পরিবেশবান্ধব নির্মাণে পারভিয়াস কংক্রিট

প্রতিনিয়তই বদলাচ্ছে জলবায়ু। ফলে পরিবেশ-প্রতিবেশে দেখা দিচ্ছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। বাড়ছে ঝড়, বজ্রপাত, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অন্যদিকে পানির বহুমুখী ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি খরা, নদী-খাল-বিল-জলাধারের নাব্যতা কমায় বিবর্ণ হচ্ছে প্রকৃতি, আশঙ্কাজনক হারে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। ফলে একটু ভারী বৃষ্টি হলেই পানি উপচে প্লাবিত হচ্ছে জনপদ। ব্যাপক নগরায়ণ, শিল্পায়নে কমছে উন্মুক্ত স্থান; ঢাকা পড়ছে কংক্রিট, বিটুমিনের আস্তরে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে হাজার হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত কংক্রিট ও বিটুমিনের এ জালে। এ ছাড়া রয়েছে ভবন ও অবকাঠামো। এসব কারণে ভূগর্ভে দরকারি পানি প্রবেশ করতে পারে না। ফলে একদিকে যেমন দেখা দিচ্ছে জলাবদ্ধতার সমস্যা, অন্যদিকে পানির জন্য হাহাকার। এ এক বৈশ্বিক সমস্যা। সমাধান খুঁজতে গিয়ে একদল গবেষক কংক্রিটের রূপ কিছুটা বদলে উদ্ভাবন করেছে পারভিয়াস কংক্রিট। সাধারণ কংক্রিট ও বিটুমিন যেখানে পানি ধরে রাখে, সেখানে এই কংক্রিট শোষণ করে তা ভূ-অভ্যন্তরে প্রেরণ করে। বিশেষ এই কংক্রিট বদলে দিচ্ছে চিরচেনা কংক্রিটের সনাতন আদল।

পারভিয়াস কংক্রিট কী

পারভিয়াস কংক্রিট (Pervious Concrete) সাধারণ কংক্রিটের সমধর্মী। মূলত এ কংক্রিট একধরনের স্ট্রাকচারাল পেভমেন্ট কংক্রিট, যাতে বিশাল ভলিউমে (১৫ থেকে ৩৫ শতাংশ) পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত ছিদ্র (Interconnected Voids) থাকে। প্রচলিত কংক্রিটের মতো, এই কংক্রিটও সিমেন্ট মিক্স বা সাধারণ পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট, কোর্স এগ্রিগেটস ও পানির সাহায্যে তৈরি। তবে এতে কোনো ফাইন এগ্রিগেট অর্থাৎ বালু মেশানো হয় না বা মেশালেও তা পরিমাণে সামান্য, যা কংক্রিটে অসংখ্য ছিদ্র সৃষ্টি করে। এই পেভমেন্ট দেখতে অনেকটাই মৌচাকের মতো, যাতে প্রচুর পানি প্রবেশ করে বেরিয়ে যেতে সক্ষম। অর্থাৎ এই কংক্রিট পানিকে সহজে ভেদ করতে পারে। কংক্রিটের পোরসিটি বা ভেদ্যতা অনেক বেশি থাকায় সারফেস ওয়াটারকে ভূগর্ভের মধ্যে প্রবেশ করতে দেওয়ায় ভূগর্ভস্থ জলাধার ওয়াটার টেবিল রিচার্জ করতে সাহায্য করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশগত সুরক্ষা সংস্থা (EPA-Environmental Protection Agency) এই কংক্রিটকে পোরাস কংক্রিট, পারমিঅ্যাবল কংক্রিট এবং নো-ফাইনস কংক্রিট নামেও অভিহিত করেছে। বিশেষ ধরনের এই কংক্রিট ১ মিনিটের মধ্যে পার্কিং লটের ১ হাজারেরও বেশি গ্যালন পানি শোষণে সক্ষম। প্রতি বর্গফুটে এই পরিমাণ ৩-৮ গ্যালন বা ৩৪০ ইঞ্চি প্রতি মিনিটে। অন্য কোনো ধরনের কংক্রিট এমন গুণাগুণসম্পন্ন নয়।

