সবুজের পথে আগামীর আবাসন

জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ব আজ উৎকণ্ঠিত। কার্বণ নিঃসরণ বেড়ে পরিবেশ বিপর্যয় আজ চূড়ান্তে। প্রতিবছরই বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এসি, ফ্যান, কুলার, ফ্রিজের ব্যবহার। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে আবাসন সংকটও হচ্ছে প্রকট। বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো বাংলাদেশও এর ভুক্তভোগী। ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মাথা গোজার ঠাই করতে গড়ে উঠছে জলবায়ু, পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যবান্ধব বর্জিত অগনন স্থাপনা। বিশেষত রাজধানী ঢাকায়। এতে রাজধানী ঢাকা উন্মুক্ত পরিসরহীন; বৃক্ষহীন হয়ে দিনে দিনে পরিণত হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে নিকৃষ্ট বাস অনুপযোগী শহরে। এ শহরের বাসযোগ্যতা ও সঠিক প্রতিবেশব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সবুজ ও পরিবেশবান্ধব ব্যয়সাশ্রয়ী আবাসনব্যবস্থা। আর তা বাস্তবায়নের কৌশল উন্মোচনে গ্রিন আর্কিটেকচার সেল, স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) আয়োজন করে ‘গ্রিন বিল্ডিং ডিজাইন ইন কনটেক্সট অব ঢাকা’ শীর্ষক তিন দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার। আয়োজনটির ব্যবস্থাপনায় ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির গ্রিন আর্কিটেকচার সেল-এর সমন¦য়ক ও স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আশিকুর রহমান জোয়ার্দ্দার। স্যাসটেইন্যাবল অ্যান্ড রিনিউঅ্যাবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ও জার্মান করপোরেশন ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জিআইজেড) ছিল সহযোগী প্রতিষ্ঠান। এই কর্মশালায় অংশ নেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিষ্ঠানের একদল উদ্যমী স্থপতি, প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ, শিক্ষক, পরিবেশবিদ, অর্থসংস্থানকারী ও নীতিনির্ধারকগণ। 

বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশ। লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া আর ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। সে লক্ষ্যে সরকার জোর দিচ্ছে বিদ্যুৎ ও শক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, রপ্তানির প্রবৃদ্ধি, ব্যাপক উৎপাদন, শিল্পায়ন, বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানসহ নানা প্রকল্পে। এসব সময়োপযোগী উদ্যোগে দেশ এগিয়ে যাবে তা দ্বিধাহীনভাবেই বলা যায় কিন্তু তা সাসটেইন্যাবল ডেভেলপমেন্ট গোল বাস্তবায়নে কতটা সফল হবে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকছেই। কারণ, উন্নয়ন মানেই ব্যাপক নির্মাণযজ্ঞ, গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সবুজ কমে যাওয়া, কার্বন নির্গমন সর্বোপরি পরিবেশ বিপর্যয়। অথচ টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত প্রকৃতি ও পরিবেশের যথাসম্ভব কম ক্ষতি করে অবকাঠামো উন্নয়ন। সে ক্ষেত্রে রিনিউঅ্যাবল এনার্জি বা নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো, এনার্জি এফিসিয়েন্সি তথা জ্বালানি ও শক্তিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহারের সাথে সর্বোপরি কার্বন নির্গমন রোধ করা অন্যতম করণীয়। 

উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আবাসন চাহিদা মেটাতে যেসব স্থাপনা ও অবকাঠামো গড়ে উঠছে, তাতে ব্যয় হচ্ছে প্রচুর এনার্জি। এর অন্যতম কারণ আলো-বাতাসের মতো প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে না লাগিয়ে স্থাপনা ডিজাইন ও নির্মাণ। স্থাপনাগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস প্রবেশ করাতে না পারায় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ওপর বাড়ছে নির্ভরতা। এতে একটি ভবন যেমন পুরো জীবনকালে প্রচুর পরিমাণে শক্তির অপচয় করে ব্যয় বাড়াছে, তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকছে ভবনের বাসিন্দারা। অথচ পরিবেশবান্ধব স্থাপনা বা গ্রিন বিল্ডিং সহজেই একটি ভবনের ব্যয় অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে তুলনামূলক কম শক্তি ব্যবহার করে। কিন্তু গ্রিন বিল্ডিং সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নেই অধিকাংশের। এমনকি স্থাপনা সম্পর্কিত পেশাজীবীদেরও। এ উপলব্ধি থেকেই স্থাপনা ও অবকাঠামো সম্পর্কিত সব সেক্টরের পেশাজীবীদের মধ্যে গ্রিন বিল্ডিং সম্পর্কে বাস্তবিক জ্ঞান দান, চেতনার জাগরণ এবং নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে তা প্রয়োগ নিশ্চিত করতেই গ্রিন আর্কিটেকচার সেলের এই প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন। কর্মশালাটি আয়োজিত হয় বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্স ইনস্টিটিউট ভবনের সেমিনার হলে। 

