সীমানাপ্রাচীরের গল্প (পর্ব ১)

ছোটবেলায় পড়ার টেবিলে বসে বসে মুখস্থ পড়তামÑ‘চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে দেখা যায় চীনের মহাপ্রাচীর।’ পড়ার সময় মনে হতো, আহ্্ যদি চাঁদে যেতে পারতাম, তাহলে হয়তো চাঁদ থেকে চীনের প্রাচীর দেখতে পেতাম। কিন্তু ভাগ্য খারাপ! কদিন আগে খবর এল, চাঁদ থেকে চীনের প্রাচীর মোটেও দেখা যায় না। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ দেখা গেলেও যেতে পারে। এই তথ্য জানার পর হতাশ হয়ে ভাবলাম, চীনের লোকেরা এত বড় একটা প্রাচীর বানাল আর সেটা মহাকাশের কেউ দেখল না, এতে কি তাদের মন খারাপ হচ্ছে? আমার ধারণা, ওদের এ বিষয়ে কোনো মাথাব্যথাই নেই। তবুও সীমানাপ্রাচীর নিয়ে আমার মাথাব্যথাটা বেড়ে গেল। পড়তে শুরু করলাম বিভিন্ন বই। নিজ আবাসকে সবাই গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করলেও অনেকটা উপেক্ষিত থেকে যায় সীমানাপ্রাচীরের বিষয়টি। অথচ ভবনের সুরক্ষায় সীমানাপ্রাচীর বা বাউন্ডারি ওয়াল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাচীর বানানোর ইতিহাসটা বেশ পুরোনো। এতটাই পুরোনো যে মানুষের সভ্যতার শুরু থেকেই এর বিস্তার। সেই প্রস্থর যুগের পর যখন মানুষ ধীরে ধীরে সভ্য হতে শুরু করল, তখন দুটো ব্যাপার ঘটল। এক. আগুন আবিষ্কার আর দুই. ফসল ফলানো। মানুষের বিকাশের ক্ষেত্রে এই দুটির অবদান অনস্বীকার্য। একই সময় চালু হয় বিনিময় প্রথাও। মানুষ শুধু ফসল ফলানোতেই বসে থাকেনি। তারা বিভিন্ন বস্তু যেমন: কাপড় বা অস্ত্র বিনিময় শুরু করল। আর এর সঙ্গে সঙ্গে প্রচলন ঘটে হিসাবেরও। একজন কৃষকের কয়টা গরু আছে, সেটা যেমন হিসাব করা জরুরি, তেমনি দখলদার দস্যুদের কাছ থেকে সেই গরুগুলোকে রক্ষা করাটাও জরুরি। তাই তারা পাথর মাটিতে ফেলে প্রথম বাউন্ডারি ওয়াল বা সীমানাপ্রাচীর দিল। এটাই মানব ইতিহাসের প্রথম সীমানাপ্রাচীর। এটি মানুষের সম্পদকে চিহ্নিত করা শুরু করল। কার কোন সম্পদ, সেটা রক্ষা করতেও সাহায্য করল। তবে এটা প্রথম কারা দিয়েছিল এটি জানা যায়নি। ইন্দো-ইউরোপীয় সভ্যতা যেহেতু অনেক প্রাচীন, তাই ধরে নেওয়া যায় এই ভারত উপমহাদেশের কোনো এক অঞ্চলে প্রথম সীমানাপ্রাচীর দেওয়া হয়, যা পরে পুরো বিশ^ময় ছড়িয়ে পড়ে। মেসোপটেমিয়া সভ্যতাতে বা এর পরবর্তী বিভিন্ন সভ্যতায় আমরা সীমানাপ্রাচীরের ব্যবহার দেখতে পাই, যেগুলো শুধু উন্নত জাতির লক্ষণই বোঝায় না, একই সঙ্গে স্থাপত্যিক উৎকর্ষেরও বয়ান দেয়।

সীমানাপ্রাচীরের মূল উপজীব্য স্থানীয়ভাবে মজবুত ও টেকসই ম্যাটেরিয়েল। ভারত বা এর আশপাশে যেখানে যা শক্ত ও প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়, তাই দিয়েই বানানো হয়েছে প্রাচীর। সবচেয়ে প্রাচীন প্রাচীর সম্ভবত গাছ। বাড়ি বা সম্পদের চারপাশে বড় বড় গাছ লাগিয়ে দিয়ে সেই এলাকা চিহ্নিত করার পাশাপাশি প্রাচীর দেওয়ার বিষয়টিও রক্ষিত হয়েছে। খুব দ্রুত বর্ধনশীল বাঁশ লাগিয়ে অনেক এলাকায় প্রাচীর দেওয়ার ব্যবস্থা করার বিষয়টি এখনো গ্রামবাংলায় লক্ষণীয়।