এ ধরনের কংক্রিটে প্রযুক্তির প্রথম প্রয়োগ হয় ১৮৫২ সালে ইউরোপে। তখন সেখানে বালু ও অন্যান্য ফাইন এগ্রিগেটের সহজ প্রাপ্যতা ছিল না। ইউরোপে পানি শোষণ ক্ষমতাযুক্ত ও মাটিতে পানি প্রেরণে সক্ষম এমন আরও কিছু পেভিং সিস্টেম উদ্ভাবিত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে-

  • পার্মিঅ্যাবল কংক্রিট
  • পারমিঅ্যাবল ইন্টারলকিং কংক্রিট
  • পারমিঅ্যাবল ক্লে ব্রিক পেভমেন্ট
  • পোরাস অ্যাসফল্ট
  • পেভমেন্ট ব্রিক
  • ইন্টারলকিং কংক্রিট পেভিং ব্লক
  • পলিমারসমৃদ্ধ গ্রাস পেভার্স
  • গ্রিডস
  • জিয়োসেল
  • গ্যাপ-গ্রেডেড কংক্রিট।

পেভমেন্ট নির্মাণে এ পদ্ধতিগুলো কয়েক দশক ধরে চলে আসছে ইউরোপে। তবে এ ধরনের কংক্রিট ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের লিড (LEED- Leadership in Eergy and Environmental Design)-এর সমর্থন করায় তা যুক্তরাষ্ট্রেও জনপ্রিয়তা অর্জন করছে, যা বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে। পানি ব্যবস্থাপনা ও শহুরে তাপ-দ্বীপের (হিট আইল্যান্ড) প্রভাব কমিয়ে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য আমেরিকান দেশগুলোর বিভিন্ন পার্কিং লট, প্যাসেজ ও পেভমেন্টে এই কংক্রিট ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্ন কংক্রিট উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে এ ধরনের কংক্রিট উৎপাদনে।

যেভাবে কাজ করে পারভিয়াস কংক্রিট

পারভিয়াস কংক্রিটে যেহেতু ফাইন এগ্রিগেটস ব্যবহার করা হয় না, ফলে সৃষ্ট ভয়েডগুলোই এর মূল বৈশিষ্ট্য। পেভমেন্টে পারভিয়াস কংক্রিট স্থাপনকালে অত্যন্ত সাবধানে নিয়ন্ত্রিত পরিমাণে পানি ও সিমেন্ট উপকরণসমূহ ব্যবহার করা হয়। একটি পেস্ট তৈরি করা হয় এগ্রিগেটের চারপাশে মোটা আবরণ সৃষ্টিতে। পর্যাপ্ত পরিমাণে পেস্ট ব্যবহারের উদ্দেশ্য কোর্স এগ্রিগেটের মধ্যে দৃঢ় বন্ধন সৃষ্টি করা, যা দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়। এই কোর্স এগ্রিগেটের মধ্যেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভয়েড বা পোর (ছিদ্র) সৃষ্টি হয়। অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে পানি ও সিমেন্ট উপাদানসমূহ নিয়ন্ত্রিত পরিমাণে মেশানোর মাধ্যমেই এই বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। এই পারভিয়াস কংক্রিটের পোরগুলো দ্রুত হারে সারফেস ওয়াটার শোষণে সক্ষম। এই পরিমাণ প্রায় প্রতি বর্গফুট পৃষ্ঠে ৩ থেকে ৫ গ্যালন। বিশেষ করে বৃষ্টিপাতের সময় মাত্রাতিরিক্ত পানি সারফেসের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় পোরসমূহ দিয়ে নিচে প্রবেশ করে। পেভমেন্টের পোরগুলো দিয়ে প্রবেশকৃত পানি নিচের স্তরের আলগা গ্রাভেল দিয়ে সহজেই পানি মাটির নিচে প্রবেশ করতে পারে। উল্লেখ্য, পেভমেন্ট নিজেই রিটেনশন এরিয়া হিসেবে কাজ করে।

