সড়ক নির্মাণে অনন্য এক উপকরণ বিটুমিন। বিশে^র অধিকাংশ সড়ক নির্মিত হয়েছে এই উপকরণেই। সড়ক ছাড়াও স্থাপনা ও অবকাঠামোর বিভিন্ন প্রয়োজনে বিটুমিন বেশ কার্যকরী। আঠালো, সিলকারক ও পানিরোধী উপকরণ হিসেবে হাজার হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে বিটুমিন। অ্যাসফল্ট নামেও বিটুমিন বিশ^ব্যাপী পরিচিত।
বিটুমিন একধরনের কালো তথা ধূসর রঙের (কঠিন, হালকা তরল, আঠালো) পদার্থ। বিটুমিন কঠিন ও অর্ধতরল অবস্থায় প্রকৃতিতে পাওয়া যায়। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বিটুমিন ন্যাচারাল অ্যাসফল্ট, রক অ্যাসফল্ট, লেক অ্যাসফল্ট কিংবা অয়েল স্যান্ড নামেও পরিচিত। প্রাকৃতিক কিছু লেকে বিটুমিন অর্ধতরল অথবা শৈল আকারে পাওয়া যায়। এসব লেকের মধ্যে অন্যতম-ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর পিচ লেক আর ভেনেজুয়েলার লেক বার্মাডেজ। এসব হ্রদে তরল পেট্রোলিয়াম হাজার হাজার বছর ধরে শুকানোর ফলে তা কঠিন আকার ধারণ করেছে। কঠিন শৈল গরম করলে আস্তে আস্তে তা তরল দ্রবণে পরিণত হয়। কঠিন শৈল হ্রদ থেকে সংগ্রহের পর তা পরিশোধন করা হয়। কারণ, বিটুমিনে অনেক রকম অপদ্রব্য মিশে থাকে, যেমন মৃত পশুর অবশেষ, গাছের টুকরো, বালু, কাদা-মাটি, পাথর প্রভৃতি। পরিশোধন করেই ব্যবহার উপযোগী বিটুমিন পাওয়া যায়। কানাডা, সৌদি আরব, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়াসহ দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে প্রাকৃতিক খনি ও হ্রদ থেকে শৈল বিটুমিন পাওয়া যায়। কানাডায় রয়েছে বিশ্বের প্রাকৃতিক বিটুমিনের সবচেয়ে বড় মজুত।
অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম থেকেও প্রচুর পরিমাণে বিটুমিন সংগ্রহ করা হয়। খনিজ পেট্রোলিয়াম পরিশোধনের মাধ্যমেই পাওয়া যায় এ উপকরণটি। খনিজ পেট্রোলিয়াম থেকে পেট্রল, কেরোসিন, ডিজেল, গ্যাসোলিন ইত্যাদি সংগ্রহের পর যে উদ্বায়ী পদার্থ অবশিষ্ট থাকে, সেটাই মূলত বিটুমিন। প্রক্রিয়াগত পার্থক্য সৃষ্টির মাধ্যমে আলাদা আলাদা গুণ-মানের বিটুমিন উৎপন্ন করা হয়। একে প্রয়োজনমতো গাঢ় বা হালকাও করা যায়। যেসব ক্ষেত্রে সরাসরি অপরিশোধিত বিটুমিন ব্যবহার সম্ভব নয়, সে ক্ষেত্রে বিটুমিনের সঙ্গে উপযোগী উদ্বায়ী পদার্থ মিশিয়ে তা তরল ও মসৃণ করে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। বিটুমিন ১৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত হতে শুরু করে। ৩০০ ডিগ্রি থেকে ৩৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে তাতে আগুন ধরে।
সাধারণত পেট্রোলিয়াম বিটুমিনকে অ্যাসফল্ট বলা হলেও বিশে^ও অনেক স্থানে অ্যাসফল্ট কিছুটা ব্যতিক্রম। অ্যাসফল্ট আসলে নুড়িপাথর, বালু, ফিলার আর বিটুমিনের সংমিশ্রণ। অনেকে আবার পেট্রোলিয়াম বিটুমিনকে আলকাতরার সঙ্গেও গুলিয়ে ফেলেন। যদিও বিটুমিন ও কয়লার আলকাতরা দেখতে কালো রঙের আঠালো কিন্তু উভয়ই উৎপত্তিগত দিক, রাসায়নিক মিশ্রণ এবং উপাদানগত দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। উষ্ণ কয়লাকে অতি উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ালে এবং বাই প্রোডাক্ট হিসেবে কোল টার উৎপন্ন হয়। বিটুমিনকে কখনো কখনো পেট্রোলিয়াম পিচ মনে করে অনেকে বিভ্রান্ত হন। যদিও উভয়ই ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল থেকে প্রস্তুত, তবে তা ভিন্ন প্রক্রিয়ায়। এদের রাসায়নিক গঠনও ভিন্ন। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমা-বাড়ার ওপরেই এ উপকরণটির মূল্য নির্ধারিত হয়।
বিটুমিনে বেশ কিছু রাসায়নিকের মিশ্রণ লক্ষণীয়। অধিকাংশ বিটুমিনেই যুক্ত থাকে সালফার। এ ছাড়া রয়েছে অন্যান্য বিষাক্ত উপাদানের মতো বেশ কয়েকটি ভারী ধাতু ও রাসায়নিক। এর মধ্যে অন্যতম-
