সড়ক নির্মাণের আদ্যোপান্ত (প্রথম পর্ব)

মুসলমানদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদ। এই ঈদে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব একত্রিত হওয়ার জন্য উদগ্র একটি বাসনা নিয়ে সারা বছর প্রতিক্ষার প্রহর গোনে সবাই। নিজের বাবা-মা আর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদ উদ্যপানের জন্য সবাই ছুটে চলে শিকড়ের টানে। এ উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে উৎসব ভাতাসহ ছুটি প্রদান করা, যানবাহনের সুবিধা ও সংখ্যা বাড়ানো, আলোকসজ্জা এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে নানাবিধ কার্যক্রম নেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর ঈদের আগে সড়ক ও জনপথ উন্নয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা কর্তৃক তোড়জোড় লেগে যায় সড়ক সংস্কারে। সময়স্বল্পতার কারণে ঈদের আগে কাজ শেষ করা কিংবা কাজের গুণগত মান রক্ষা করা কোনোটাই সম্ভব হয় না। ফলে সড়কপথে চলাচলকারী ঘরমুখো মানুষজনকে ভোগান্তির চরম সীমায় পৌঁছাতে হয়। বিভ্রাট মানুষের জীবনে আসা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যদি তা হয় মানব সৃষ্ট, তাহলে তা বড়ই বেদনাদায়ক। প্রসঙ্গত, সড়ক নির্মাণ কিংবা সংস্কারকাজের জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি আছে, যা যথাযথভাবে মেনে এতদ্সংশ্লিষ্ট সব কাজ সম্পন্ন করা, নির্মিত সড়কসমূহ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা, সড়কপথে যাতায়াতব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে ট্রাফিক চলাচলব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করার মতন বিষয়ের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারলে সড়কপথে চলাচলকারী মানুষের ভোগান্তি লাঘব হতো অনেকটাই। 

আমি আমার কর্মজীবনে দেশ-বিদেশ মিলিয়ে ৪১ বছর পার করেছি, বইপুস্তক পড়ে অর্জনকৃত জ্ঞানের পাশাপাশি এই সুদীর্ঘ সময়ে অর্জিত ইমারত ও সড়ক নির্মাণকাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশভুক্ত ২০টি দেশের ১০০টির অধিক শহর ঘুরে যা দেখেছি, তাতে আমাদের দেশে নির্মাণ কিংবা সংস্কারসংক্রান্ত নিয়মনীতিগুলো যথাযথভাবে মেনে না চলা এবং ট্রাফিক চলাচল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারাই এই জনভোগান্তির প্রধান কারণ বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। 

ফলে, আমার অভিজ্ঞতার আলোকে ‘সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার এবং নির্মাণসামগ্রী ও কাজের গুণগত মান’ সম্পর্কিত বিষয়গুলো সবার জ্ঞাতার্থে তুলে ধরার লক্ষ্যে এবারের এই ধারাবাহিক প্রয়াস। প্রথমত, প্রাসঙ্গিক কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের একটি অধিদপ্তর আছে। এই অধিদপ্তরে কর্তব্যরত ব্যক্তিবর্গেরই দায়িত্ব অত্র কাজগুলো যথাযথভাবে সম্পাদন করা। আর তাদের এই দায়িত্বসমূহ সঠিকভাবে পালন করার মাধ্যমেই ঘটে আমাদের সার্বিক শিক্ষা ও নীতি-নৈতিকার বহিঃপ্রকাশ। 

দ্বিতীয়ত, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের নিজ নিজ কর্তব্যগুলো সুষ্ঠুভাবে পালন করার জন্য সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও আত্মসচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি প্রয়োজন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সব কাজের নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে জবাবদিহির আওতায় আনা। কারণ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক শিথিলতা কিংবা যেকোনো ধরনের দুর্বলতা যদি একবার প্রকাশ পায় তাহলে কোনো কাজই সঠিকভাবে সম্পাদন করা সম্ভব নয়।

এ ছাড়া, একটি প্রকল্পের প্রতিটি কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা অত্যাবশ্যক। তাই ‘ঈদ’ উপলক্ষে ঘরে ফেরার নিমিত্তে চিন্তিত মানুষগুলোর যাতায়াতব্যবস্থা নির্বিঘ্ন কিংবা সহজতর করণার্থে সড়ক সংস্কারের জন্য গৃহীত প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নকল্পে সুচিন্তিত একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা এবং তদ্নুযায়ী সব কাজ সম্পন্ন করা নিশ্চিত করতে পারলে ভুক্তভোগী মানুষকে এহেন ভোগান্তির হাত থেকে রেহাই দেওয়া যেতে পারে সহজেই।

