ রোমানদের গোপন ফর্মুলার রহস্য সমাধানে সক্ষম হয়েছেন। 

আধুনিক কংক্রিটে যে পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়, রোমানরা তাদের কংক্রিট তৈরিতে ব্যবহার করত ভিন্ন একটি উপাদান-ভোলকানিক লাইমস্টোন (আগ্নেয়গিরি থেকে উৎপন্ন বিশেষ ধরনের পাথর)। স্বাভাবিকভাবেই এটি পোর্টল্যান্ড সিমেন্টের থেকেও বেশি দীর্ঘস্থায়ী আর মজবুত-কংক্রিটের অন্য উপাদানগুলোকে আরও দৃঢ়ভাবে আটকে রাখতে সক্ষম। ফলে কংক্রিটের গায়ে সহজে চিড় ধরে না। রোমান কংক্রিট, পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট কংক্রিটের থেকে শুধু যে বেশি মজবুত তাই নয় বরং এটি এর থেকে আরও বেশি পরিবেশবান্ধব। পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট তৈরির প্রক্রিয়ায় একে ১৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করার প্রয়োজন পড়ে, যা কিনা বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৭ শতাংশ। রোমান কংক্রিটে এসব কিছুরই প্রয়োজন নেই। অগ্ন্যুৎপাতের ছাই আর লাইমস্টোন কম তাপেই কাক্সিক্ষত ফল দিতে সক্ষম। তাই এটি প্রচলিত কংক্রিটের থেকে বহুগুণে টেকসই (২০০০ বছরেরও বেশি), দৃঢ় আর পরিবেশবান্ধব। 

প্রাকৃতিক কংক্রিট

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি-এমআইটি -এর গবেষকগণ কংক্রিটের জগতে নতুন ধারণা আনতে যাচ্ছেন। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের গবেষকগণ কংক্রিট তৈরির ক্ষেত্রে এর প্রধান উপকরণ সিমেন্টকেই বাদ দিতে চাইছেন। সিমেন্টের পরিবর্তে অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান যেমন- হাড়, শামুক, ঝিনুকের খোলস, প্রবাল ইত্যাদি ব্যবহার করা যায় কি না তার উপায় খুঁজছেন। এই উদ্ভাবনের ফলে পোর্টল্যান্ড সিমেন্টের অন্তত দুইটি অসুবিধা দূর করা সম্ভব হবে। ১. এটি তৈরিতে শক্তির যে বিশাল অপচয় হয় সেটি বন্ধ করা যাবে আর ২. কংক্রিটের গায়ে যে সূ² চিড় ধরে সেটি রোধ করা যাবে। তবে এই বোন-ক্রিট তৈরি অতটা সহজ হবে বলে মনে হয় না। একদিকে যেমন হাড়, ঝিনুক, প্রবাল ইত্যাদিকে ব্যবহারের উপযোগী করতে হবে আবার এর সহজপ্রাপ্যতাও নিশ্চিত করতে হবে। তবে এটি ইঞ্জিনিয়ারদের বিল্ডিং তৈরির সময় এর উপাদান নিয়ে নতুন করে ভাবাবে বৈকি! 

কার্বন-ফাইবার বালসা

বালসা কাঠ একদিকে যেমন ওজনে ভীষণ হালকা অপর দিকে খুবই দৃঢ়। একই সঙ্গে এটি অপ্রতুল আর তাই ভীষণ ব্যয়বহুলও। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক একধরনের কোষীয় উপাদান তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন, যেটি বালসার মতো ওজনে হালকা অথচ দৃঢ়।

অ্যাপোক্সি-বেসড থার্মসেটিং রেইজিন এবং থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের ক্ষেত্রে কার্বন ফাইবারের ব্যবহার বেশ লক্ষণীয়। হার্ভার্ডের গবেষকগণ ঠিক এই পদ্ধতি অনুসরণ করেই কার্বন ফাইবারকে অ্যাপোক্সি রেইজিনের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। ফলে এটি বালসা কাঠের বিকল্প একটি পণ্যতে পরিনত হয়েছে। বালসা কাঠ শুধু যে অপ্রতুল তাই নয়, কাঠকে যেহেতু ইচ্ছেমতো আকৃতি দেওয়া যায় না বলে এটিও বেশ বড় এক সমস্যা। কার্বন ফাইবার বালসা তাই বালসা কাঠের চেয়ে উপযোগী এক বিকল্প। এর খরচ যেমন কম তেমনি এটি প্রয়োজনমাফিক আকৃতির করে তৈরি করা যায়। 

