কাঠ এক অনন্য প্রাকৃতিক নির্মাণ উপকরণ। সাধারণত দরজা, জানালার পাল্লা, চৌকাঠ, সিঁড়ি, বারান্দার রেলিং তৈরিতে, অন্দরসজ্জা, আসবাব ও গৃহনির্মাণ বা সাজসজ্জায় কাঠের ব্যবহার বহুল প্রচলিত। এ ছাড়া নৌকা, জাহাজ, রেলওয়ের স্লিপার, বৈদ্যুতিক খুঁটি তৈরির কাজেও কাঠের ব্যবহার রয়েছে। আমাদের দেশে শহরে কাঠের ব্যবহার মূলত অন্দরসজ্জা, আসবাব, দরজা, জানালা তৈরির কাজে। আর গ্রামাঞ্চলে প্রচুর কাঠ ব্যবহৃত হয় ঘরবাড়ি তৈরিতে। প্রয়োজনের পাশাপাশি বিলাসিতার জন্যও আমাদের এখানে কাঠের রয়েছে অন্য রকম কদর। রুচি ও সামাজিক অবস্থান অন্যের কাছে তুলে ধরায় কাঠের আসবাবের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তবে কাঠের গুণাগুণ এবং বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে হয় চাহিদার তারতম্যও। বাহ্যিক সৌন্দর্য, টেকসই ক্ষমতা, আবহাওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে কতটা মানানসই ইত্যাদির ওপর নির্ভর করেই বাছাই করা হয় কাঠ। কাঠের এসব গুণাগুণ বা বৈশিষ্ট্য অনেকাংশে নির্ভর করে সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের ওপর। আমরা প্রায়ই দেখি বর্ষায় ঘরের জানালা দরজা ঠিকমতো আটকানো যায় না। আবার শীতকালে কাঠের জোড়া ছেড়ে দেয়। দেখতে মনে হয় যেন ফেটে ফেটে গেছে। কেন এমন হয়? উত্তরে বলা যায়, এর প্রক্রিয়াজাতকরণ বা সিজনিং ঠিকমতো হয়নি বলেই এ রকম হয়। সিজনিং হচ্ছে কাঠের ভেতর থাকা অতিরিক্ত পানি বের করে দিয়ে একে আবহাওয়া উপযোগী করে তোলা।
কাঠ প্রধানত সেলুলোজ (Cellulose), হেমিসেলুলোজ (Hemicellulose) ও লিগনিন (Lignin) এই তিন উপাদানে তৈরি। এসব উপাদানের মধ্যে লিগনিনের পরিমাণ শতকরা প্রায় ২২ থেকে ২৯ ভাগ। এই লিগনিনই একটি গাছকে বা কাঠকে দৃঢ় করে। আর এর সঙ্গে থাকে প্রচুর পরিমাণে পানি বা জলীয় অংশ। গাছভেদে সদ্য কাটা বা চেরাই করা একটি কাঠে তার প্রকৃত ওজনের চেয়ে ৫০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত পানি থাকতে পারে। তাই এ রকম কাঁচা কাঠ ব্যবহার করতে গেলে কাঠের ভেতরে থেকে যাওয়া পানি আবহাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাঠের আকার আকৃতিতে পরিবর্তন আনে। এ কারণে বিভিন্ন প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম পদ্ধতিতে কাঠ থেকে জলীয় অংশ বের করা হয়। কাঠে কী পরিমাণ জলীয় অংশ থাকবে তা নির্ভর করে কাঠটি কোথায় ব্যবহৃত হবে তার ওপর। অর্থাৎ যে এলাকায় ব্যবহৃত হবে সেই এলাকার গড় তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতার ওপর নির্ভর করে কাঠ সিজনিং পদ্ধতি। যেমন আমাদের দেশের বাতাসে জলীয় অংশের গড় পরিমাণ ১২ শতাংশ। তাই এখানে ব্যবহারের জন্য কাঠের ভেতরের জলীয় অংশ হবে ১২ শতাংশ।