প্রাপ্তি যা কিছু

প্রশিক্ষণ কর্মশালার মূল আরোপিত বিষয় ছিল গ্রিন বিল্ডিং ডিজাইনে সকল বিবেচ্য বিষয়। কীভাবে একটি স্থাপনাকে পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও বাহুল্যবর্জিত করে নির্মাণ করা যায়। কীভাবে ভবনের বাসিন্দাদের সুস¦াস্থ্য নিশ্চিত করা যায়। সবচেয়ে গুরুত্ব পায় ডিজাইনে কীভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তি ও কম ব্যয়ের নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করে কম আয়ের মানুষের সামর্থ্যরে মধ্যে স্থাপনা নির্মাণ করা যায়। এ ছাড়া আবাসন, অফিস, শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, বাণিজ্যিক ভবন, শপিংমল নির্মাণে যেসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া উচিত; তা হচ্ছে- 

  • গ্রিন বিল্ডিং সম্পর্কিত ধারণা
  • গ্রিন বিল্ডিং পলিসি
  • গ্রিন বিল্ডিং মডেলিং
  • স্থাপনা নির্মাণে সঠিক ভূমির ব্যবহার
  • পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার
  • স্থাপনায় নবায়নযোগ্য শক্তির (সৌর, বায়ু) ব্যবহার
  • দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার
  • বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার
  • থার্মাল ইনস্যুলেশন
  • সঠিক ভেন্টিলেশন সিস্টেমে স্বাস্থ্য সুরক্ষা 
  • অবারিত বায়ু চলাচল
  • বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
  • পানি ব্যবস্থাপনা
  • গ্রিন বিল্ডিং মনিটরিং 
  • সহজলভ্য সম্পদের সর্বোচ্চ ক্ষমতার ব্যবহার 
  • অতিরিক্ত তাপমাত্রা রোধে গ্রিনরুফ বা সবুজ ছাদ তথা রুফটপ গার্ডেনিং
  • খোলামেলা পরিসর ব্যবস্থাপনা
  • নেইবারহুড ডিজাইন ও ল্যান্ডস্কেপিং
  • স্থাপনাকে ঘিরে সবুজায়ন ও বৃক্ষায়ন
  • সবুজ ডিজাইনে পরিবেশবান্ধব কৌশল ও উপকরণ বাছাই
  • দূষণ নিয়ন্ত্রণ
  • লিড (লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন) সার্টিফিকেশন অর্জন।

সবুজ স্থাপনার আদ্যোপান্ত

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবিলায় গুরুত্ব পাচ্ছে সবুজ আবাসন প্রকল্প তথা গ্রিন বিল্ডিং। স্থপতিরাও সচেতন হয়ে উঠছেন পরিবেশবান্ধব স্থাপনা নির্মাণে। কিন্তু অনেকের মধ্যেই গ্রিন বিল্ডিং সম্পর্কে রয়েছে ভুল ধারণা। কেউ কেউ ভাবেন স্থাপনাকে গাছে গাছে ভরিয়ে তুললেই সেটা হবে গ্রিন বিল্ডিং। বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. খন্দকার সাব্বির আহমেদ তাঁর প্রেজেন্টেশন ও লেকচার সেশনে তুলে ধরেন গ্রিন বিল্ডিং এর আদ্যোপান্ত। সবুজ আবাসন প্রকল্প নির্মাণে চ্যালেঞ্জ, প্রযুক্তি ও পরিবেশগত নানা দিক সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন। গ্রিন বিল্ডিং সার্টিফিকেশন রেটিং সিস্টেমের অন্যতম ইস্যু এনার্জি ও থার্মাল ইনস্যুলেশন বিষয়েও কথা বলেন। এ ছাড়া বৈশ্বিক অন্যান্য দেশের গ্রিন বিল্ডিং রেটিং সিমেস্ট পুরো অনুসরণ না করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেটিং সিস্টেম তৈরির গুরুত্ব তুলে ধরেন। সাসটেইন্যাবল গ্রিন বিল্ডিং ডিজাইনে যেসব বিষয় প্রাধান্য দেওয়া উচিত সেগুলো হচ্ছে-