তদুপরি, সুপরিকল্পিত একটি নিয়মনীতির মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট কাজগুলো বাস্তবায়ন করা হলে, স্বল্প সময়ে কিংবা অসময়ে তাড়াহুড়োর মাধ্যমে কাজ শেষ করতে গিয়ে কাজের গুণগত মান রক্ষা করতে না পারা কিংবা সময়মতো কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে মানুষকে ভোগান্তির মুখে ঠেলে দেওয়ার মতো বিষয়গুলো এড়িয়ে চলা সম্ভব হতে পারে। ফলে সংশ্লিষ্ট সকলের উচিত, যে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে নির্দিষ্ট পরিকল্পনামাফিক সব কাজ সম্পন্ন করণার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

মনে রাখা দরকার, একটি দেশে প্রতিষ্ঠিত সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থাই সে দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি। অতএব, উন্নয়নশীল যে কোনো দেশের উন্নতি নিশ্চিত করণার্থে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক সব ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য একটি বিষয়। এতদ্লক্ষ্যে, সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতা ও আত্মসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। তাই, দেশ ও জাতির স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সবারই উচিত, আত্মবিশ্লেষণ করে নিজ নিজ অবস্থানের উন্নয়ন সাধন করা।

এবার আসা যাক, আমাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ‘নির্মাণ ও সংস্কার এবং নির্মাণসামগ্রী ও কাজের গুণগত মান’ সম্পর্কিত মূল আলোচনায়। অত্র বিষয়ের ওপর বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগেই একটি দেশের সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে মৌলিক কিছু ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছি। 

পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই মানুষের যাতায়াতব্যবস্থা নির্বিঘ্নে এবং সহজতর করার জন্য যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকে সাধারণত তিনভাগে বিভক্ত করা হয়। 

যেমনঃ স্থলপথ,

         ১। স্থলপথ আবার দুইভাগে বিভক্ত- 

         ক. সড়ক ও জনপথ 

         খ. রেলপথ।

         ২। জলপথ আর 

         ৩। আকাশপথ। 

আগেই বলা হয়েছে, উপরোল্লেখিত প্রতিটি ব্যবস্থার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার ওপর একটি দেশের সামগ্রিক উন্নতি নির্ভর করে। তাই, এসব যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকল্পে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসমূহ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সব দেশেই আলাদা আলাদাভাবে এক একটি অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত করা হয়। অত্র অধিদপ্তরসমূহ তাদের আওতাধীন এলাকায় নির্মাণ কিংবা সংস্কারসংক্রান্ত সব পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকল্পে সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।

যাই হোক, উল্লেখিত যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্য থেকে আমাদের আলোচ্য বিষয় স্থলপথের একটি অংশ ‘সড়ক ও জনপথ’। অত্র সড়ক ও জনপথ এর নির্মাণপ্রক্রিয়া এবং নির্মাণকাজে ব্যবহৃতব্য মালামালের প্রকারভেদ অনুসারে এদেরকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। 

যেমন:

  • কাঁচা সড়ক/রাস্তা
  • ওয়াটার বা উন্ডম্যাকাডম রোড (সড়ক)
  • সিমেন্ট কংক্রিট রোড (সড়ক)
  • আর.সি.সি. রোড (সড়ক)
  • অ্যাজফাল্ট রোড (সড়ক) প্রভৃতি। 

সড়ক ও রাস্তাসমূহের নির্মাণ কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ (সংস্কার) কাজের জন্য গৃহীত প্রকল্পের কাজসমূহ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করার নিমিত্তে ধারাবাহিকভাবে যে কাজগুলো সম্পন্ন করা দরকার- 

যেমন;

১. নির্মাণ

  • স্থান পরিদর্শন করা এবং প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা,
  • ভৌতকাজের নকশা প্রণয়ন করা,
  • কাজ ও মালামালের স্পেসিফিকেশন তৈরি করা,
  • সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রাক্কলন তৈরি করা,
  • প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক অনুমোদন নেওয়া,
  • প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি জোগাড় করা,
  • ভৌতকাজ বাস্তবায়ন করা প্রভৃতি। 

২. রক্ষণাবেক্ষণ (সংস্কার)

  • প্রকল্পের স্থান পরিদর্শন করা,
  • কাজ ও মালামালের স্পেসিফিকেশন তৈরি করা,
  • সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রাক্কলন তৈরি করা,
  • প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক অনুমোদন নেওয়া,
  • প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি জোগাড় করা,
  • ভৌতকাজ বাস্তবায়ন করা ইত্যাদি। 

উপরোল্লিখিত কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা এবং তদ্নুসারে সব কাজ সম্পন্ন করা অত্যাবশ্যক। 

(চলবে)

ডিজিএম (কিউ) অ্যান্ড এম.আর.

দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লি.

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০১তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৮

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top