অরোভিলা ধর্মের ভেদাভেদবিহীন এক নতুন রাষ্ট্র ধারণার অরুণোদয়। ভারতের তামিলনাড়ু প্রদেশের ভিলুপুরাম জেলায় এর অবস্থান। এর কিছু অংশ অবশ্য দক্ষিণ ভারতের পুডুচেরিতে পড়েছে। সাধক শ্রী অরবিন্দের সহকারিণী ‘গুরুমাতা’ মীরা আলফাসা এই অরোভিলার প্রতিষ্ঠাতা। অরোভিলার নকশা প্রণয়ন করেছেন অবশ্য একজন ভিনদেশি, ফ্রান্সের আর্কিটেক্ট রজার অ্যাঙ্গার (জড়মবৎ অহমবৎ)। অরোভিলা গড়ে তোলার পেছনে মীরা আলফাসার উদ্দেশ্য ছিল ‘মানুষের মধ্যে একতাবোধ’ সৃষ্টি। পৃথিবীর সব দেশের নর-নারী এখানে এসে ঐক্য আর শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। সেখানে থাকবে না কোনো রাজনীতি, জাতীয়তা কিংবা অন্য কোনো ভেদাভেদ।
অরোভিলার নামকরণ হয়েছে ফরাসি শব্দ অরোর (Auro) আর ভিলে (Ville) থেকে, যার অর্থ হচ্ছে ঊষা আর নগরী। পরে অবশ্য এটি শ্রী অরবিন্দের নামানুসারে অরোভিলার নামকরণ করা হয়। শ্রী অরবিন্দের ভক্তগণ মীরা আলফাসার নেতৃত্বে পুডুচেরিতে ১৯৬৪ সালে অরবিন্দের জীবনাদর্শে একটি নগর গড়ে তোলার প্রস্তাব করেন। মীরা বিশ্বাস করতেন যে মানবজীবন নিয়ত পরিবর্তনশীল। তাই তাঁর চাওয়া ছিল অরোভিলা এই পরিবর্তনশীল জীবনে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। মানুষ নিজেদের সৃষ্ট সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একই কাতারে এসে দাঁড়াবে। অরোভিলা হবে পৃথিবীর প্রথম বৈশ্বিক নগরী, যেখানে থাকবে না কোনো সীমান্তবেড়ী, থাকবে না ভিন্ন ভিন্ন জাতীয়তা, রাজনীতির মারপ্যাঁচ কিংবা ধর্মের বেড়াজাল। মানুষ একে অন্যের পাশে থাকবে কেবল মানুষ হিসেবে, আত্মিক উন্নতি আর মানবতাই হবে একমাত্র সাধনা।
আয়তনে অরোভিলা বেশি বড় নয়, ২০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে এর অবস্থান। ১২৪টি জাতীর প্রতিনিধিত্বে গুরুমাতা মীরা আলফাসা ১৯৬৮ সালে অরোভিলার উদ্বোধন করেন। গুরুমাতা স্বহস্তে অরোভিলার চারটি নীতি লিখে প্রকাশ করেন। অরোভিলা মূলত এই চার নীতির ওপরেই প্রতিষ্ঠিত-
অরোভিলা কোনো বিশেষ কারও সম্পত্তি নয়। অরোভিলা সমগ্র মানবজাতির। তবে অরোভিলাতে বাস করতে চাইলে তাকে অবশ্যই আধ্যাত্মিক চেতনা (উরারহব ঈড়হংপরড়ঁংহবংং)-এর পরিচর্যক হতে হবে।
অরোভিলা হবে চির তারুণ্যের। এখানে জ্ঞান চর্চা হবে অবিরাম ও সীমাহীন।
অরোভিলা হবে অতীত আর ভবিষ্যতের মেলবন্ধন। অতীতের সব আবিষ্কারকে সে আলিঙ্গন করে নেবে আর ভবিষ্যতের কল্যাণে যাকে কাজে লাগাবে।
অরোভিলা হবে মানুষের সত্যিকার ঐক্যের জন্য প্রয়োজনীয় জাগতিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে গবেষণার স্থান।
