আপনার হাতের ফোনটি কিংবা বাড়ির টিভিটি স্মার্ট হয়েছে অনেক দিনই। এর বাইরে ঘড়ি, ট্যাব, ক্যালেন্ডার, ক্যামেরা আরও কত কিছুই না স্মার্টের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। তাহলে আর ভবন বাকি থাকবে কেন? না, ভবন পিছিয়ে নেই। ভবনও স্মার্ট হয়েছে সেও অনেক দিন হলো। স্মার্ট ভবন বলতে আসলে আমরা কী বুঝি? সাধারণভাবে স্মার্ট ভবন হচ্ছে এমন অবকাঠামো, যেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভবনের দেখভাল করার ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন: এর তাপমাত্রা, ভেন্টিলেশন, আলোক নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, ইলেকট্রিসিটি মতন যাবতীয় বিষয়। আর এটা করা হয় সেন্সর, মাইক্রো চিপস ইত্যাদির মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ ও সেই মতে ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে। এই ধরনের ব্যবস্থাপনা ভবনের মালিক, বাসিন্দা বা ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গকে ভবনের সব ধরনের রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে এর পরিবেশ, সময়ের সদ্ব্যবহার, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা কিংবা কর্মতৎপরতার ব্যাপারে নিশ্চিত রাখে। কেননা ভবন নিজেই জানে তার কী সমস্যা এবং সেই সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান কী হতে পারে। তাই বলে স্মার্ট ভবন আর ইন্টেলিজেন্ট ভবনকে গুলিয়ে ফেলবেন না। এর মধ্যে সূক্ষ্ম কিছু পার্থক্য রয়েছে। অবশ্য এদের কার্যপদ্ধতিতে এত বেশি মিল যে দুইটি টার্মকে মিলিয়ে ফেললে খুব বেশি দোষ দেওয়া যাবে না।
ইন্টেলিজেন্ট ভবনকেও প্রায়ই স্বয়ংক্রিয় ভবন বলা হয় (স্মার্ট ভবনের মতো)। ভবনের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা হচ্ছে এমন ব্যবস্থা, যেখানে কেন্দ্রীয় ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিল্ডিংয়ের শক্তি ব্যবস্থাপনা (Energy Systems) তথা-তাপমাত্রা, বায়ু ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ চলাচল, আলো ব্যবস্থাপনাÑ সবকিছুই চলে। ভবনকে স্বয়ংক্রিয় করার উদ্দেশ্যই হচ্ছে এতে বাইরের সাহায্যের যাতে প্রয়োজন না হয়, আর সেই সঙ্গে কম খরচে অত্যন্ত কার্যকর এক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়, যেখানে শক্তির অপচয়ও হয় কম।
এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় কম্পিউটারের নেটওয়ার্ক সিস্টেম ব্যবহার করে ভবনের সব ধরনের ব্যবস্থা নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ভবনের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা থেকে নিরাপত্তা সবকিছুই এর আওতাধীন। এটি ভবনের আবাসনব্যবস্থা, তাপমাত্রা, কাজের ধরন ইত্যাদি থেকে নিয়মিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সেই মতে কাজ করে। সাধারণত এ ধরনের ব্যবস্থাপনায় শক্তি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় উভয়ই হয় কম।
স্মার্ট ভবনকে এই ধরনের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনার একটি শাখা বা পরিবর্ধিত রূপ বলা যেতে পারে। প্রথাগত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনার মতো স্মার্ট ভবনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে যতটা সম্ভব এর কার্যকারিতা বাড়িয়ে ব্যয়ভার কমানো। যদিও স্মার্ট ভবনের নেটওয়ার্ক সিস্টেমের পাশাপাশি কিছু অতিরিক্ত যন্ত্রপাতি আর আলাদা নিয়ন্ত্রকের ব্যবস্থাও করা হয়। যেমন: অনেক সময় স্মার্ট ফোন বা রিমোটের সাহায্যে বাইরে থেকেও এর নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা করা হয় কিংবা সফটওয়্যারের কাস্টমাইজেশনের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট কাজের নির্দেশ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে।