প্রাচীনকালের পর পলিলিথিক যুগ বা এর পরবর্তী প্রাক্্-আধুনিক যুগে পাথরকেই ধরে নেওয়া হয়েছে সীমানাপ্রাচীর দেওয়ার জন্য আদর্শ বস্তু হিসেবে। এটি কেন আদর্শ? কারণ, এটি সে সময় ভাঙাটাই ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। সীমানার ভেতর মূল্যবান বস্তুগুলো রেখে দেওয়া এবং সেগুলো পাহারা বসানোর জন্য লম্বা টাওয়ার বসানো শুরু হয় এই সময়েই। ধর্মীয় উৎকর্ষতার যুগে মূল্যবান ধনরত্ন ভান্ডার হতে শুরু করে মন্দিরগুলোও ছিল এর আওতায়। প্যাগানিজম বা হিন্দুমন্দির বা প্রাচীন বৌদ্ধ মঠগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় কী পরিমাণ স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতু এখানে থাকত। আর সেগুলো রক্ষার জন্য গঠন করা হতো স্বেচ্ছাসেবক দল। ওরা স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে পাহারা বসাত, আরেকটি দল সীমানাপ্রাচীর বসাত। এই সীমানাপ্রাচীরের প্রথম দিকে বন্ডিং ম্যাটেরিয়েল হিসেবে চুনের ব্যবহারও দেখা যায়। সেসব প্রাচীন পাথরের দেয়াল এখন আর তেমনটা দেখা যায় না। তবে যে প্রাচীরের কথা না বললেই নয়, সেটি হলো চীনের প্রাচীর, যা মহাপ্রাচীর নামেই খ্যাত। বিশালাকার এই প্রাচীরের কথা আমি শুরুতেই বলেছি। একসময় তো মিথই হয়ে গেল যে মহাকাশ থেকে চীনের প্রাচীর দেখা যায়, যা সুতোর মতো বয়ে গেছে চীন সীমান্তে। এই বিশাল প্রাচীর বানানো হয়েছিল বর্বর দস্যুদের হাত থেকে চীনকে রক্ষা করতে। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ৫০০ বছর আগ থেকে এর বুনন শুরু হয়। এরপর চলতে থাকে ঠিক ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।

চীনের প্রাচীরের ইতিহাস ঘাঁটতে যাব না। শুধু এর আর্কিটেকচারাল ডিটেইলগুলো নিয়ে বলব। চীনের প্রাচীর মূলত বানানোই হয়েছিল শত্রুদের হাত থেকে চীনের তৎকালীন সাম্রাজ্য রক্ষায়। তাই এতে ছিল অনেক লেয়ার। শত্রুদের আক্রমণ কতটা জঘন্য হলে এমন প্রাচীর তৈরি সম্ভব, সেটা চোখে না দেখলে বলে বোঝানো অসম্ভব। এটির গোড়ার দিকের গড় ব্যাস ১০ মিটার। পাহাড়ের পাথুরে পাদদেশে পাথর দিয়েই একটি বেইজ তৈরি করে এর ওপর আবারও বড় পাথরের চাই কেটে কেটে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল তখনকার সময়ের মর্টারের সাহায্যে। এরপর এর কিছু দূর পর টাওয়ার স্থাপন করা হয়। প্রতিটি টাওয়ারে বসানো হয় সৈন্য বাহিনীর অনেক স্তর। কেউ ছিল তিরন্দাজ, কেউ অশ্বারোহী, আবার কেউ-বা রক্ষী। সবাই সার্বক্ষণিকভাবে নজরদারি করেছে এই প্রাচীরে। সব সময় প্রস্তুত থাকতে হতো যুদ্ধের জন্য। প্যারাপেটগুলো কেটে কেটে বসানো হতো যেন তিরন্দাজেরা ভালোভাবে ধনুকের টংকার টেনে ধরে তির ছুড়তে পারে।

এটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ২  হাজার ৬৯৫ কিলোমিটার এবং উচ্চতা ৪ দশমিক ৫৭ থেকে ৯ দশমিক ২ মিটার বা প্রায় ১৫ থেকে ৩০ ফুট। চওড়ায় যা প্রায় ৯ দশমিক ৭৫ মিটার বা ৩২ ফুট। এতগুলো বছর ধরে বিশাল যে কর্মযজ্ঞ, সেই বিশালাকার প্রাচীরের একটি অংশ এখন দারুণ জনপ্রিয়। যেটি খ্রিষ্টপূর্ব ২২০-২০০ এর মধ্যে প্রথম সম্রাট কিং শি উয়ানের আমলে নির্মিত। তবে এটি প্রায় ধবংসপ্রাপ্ত। অবশিষ্ট যে প্রাচীর আমরা দেখতে পাই সেটি মিং রাজবংশের আমলে নির্মিত।

তবে দুঃখের বিষয় হলো, এই প্রাচীর নির্মাণ করে কোনো লাভ হয়েছে বলে মনে হয় না। প্রায়ই মঙ্গোলীয় দস্যুরা এটি ভেঙে ঢুকে পড়ত। এখনো এর অনেক অংশ ভাঙা অবস্থায় রয়েছে। ঐতিহ্য হিসেবে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে বটে। কিন্তু অতিরিক্ত ভাঙা অংশগুলো ওভাবেই রেখে দেওয়া রয়েছে। বিশালাকার ও প্রায় ২ হাজার ১০০ বছর ধরে যে প্রাচীর বানানো হয়েছে, সেই প্রাচীর সীমানাপ্রাচীরের ইতিহাসে বিশেষ একটি স্থান দখল করে আছে বলতেই হয়।

কিন্তু সীমানাপ্রাচীর মানেই তো সৈন্যসামন্ত-তিরন্দাজে ভর্তি হবে এমনটা নাও তো হতে পারে! ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি যখন নালন্দা বিহারের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি দেখলেন বিশালাকারের দেয়াল। এত বড় দেয়াল তিনি জীবনেও দেখেননি। ইতিহাস বলে বিশালাকার এই দেয়ালের পাশে ও ওপরে তিনি কোনো সৈন্য বা প্রহরীকে দেখতে পাননি। বিখ্যাত পরিব্রাজক হুয়ান জাং-এর লেখায়ও এর বর্ণনা পাওয়া যায়। নালন্দায় অনেক সুন্দর ব্যবস্থা ছিল। উত্তর পাশে ছিল সব ক্লাসরুম, পশ্চিমে ছিল মঠ। এভাবেই গড়ে উঠেছিল বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে সারা পৃথিবী থেকে ছাত্ররা বিদ্যা শিক্ষার জন্য আসত। এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার প্রাচীর ছিল একেবারেই সৈন্যসামন্তহীন। ফলে বারবার একে আক্রমণ করা হয়েছে। আক্রান্ত নালন্দা বারবার পুনর্গঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু পারেনি। শেষে একে ধ্বংস করা হয়েছে। তুুর্কি সৈন্যরা একে ধ্বংস করতে পেরেছিল এর দেয়ালের চারপাশে কোনো পরিখা খনন করা ছিল না বলেই। তাই প্রাচীর বানিয়েই ক্ষ্যান্ত হলে চলবে না। একে রক্ষা করার ব্যবস্থাও করার প্রয়োজন বৈকি, যা আজকের দিনেও লক্ষ করা যায়। সাধারণ চোর-ছ্যাচড় যাতে প্রাচীর বেয়ে সীমানা টপকে যেতে না পারে, তাই দেওয়া হয় বিশালাকার কাঁটা। হালে শাহবাগের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ব্যবহার করা হয়েছে এমন কাঁটা। এত সূক্ষ্ম এসব কাঁটা যে কেউ পার হতে গেলেই তার ইহকাল হবে পরকাল সামান্য ভুলেই। আবার পাখিদের কথাও ভাবা হয়েছে। পাখিদের কথা চিন্তা করে দেওয়া হয়েছে ‘বার্ড গার্ড’। এতে পাখিরা দেয়ালের ওপর বসে দেয়াল নষ্ট করার চিন্তাও করতে পারবে না। এসব আধুনিক চিন্তাভাবনা প্রাচীনকালে প্রাপ্ত সেই সব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান, তা কি আর বলতে?

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১১তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৯।

স্থপতি রাজীব চৌধুরী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top