অরোভিলার ব্যবস্থাপনায় গুরুমাতা মীরা আলফাসার অন্তর্ধানের পরে বেশ পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে এটি অরবিন্দ সোসাইটির হাতে ন্যস্ত ছিল। ১৯৭৩ সালে মীরা আলফাসা মরার যান। এরপর থেকেই অধিবাসী আর সোসাইটির মধ্যে কিছু সমস্যা সৃষ্ট হয়। অধিবাসীদের দাবির মুখে ১৯৮০ সালে ভারত সরকার এই বিষয়ে প্রথম হস্তক্ষেপ করে। অরবিন্দ সোসাইটি অবশ্য সরকারের এই হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আপিল করে। শেষমেশ ১৯৮৮ সালে এর রফা হয়। ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থাপনা বোর্ড গঠন করা হয়। প্রথমে থাকবে সরকারি বোর্ড, এর সদস্য সরকার নির্ধারণ করে দেবে। এরপরের ধাপে থাকবে অরোভিলা আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা পর্ষদ, এর সদস্যও সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হবে। সর্বশেষ ধাপে থাকবে অধিবাসী সংসদ। এটি স্থানীয় সমস্ত অফিশিয়াল ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত। এ ছাড়া অরোভিলা ফাউন্ডেশন নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান এখানে রয়েছে। এটি ভারতের মানব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান।
৫০ হাজার অধিবাসীর জন্য নির্মিত হলেও শুরুর ২০ বছরে এখানে ২০টি দেশ থেকে আসা মাত্র ৪০০ অধিবাসী ছিল। ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে এখন ৪৯টি দেশ থেকে ২ হাজার ৪৮৭ জন এখানে থাকেন, যার অধিকাংশই ফ্রান্স, জার্মানি আর ভারতের স্থানীয় নাগরিক।
অরোভিলার স্থাপত্যেও আছে বেশ নতুনত্ব। অরোভিলার প্রতীকী স্থাপত্য হচ্ছে এর ‘মাতৃমন্দির’। মায়ের জন্য নির্মিত এই মন্দির স্থাপনের উদ্দেশ্য হচ্ছে সাধক শ্রী অরবিন্দের ‘মাতৃ-দর্শন’-এর বহিঃপ্রকাশ। শ্রী অরবিন্দের মতে, ‘মা’ হচ্ছে একটি বৈশ্বিক ধারণা। ‘মা’ হচ্ছে জীবন দর্শন, চেতনা ও জ্ঞানের ক্রমবিবর্তনের অপর নাম, যা মানুষের বর্তমান সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে মানবতার পরবর্তী ধাপে পৌঁছে দেয়। তাই ‘মাতৃ’ শব্দটি আধ্যাত্মিক চেতনার আরেক রূপ। শ্রী অরবিন্দের এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই ফরাসি আর্কিটেক্ট রজার অ্যাঙ্গার মাতৃমন্দিরের নকশা করেছেন।
অরোভিলার একদম মাঝখানে আপনি তাই খুঁজে পাবেন এই শহরের আত্মা, শান্তির জায়গা- মাতৃমন্দির। মাতৃমন্দির যে স্থানে অবস্থিত সে জায়গাটির নামকরণ করা হয়েছে ‘শান্তি’ নামে। রজার অ্যাঙ্গার মাতৃমন্দিরের টেকনিক্যাল দিক নিয়েও কাজ করেছেন। মাতৃমন্দিরের ৮০০ পোর্টহলের ভেতর দিয়ে সূর্যকিরণ ছড়িয়ে পড়বে এর ভেতরের দেয়ালে, যেখানে আছে আরও ৮০০টি স্বচ্ছ কুসুমরঙা ত্রিভুজ। যদিও এই ত্রিভুজগুলো বাইরে থেকে দৃশ্যমান নয়। কুসুমরঙা ত্রিভুজে প্রতিফলিত হয়ে সেই নরম আলো ছড়িয়ে পড়বে মাতৃমন্দিরের প্রতিটি কোনায় কাউকে কোনো কিছু জানান না দিয়েই, যেন সেখানে কারও শান্তিতে ব্যাঘাত না ঘটে।