একটি স্মার্ট ভবন সাধারণভাবে যে যে বিষয়ের আওতাধীন-
- একটি যোগাযোগের মাধ্যম বা নেটওয়ার্ক
- সংযোগকারী সেন্সর
- ডোমেস্টিক অ্যাপ্লাইয়েন্স
- আনুষঙ্গিক বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি।
যা কি না সহজেই দূরনিয়ন্ত্রক বা রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে এর ব্যবহারকারীর প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম।
অন্য কথায় এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভবনে কোথাও আগুন লাগলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ, লিফটের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা, শীতাতপব্যবস্থার দেখভাল করা, ভবনের আলো ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, ভবনের প্রবেশপথসহ অন্যান্য দরজা ও নির্গমন পথের নিরাপত্তা, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ইত্যাদির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, যেকোনো যন্ত্রের ত্রুটি ও অবস্থার পর্যবেক্ষেণসহ সেইমতে তথ্যের সরবরাহ করা।
এখন আসা যাক কীভাবে একটি ভবনকে স্বয়ংক্রিয় বা স্মার্ট বানাবেন। ভবন অটোমেশন সিস্টেম যেকোনোভাবেই করা যায়। ভবন তৈরির প্রাথমিক সময়ে কিংবা ভবন প্রস্তুতির পরবর্তী সময়ে। একটি স্মার্ট ভবনের পাঁচটি প্রধান উপাদান থাকে-
১. সেন্সরস
সেন্সরের কাজ হলো ভবনের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, সেখানে বসবাসরত প্রাণীর সংখ্যা, আলোর পর্যাপ্ততা ও অন্যান্য বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা। সেন্সরস এই তথ্য কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক যন্ত্রের কাছে প্রেরণ করে।
২. নিয়ন্ত্রক বা কন্ট্রোলার
কন্ট্রোলার মূলত ভবন অটোমেশন সিস্টেমের মগজস্বরূপ। এটি সেন্সরস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এবং সেই মতে, প্রতিটি ইউনিটে নির্দেশ পাঠায়।
৩. আউটপুট ডিভাইস
কন্ট্রোলার থেকে যখন কোনো নির্দেশ আসে তখন সেটি কার্যে পরিণত করার দায়িত্ব হচ্ছে আউটপুট ডিভাইসের। যেমন: প্রয়োজন হলে এটি ভবনের কোনো নির্দিষ্ট জায়গার তাপ বাড়াবে বা কমাবে, কোথাও হয়তো বাতি জ্বালাতে হবে অথবা ফ্যান বন্ধ করতে হবে এ ক্ষেত্রে এটি দারুণ কার্যকর।
৪. কমিউনিকেশন প্রটোকল
ভবন অটোমেশন সিস্টেমে সাধারণত বিশেষ ধরনের নির্দিষ্ট ভাষা ব্যবহার করা হয়, যার নির্দেশনা সিস্টেমে ব্যবহৃত প্রতিটি যন্ত্রই বুঝতে সক্ষম। BAC net এবং Modbus এই দুটি হচ্ছে সব থেকে বেশি ব্যবহৃত যোগাযোগ মাধ্যম।
৫. টার্মিনাল ইন্টারফেস
ভবন অটোমেশন সিস্টেমের সঙ্গে এর ব্যবহারকারী টার্মিনাল ইন্টারফেসের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারে। এতে সিস্টেমের সব তথ্য প্রদর্শিত হয় যেন ব্যবহারকারী সহজেই পুরো চিত্রের ধারণা পেতে পারে; ভবনের সামগ্রিক অবস্থা কী, কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে অথবা কোনো কিছুর পরিবর্তন/পরিবর্ধন করতে হবে কি না ইত্যাদি।