কংক্রিট ও বিটুমিনাস পেভমেন্টের সঙ্গে পারভিয়াস কংক্রিটের পার্থক্য

কংক্রিট মূলত এগ্রিগেট, সিমেন্ট, মর্টার, পানিসহ অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্যের সংমিশ্রণে প্রস্তুত। এসব উপাদান নিজেদের মধ্যেই বিক্রিয়া করে থাকে। সিমেন্ট সাধারণত রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এর দৃঢ়তা অর্জন করে সর্বোচ্চ শক্তি লাভ করে। সালফেট সিমেন্টের ক্যালসিয়াম অ্যালুমিনেটের সঙ্গে বিক্রিয়া করে। এই বিক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন দ্রব্য এর উৎপাদনকারী উপাদানসমূহের পরিমাণের থেকে বেশি আয়তনে পাওয়ায় তা কংক্রিটের ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলে। যেকোনো কংক্রিটের স্থায়িত্ব নির্ভর করে অন্তর্বর্তী বিষয়ের ওপর। কংক্রিট ড্যাম্প বাড়াতে এর ভেদ্যতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। যেসব কংক্রিটের ভেদ্যতা যত বেশি, তার স্থায়িত্ব তত কম। আবার কংক্রিটে ছিদ্রের আকার এবং এদের বিস্তার কংক্রিটের ভেদ্যতার মানকে নিয়ন্ত্রণ করে। কংক্রিটের ভেদ্যতার হার কমালে কংক্রিটের শক্তি ও স্থায়িত্ব বাড়ে।

অন্যদিকে সড়ক ও পেভমেন্ট নির্মাণে বহুল ব্যবহৃত উপাদান বিটুমিন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের সড়ক নির্মাণেও বিটুমিন মিশ্রিত নুড়িপাথর ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বছর না যেতেই রাস্তাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন পড়ে। কারণ, বৃষ্টিবহুল এ দেশে বিটুমিন পানিতে ক্ষয় হয়। পানি প্রবাহের সঙ্গে বিটুমিন উঠে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক। বিটুমিন দিয়ে সড়কের নির্মাণব্যয় অ্যাসফল্টের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় মূলত এর ব্যবহার বেশি। 

সাধারণ কংক্রিট ও বিটুমিনের সঙ্গে পারভিয়াস কংক্রিটের মূল পার্থক্যই ভেদ্যতায়। যেহেতু ভেদ্যতা কংক্রিটের শক্তিমাত্রা কমায়, এ জন্য এই কংক্রিট সব স্থানে ব্যবহারযোগ্য নয়। আর সে কারণেই বিশেষ এ কংক্রিট মূলত পেভমেন্ট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এই পারভিয়াস কংক্রিটের আরও যেসব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে-

  • সর্বোচ্চসংখ্যক পোর তথা ছিদ্রবিশিষ্ট কংক্রিট
  • প্রচুর পোর থাকায় পৃষ্ঠদেশের পানি দ্রুত শোষণ করতে পারে
  • দূষিত উপকরণ শোষণ করে নেওয়ায় তা জলাধারে মিশতে পারে না। ফলে পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে
  • প্রক্রিয়াজাত করে পুনরায় এ কংক্রিট ব্যবহার করা সম্ভব বিধায় তা পরিবেশবান্ধব
  • ব্যয়সাশ্রয়ী
  • সহজ স্থাপন কৌশল
  • নান্দনিক সারফেস
  • বর্ণিল কংক্রিট পেভমেন্ট তৈরির সুবিধা
  • রিসাইকেলকৃত কংক্রিট পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব।

পারভিয়াস কংক্রিটের ব্যবহার ক্ষেত্র

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে পারভিয়াস কংক্রিটের শক্তিমাত্রা সাধারণ কংক্রিটের চেয়ে কম হওয়ার এর ব্যবহারের ক্ষেত্র সীমিত। শুধু পেভমেন্ট ও ডেনেজ ব্যবস্থাপনায় এই কংক্রিট ব্যবহার করা হয়। উল্লেখ্য, পরিবেশবান্ধব পেভমেন্টের জন্যই উদ্ভাবন করা হয়েছে এ ধরনের কংক্রিট। যেসব প্রকল্পে পারভিয়াস কংক্রিট ব্যবহার করা সম্ভব, সেগুলো হচ্ছে-