মাতৃমন্দিরের আকার হচ্ছে গোলকের মতো। বাইরে থেকে দেখতে মনে হবে স্বর্ণগোলক। গোলকের ভেতরের ওপরের দিকের প্রশস্ত চেম্বারটি অবশ্য পুরোপুরি সাদা রঙের-সাদা মার্বেল পাথরের দেয়াল আর সাদা কার্পেট। মাঝখানে আছে একটি স্ফটিক গোলক, যার মধ্য দিয়ে ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায় সূর্যরশ্মির চলাচল নিয়ন্ত্রিত হয়। আর কম্পাসের দিক মেনে এর চারদিকে আছে চারটি সাপোর্ট পিলার। প্রতিটি পিলার আলাদা নাম এবং তাৎপর্য বহন করে। মহেশ্বরী (দক্ষিণ পিলার), মহাকালী (উত্তর পিলার), মহাকালী (পূর্ব পিলার), মহাস্বরস্বতী (পশ্চিম পিলার)।
এর ধ্যানকক্ষটিও দেখতে বারোটি ভিন্ন রঙের পাথরের তৈরি পাপড়ির সমন্বয়ে ফুলের মতো। প্রতিটি পাপড়ির রং আলাদা আলাদা অর্থবহন করে।
| রং | অর্থ |
| আকাশি | আন্তরিকতা |
| গাঢ় নীল | শান্তি |
| নীলাভ বেগুনি | সাম্য |
| বেগুনি | উদারতা |
| লালাভ বেগুনি | ধার্মিকতা |
| লাল | সাহসিকতা |
| ফ্যাকাসে লাল | উন্নতি |
| কমলা | সক্ষমতা |
| ফ্যাকাসে কমলা | মহাশক্তি |
| হলুদ | অধ্যবসায় |
| হালকা সবুজ | কৃতজ্ঞতা |
| সবুজ | বিনয় |
মাতৃমন্দির ঘিরে আছে ১২টি বাগান। এই বাগানগুলোরও রয়েছে নিজস্ব নাম-অস্তিত্ব, চেতনা, আশীর্বাদ, আলো, জীবন, শক্তি, সম্পদ, উপযোগ, উন্নতি, যৌবন, ঐক্য, উৎকর্ষ।
মাতৃমন্দিরের গঠনকাল ১৯৭০ সালে শুরু হলেও এটি শেষ হয় ২০০৮ সালে। এত দীর্ঘ সময় লাগার কারন এর নির্মাণজটিলতা আর উপাদানের দুর্লভ্যতা। প্রথমে এর ভিত্তি স্থাপন করা হয় ১৯৭০ সালে। ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে এর চারটি পিলার আর ভেতরের চেম্বারের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। ভেতরে ও বাইরের দেয়ালে প্রথমে সিমেন্ট ব্যবহার করতে চাইলেও পরে বাইরের দেয়ালের জন্য ফেরোসিমেন্ট এবং ভেতর দেয়ালের জন্য টিন্টেড গ্লাসস ব্যবহার করা হয়। বাইরের দেয়াল গোল্ডেন ডিস্ক বা সোনার প্রলেপ দেওয়া চাকতির সাহায্যে সজ্জিত করা হয়। এই চাকতিগুলো লাগানোর কাজে প্রায় আট বছর সময় লেগেছে। এর মাঝে র্যাম্প নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়। প্রথম র্যাম্পটি ২০ হাজার কেজি ভর সক্ষমতা পরীক্ষায় বেশ ভালোভাবেই উতরে যায়।
জার্মানির জিস (তবরংং) নামে একটি কোম্পানি চেম্বারের জন্য স্ফটিক গ্লোব তৈরি করে দেয়। আর ইতালি থেকে এর দেয়ালের জন্য সাদা মার্বেল পাথর আনা হয়। একই সঙ্গে এই সময়ের মধ্যে এর ভেতরের বাগানের জন্য নকশা প্রণয়নের কাজ চলতে থাকে।
