নির্মাণে অধুনা অনুষঙ্গ 

এমএস স্টিল প্রসঙ্গ

নগরায়ণের এই যুগে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটছে স্থাপনা ও অবকাঠামোতে। ক্রমেই বদলে যাচ্ছে নির্মাণের ধরন। নির্মিত হচ্ছে বিশাল বিশাল অট্টালিকা, উড়াল সেতু, কালভার্ট, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসহ নানা অবকাঠামো। এসব স্থাপনার প্রায় সিংহভাগই নির্মিত হয় কংক্রিটে। নির্মিতব্য ভবনের বিভিন্ন স্তরেই প্রয়োজন হয় দৃঢ় সাপোর্ট। একই সঙ্গে প্রয়োজন দ্রুত তম ও নিরাপদ নির্মাণ নিশ্চিত করা। এই নিরাপত্তা যেমন ভবনের ক্ষেত্রে, তেমনি নির্মাণশ্রমিকেরও। শাটারিং, স্কাফোল্ডিং, শোরিং ও রিটেইনিং ওয়াল স্থাপনার পাশাপাশি শ্রমিকের নিরাপত্তা বা সাপোর্ট প্রদান করে। আর উল্লেখিত এ কাজের জন্য সবচেয়ে কার্যকর অনুষঙ্গ প্রসঙ্গ।  

প্রকৌশলের কাজে প্রসঙ্গের জুড়ি মেলা ভার। বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ, মেরামত, ফিনিশিং আর পেইন্টিংয়ের মতো কাজে প্রয়োজন স্কাফোল্ডিংয়। এটা একধরনের অস্থায়ী কাঠামো, যা বিভিন্ন ধরনের বড় নির্মাণস্থলে বা সাইটে কিংবা যেকোনো ধরনের স্থাপনার মেরামত বা সংস্কারের সময় তৈরি করা হয়। স্কাফোল্ডিংয়ের মাধ্যমে নির্মাণকৃত অস্থায়ী কাঠামো একজন নির্মাণশ্রমিককে যেকোনো উচ্চতায় কাজ করার সুযোগ করে দেয়। তদুপরি এটা নির্মাণশ্রমিকদের যথাযথ নিরাপত্তা প্রদান করায় কাজে নির্মাণশ্রমিকেরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। 

মজবুত ভবন নির্মাণের জন্য মাটির বেশ গভীরে স্থাপন করতে হয় ফাউন্ডেশন। সে কারণেই করা হয় মাটি খনন। ফলে আশপাশের ভবন হয়ে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ। আবার অনেক পুরোনো স্থাপনা রয়েছে, যেগুলো সময়ের ব্যবধানে হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ! যা যেকোনো সময়ই ভেঙে পড়তে পারে। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজন তা ভেঙে নতুন ভবন করা অথবা রেট্রোফিটিংয়ের মাধ্যমে স্থায়িত্ব বাড়ানো। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে যদি তা করা না যায় তাহলে সাময়িকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোকে অস্থায়ীভাবে সাপোর্ট দেওয়া গেলে রক্ষা করা সম্ভব স্থাপনাটি; রোধ করা যাবে জীবনহানি ও এর পার্শ্বস্থ অন্যান্য স্থাপনা। সে লক্ষ্যেই সাময়িকভাবে বিপদগ্রস্ত কাঠামোকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য যে অস্থায়ী কাঠামো নির্মাণ করা হয়, তাকেই শোরিং বলে। এই শোরিংয়ের কাজের জন্যও প্রয়োজন প্রসঙ্গ। 

স্থাপনা নির্মাণে এর বিভিন্ন নির্মিতব্য অংশ যেমন বিম, কলাম, স্ল্যাব ইত্যাদি। ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার এগুলোর ডিজাইন করে নির্দিষ্ট কিছু মাপ বা আকার নির্ধারণ করে দেন। এগুলো নির্মাণ করা হয় রডের ফ্রেম ও কংক্রিট দিয়ে। কংক্রিট যেহেতু সদ্য মিশ্রিত অবস্থায় অর্ধতরল একটি পদার্থ। তাই একে ধরে রাখার জন্য একটি ধারকের প্রয়োজন। আর এই কাজটি করা হয় শাটারিং দ্বারা। 