  • স্বল্প ব্যস্ত সড়ক
  • গলি
  • হাঁটাপথ
  • পার্কিং এলাকা
  • ড্রাইভওয়ে
  • পাটিওস (একধরনের পেভমেন্ট)
  • ঢাল
  • পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্রের পেভমেন্ট
  • সুইমিংপুল ডেক
  • টেনিস কোর্ট
  • উন্মুক্ত স্থান
  • বাড়ি বা ভবনের চারপাশ
  • খামার পেভমেন্ট
  • বাফার জোন
  • সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং স্ট্রাকচার
  • ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনায়।

পারভিয়াস কংক্রিটে নানা সুবিধা

প্রথাগত পেভমেন্ট ও ড্রেনেজ সিস্টেম পানিকে মাটির নিচে যেতে বাধা দেয়। কিন্তু এই কংক্রিট তার ব্যতিক্রম। শহরাঞ্চলে যেহেতু উন্মুক্ত স্থান রাখার সুযোগ একেবারেই কম, তাই এই কংক্রিট দিয়ে পেভমেন্ট ও ড্রেন নির্মাণ করলে অনেকাংশে প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। এমনকি রিটেইনিং ওয়াল হিসেবেও এ কংক্রিট ব্যবহার করা সম্ভব। পাহাড়ি এলাকার সড়কগুলোতে বৃষ্টির পানির প্রচণ্ড প্রবাহের কারণে সড়কের স্থায়িত্ব রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে এসব অঞ্চলের সড়ক নিরাপত্তায় পারভিয়াস কংক্রিট আদর্শ। এ ছাড়া পারভিয়াস কংক্রিটে যেসব সুবিধা রয়েছে, সেগুলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য-

  • বৃষ্টি বা বন্যার ঝুঁকি হ্রাস করে
  • প্রাকৃতিকভাবে পানি বিশুদ্ধকরণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে তা ভূপৃষ্ঠে প্রেরণ করে
  • পৃষ্ঠদেশে পানির প্রবাহ হ্রাস করে
  • প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ বজায় রাখা
  • জল নিঃসরণ রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হ্রাস করে
  • তাপ দ্বীপের (হিট আইল্যান্ড) প্রভাব হ্রাস করে
  • ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়
  • টেকসই ড্রেনেজ সিস্টেম নিশ্চিত করে
  • হড়কা বান বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড ঝুঁকি কমায়
  • কংক্রিট স্লিপ রেজিস্ট্যান্ট হওয়ায় সড়ক নিরাপত্তা বাড়ায়।

অসুবিধা

পারভিয়াস কংক্রিটের রয়েছে কিছু অসুবিধাও-

  • অতিরিক্ত জনবহুল ও ভারী যান চলাচল সড়কে এই কংক্রিট কার্যকর নয়
  • শীতপ্রধান দেশে, গ্রীষ্মপ্রধান দেশে, প্রচুর ঝোড়ো বাতাস প্রবাহিত হয় সেসব স্থানে কার্যকর নয়
  • পেভমেন্ট নির্মাণে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়
  • উপকরণের গুণাগুণের অভাব, মাটির ভেদ্যতা কম, রয়েছে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব
  • পোরগুলো ভরে যাওয়ার প্রবণতা বেশি
  • রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেশি।