- কার্বন
- নিকেল
- ভ্যানডিয়াম
- লেড
- ক্রোমিয়াম
- মারকারি
- আর্সেনিক
- সেলেনিয়াম
- হাইড্রোজেন
- নাইট্রোজেন
- অক্সিজেন
- আয়রন
- ম্যাঙ্গানিজ
- ক্যালসিয়াম
- ম্যাগনেশিয়াম
- সোডিয়াম।
ব্যবহার শুরু যেভাবে
সুপ্রাচীন কাল থেকেই পানিরোধী উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রাকৃতিক বিটুমিন। বিশে^র বিভিন্ন অবকাঠামো ও উপকরণে বিটুমিন ব্যবহারের অস্তিস্ত পাওয়া গেলেও সবচেয়ে প্রাচীনতম ব্যবহারের নমুনা পাওয়া যায় সিন্ধু সভ্যতায়। প্রায় ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বে গড়ে ওঠা এ সভ্যতার মহেঞ্জোদারো নগরের গ্রেট বাথ নামক জলাধারটিকে ওয়াটারপ্রুফ করতে এই উপকরণটি ব্যবহৃত হয়। ব্যাবিলনের দেয়াল তৈরির মর্টার হিসেবে ব্যবহৃত হতো গরম বিটুমিন, গ্রিক দার্শনিক হেরোডোটাসের লেখনীতে এমনটাই উল্লেখ রয়েছে। রানী সেমিরামিস (৮০০ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দ)-এর সময় ব্যাবিলনের ইউফ্রেটিস নদীর নিচ দিয়ে ১ কিলোমিটার (০.৬২ মাইল) দীর্ঘ ইউফ্রেটাস টানেলে জলরোধক এজেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এ উপকরণটি। পরে নৌযান, রাস্তা ও স্থাপনায় হরহামেশায় ব্যবহৃত হতো বিটুমিন। এ ছাড়া অয়েল পেইন্টিংসহ অন্যান্য ছবি আঁকার কাজেও বিটুমিন ব্যবহারের প্রমাণ মেলে। বিভিন্ন শিল্পকর্মে যেমন, হাতির দাঁতে রত্ন পাথর বসাতে বিটুমিন ছিল বেশ কার্যকর।
বিটুমিনের ব্যবহার ক্ষেত্র
সড়কে বাইন্ডিং এজেন্ট হিসেবে বিটুমিন/অ্যাসফল্ট ব্যবহার শুরু হয় বিগত শতাব্দীর শেষ দিকে। কিন্তু পরে এই জায়গাটি দখল করে নেয় রিফাইনড বিটুমিন। বিশে^র বেশির ভাগ বিমানবন্দরের রানওয়ে নির্মিত হয়েছে বিটুমিনে। এ ছাড়া নানা কাজে ব্যবহার করা হয় এ উপকরণটি। যার মধ্যে অন্যতম-
- সড়ক তৈরিতে
- সড়কের কার্পেটিংয়ের কাজে
- বিমানবন্দরের রানওয়ে নির্মাণে
- বাড়ির ছাদে
- বার্নিশ করতে
- কোল্ড স্টোরেজ তৈরিতে
- ইলেকট্রনিক ব্যাটারি
- রেফ্রিজারেটর
- গাড়ি পার্কিং জোন
- টেনিস কোর্ট
- বাঁধ
- জলাধার এবং পুল লাইনিং
- স্থাপনায় রঙের বিকল্প হিসেবে।
বিটুমিনের ব্যবহারের উপযোগিতা
বিটুমিনের ব্যবহার বৈচিত্রতা থাকলেও প্রধানত তা ব্যবহৃত হয় সড়ক নির্মাণের জন্যই। এমনকি বিশে^র বেশির ভাগ বিমানবন্দরের রানওয়ে নির্মিত হয়েছে বিটুমিনে। এই উপকরণটির আরও যেসব উপযোগিতা রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে-
- সড়কপৃষ্ঠের ওপর স্মুথলি বা সাবলীলভাবে গাড়ি চলাচল নিশ্চিত করে
- ড্রেন বা নালার পানি ও বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনে সাহায্য করে
- ড্যামপ্রুফ এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা যায়
- বাসাবাড়ির ছাদ, নৌকা, পানির ট্যাঙ্ক, নদী ও সমুদ্রের তটরেখা সিল বা পানিরোধী করতে
- শব্দরোধক ঘর তৈরিতে
- বিদ্যুৎরোধক হিসেবেও এটা বেশ কার্যকরী
- বৃক্ষের জীবাশ্ম এবং পশুর ফসিল সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে।
বিটুমিন প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
বাংলাদেশে প্রাকৃতিকভাবে বিটুমিন পাওয়া যায় না। তবে তা উৎপাদিত হয়। ব্যবহারক্ষেত্রও ব্যাপক। দেশে একমাত্র বিটুমিন উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি। এই প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত হয় ৮০/১০০ এবং ৬০/৭০ গ্রেডের বিটুমিন। দেশে বছরে বিটুমিনের মোট চাহিদা ১ লাখ ৮০ হাজার টনের মতো। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন করে ৭০ হাজার টন। অবশিষ্ট বিটুমিন মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়।