কাঠ সিজনিংয়ের রয়েছে অনেক রকম পদ্ধতি। দেশীয় পদ্ধতিতে সাধারণত গাছ কাটার পর চেরাই করে একে দীর্ঘ সময় রোদে ফেলে রাখা হয় যেন এর মধ্যে জলীয় অংশ বেরিয়ে যায়। আবার কাঠকে প্রয়োজনীয় সাইজে কেটে একটার ওপর একটা সাজিয়ে রেখে ওপরে এমনভাবে ছাউনি দেওয়া হয় যেন পানি না লাগে, কিন্তু আলো-বাতাস পায় আর যেন নিচ থেকে স্যাঁতসেঁতে মাটি কাঠে স্পর্শ না করে। এভাবে বেশ কিছুদিন রেখে কাঠের জলীয় অংশ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আবার স্টিমের সাহায্যে, ধোঁয়া দিয়ে অথবা কেমিক্যাল প্রয়োগ করে কাঠের সিজনিং করা যায়। এতে সময় তুলনামূলকভাবে কম লাগে। অনেকে আবার কাঠ ও কাঠের গুঁড়ি বাকল ছাড়িয়ে নদীর পানিতে ভাসিয়ে দেয়। এরপর তা তুলে এনে কিছুদিন ছায়াতে রেখে দিয়ে সিজনিং করে। এ পদ্ধতির সবই হচ্ছে আমাদের দেশীয় পদ্ধতি, যা প্রকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই এসব পদ্ধতিতে বিশেষ কোনো খরচ নেই বললেই চলে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এসব প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে প্রচুর সময় ব্যয় হয়। তা ছাড়া সারা বছর এভাবে সিজনিং করা সম্ভব হয় না। ফলে কাঠশিল্পকে বিকল্প কৃত্রিম সিজনিংয়ের পথ খুঁজতে হয়।
এ রকম কৃত্রিম সিজনিংয়ের একটি পদ্ধতি কিল্ন (Kiln) বা চুল্লি সিজনিং পদ্ধতি। এখন পর্যন্ত সম্ভবত এটাই কাঠ সিজনিংয়ের সবচেয়ে দ্রুত ও কার্যকর পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে কাঠ শুকানোর প্রক্রিয়া সাবধানতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ জন্য শুকানোর বা সিজনিংয়ের সময় কাঠের মাঝে চিড় ধরা বা বেঁকে যাওয়ার প্রবণতা অনেক কমিয়ে ফেলা সম্ভব। কিল্ন দিয়ে কাঠ সিজনিংয়ের জন্য তুলনামূলক সময় প্রয়োজন হয় অনেক বেশি। তাই যখন কম সময়ে অনেক কাঠের প্রয়োজন হয় তখন এটাই হতে পারে উপযুক্ত সমাধান। দেশীয় পদ্ধতিতে সিজনিংয়ের আরেকটি অসুবিধা হচ্ছে কাঠের রং পরিবর্তন হয়ে যাওয়া বা দাগ পড়া। যদিও অনেক সময় এই সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কিল্ন সিজনিংয়ে এই সমস্যা কেমিক্যাল ব্যবহার না করেও সমাধান করা সম্ভব।
সাধারণত দুই ধরনের কিল্ন সিজনিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়
১.প্রোগ্রেসিভ
২.কম্পার্টমেন্টাল।
এই দুই ধরনের পদ্ধতিই নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কাজ করে এবং কাঠ সিজনিংয়ের জন্য কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। যেমন, দুটি পদ্ধতিতেই বড় ফ্যান বা ব্লোয়ার ব্যবহার করে বাতাস চলাচল করানো হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের জন্য পাইপ দিয়ে বা অন্য কোনোভাবে বাষ্প চালনা করা হয়। মোট কথা এসব কিল্ন বা চুল্লিতে বাতাস, তাপ ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে সিজনিং করা হয়। আর এ তিনটি জিনিস নির্ভর করে কাঠের ধরন, সাইজ ও পরিমাণের ওপর।