পরিবেশ সহায়ক পারভিয়াস কংক্রিট

পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলার পাশাপাশি সবুজ, টেকসই পৃথিবী গড়ার প্রয়াসে অনন্য ও কার্যকর এক উপায় হতে পারে পারভিয়াস কংক্রিট। নগরায়ণ থেকে সরে আসার সুযোগ আমাদের নেই। অথচ যেখানে কংক্রিট প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে; ভূগর্ভস্থ পানির অনুপ্রবেশকে বাধাগ্রস্ত করে সেখানে পারভিয়াস কংক্রিট ভূগর্ভস্থ ওয়াটার টেবিল রিচার্জে সাহায্য করে স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান বজায় রাখে। এই কংক্রিট পেভমেন্ট শুধু বৃষ্টির পানিকে অভ্যন্তরীণ মাটিতে ছড়িয়ে দেয় না বরং কিছুটা পানি ধরে রেখে প্রকৃতিকে শীতল রাখে। ফলে আরবান হিট আইল্যান্ড কমাতে সাহায্য করে। আর কংক্রিট পানি ধরে রাখায় পার্শ্ববর্তী বৃক্ষরা তা থেকে পানি গ্রহণ করে। ফলে পানির অভাবে এসব গাছের মৃত্যু হয় না। তা ছাড়া এই কংক্রিট গাছগুলোকে শিকড় গজানোর জায়গা দেয়, যা তাদের পূর্ণ আকারে বাড়তে সাহায্য করে। প্রয়োজনীয় পানিপ্রাপ্তির ফলে গাছের বৃদ্ধি বেশি হয়, যা নগরে পর্যাপ্ত ছায়া দেয়।

পারভিয়াস কংক্রিট যে কোনো প্রকল্পকে করে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব। গ্রিন প্রযুক্তিকে সমর্থন করায় এই কংক্রিট ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের অধীন লিড সার্টিফিকেটের ক্রেডিট পয়েন্ট অর্জনে সহায়ক। পরিবেশের উপকারের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্য ভালো কিছু রয়েছে এতে। এই কংক্রিটে বিদ্যমান পানি মাইক্রো-অর্গানিজম বা অণুজীব জন্মাতে সাহায্য করে, যা নাইট্রোজেন ও ফসফরাস দূরীভূত করতে সাহায্য করে। এতে রাসায়নিক, জ্বালানি তৈল, অ্যান্টি-ফ্রিজ, ক্ষতিকর তরলÑএগুলো শুষে নিয়ে পরিবেশ সুরক্ষিত রাখে। যেহেতু পেভমেন্ট নিজেই ছাঁকনি হিসেবে কাজ করে, ফলে এটি সাধারণত দূষণযুক্ত পানি প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখে। এমনকি পরিস্রাবণ প্রক্রিয়া পানি পরিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে। এর ভয়েড ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু ধ্বংস করতে সাহায্য করে। নদী, হ্রদ এবং জলাধারে দূষিত পানি মিশতে পারে না বিধায় জলাধারগুলোও থাকে পরিশুদ্ধ ও নির্মল।

পেভমেন্ট নির্মাণপ্রক্রিয়া

পারভিয়াস কংক্রিট দিয়ে পেভমেন্ট তৈরির প্রক্রিয়া সাধারণ কংক্রিটের মতোই। পেভমেন্ট নির্মাণ উপকরণ বাছাইয়ের পরবর্তী ধাপ কংক্রিট প্রস্তুত ও পেভমেন্ট নির্মাণ। সাধারণত তিন স্তরে এর নির্মাণকাজ পরিচালিত হয়। সেগুলো হচ্ছে-