দেশের সড়ক-মহাসড়কের উন্নয়ন টেকসই করতে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সাধারণত ৬০/৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহার করে থাকে ও ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় দেখা যায়। একশ্রেণির ঠিকাদার রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একশ্রেণির কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অপেক্ষাকৃত কম দামের ৮০/১০০ গ্রেডের নিম্নমানের বিটুমিন সড়কে ব্যবহার করে। অপেক্ষাকৃত পাতলা এই বিটুমিন ব্যবহার করলে তা গরমে দ্রুত গলে যায়, সড়কের উপরিভাগে ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। এতে গরমকালে সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ বাড়ে। আবার বর্ষকালে বৃষ্টিতে সড়কের পিচ উঠে গিয়ে দ্রুত গর্তের সৃষ্টি হয়।
বিটুমিনের বিকল্প
বিটুমিনের নানা উপযোগিতা থাকলেও তা পরিবেশবান্ধব উপকরণ নয়। বিটুমিনে ব্যবহৃত কালো রঙের পিচ সাধারণত অশোধিত পেট্রোলিয়ামের উচ্ছিষ্ট বা বর্জ্য। এতে পরিবেশ ও মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বিষাক্ত হাইড্রোকার্বন থাকে। পিচ উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং ব্যবহারের সময় বাতাসে প্রচুর হাইড্রোকার্বন ছড়ায়। আর এই বিষাক্ত উপাদান পাথরে মিশিয়ে সড়ক নির্মিত হয়। অথচ এটা সবার অগোচরেই এর পুরো জীবনকালেই মানবদেহ, প্রাণিকুল ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সূর্যের তাপে প্রায় সব সময়ই পিচ থেকে বিষাক্ত হাইড্রোকার্বন নির্গত হয়। তা ছাড়া বৃষ্টির পানিতে পিচ ধোঁয়া পানি যখন ফসলি জমিতে মেশে তখন ফসল, মাছসহ জলাভূমির বিভিন্ন প্রাণীর ওপরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
বিশ্বে বিটুমিনের চাহিদা বছরে ১০০ মিলিয়ন টন, যা প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ব্যারেল ব্যবহৃত হয়। বিটুমিন পানিতে শক্তি হারায়। বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, বিটুমিন সড়ক গাড়ির জ্বালানি খরচ বাড়িয়ে দেয় এবং টায়ারের প্রচুর ক্ষয় সাধন করে। তা ছাড়া ভঙ্গুর সড়কগুলো যানবাহনের কাঠামোর আয়ু কমিয়ে দেয়, যার সবটাই অর্থনৈতিক ক্ষতি। এ ছাড়া সড়ক নির্মাণকারী শ্রমিকদের নানা সমস্যার বিষয়টি আড়ালেই থেকে যায়। যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রায়ই গরম পিচে তাঁদের শরীরের বিভিন্ন অংশ দগ্ধ হয়। তা ছাড়া দীর্ঘদিন যাঁরা সরাসরি সড়ক নির্মাণের সঙ্গে জড়িত, তাঁরা ক্যানসারসহ নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভোগেন। এগুলোর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ত্বকের রোগ, কফ, অস্থিরতা, গলা ও চোখের সমস্যা, ক্ষুধামান্দ্য অন্যতম।
গ্রিনহাউজ গ্যাসের কারণে বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষণীয়। প্রতিনিয়তই বাড়ছে পৃথিবীর উত্তাপ। বিটুমিনে নির্মিত সড়কগুলোও এই উষ্ণতা বৃদ্ধিতে রাখছে ভূমিকা। কালো রঙের সড়ক সৌর কিরণ থেকে শোষণকৃত তাপ বায়ুমন্ডলে ছেড়ে দেয়, যা শহরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এ জন্য বিকল্প হিসেবে বিশে^র অনেক স্থানেই সড়ক নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে কংক্রিট, যা কংক্রিট বা রিজিট পেভমেন্ট নামে পরিচিত। এ ছাড়া বিটুমিন উৎপাদনে ও পরিবেশের ক্ষতি করায় বিকল্প পদ্ধতিতে উৎপাদনের প্রচেষ্টা চলছে। বিটুমিন এখন অ-পেট্রোলিয়াম রিনিউঅ্যাবল উপকরণ যেমন চিনি, গুড়, চাল, ভুট্টা ও আলুর গাদ থেকে তৈরি হচ্ছে। ব্যবহৃত মোটর তেলের আংশিক পাতন দ্বারা বর্জ্য পদার্থ থেকেও চলছে বিটুমিন তৈরির প্রক্রিয়া।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০২তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৮