সায়েন্স ফিকশন মুভিগুলোকে এখন আর সাই-ফাই বা সায়েন্স ফিকশন মুভি বলার দিন ফুরালো বলে! সায়েন্স ফিকশনের অনন্য সব আবিষ্কার দেখে কুশলী বিজ্ঞানীরা গড়ছেন নতুন সব প্রযুক্তি। সেক্ষেত্রে আমরা এ মুভিগুলোকে বলতে পারি ‘সায়েন্স ফিউচার মুভি’। সাই-ফাই মুভিগুলোতে দেখা যায় হিরো বা ভিলেন এমন গাড়ি নিয়ে ঘুরছে, যা বিমানের গতিকেও হার মানায়। বেশির ভাগ আধুনিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটেছে এ রকম বিজ্ঞানভিত্তিক বই বা সিনেমার সূত্র থেকেই। বিশ্ববিখ্যাত টেক প্রতিষ্ঠান টেসলা বা স্প্যাসেক্সের পেছনের মানুষ ইলন মাসক হাইপারলুপের আবিষ্কারক। তিনি এমন সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার পরিকল্পনা করেছেন, যা মানুষ বা পণ্য পৌঁছে দেবে নির্দিষ্ট গন্তব্যে বিমানের চেয়েও দ্রুততায়।
হাইপারলুপ মূলত পাইপলাইনের যোগাযোগব্যবস্থা। অনেকটা ঢাকার শপিং মলের ক্যাপসুল লিফটের মতো। তবে ক্যাপসুল লিফটের সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, এটি আপনাকে নিয়ে যাবে ওপরে বা নিচে এবং হাইপারলুপ দ্রুতগতিতে নিয়ে যাবে আপনার গন্তব্যে। হাইপারলুপ মূলত একটি লম্বা টিউব, যার ভেতরের সব বাতাস বের করে শূন্যস্থান তৈরি করা হয়। ফলে বায়ুশূন্য এ টিউবের ভেতর দিয়ে চুম্বকশক্তি কাজে লাগিয়ে প্রচণ্ড গতিতে যাতায়াত করতে পারে যানবাহন আকৃতির কোনো কাঠামো। হাইপারলুপের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাসকের মতে, এটি যেমন দ্রুতগতিসম্পন্ন, তেমনি ট্রেনের তুলনায় এটিতে খরচাপাতিও কম।
বিমানের চেয়েও গতিশীল এ এক অদ্ভুত বাহন চালু হতে যাচ্ছে দুবাই থেকে আবুধাবির মধ্যে। বায়ুশূন্য টানেলের মধ্যে দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে চলবে এ বাহনগুলো। মার্কিন প্রতিষ্ঠান ভার্জিন ‘হাইপারলুপ ওয়ান’ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে দুবাইয়ে। সম্প্রতি দুবাইয়ে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভার্জিনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে হাইপারলুপ প্রযুক্তির একক প্রদর্শনীও।
হাইপারলুপের যে বাহনগুলোতে যাত্রী পরিবহন করা হবে, সেগুলোকে বলা হচ্ছে ‘পড’। দুবাইতে বেশ বিলাসবহুল ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ডিজাইনের পড প্রদর্শিত হয়েছে। প্রতিটি পডে ১০ জন করে যাত্রী পরিবহন করা যাবে বলে জানানো হয়েছে। দুবাইয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও পড পরিদর্শন করেছেন। হাইপারলুপের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ২০২০ সালের মাঝেই দুবাই ও আবুধাবির মাঝে এই হাইপারলুপ চালু করা সম্ভব হবে। তবে, এখনো সবকিছু চূড়ান্ত নয়।
পডগুলোতে রয়েছে বেশ আরামদায়ক আসনব্যবস্থা। এ ছাড়া যাত্রীদের যেন একঘেয়েমি না লাগে সে জন্য এগুলোর সঙ্গে রয়েছে হাইরেজল্যুশন স্ক্রিন। দুবাই ও আবুধাবির মাঝে হাইপারলুপের টানেল তৈরি করা হবে পিলারের ওপরে। বায়ুশূন্য হওয়ার কারণে ওই টানেলে বায়ুর ঘর্ষণের ফলে সৃষ্ট কোনো বাধা ছাড়াই পডগুলো দৌড়াবে দুর্বার গতিতে! বলা হচ্ছে, এই ট্রেনের গতি হবে ঘণ্টায় ১২০০ কিলোমিটার!
দুবাইয়ের পাশাপাশি ভারতেও হাইপারলুপ চালু করার কথা ভাবছে প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি দেশটির কেন্দ্রীয় পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে তারা সম্মতও হয়েছে এ প্রস্তাবনায়। প্রাথমিকভাবে ভারত পুনে থেকে মুম্বাই পর্যন্ত একটি হাইপারলুপ স্থাপনে আগ্রহী। দুবাই ও আবুধাবির মাঝে যাতায়াতকারী হাইপারলুপ প্রতি ঘণ্টায় উভয় দিকে ১০ হাজার যাত্রী পরিবহনে সক্ষম হবে বলে আশাবাদী নির্মাতারা। প্রাথমিকভাবে আবুধাবির আল মাকতুম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুবাই সীমান্ত পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার লম্বা হাইপারলুপ ট্র্যাক (যে টিউবের ভেতর দিয়ে বাহনটি চলাচল করবে) নির্মিত হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে তা সৌদি আরবের রিয়াদ পর্যন্ত ১০,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ানো হবে।
এ ছাড়া এ সম্পর্কে আরেকটি প্রকল্পের দায়িত্ব পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘হাইপারলুপ ট্রান্সপোর্টেশন টেকনোলজিস’। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, দুর্বার গতির এ যাতায়াতব্যবস্থা যাত্রী পরিবহন ছাড়াও বিভিন্ন বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে কার্গো বহনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান বিবব গ্রেস্তা বলেন, ‘এটা হতে চলেছে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক হাইপারলুপ-ব্যবস্থা। ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের একটি বড় অঞ্চলকে হাইপারলুপ যাতায়াতের আওতায় আনার প্রত্যাশা করছি আমরা।’
২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো হাইপারলুপ যাতায়াতব্যবস্থার ধারণাটি প্রথম জনসম্মুখে আনেন মার্কিন উদ্ভাবক ইলন মাসক। তার প্রস্তাবিত ধারণায় বলা হয়েছে, লস অ্যাঞ্জেলস থেকে সানফ্রান্সিসকো যাতায়াত করা সম্ভব মাত্র ৩০ মিনিটে অর্থাৎ দ্রুতগামী প্লেনে যাতায়াতের চেয়েও অর্ধেক সময়ে।
হাইপারলুপ মূলত একটি লম্বা টিউব, যার মধ্যে থেকে সব বাতাস বের করে শূন্যস্থান তৈরি করা হয়। ফলে এ বায়ুশূন্য টিউবের ভেতর দিয়ে চুম্বকশক্তি কাজে লাগিয়ে প্রচণ্ড গতিতে যাতায়াত করতে পারে যানবাহন আকৃতির কোনো কাঠামো। বর্তমানে এর উদ্ভাবক ইলন মাসকসহ বেশ কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে আগামীর যাতায়াতব্যবস্থা হাইপারলুপ নির্মাণের প্রতিযোগিতায়।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৮তম সংখ্যা, জুন ২০১৮।