  • সারফেস লেভেল
  • সাব-বেইজ লেভেল
  • বেইজ লেভেল।

প্রথমেই প্রস্তুত করতে হয় পেভমেন্টর ভিত বা বেইজ লেভেল। প্রথমেই মাটিসংলগ্ন বেইজ লেভেল ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হয়। এরপর ভালোমতো দুরমুজ বা কম্প্যাকশন করে সাব-বেইজ লেভেল প্রস্তুত করতে হয়। এই স্তরের জন্য নুড়িপাথর, পাথর চিপস বা ব্রিক চিপস দিতে হয়। এই স্তরে পানি অপসারণের জন্য পিভিসি পাইপ স্থাপন করা যেতে পারে। লুজ গ্রাভেল ধরে রাখার জন্য অনেকে জিওসিনথেটিক পলিমার ব্যবহার করেন। এর পর মূল স্তরের ঢালাইয়ের কাজ। এই কংক্রিট পেভমেন্টও সাধারণ সিমেন্ট মিক্স, কোর্স এগ্রিগেটস ও পানি দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। তবে আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, মিশ্রণে কোনো ফাইন এগ্রিগেট বা বালু মেশানো হয় না। কোর্স এগ্রিগেট হিসেবে ব্যবহৃত হয় লুজ গ্রাভেল ও স্টোন বা ব্রিক চিপিং। পেভমেন্টের আদর্শ শক্তিমাত্রা এবং কাক্সিক্ষত ভয়েড পেতে এগ্রিগেটের সাইজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথাগত সাইজের মধ্যে ব্যবহার করা হয় ৩/৮”  থেকে ১”  এগ্রিগেট। তবে ৩/৪”  এগ্রিগেট আদর্শ ভয়েড স্পেস সৃষ্টি করে। ভয়েডের পরিমাণ হয় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ। ASTM D 7063 ও ASTM C 140 এই দুই টেস্ট মেথডে ভয়েড অনুপাত বের করা সম্ভব। কংক্রিট প্রস্তুতের জন্য পানি ও সিমেন্টের অনুপাতও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মিশ্রণের জন্য সাধারণত পানি থেকে সিমেন্ট অনুপাত ০.২৮ থেকে ০.৪০। আরও যেসব অনুপাত ও সাইজ অনুসরণ করতে হয়- 

এগ্রিগেট-সিমেন্ট অনুপাত৪ থেকে ৪.৫ : ১
পানি থেকে সিমেন্ট অনুপাত০.২৭-০.৩৩
মিশ্রেণে এগ্রিগেটের সাইজ২০, ১৪ বা ১০ মিমি
ভয়েড কনটেন্ট১৫%-২৫%
বাইন্ডার থেকে অ্যাগ্রিগেট অনুপাত০.২৫ এর কম

ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়ে গেলে পেভমেন্টকে ব্লকে ভাগ করা যায় আবার না করলেও চলে। কংক্রিট শুকানোর আগে পিজ্জা কাটার (একধরনের কংক্রিট কাটার মেশিন) দিয়ে কংক্রিট ব্লকগুলো সহজেই আলাদা করা যায়। প্রয়োজন মনে হলে পেভমেন্টকে ৫% স্লোপ করা যেতে পারে। এমনকি রং মিশিয়ে এই কংক্রিটকে পছন্দের রঙে রাঙানো যায়। কংক্রিট পেভমেন্টকে যথাযথ উপায়ে পেতে ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে যে বিষয়গুলো অবশ্যই মানতে হবে-

  • পেভমেন্ট ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে
  • উপাদানসমূহ ভালোভাবে মেশাতে হবে
  • ভালোভাবে চিপিং করতে হবে
  • সবশেষে পর্যাপ্ত পরিমাণে কিউরিং করতে হবে।

সাধারণ কংক্রিটের তুলনায় পারভিয়াস কংক্রিটের কিউরিং-প্রক্রিয়া কিছুটা ব্যতিক্রম। যেহেতু প্রিভিয়াস কংক্রিটে প্রচুর ছিদ্র থাকে, তাই এই কংক্রিট পানি ধরে রাখতে পারে না, দ্রুত শুকিয়ে যায়। ফলে কিউরিংয়ের জন্য নিতে হয় বিকল্প ব্যবস্থা। সাধারণত পেভমেন্টে পানি ধরে রাখতে চটের বস্তা, কচুরিপানা স্থাপন করে ঘন ঘন পানি দিতে হয়। কিউরিংয়ের জন্য প্রয়োজন ন্যূনতম ৭ দিন।

