আবাসস্থল ও পারিপার্শ্বিকতা

মানুষের জীবনে পাঁচটি মৌলিক চাহিদাÑখাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা। এর মধ্যে বাসস্থান (আবাসস্থল) অন্যতম। কারণ, জীবনে আশ্রয় বড় একটি অবলম্বন। খাদ্য গ্রহণ, বস্ত্র পরিধান, খাদ্য ও বস্ত্র সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যরক্ষা এবং শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বাসস্থানের কোনো বিকল্প নেই। তাই প্রতিটি মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য জীবনযাপনের জন্য সুন্দর ও পরিবেশবান্ধব আবাসস্থলের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। 

মানুষ ‘সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব’ বিবেক-বুদ্ধি, বিচার-বিবেচনা সবকিছুতেই শ্রেষ্ঠ। তাই জীবনের ভালো-মন্দ দিকগুলো বাছ্-বিচার করা এবং সুন্দরভাবে জীবনযাপন করাই মানবজীবনের সার্থকতা। ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ হিসেবে মানুষের মনন ও সৃজনশীলতা অনন্য ও অন্তহীন। আদিকাল থেকেই মানুষ তার নিজের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিটি বিচরণক্ষেত্রে নিরন্তন উন্নয়ন করছে। তারই ধারাবাহিকতায় উন্নত হয়েছে মানুষের ‘আবাসস্থল ও পারিপার্শ্বিকতা’র।

মানুষের সার্বিক চাহিদা পূরণার্থে যুগে যুগে নানাবিধ পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সাধিত হয়ে আসছে আমাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডে। একের পর এক নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবিত হচ্ছে, ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী। প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে যোগাযোগ, যাতায়াত আর আবাসনব্যবস্থায়। এত সব পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুন্দর আর সুস্থভাবে টিকে থাকার জন্য সর্বশেষ ‘টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য’কে (এসডিজি বা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল) সামনে রেখে এগিয়ে চলছে দেশ।

এ উপলক্ষে গ্রিন টেকনোলজি, রিনিউয়েবল এনার্জি এবং এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশনের বিষয়গুলো নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা, এর বাস্তবায়ন ও সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন রকম কার্যক্রম গৃহীত হয়েছে। পৃথিবীতে মানুষসহ বিদ্যমান সব প্রাণীর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করার কোনো বিকল্প নেই। তাই মানুষের বসবাসের জন্য আবাসস্থল নির্মাণ কিংবা নির্বাচন করতে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ রক্ষাকল্পে প্রত্যেকেরই আত্মসচেতন হওয়া অত্যাবশ্যক।

প্রসঙ্গত, আগে মানুষ নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী খোলামেলা জায়গায় স্বাস্থ্যসম্মতভাবে আলাদা আলাদা বাড়ি নির্মাণ করত। যার পারিপার্শি¦ক পরিবেশ নিয়ে এত চিন্তা করতে হতো না। প্রতিদিন বাড়ছে মানুষের সংখ্যা, বাড়ছে ক্রমবর্ধমান চাহিদা। যুগের এই পরিবর্তন হেতু বর্তমান আবাসস্থল নির্মাণকল্পে কৌশলগত দিকসহ ব্যবহৃতব্য নির্মাণসামগ্রী ও কর্মপদ্ধতিতে এসেছে অনেক পরিবর্তন, যার প্রতিটি ক্ষেত্রই সুষ্ঠু তদারকির দাবি রাখে।

অতীতে আলাদা বাড়ির পরিবর্তে এসেছে বহুতলবিশিষ্ট ফ্ল্যাটের কনসেপ্ট, যা সাধারণত নির্মাণকারী সংস্থা কর্তৃক ব্যবসায়িক ভিত্তিতে নির্মিত হচ্ছে। ফলে ফ্ল্যাটসমূহ নির্মাণকল্পে বেড়েছে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিযোগিতা। ক্ষেত্রবিশেষে বেড়েছে নির্মাণকারী সংস্থার অধিক মুনাফা লাভের প্রবণতা। ফলে নির্মাণসামগ্রী হিসেবে নিম্নমানের মালামালের ব্যবহার এবং ভৌতকাজের গুণগত মান নিশ্চিত না করার বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রেই প্রতীয়মান।