শাটারিং একটি অস্থায়ী ছাঁচ, যা ঢালাইকৃত কংক্রিটকে পর্যাপ্ত শক্তি অর্জন করা পর্যন্ত নির্দিষ্ট স্থানে ধরে রাখে। শাটারিং কংক্রিট স্ট্রাকচারকে অস্থায়ী সাপোর্ট প্রদান করে। শাটারিংকে সাধারণত সেন্টারিং ও ফর্মওয়ার্কও বলা হয়। বিম, কলাম বা স্ল্যাবের মাপ অনুযায়ী শাটারিংয়ের ফ্রেম প্রস্তুত করা হয়। এরপর এর মধ্যে ঢালা হয় কংক্রিট। তবে বিম, স্ল্যাবের ক্ষেত্রে ঝুলন্ত অংশসমূহের জন্য শাটারিংগুলোকে ধরে রাখার জন্য বাঁশ বা লোহার খুঁটির সাহায্যে ঠেকনা (ঝঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ) দেওয়া হয়। মূলত এই ঠেকনা দেওয়ার জন্যই ব্যবহৃত হয় প্রসঙ্গ। 

শাটারিং বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন- 

  • কাঠের শাটার
  • স্টিলের শাটার
  • প্লাইউড শাটার
  • জিপসাম বোর্ড শাটার
  • প্লাস্টিক শাটার।

কাঠের শাটার

কাঠের শাটার বহুল ব্যবহৃত এবং সর্বত্র পাওয়া যায়। এই শাটার কাঠের তক্তা, ব্যাটেন, স্ট্রাটস ও রানার ব্যবহারে তৈরি। এই শাটার করতে সাধারণত ১ থেকে ১.৫ ইঞ্চি কাঠের তক্তা ১ ইঞ্চি দ্ধ ১.৫ ইঞ্চি কাঠের ব্যাটেন ও ২ ইঞ্চি দ্ধ ৩ ইঞ্চি কাঠের রানার ব্যবহার করা হয়। কাঠের শাটারে খাড়া ও আড়াআড়ি খুঁটি হিসেবে বাঁশ ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে সর্বত্র কাঠের শাটার ব্যবহার করা হয়।

স্টিল শাটার

স্টিল শাটার অ্যাঙ্গেল, টিউব, জয়েন্ট ফ্লাট, প্লেট এমএস প্লেট ইত্যাদি দ্বারা তৈরি করা হয়। স্টিল শাটারে ১৬‍ ংমি থেকে ১০ ংমি স্টিল প্লেট ব্যবহার করা হয়। ১.৫ ইঞ্চি দ্ধ ১.৫ ইঞ্চি অথবা ২ ইঞ্চি দ্ধ ২ ইঞ্চি অ্যাঙ্গেল ব্যবহার করা হয়। স্টিল শাটারে খাড়া এবং আনুভ‚মিক সাপোর্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয় স্টিল প্রসঙ্গ (চৎড়ঢ়ং)। একে অ্যাডজাস্টঅ্যাবল প্রসঙ্গও বলা হয়। সাধারণত এই প্রপ্স তৈরি হয় এমএস (মাইল্ড স্টিল) স্টিলে। 

মাইল্ড স্টিল একধরনের হালকা ইস্পাত। মূলত এটা একধরনের কার্বন ইস্পাত, যেখানে কার্বনের পরিমাণ থাকে কম। লো কার্বন স্টিল নামেও এই স্টিল পরিচিত। তবে কার্বনের মাত্রা প্রাপ্ত উৎসের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। ওজনের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত এই মাইল্ড স্টিলে কার্বনের পরিমাণ ০.০৫ থেকে ০.২৫ শতাংশ হয়ে থাকে, যেখানে উচ্চ কার্বন স্টিলে থাকে ০.৩০ থেকে ২.০ শতাংশ পর্যন্ত। এই পরিমাণের চেয়ে আরও অধিক কার্বন যোগ করা হলে সে ইস্পাতকে কাস্ট আয়রন বলা হয়। 

কম কার্বনসমৃদ্ধ মাইল্ড স্টিল সাধারণত উচ্চ কার্বন এবং অন্যান্য স্টিলের তুলনায় অধিক নমনীয় ও বেশ শক্তপোক্ত। এই স্টিল সহজেই জোড়া লাগানো যায়। বিভিন্ন ধরনের স্ট্রাকচার, সাইন, যানবাহন, আসবাব, সীমানা ও অন্যান্য কাজে এমএম স্টিল বেশ কার্যকরী।  

মাইল্ড স্টিল প্রসঙ্গের বৈশিষ্ট্য

  • সহজে স্থাপনযোগ্য 
  • দ্রত নির্মাণে অধিক কার্যকর
  • নির্মাণকাজে চমৎকার ফিনিশিং পাওয়া যায়
  • মরিচারোধী
  • আগাগোড়া সমান
  • ওপর-নিচে বাড়ানো-কমানো যায়
  • দীর্ঘস্থায়ী ও মজবুত
  • ভাঙার আশঙ্কা খুবই কম
  • সমভাবে চাপ বণ্টনে সক্ষম
  • রঙিন গ্যালভানাইজড বিধায় মরিচা ধরে না
  • রক্ষণাবেক্ষণ ঝামেলা কম। 