টার্মিনাল ইন্টারফেস কার্যকরী ভবন অটোমেশন সিস্টেমের জন্য খুবই গুরত্বপূর্ণ। এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে যাঁরা থাকবেন তাঁদের এগুলো জানা খুব জরুরি যে সেন্সরস কী ধরনের তথ্য সরবরাহ করছে, কোথাও কোনো ত্রুটি বা গোলযোগ দেখা দিচ্ছে কি না, কোথাও কোনো সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে কি না কিংবা সবকিছু পরিকল্পনামাফিক চলছে কি না। তাই টার্মিনাল ইন্টারফেসটি যদি যথাযথভাবে ডিজাইন করা না হয় তাহলে স্মার্ট ভবনের কার্যকারিতা অনেকাংশেই ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
ভবন অটোমেশন সিস্টেমের প্রাথমিক কাজ হচ্ছে ভবনের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ, বায়ু চলাচলের হার নির্ধারণ, আলোর পর্যাপ্ততা নিশ্চিতকরণের সঙ্গে সঙ্গে ভবনের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য বিষয়ের দেখভাল করা। এ ছাড়া ভবন অটোমেশন সিস্টেম প্রতিটি যন্ত্রের অবস্থা কীরূপ সেটি নির্ণয় করেও এর ব্যবহারকারীকে জানায়। এমনকি পরিস্থিতি অনুযায়ী সম্ভব হলে কোনো মানুষের সাহায্য ছাড়াই এটি নির্দিষ্ট কিছু সমস্যার সমাধানও করে দিতে পারে। সার্বক্ষণিক স্বয়ংক্রিয় নজরদারির কারণে অনেক সমস্যার শুরুতেই সমাধান করা সম্ভব; এর ফলে ব্যয়সাশ্রয়ের পাশাপাশি এর কার্যকারিতাও বাড়ে।
এখন দেখা যাক ভবন অটোমেশন সিস্টেমে ব্যবহৃত সেন্সরস কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। সব থেকে বেশি ব্যবহৃত সেন্সরস ডেটা বা তথ্য হচ্ছে একটি ভবনের শীতাতপব্যবস্থার তথ্য সংগ্রহ করা। এটি শুধু ভবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তা-ই নয়, বরং আবহাওয়ার জন্যও সমান গুরুত্ববহ। ভবনে ব্যবহৃত তাপনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি পরিবেশের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না সেটা নিশ্চিত করাও নাগরিক দায়িত্ব। এ ছাড়া ভবনের ভেতরের এবং বাইরের বাতাসের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করাও সেন্সরের অন্যতম কাজ। বাতাসের আর্দ্রতা পরিমাপ করে সেই মতে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করার কাজটিও সেন্সর করে থাকে।
প্রেশার এবং কেমিক্যাল সেন্সরস বাতাসের পরিশুদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য মেকানিক্যাল ইস্যু দেখভাল করে। সিকিউরিটি সিস্টেম সেন্সরের মোশন বা গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ভবনে কোনো অনুপ্রবেশের ঘটনা চিহ্নিত করে। সিস্টেমের কোথাও কোনো অসংগতি চিহ্নিত হলে বাতি বা অ্যালার্মের মাধ্যমে সেটির সতর্কসংকেত দেওয়া, কাজ শেষ হলে সেটি আগের অবস্থায় দেখানোÑএসবই সেন্সরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
একটি স্মার্ট ভবনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে সতর্কতা জরুরি। যেমন-স্থাপত্য, পরিবেশ ও মানুষের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে স্থানীয় প্রচলিত কিংবা অনুমোদিত নিয়মকানুনের কোনো বিরোধ আছে কি না দেখে নেওয়া। যেমন: কোনো কোনো দেশে ১১০ ভোল্ট এবং কোথাও ২২০ ভোল্ট হচ্ছে আদর্শ। কোথাও হয়তোবা ভারী বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার একেবারেই নিষিদ্ধ।
সর্বোপরি আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কোনো কিছুই আমাদের করা উচিত নয়। আমাদের বাড়ি, গাড়ি, ফোন, ঘড়ি ব্যবহারে আমরা যতই স্মার্ট হয়ে উঠি না কেন, পরিবেশ রক্ষা আমাদের প্রধান দায়িত্ব। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই পরিবেশ সুরক্ষা একান্ত প্রয়োজন।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১০০তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৮।