অধ্যাপিকা ড. জেবুন নাসরিন আহমেদ তাঁর প্রেজেন্টেশনে স্থাপনা ডিজাইনের ক্ষেত্রে ইকুইটি, ইকোনমি ও এনভায়রনমেন্টের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘স্থপতি, প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদ একটি প্রকল্পের সঙ্গে থাকবে স্বাভাবিক কিন্তু প্রতিটি প্রকল্প হওয়া উচিত ব্যবহারকারীর স্বাচ্ছন্দ্যবোধ বিবেচনায় রেখে; এমনকি ব্যবহারকারীকে সঙ্গে নিয়েই ডিজাইন করতে হবে।’ তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন, অসম উন্নয়ন করতে গিয়ে যেন ওই এলাকার বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

ড. মো. আশিকুর রহমান জোয়ার্দ্দার, গ্রিন বিল্ডিং সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বিশেষ করে স্থাপনায় দিনের আলো ব্যবহারের নানা কৌশল ও মানুষের সুস্থতা নিশ্চিত করতে তা কতটা জরুরি সে সম্পর্কে বলেন। কীভাবে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস পেয়ে হাসপাতালে রোগী দ্রæত আরোগ্য লাভ করতে পারে আবার কলকারখানায় প্রাকৃতিক আলোর অভাবে কীভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভোগে তা তিনি বুঝিয়ে দেন। এ ছাড়া স্থাপত্য নকশার ক্ষেত্রে দিকের গুরুত্ব কেমন এবং জানালা ছাড়াও স্বচ্ছ টিউব পাইপের মাধ্যমে ভবনের মধ্যে সূর্যের আলো আনা যায় সেসব কৌশল উপস্থাপন করেন। এই আলোর সংস্থান নিশ্চিত করা গেলে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুৎ খরচ হবে অনেক কম, যা অর্থনীতিতে রাখবে সবিশেষ ভূমিকা।

ঘরের ভেতর পর্যাপ্ত আলো-বাতাস অবাধ চলাচলের সুযোগ থাকা উচিত। কিন্তু তা কোথায় কী পরিমাণে? আলো সরাসরি না তীর্যকভাবে? এই প্রশ্নগুলো হয়তো আমাদের ভাবায় না। অথচ অতিরিক্ত আলোও অনেক সময় আমাদের স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, আলোর অতিমাত্রার (এষধৎব) কারণে বই পড়তে, কাজ করতে বা ঘুমাতে সমস্যা হয়। এ জন্য প্রয়োজন আলোর সঠিক মাত্রা নির্ণয়। কীভাবে ‘এনার্জি সফটওয়্যার সিমুলটেশনের’ মাধ্যমে এই মাত্রা নির্ধারণ করা যায় সে সম্পর্কে বলেন স্থপতি সজল চৌধুরী। তিনি তাঁর বক্তব্যে কীভাবে গ্রিন বিল্ডিং মনিটরিং এবং পরফরম্যান্স মূল্যায়ন করতে হয় তা তুলে ধরেন। অনেকেই প্রাকৃতিক আলো আনতে বড় জানালা ব্যবহার করেন, অনেকে আবার যথেচ্ছাভাবে কাচ ব্যবহার করেন। এতে আলো পাওয়া গেলেও একই সঙ্গে আসে তাপ। তাপ কমাতে প্রয়োজন হয় এসির। অথচ যথাযথ সানশেড ও ল্যুভার ব্যবহার করে কীভাবে এই সমস্যাটির সমাধান করা যায় তা বুঝিয়ে বলেন তিনি।