অরোভিলার এই মাতৃমন্দিরের নির্মাণকাজে তিনটি প্রধান পর্ব আছে। প্রথমটি হচ্ছে বাইরের দেয়ালের জন্য ফেরোসিমেন্টের ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া ও সেই মতে কাজ করা; দ্বিতীয়ত, বাইরের ১২টি পাপড়িসদৃশ মেডিটেশন রুম বা ধ্যানকক্ষ নির্মাণ আর মুক্ত মঞ্চের জন্য আগ্রার স্থানীয় লাল পাথরের ব্যবহার।
পাথরের পাপড়িসদৃশ মেডিটেশন রুমগুলো মাতৃমন্দিরের নিচের পুকুর থেকে ঢেউ খেলিয়ে ওপরের দিকে উঠে গেছে। এক একটির পরিধি ৪০ মিটারের মতো, যেটি ধীরে ধীরে গ্রাউন্ড লেভেল থেকে বাগানের দিকে নেমে গেছে। এগুলোর মধ্য দিয়ে ১২টি রাস্তা আছে, এর মধ্যে ৪টি সরাসরি মাতৃমন্দিরের ভেতরে ৪ পিলারের মাঝে সিঁড়ি ধরে উঠে গেছে। বাকি ৮টি নিচের পুকুরের দিকে গেছে। প্রতিটি পাপড়িতে একটি করে ডিম্বাকৃতির মেডিটেশন রুম আছে।
প্রতিটি ৮৩০ কেজি ওজনের ২৪ মিটার দীর্ঘ ব্যাসের কলাম স্টেইনলেস স্টিল থেকে নির্মিত এবং গ্যালভানাইজ করা। এর দৈর্ঘ্য ৮.৬৫ মিটার আর গায়ে আছে কারুকার্যের ছোঁয়া।
মাতৃমন্দিরের বহির্দেয়ালের সজ্জায় পুরোপুরি স্বর্ণালী চাকতির ব্যবহার করা হয়েছে। বড় চাকতিগুলো গড়ে ২.৩ মিটার আর ছোটগুলো ১.৫ মিটার ব্যাসার্ধের। এগুলো পুরোপুরি চ্যাপ্টা নয় বরং ঢাকনার মতো কিছুটা বাঁকানো। আর এর ফাঁকে ফাঁকে ৭,৫০,০০০টি ২৪ ক্যারটের স্বর্ণের তৈরি পাতা বসানো আছে। প্রতিটি পাতার জন্য ২৮ গ্রাম সোনা লেগেছে। ফলে সর্বমোট ১৮ কেজির মতো সোনা ব্যবহার করা হয়েছে। জার্মানি থেকে বানিয়ে আনা এই স্বর্ণপত্রগুলো প্রথমে উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত হলে পরে সেটি পালটে ফেলা হয়। কারণ, এগুলো বাইরের পাখি এবং পোকামাকড়কে আকর্ষণ করবে আর এর নিরাপত্তাও একটি বড় প্রশ্ন। তাই এগুলো দ্বিস্তরের পাতলা গ্লাসসের মধ্যে বসানো হয়। এতে সুরক্ষার পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণসহ প্রয়োজনে কোনোটির পরিবর্তনের কাজও বেশ সহজ হয়েছে।
এ ছাড়া মাতৃমন্দিরের আরেকটি বিস্ময় হচ্ছে এর স্ফটিক গ্লোব। ৭০ সেন্টিমিটার ব্যাসের এই গ্লোবটি শুধু পৃথিবীর একমাত্র নয়, সব থেকে বড় ‘অপটিক্যালি পারফেক্ট গ্লাস গ্লোবও। গুরুমাতা মীরা আলফাসার ইচ্ছানুযায়ী এটি শ্রী অরবিন্দের বিশেষ চার প্রতীকের মাঝে বসানো হয়।
মাতৃমন্দির ছাড়াও অরোভিলার অন্যান্য স্থাপনাও বেশ নজরকাড়া। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-সাবিত্রী ভবন, ভেরেটি লার্নিং সেন্টার, ভারত নিবাস, আফসানা গেস্টহাউস ইত্যাদি। অরোভিলাতে কোনো পেপার বা কয়েন কারেন্সি নেই। অধিবাসী সবারই নিজস্ব অ্যাকাউন্ট আছে। দর্শনার্থীদেরও সাময়িক অ্যাকাউন্ট খুলতে হয় আর সংগ্রহ করতে হয় অরোকার্ড (একধরনের ডেবিট কার্ড)।