সেই সঙ্গে, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ রক্ষা করার বিষয়টিও ক্ষেত্রবিশেষে উপেক্ষিত। নানা ধরনের দুর্যোগপ্রবণ এবং ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। জনসংখ্যা বিবেচনায় পৃথিবীতে ঘন বসতিপূর্ণ দেশসমূহের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৮ম। অতএব জীবন-জীবিকা, সুস্থ’ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে প্রতিটি মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। তাই উপরোল্লিখিত বিষয়গুলোর ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অধিকতর সজাগ হতে হবে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, একটি কাজ সম্পন্ন করার পর তাতে কোনো প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিলে তা অপসারণ করা খুবই দুরূহ। অনেক ক্ষেত্রে এর কোনো প্রতিকার নেই। তাই মানুষের আবাসস্থল নির্মাণ কিংবা নির্বাচন করার ক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই আত্মসচেতন হওয়া অপরিহার্য। ফ্ল্যাট নির্মাণকারী সংস্থা (বিক্রেতা) কর্তৃক নির্মিতব্য ফ্ল্যাটসমূহে ব্যবহৃত মালামাল ও কাজের গুণগত মান এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ রক্ষা করে সব কাজ সম্পাদন করা তাদের মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

অন্যদিকে, ফ্ল্যাটের ক্রেতাসাধারণ যদি ফ্ল্যাট কেনার আগে উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো (যেমন-ফ্ল্যাট নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণ ও কাজের গুণগতমান, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ইত্যাদি) একটু লক্ষ করে ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নেন, তাতে নিজেরা আত্মতৃপ্ত হওয়ার পাশাপাশি নির্মাণকারী সংস্থাসমূহের সচেতনতা বাড়বে। প্রসঙ্গত, একটি ইমারত নির্মাণকল্পে ব্যবহৃতব্য উপকরণ এবং কাজের গুণগতমান রক্ষা করার ওপর নির্ভর করে অত্র ইমারতের দীর্ঘস্থায়িত্বতা ও বসবাসকারীর স্বাচ্ছন্দ্যতা। সুতরাং সংশ্লিষ্ট সবার সার্বিক সচেতনতা এখানে মুখ্য বিষয়।

দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে গুণগত মানসম্পন্ন এবং পরিবেশবান্ধব আবাসস্থল নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি। বিভিন্ন সেক্টর থেকে এ বিষয়ে নানাবিধ লেখালেখিসহ সভা-সেমিনার হচ্ছে, শুরু হয়েছে গ্রিন বিল্ডিং কনসেপ্ট তথা পরিবেশবান্ধব ইমারত নির্মাণ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা। এ ছাড়া দেশের সার্বিক পরিবেশ রক্ষার্থে সরকারি (পরিবেশ অধিদপ্তর) এবং বেসরকারি (পরিবেশ আন্দোলন) সংস্থাসমূহ একযোগে কাজ করছে।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা মানুষের অন্যতম কর্তব্য। নিজে ভালো থাকলে অন্যের ভালো করা যায়। অন্যকে ভালো দেখলে নিজে ভালো হওয়া যায়। ফলে, যে যার সার্বিক কর্মকাণ্ডে নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা কাজে লাগানো, মানুষ হিসেবে মানুষের উপকার করা, উপকার করতে না পারলেও অন্তত অপকার করা থেকে বিরত থাকার মতো দিকগুলো বিবেচনা করে পথচলা আপনার আমার নৈতিক দায়িত্ব। সবাই সুন্দর ও স্বাচ্ছন্দ্য জীবনযাপনের আশায় এগিয়ে যাবে, সুন্দর-সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলবে এটাই হোক আমাদের আজকের প্রত্যাশা। 

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১০০তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৮।

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top