অধ্যাপক ড. সাইফুল হক সবুজ ও টেকসই স্থাপনা গড়ে তুলতে নবায়নযোগ্য শক্তির ভূমিকা সম্পর্কে অলোকপাত করেন। নবায়নযোগ্য শক্তির নানা উৎসও এবং কীভাবে সেসব উৎসগুলো বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পারে, তা উপস্থাপন করেন। তাঁর উপস্থাপনার মূল বিষয় ছিল সোলার প্যানেল-বিষয়ক বহুমুখী তথ্য। 

নির্মাণপণ্যের অতিরিক্ত মূল্য মানসম্মত ভবন নির্মাণের সবচেয়ে বড় বাধা। অথচ গ্রিন বিল্ডিংয়ের অন্যতম বিবেচ্য বিষয় সহজলভ্য নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে কম খরচে বাড়ি নির্মাণ। কিন্তু নিশ্চিত করতে হবে স্বল্পমূল্যের বাড়ি মানেই নিম্নমানের বাড়ি নয়। এ জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত বিকল্প উপকরণ বাছাই। স্থপতি ফারুক আহমেদ তাঁর উপস্থাপনায় বিকল্প নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করে ভবন নির্মাণের বিভিন্ন কৌশল তুলে ধরেন। যেমন- ব্লক  ওয়াল, র‌্যাট ট্রাপ ব্রিকওয়াল, স্ট্রাইরোফোম, হলো ব্লক  রুফ, হলো কোর রুফ, বাবল ডেক রুফ, ফেরো-সিমেন্ট রিবড রুফ। এগুলোর থার্মাল উপযোগিতাও অসাধারণ। ব্যয়সাশ্রয়ী অন্যান্য নির্মাণ উপকরণের মধ্যে রয়েছে- 

  • কংক্রিট হলো-ব্লক 
  • ফেরো সিমেন্ট ব্লক 
  • রেমড আর্থ
  • আরসিসি চৌকাঠ
  • প্রি-স্ট্রেসড কংক্রিট হলো-স্ল্যাব
  • প্রিকাস্ট ফেরোসিমেন্ট চ্যানেল
  • ফেরোসিমেন্ট পানির ট্যাংক
  • বাঁশ
  • কাঠ
  • মাটি ও মাটির ব্লক 
  • স্ট্রাইরোফোম।

কার্যক্রম যখন মাঠ পর্যায়ে

লেকচার ও প্রেজেন্টেশন থেকে শেখা বিষয়গুলো বাস্তবের সঙ্গে কতটা মিল তা সরেজমিনে পরিদর্শন করে উপলব্ধি করার জন্য প্রশিক্ষণ কর্মশালায় রাখা হয়েছিল কেসস্টাডি। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে থেকে স্থপতি, প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ ও অন্য পেশাজীবীদের সমন¦য়ে ছয় সদস্যের চারটি গ্রুপ তৈরি করা হয়। এই দলগুলো নির্ধারিত দুয়ারীপাড়া, রূপনগর, মিরপুর-১১ আবাসিক এলাকা পরিদর্শন করে। দলগুলো ভিন্ন ভিন্নভাবে ওই এলাকার আবাসনব্যবস্থা, বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা, তাদের সুযোগ-সুবিধা এবং সমস্যার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে। এই তথ্যচিত্রের ওপর ভিত্তি করেই ওই এলাকার বাসিন্দাদের জন্য পরিবেশবান্ধব, ব্যয়সাশ্রয়ী এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয় বা নির্মাণসাধ্য আবাসন প্রকল্পের ডিজাইন প্রস্তুত করতে বলা হয়।

সরেজমিনে প্রাপ্ত তথ্যচিত্র

সরকার নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য রূপনগরের দুয়ারীপাড়া এলাকায় প্লট বরাদ্দ দিয়েছে। প্রতিটি প্লটের আকার আড়াই থেকে পাঁচ কাঠা। এলাকাটিতে উন্নয়ন হয়েছে অসমভাবে। চারপাশে উঁচু উঁচু ভবনের ভিড়ে কোনোমতে টিকে থাকা এই প্লটগুলোতে নির্মিত হয়েছে একতলা ও দ্বিতল ভবন, যেগুলোর অধিকাংশই টিনশেড। তবে এই স্থাপনাগুলোও হয়তো কিছুদিনের মধ্যে রূপ নেবে অপরিকল্পিত কোনো ভবনে। এখানকার বাড়িগুলোর প্রতিটি একতলা ভবনে ৮-১৫টি পরিবার আর দুইতলা ভবনে ১৮-২৪টি পরিবার বাস করে। এই এলাকার আবাসনব্যবস্থা ও বাসিন্দাদের বিষয়ে প্রাপ্ততথ্যসমূহ-  