প্রোগ্রেসিভ কিল্ন বা চুল্লিতে সিজনিংয়ের জন্য কাঠকে চুল্লির টানেলের এক প্রান্ত দিয়ে প্রবেশ করানো হয় এবং অন্য প্রান্ত দিয়ে বের করে আনা হয়। একটি ট্রলি বা কনভেয়ারের ওপর কাঠকে একটির ওপর আরেকটি রেখে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সাজানো হয়। এরপর ট্রলি বা কনভেয়ার সাজানো কাঠের স্তূপকে কিল্নের এক প্রান্ত দিয়ে প্রবেশ করিয়ে অন্য প্রান্ত দিয়ে বের করে আনা হয়। এ সময়ে বিভিন্ন স্তরের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতাকে প্রয়োজন অনুযায়ী কম বা বেশি করে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এ রকম নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় কাঠ তার ভেতরের জলীয় অংশ হারাতে থাকে এবং ক্রমেই ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে। প্রোগ্রেসিভ কিল্নে কোনো কোনো সময় গরম বাতাসকে তার নিজের মতো প্রবাহিত হতে দেওয়া হয় আবার কোনো কোনো সময় ফ্যান ব্যবহার করে কাঠের মধ্যে প্রবাহিত করা হয়।
প্রোগ্রেসিভ কিল্নের সুবিধা হচ্ছে, এর প্রক্রিয়া একবার চালু হলে তা বন্ধ না করা পর্যন্ত চলতেই থাকে। কারণ, যেহেতু কাঠগুলোকে একটি ট্রলি বা কনভেয়ারের ওপর সাজানো হয় এবং তা কিল্নের বাইরেই হয়ে থাকে, সেহেতু নতুন কাঠ ঢুকানো বা বের করার জন্য প্রক্রিয়াটিকে বন্ধ করতে হয় না। যদিও কিল্ন সিজনিংয়ে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহার করতে হয় তারপরও সময়ের বিবেচনায় এটি অনেক গ্রহণযোগ্য। কারণ, এ পদ্ধতিতে যত দ্রুত কাঠ হতে আর্দ্রতা বের করতে পারে, প্রচলিত অন্যান্য পদ্ধতিতে তা সম্ভব নয়। খোলা বাতাসে কাঠকে শুকানোর জন্য যেভাবে সাজানো হয়ে থাকে এখানেও সেভাবে ট্রলি বা কনভেয়ারের ওপর সাজানো হয়। তবে সব কাঠকে একই সময়ে কিল্নের ভেতর রাখা হয় না। কারণ একেক ধরনের কাঠের মধ্যে আর্দ্রতা বা পানির পরিমাণ একেক রকম থাকে। আগেই বলা হয়েছে, কাঠভেদে এর পরিমাণ প্রকৃত ওজনের ৫০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তাই কোনো কাঠ উপযুক্তভাবে সিজনিং হতে দুই দিনও লাগতে পারে, আবার কোনো কোনো কাঠের জন্য এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় প্রয়োজন। সাধারণত ৪৫ মি.মি. পর্যন্ত পুরু কাঠের জন্য এই প্রোগ্রেসিভ কিল্ন পদ্ধতি খুব ভালোভাবে কাজ করে। যদিও অনেক সময় ৭০ মি.মি. পর্যন্ত পুরু নরম ধরনের কাঠও এই চুল্লির মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু আস্ত গাছের গুঁড়ি বা লগ সিজনিংয়ের জন্য এটা খুব কার্যকর পদ্ধতি নয়।
