সুব্যবসায়ী হতে চাই সততা

জনপদটি বেশ প্রাচীন, যা ছিল সুন্দরবনের বর্ধিতাংশ; জঙ্গলাকীর্ণ। সবাই বলত সূর্যদ্বীপ। বহতা নদী নবগঙ্গায় ছিল বর্ণিল ঝিনুকের প্রাচুর্য। দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীরা আসতেন ঝিনুকের মুক্তা কিনতে। ইতিহাসের মণিকোঠায় এ জনপদের রয়েছে নীল বিদ্রোহ, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতাযুদ্ধসহ সব আন্দোলনে গৌরবময় অবদান। বারো আউলিয়ার আশীর্বাদপুষ্ট; গাজী-কালু-চম্পাবতীর উপাখ্যানধন্য; কে পি বসু, গোলাম মোস্তফার স্মৃতিবিজড়িত; বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, বিপ্লবী বীর বাঘা যতীন, পাগলাকানাই, লালন শাহের জন্মধন্য এ জেলার নাম ঝিনাইদহ। এ জনপদের একজন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী মো. তামজিদুর রহমান (টুটুল)। শের-ই-বাংলা সড়ক, ঝিনাইদহের ‘মেসার্স সোয়াদ ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী তিনি। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব এ ব্যবসায়ীর সাফল্য-রহস্য। সঙ্গে ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা মো. মোহন রায়হান।

ব্যবসায়ী তামজিদুর রহমান টুটুুলের জন্ম ১৯৭৭ সালের ১৬ নভেম্বর ঝিনাইদহ জেলার হামদহে। বাবা মো. বজলুর রহমান ও মা আতিয়া বানু ডলি। বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। তিনি ঝিনাইদহ সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৯৩ সালে মাধ্যমিক এবং ঝিনাইদহ কলেজ থেকে ১৯৯৫ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ছাত্রজীবন থেকেই যুক্ত ছিলেন রাজনীতির সঙ্গে। উচ্চমাধ্যমিকের পর রাজনৈতিক নানা কাজে বেড়ে যায় সম্পৃক্ততা। ফলে লেখাপড়ায় আর অগ্রসর হতে পারেননি। এভাবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর পেশাগত কাজের তাগিদে পারিবারিক চাপ বাড়ায় পরিবারের সহযোগিতায় সেজো ভাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন ব্যবসায়। ২০০১ সালে শহরের নগরবাথানে শুরু করেন সারের ব্যবসা। কিন্তু এ ব্যবসায় নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেননি। পরে সারের ব্যবসা বাদ দিয়ে ২০১১ সালে শুরু করেন নির্মাণপণ্যের ব্যবসা।

ব্যবসায়ী টুটুল নির্মাণপণ্যের এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন অনেকটাই কাকতালীয়ভাবে। তাঁর বড় এক ভাই সিমেন্ট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। তাঁর সূত্র ধরেই ঘটনাচক্রে এ ব্যবসায় আসা। পণ্য বিক্রি করতে নিজ বাড়ির সামনেই গড়ে তোলেন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। প্রথমে সিমেন্ট; পরে যোগ করেন বালু ও রড। ব্যবসা শুরুর কিছুদিন পর শুরু করেন আকিজ সিমেন্ট বিক্রি। গুণগতমানের এ পণ্যটি তাঁকে এনে দেয় অনন্য ব্যবসায়িক সাফল্য। তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির ঝিনাইদহ টেরিটরির অন্যতম সেরা বিক্রেতা। পণ্যটি বিক্রিতে এ বছর তিনি চতুর্থ এবং গত বছর পঞ্চম সেরা বিক্রেতার স্বীকৃতি অর্জন করেন। এমন অভূতপূর্ব সাফল্যে তিনি কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন ল্যাপটপ, মাইক্রোওভেন, মোবাইল ফোন, ক্রোকারিজ সামগ্রী, ডিনার সেট, স্বর্ণালংকার। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন আমেরিকা, মিশর, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভুটান, নেপালসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অফার। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাঁর চমৎকার ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য পেয়েছেন বিশেষ (বেস্ট পেমেন্ট অ্যাওয়ার্ড) পুরস্কার।

ব্যবসায়ী তামজিদুর রহমান টুটুল স্বল্পকালীন ব্যবসায়ী জীবনে যে সফলতা পেয়েছেন, তা মোটেও সহজসাধ্য নয়। একবারেই শূন্য হাতে শুরু করেন ব্যবসা। যেখানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন সেটাও ছিল না কোনো বাজার বা ব্যবসার আদর্শ স্থান। এমনকি ওই স্থানে দ্বিতীয় কোনো নির্মাণপণ্যের দোকানও ছিল না। যদিও পরে আরও দুটি নির্মাণপণ্যের দোকান গড়ে ওঠে কিন্তু ব্যবসা না হওয়ায় তাঁরা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। এমন একটি স্থানে অনেক সংগ্রাম করে তিনি ব্যবসাটিকে দাঁড় করিয়েছেন। প্রথম দিকে বেচাকেনা এতটাই কম ছিল, শঙ্কা ছিল ব্যবসা টিকিয়ে রাখার! কিন্তু ব্যবসায়ী টুটুল এ ব্যবসাটিকে দাঁড় করাতে ছিলেন সংকল্পবদ্ধ। প্রচুর পরিশ্রম এবং জনসংযোগ শুরু করেন। যেহেতু তিনি সামাজিক সংগঠন করতেন, এ জন্য পরিচিতি ছিলেন; সবাই চিনতেন। এ ছাড়া আকিজ সিমেন্টের ব্র্যান্ড ইমেজ থাকায় সহজেই তিনি অধিকসংখ্যক পণ্য বিক্রি করতে সক্ষম হন। এ ছাড়া কোম্পানির তরফ থেকেও পেয়েছেন যথেষ্ট সহযোগিতা। পরিচিতজনেরা ছাড়াও স্থানীয় নির্মাণশ্রমিকদের। সবার সহযোগিতার এবং সাফল্যের ধারাবাহিকতায় তিনি আরও একটি নির্মাণপণ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

ব্যবসায়ী তামজিদুর রহমান টুটুল বিয়ে করেছেন ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর। সহধর্মিণী ডালিয়া আফরোজ। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর নিয়েছেন। বর্তমানে ঢাকার নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে (এলএলবি) অধ্যয়নরত। উল্লেখিত ব্যবসা ছাড়াও ব্যবসায়ী টুটুল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একজন প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার। জীবনের বহু মূল্যবান সময় তাঁর নষ্ট হয়েছে অবহেলায়। কিন্তু এমনটা আর নয়! নির্মাণপণ্যের এ ব্যবসাটি তাঁর জীবনকে নতুনভাবে চালিত করেছে; এনে দিয়েছে ব্যবসায়িক সাফল্য। এ জন্য ব্যবসাটি করতে চান আরও বৃহৎ পরিসরে; হতে চান একজন সৎ আদর্শ ব্যবসায়ী।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৬তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৮।

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top