অসংগতি যেখানে

  • বাসস্থানের অবস্থান ও মানের ভিত্তিতে ভাড়া তুলনামূলক বেশি
  • সরু ও অপর্যাপ্ত যাতায়াতের ব্যবস্থা
  • উন্মুক্ত পরিসরের অভাব
  • ঘরগুলোতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের অভাব
  • আলোর অভাবে সারা দিন বাতি জ্বেলে রাখা
  • অপর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ
  • বিশুদ্ধ খাবার পানির সমস্যা
  • স্বাস্থ্য সমস্যা
  • স্যাঁতসেঁতে মেঝে
  • ঘরগুলোতে স্টোরেজের অভাব
  • শিশুদের খেলাধুলা ও বিনোদনের জায়গার অভাব
  • অনেক মানুষ একই গোসলখানা ও পায়খানা ব্যবহার করায় ঝুঁকিতে স্বাস্থ্য।

ডিজাইনে গুরুত্ব পেয়েছে যা

সাইট ভিজিটে প্রাপ্ততথ্য ও বাস্তবচিত্রের ওপর ভিত্তি করে দল চারটি কর্মশালা থেকে শেখা জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ওই এলাকা তথা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আবাসন প্রকল্পের ডিজাইন করে। এই ডিজাইনসূহ চারটি স্কেচ ও কম্পিউটার গ্রাফিকসে প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তাবনা তুলে ধরে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, বৃষ্টির পানি, বায়োগ্যাস ইত্যাদি সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করেই করা হয় আবাসন প্রকল্পের মডেল ডিজাইন। এ ছাড়া রাজউকের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুযায়ী রাজধানীর ভ‚মি ব্যবহারের যেসব নির্দেশনা রয়েছে এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০০৮ অনুসারে প্লটে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ভবনের চারপাশে খোলা জায়গা ছেড়ে ‘ফ্লোর এরিয়া রেশিও’ (এফএআর) বজায় রেখেই ডিজাইন করা হয়। উন্মুক্ত পরিসরগুলোকে পাকা না করে সেখানে শিশুদের জন্য খেলাধুলার পরিসর, বাগান সৃষ্টির চেষ্টা ছিল প্রকল্পে। এ ছাড়া কয়েকটি প্লটকে এক করে ক্লাস্টার ডিজাইনসহ নেইবারহুড কমিউনিটি স্পেস তৈরির মাধ্যমে সবুজ পরিসর সৃষ্টির চেষ্টাও ছিল। সর্বোপরি ওই এলাকার বাসিন্দাদের চাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে ডিজাইন প্রকল্পে যেসব সুবিধা রাখা হয় সেগুলো হচ্ছে- 

  • ভূমির সঠিক ব্যবহার
  • স্থাপনার অভ্যন্তরে দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার
  • বাতাস চলাচল নিশ্চিত করতে যথাযথ ভেন্টিলেশন সিস্টেম
  • পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার (থার্মাল ব্লক , বালু-সিমেন্ট হলো ব্লক , ইন্টারলকিং ব্লক)
  • কমমূল্যের নির্মাণ উপকরণ (ফেরোসিমেন্ট ছাদ, দেয়াল ও মেঝে)
  • নবায়নযোগ্য শক্তি (সোলার প্যানেল)
  • বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
  • পানি ব্যবস্থাপনা
  • শিশুদের জন্য খেলাধুলা ও বিনোদনের পরিসর তৈরি
  • বিদ্যুৎসাশ্রয়ী এলইডি বাতি
  • পরিবেশবান্ধব বন্ধ চুলা বা ইমপ্রæভ কুক স্টোভ 
  • কমিউনিটি আয়ের পরিবেশ
  • ভূমিকম্প সহায়ক নির্মাণকৌশল।