গ্রিন-মিক্স কংক্রিট

নতুন বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল উদ্ভাবন কি শুধু এর দৃঢ়তা, নমনীয়তা, স্থায়িত্ব আর ব্যয় কমানোকেই বেশি গুরুত্ব দেয়? বর্তমান বিশ্বে আরও একটি বিষয় খুব আলোচিত। আর তা হচ্ছে পরিবেশ। নতুন উপাদানটি যদি ওপরের গুণাগুণ সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশবান্ধব হয়, তাহলে এর গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণে বাড়বে। মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদল ঠিক এমনই একটি উপাদান তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘গ্রিন-মিক্স কংক্রিট’। এই কংক্রিট তৈরিতে প্রচলিত উপাদানের সঙ্গে উপযুক্ত আবর্জনা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, যা একই সঙ্গে খরচ আর পরিবেশ দুটিই রক্ষা করে। এ ছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে এতে ফ্লাই অ্যাশ, রিসাইকেল্ড কংক্রিট আর অ্যালুমিনিয়াম ক্যান ফাইবারের ব্যবহার করা হয়েছে।  

সিনথেটিক মাকড়শার জাল (ঝুহঃযবঃরপ ঝঢ়রফবৎ ঝরষশ)

মাকড়শা তার জাল তৈরিতে যে রেশম বা উপাদানটির ব্যবহার করে থাকে, সেটি এককথায় অনন্য। এর ঘনত্ব আর দৃঢ়তার তুলনা করলে সেটি দারুণ বিস্ময়ের। কখনো হাত দিয়ে ধরে দেখেছেন এটি কী ভীষণ হালকা অথচ নিজের ওজনের থেকে কয়েকগুণ ভারী পোকামাকড় অনায়াসে আটকে রাখে! তাই ওজন, ঘনত্ব, নমনীয়তার বিচারে এটি স্টিলের থেকেও বেশি দৃঢ়। গবেষকগণ বহুদিন থেকেই মাকড়শার জালির মতো কৃত্রিম তন্তু আবিষ্কারের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু এর রহস্যভেদ হচ্ছিল না। এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের সাহায্যে নকল মাকড়শার জাল তৈরি করে এর গঠনশৈলী বোঝার জন্য। তাঁদের বিশ্বাস, সিনথেটিক মাকড়শার রেশম তৈরিতে এটি বেশ বড় ভূমিকা রাখবে। তাই আশা করাই যায়, শুধু সুপার হিরো সিনেমার নায়ক স্পাইডারম্যান মাকড়শার জালি তৈরি করবে না, অচিরেই বাস্তবেও এটি তৈরি করবে মানুষ।

উন্নত কাঠ

ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারভিক আর কেমব্রিজ -এর যৌথ গবেষক দল কাঠের বুনন আর কোষীয় গঠনের সম্পর্ক জানার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের এই গবেষণার ফলে কাঠের কোষীয় গঠনশৈলী সম্পর্কে সহজেই জানা গেছে। এই আবিষ্কার পৃথিবীর বহুল ব্যবহৃত স্থাপত্য উপাদান কাঠের ক্ষেত্রে নতুন ধারণার জন্ম দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন জাইলান পলিমার (ঢুষধহ চড়ষুসবৎ) নামক একটি উপাদান প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গাছের কাঠকে ভিন্ন আকৃতি প্রদানের জন্য দায়ী। এর ফলে কাঠ এমন আকৃতি পায়, যা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহারের উপযোগী নয়। এখন বিজ্ঞানীরা জানেন কীভাবে মলিকিউল আর সেল গাছের কাÐ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এই গবেষণার ফলাফল পরবর্তী সময়ে বিল্ডিং তৈরির উপাদানের ক্ষেত্রে গাছের মলিকিউল আর কোষের গঠনশৈলীকে অনুসরণ করে নতুন কিছু তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।    

নিত্যনতুন আবিষ্কার স্থাপত্যশিল্পে প্রতিনিয়ত নতুন সংযোজন ঘটিয়ে চলছে। ভবিষ্যতে আরও নতুন উপাদান, নতুন প্রকৌশলের জন্ম হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এসব উপাদানের ব্যবহার প্রকৌশলীদের তাঁদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে আরও সৃজনশীল এবং স্বপ্নপূরণে স্বাধীন চিন্তার উন্মেষ ঘটাবে বলে আশা করাই যায়।


প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৩তম সংখ্যা, নভেম্বর, ২০১৮

মহুয়া ফেরদৌসী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top