কোন কাঠ কতক্ষণ কিল্নের মধ্যে থাকলে ঠিকভাবে সম্পূর্ণরূপে সিজনিং হবে তা নির্ধারণ করার কাজটা একটু কঠিন। তাই বিভিন্ন ধরনের কাঠ সবচেয়ে কম সময়ে কম শক্তি ব্যবহার করে এবং কাঠের গুণগত মান নষ্ট না করে কীভাবে সর্বোত্তম সিজনিং সম্ভব, তা নিয়ে এখনো অনেক গবেষণা চলছে।
অনেক সময় কাঠ বেশি শুকালে কিংবা তাপের তারতম্যের কারণে এর উপরিভাগের কোষগুলো নষ্ট হয়ে যায়। বাহ্যিকভাবে এগুলো নষ্ট হয়ে গেছে বলে মনে হলেও তা আরেকটি চেম্বারে নিয়ে কোষগুলোতে আর্দ্রতা ঢুকিয়ে দিলে তা পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী হয়। তবে শক্ত কাঠের জন্য বা অনেক মোটা ও বড় গুঁড়ি কিংবা লগ সিজনিংয়ের সময় বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রির নিচে রাখা হয় এবং আংশিক শুকানোর পর তাকে দীর্ঘ সময় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বাতাসের মাধ্যমে পুরোপুরি সিজনিং করা হয়। যদিও এ ধরনের কাঠ প্রগ্রেসিভ কিল্নে পুরোপুরি সিজনিং হয় না তারপরও এ পদ্ধতিতে বড় বড় কাঠের জন্য তুলনামূলক সময় লাগে অনেক কম।
কিল্ন সিজনিংয়ের আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে কম্পার্টমেন্টাল (Compartmental) পদ্ধতি। খুব সহজভাবে বলতে গেলে একটি বদ্ধঘর বা ভবনকে কিল্ন সিজনিংয়ের জন্য ব্যবহার করার পদ্ধতিই ‘কিল্ন সিজনিং কম্পার্টমেন্টাল পদ্ধতি’। এ পদ্ধতিতে কাঠকে বদ্ধঘরের মধ্যে সাজিয়ে রেখে ওই ঘরের মধ্যে গরম বাতাস প্রবাহিত করা হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত আর্দ্রতার পরিমাণ কমে কাক্সিক্ষত পর্যায়ে না আসে ততক্ষণ পর্যন্ত কাঠের স্তূপকে কম্পার্টমেন্টের ভেতরে রেখে দেওয়া হয়। কম্পার্টমেন্টাল কিল্ন প্রগ্রেসিভ কিল্নের তুলনায় আকারে ছোট এবং ছোট হওয়ার কারণে এর ভেতরের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এ ধরনের কিল্নেও বায়ুপ্রবাহের জন্য অনেক সময় ফ্যান বা ব্লোয়ার ব্যবহার করা হয়।
কিল্ন অর্থাৎ কৃত্রিম সিজনিংয়ের পদ্ধতি যা-ই হোক না কেন, প্রাকৃতিক সিজনিংয়ের চেয়ে এর সুবিধা অনেক। যেমন, প্রাকৃতিক উপায়ে একটি গাদা কাঠ শুকাতে শুষ্ক আবহাওয়ায় যদি ২২ থেকে ৬০ দিন সময় লাগে তাহলে কিল্ন অর্থাৎ কৃত্রিম সিজনিংয়ে ১০ দিনের মধ্যেই তা করা সম্ভব। আবার যেহেতু নিয়ন্ত্রিতভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় তাই কাঠ নষ্ট হয় না বললেই চলে এবং গুণগত মানও ঠিক থাকে। আর সঠিকভাবে সিজনিং হলে পোকামাকড়ের আক্রমণও ঠেকানো যায় সহজেই।
এখন যদিও কাঠের উৎপাদন, প্লাস্টিক আর কৃত্রিম বা বিকল্প কাঠের চাপে প্রকৃত কাঠশিল্প একটু বিপদেই আছে, তারপরও চাহিদার বিবেচনায় এর গুরুত্ব কমেনি মোটেই। আমাদের এই সীমিত সম্পদ বৈজ্ঞানিক উপায়ে সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে অবশ্যই সম্ভব এর অপচয় ও ধ্বংস রোধ করা।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৮তম সংখ্যা, জুন ২০১৮।