আগে কাঠ ও বাঁশ প্রপ্সের চাহিদা মেটালেও বর্তমানে বিশে^র সর্বত্রই ব্যবহৃত হচ্ছে এমএস স্টিল প্রসঙ্গ। গুণগত মান ও অন্যান্য সুবিধার কারণে দিন দিন বাড়ছে এর চাহিদা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরি ও বাজারজাত করছে এই প্রসঙ্গ। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ইন্ডাস্ট্রিজ গাইডলাইন ও ভালো মানের মাইল্ড স্টিলে তৈরি হচ্ছে এ উপকরণটি। বাজারে ২-৬ মিটার বিশিষ্ট প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গগুলো অধিক চাপ নিতে সক্ষম। সবচেয়ে সুবিধা হচ্ছে অত্যন্ত দ্রুত তার সঙ্গে স্বল্প সময়ের মধ্যেই স্থাপন করা যায় এর স্ক্রু জ্যাক থাকায়। প্রসঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কিত আরও কিছু অনুষঙ্গ রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- 

  • বিম ক্লাম্প
  • এমএস কাপলক
  • এমএস পাইপ
  • এমএস বেইজ জ্যাক
  • অ্যাডজাস্টঅ্যাবল হেড
  • এমএস বেইজ প্লেট
  • এমএস জয়েন্ট পিন
  • এমএস কপলার
  • ইউনিভার্সাল জ্যাক
  • কাপলক লেজার
  • প্রপ নাট
  • এমএস টপ প্লেট।

প্লাইউড শাটার

মসৃণ এবং সুন্দর ফিনিশ পাওয়ার জন্য কাঠের প্লাইউড শাটার তৈরি করা হয়। ফেয়ার ফেইস কংক্রিটিং করতে প্লাইউড শাটার ব্যবহার করা হয়।

জিপসাম বোর্ড শাটার

কারুকার্যপূর্ণ ও শৈল্পিক কংক্রিট তৈরি করার জন্য জিপসাম বোর্ড দিয়ে এই শাটার তৈরি করা হয়। বাংলাদেশে এই শাটারের অল্প কিছু ব্যবহার রয়েছে।

প্লাস্টিক শাটার

গ্যাস ফাইবার মিশিয়ে প্লাস্টিক শাটার তৈরি করা হয়। প্লাস্টিক শাটার মডুলার সাইজে তৈরি করা হয়। বাংলাদেশে এই শাটারের ব্যবহার নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশে সাধারণত স্টিল শাটার ও কাঠের শাটার বেশি ব্যবহার করা হয়। এদের মধ্যকার তুলনামূলক চিত্র: 

  • স্টিল শাটার
  • কাঠের শাটার
  • স্টিল শাটার শক্ত দৃঢ় ও দীর্ঘস্থায়ী
  • স্টিল শাটারের তুলনায় নরম, যার স্থায়িত্ব কম
  • শাটার স্থাপন করা এবং পুনরায় খুলে ফেলা সহজ
  • শাটার স্থাপন করা এবং পুনরায় খোলা সময় সাপেক্ষ।
  • কংক্রিট বহিরাবরণ মসৃণ হয়
  • কাঠের বহিরাবরণ অমসৃণ হয়
  • কংক্রিট থেকে পানি শোষণ করে না
  • কাঠ থেকে পানি শোষণ করে
  • সংকোচন ও প্রসারণ নেই।
  • সামান্য পরিমাণ সংকোচন ও প্রসারণ রয়েছে 
  • একই শাটার একাধিকবার ব্যবহার করা যায়
  • একই শাটার বারবার ব্যবহার করা যায় না
  • প্রাথমিক খরচ বেশি হলেও অনেকবার ব্যবহার করা যায় বলে এটা লাভজনক
  • প্রাথমিক খরচ কম এবং সহজলভ্য
  • কাঠের শাটারের তুলনায় ভারী বিধায় নাড়াচাড়া করা কষ্টকর
  • ওজনে হালকা এবং সহজে বহনযোগ্য
  • শাটারিং করতে অভিজ্ঞ ও দক্ষ লোকের প্রয়োজন
  • কর্মক্ষেত্রেই সুবিধামতো তৈরি করা যায়

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০২তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৮

কাজী গোলাম মোর্শেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top