পারভিয়াস কংক্রিটের যত চ্যালেঞ্জ

পারভিয়াস কংক্রিট প্রথম দিকে এর কার্যকারিতা প্রমাণে ব্যর্থ হয় যথাযথ নির্মাণ উপকরণ ও সঠিক অনুপাত না বুঝে নির্মাণ করায়। কিন্তু দিনে দিনে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তা উন্নত হতে থাকে। প্রথমাবস্থার এর শক্তিমাত্রা ৮০০-এর কিছু কম-বেশি পাওয়া যায়, পরবর্তী সময়ে তা ৩০০০ পিএসআই পর্যন্ত। গবেষকেরা কংক্রিটের শক্তিমাত্রা বাড়াতে ফাইবার, সেলুলার ফাইবার, রেসিন বাইন্ডার ও পলিমার ব্যবহার করে বেশ ভালো ফল পেয়েছেন। তারপরও ব্যস্ত সড়কে যেখানে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ রয়েছে, সেসব সড়কে এই কংক্রিট ব্যবহার এখনো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গবেষকদের জন্য এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ প্রধান সড়কগুলোর উপযোগী করে কংক্রিটের মান উন্নয়নে। এই কংক্রিটের জন্য আরও একটা বড় চ্যালেঞ্জ পোরগুলো ময়লা-আবর্জনা দিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি। আর তা হলে এর কার্যকারিতাই-বা থাকবে কতটা? অথবা অধিক হারে পানি প্রবেশ করায় কোনো ধরনের সিংক হোল সৃষ্টি হবে কি না? উভয় ক্ষেত্রে গবেষকদের ভাষ্য, এতে সিংক হোল হওয়ার সুযোগ কম। কারণ, সিংক হোল হয় শিলার লেয়ার অ্যাসিড বৃষ্টির দ্বারা দ্রবীভূত হলে। আর পেভমেন্ট নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করলে পোর বা ছিদ্রগুলো বন্ধ হবে না।  

রক্ষণাবেক্ষণ কৌশল

পেভমেন্ট মাঝে মাঝে রক্ষণাবেক্ষণ না করলে পোরগুলো বন্ধ হয়ে অভেদ্য কংক্রিটে পরিণত হতে পারে। এ জন্য পেভমেন্ট সারফেসে প্রেসার বা পাওয়ার ওয়াশ দিয়ে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত ভ্যাকুয়াম ক্লিনার বা রোড ক্লিনার/সুইপিং দিয়ে ময়লা ও পলি উঠিয়ে ফেলা যেতে পারে।

পরিশেষে

বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব নির্মাণের গুরুত্ব বাড়ছে। আমাদের দেশেও পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি চলমান প্রাকৃতিক সমস্যা বন্যা, জলাবদ্ধতা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও ভূগর্ভস্ত পানির লেয়ার নেমে যাওয়ার মতো সমস্যা কিছুটা কিছুটা হলেও রোধ করা যাবে পারভিয়াস কংক্রিটের পেভমেন্ট ব্যবহারের বাড়িয়ে।

হাইলাইট:

  • পারভিয়াস কংক্রিট সাধারণ কংক্রিটের সমধর্মী। সাধারণ কংক্রিট ও বিটুমিনের সঙ্গে পারভিয়াস কংক্রিটের মূল পার্থক্যই ভেদ্যতায়। মূলত, এটি স্ট্রাকচারাল পেভমেন্ট কংক্রিট যাতে বড় পরিসরে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত ছিদ্র থাকে।
  • পানি ব্যবস্থাপনা ও শহুরে হিট আইল্যান্ডের প্রভাব কমিয়ে পরিবেশ সুরক্ষায় বিভিন্ন পার্কিং লট, প্যাসেজ ও পেভমেন্টে এই কংক্রিট ব্যবহৃত হয়। এ কংক্রিট মূলত পেভমেন্ট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনায় দারুন উপযোগী।
  • রিটেইনিং ওয়াল হিসেবেও এ কংক্রিট ব্যবহৃত হয়। সড়ক নিরাপত্তায় পারভিয়াস কংক্রিট আদর্শ।
  • নদী, হ্রদ এবং জলাধারে এ কংক্রিটের কারনে দূষিত পানি মিশতে পারে না বিধায় জলাধারগুলোও থাকে পরিশুদ্ধ ও নির্মল।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৯তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৮।

প্রকৌশলী সুবীর কুমার সাহা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top