যদিও এই প্রশিক্ষণ কর্মশালাটি ছিল মাত্র তিন দিনের, তা সত্তে¡ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, চেতনার জাগরণ আর স্ব স্ব ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন ঘটানোর প্রত্যয় ছিল লক্ষণীয়। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের ডিজাইনকৃত এসব প্রকল্পসমূহ বিস্তর গবেষণার মাধ্যমে আরও আধুনিকায়ন করে বাস্তবায়ন করা গেলে প্রতিটি এলাকায় গড়ে উঠবে পরিবেশবান্ধব স্থাপনা। এতে উৎসাহিত হবে অন্য এলাকার বাসিন্দারাও। সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল বাস্তবায়নে এসব ছোট ছোট উদ্যোগই রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। 

একনজরে প্রশিক্ষণ কর্মশালা যারা ছিলেন-

  • রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া
  • আয়োজক, বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষক ও অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় পর্ব
  • উদ্বোধনী এবং কর্মশালার উদ্দেশ্যমূলক বক্তব্য
  • গ্রিন বিল্ডিং বিষয়ে লেকচার সেশন
  • সাইট ভিজিট 
  • গ্রুপ ডিসকাশন, ওয়ার্ক, ডিজাইন, মডেলিং ও প্রেজেন্টেশন
  • সনদ বিতরণ
  • সমাপনী বক্তব্য।
  • বক্তব্য উপস্থাপনকারী, বিশেষজ্ঞ ও আয়োজক সহায়ক ব্যক্তিবৃন্দ
  • কর্মশালায় দেশের প্রথিতযশা স্থপতি বিশেষ করে গ্রিন আর্কিটেকচার বিষয়ে গবেষণারত শিক্ষক ও প্রশিক্ষকগণ লেকচার, প্রেজেন্টেশন ও ট্রেনিং প্রদান করেন। এ ছাড়া তাঁরা প্রশিক্ষণার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও জবাব দেন। কর্মশালায় যাঁরা ছিলেন-    
  • ড. খন্দকার সাব্বির আহমেদ, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (ভারপ্রাপ্ত), স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) 
  • ড. জেবুন নাসরিন আহমেদ, অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
  • ড. নাজমুল ইমাম, অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
  • ড. মো. আশিকুর রহমান জোয়ার্দ্দার, অধ্যাপক ও সমন¦য়ক, গ্রিন আর্কিটেকচার সেল, স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
  • স্থপতি ফারুক আহমেদ, প্রভাষক, স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
  • স্থপতি মো. মিজানুর রহমান, সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
  • স্থপতি তাসনিম তারিক, সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
  • ড. নাইমা খান, সহযোগী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
  • স্থপতি মাহমুদুল-আল-মুহাইমিন, স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
  • স্থপতি সজল চৌধুরী, সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)
  • অধ্যাপক ড. সাইফুল হক, পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব এনার্জি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
  • জনাব সিদ্দিক জোবায়ের, সদস্য, ¯্রডো
  • আবু হাসনাত মো. মাকসুদ সিনহা, কো-ফাউন্ডার অ্যান্ড এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, ওয়েস্ট কনসার্ন
  • সৈয়দ আজিজুল হক, পিইঞ্জ, প্রেসিডেন্ট, রেইন ফোরাম
  • মনোয়ার হোসেন খান, সিনিয়র অ্যাডভাইজার, জিআইজেড।
  • প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী সংস্থা
  • স্থাপত্য অধিদপ্তর
  • বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স
  • রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)
  • পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (পিডবিøউডি)
  • জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ
  • ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস (আইএবি)
  • হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্স ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই)
  • ঢাকা ওয়াসা
  • বাংলাদেশ ব্যাংক
  • বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন
  • স্যাসটেইন্যাবল অ্যান্ড রিনিউঅ্যাবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (¯্রডো)
  • ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)
  • বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্স অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) 
  • বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)
  • বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লি. (বিটিআই)
  • বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)
  • বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লি. 
  • পরিবেশ অধিদপ্তর
  • বন্ধন ম্যাগাজিন 

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৩তম সংখ্যা, নভেম্বর, ২০১৮

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top