বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন ঘুরে এলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের যশোর এরিয়ার (যশোর, খুলনা, নাভারন, সাতক্ষীরা, নড়াইল, বাগেরহাট) ৯টি টেরিটরির সম্মানিত পরিবেশক ও তাঁদের ব্যবসায় সহযোগীসহ বিভিন্ন স্তরের কোম্পানি প্রতিনিধিগণ। ১-৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ তিন রাত তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত আনন্দভ্রমণে কটকা, জামতলা, হিরণ পয়েন্ট, হাড়বাড়িয়া, দুবলার চরসহ আকর্ষণীয় কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরিয়ে দেখানো হয়। গত ১ ফেব্রুয়ারি আনন্দভ্রমণে অংশগ্রহণকারীরা একে একে সবাই হাজির হন খুলনার ৪ নম্বর লঞ্চঘাটে। সবাই যাঁর যাঁর কেবিন বুঝে নেন। সন্ধ্যা ৭টায় সুন্দরবনের উদ্দেশে ছাড়ে পর্যটকবাহী লঞ্চটি। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চটাও মৃদু শব্দে এগিয়ে চলে। রাতের নিকষকালো ভাবটা দূর হয়ে যায় কিছুক্ষণের মধ্যেই। আকাশে দেখা দেয় ঢাউস সাইজের চাঁদ! রুপালি আলো ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় আর পরিচিত হতেই রাত বাড়ে। সকালে ঘুম ভাঙে। চারপাশ তখনো ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন। লঞ্চ নদীতে নোঙর করা। কিছুক্ষণের মধ্যেই বনের ফাঁক গলে উঁকি দেয় সকালের সূর্য। হঠাৎ দেখা গেল বন থেকে একে একে বেরিয়ে আসছে কয়েকটি হরিণ। নদীর কিনারায় গাছের যে ডালগুলো নিচে ঝুলে আছে, সেখান থেকে পাতা খাচ্ছে ওরা।
দ্রুত ফ্রেশ হয়ে, নাশতা সেরে সবাই উঠলাম ইঞ্জিনচালিত নৌকায়। কয়েক মিনিটেই পৌঁছে গেলাম কটকা অভয়ারণ্যে। টাইগার পয়েন্ট নামে খ্যাত এ এলাকাটি শরণখোলা রেঞ্জে অবস্থিত। নৌকা থেকে নেমেই সামনে এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল বানরের খুনশুটি। এখানে রয়েছে বন বিভাগের অফিসও। বনের একটু গহিনে যেতেই দূর থেকে দেখা মিলল হরিণের আনাগোনা। প্রথমে কয়েকটা, আরও এগিয়ে যেতে পাল পাল হরিণ। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চিত্রাল হরিণের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। এরপর এগিয়ে গেলাম আরও কিছুটা বনের গহিনে। জঙ্গল ক্রমেই ঘন হয়ে এল। দেখা মিলল কিছু সুন্দরিগাছের। পরপর দুইটা কম উচ্চতার টিলার দেখা পেলাম। এই টিলাগুলোই টাইগার টিলা। বেশ বিপজ্জনক জায়গা। পাশেই বয়ে চলা শান্ত খাল। কিন্তু এই খালেই অবাধ বিচরণ সুন্দরবনের লোনাপানির ভয়ংকর কুমিরের।
কটকা ঘুরে আবারও নৌকায় করে গেলাম জামতলা সি বিচ দেখতে। সুন্দরবনের যে কটি জোনে বাঘের বিচরণ বেশি, এ অঞ্চল তার অন্যতম। ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছি। দুপাশে টাইগার ফার্ন, হেতেল ও বড় বড় ঘাসের বন। গা-ছমছমে ভাব। নিরাপত্তা দিতে সঙ্গে রয়েছেন দুজন খাকি পোশাকের বন্দুকধারী বনরক্ষী ও দুজন গাইড। তাঁরা অন্য সময়ে বন সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য ও সবার প্রশ্নের জবাব দিলেও এ সময়ে তেমন কথা বলছেন না। সদা সতর্ক দৃষ্টি তাঁদের। সবাইকে বলছেন একসঙ্গে থাকতে। আমাদের কিছুটা সামনে দিয়েই জঙ্গলের ওপার-এপার হচ্ছে চিত্রা হরিণের দল। ছবি তোলার জন্য সবার আগে আগেই এগোছিলাম। হঠাৎই কানে এল কিছুটা চাপা আওয়াজ। কয়েকটি হরিণ প্রচণ্ড গতিতে লাফিয়ে লাফিয়ে পাশের জঙ্গলে ঢুকছে! মরিয়া হয়ে দৌড়ানো একটি হরিণের ছবিও নিলাম। বাঘ! বাঘ! বাঘ! বলে মৃদু চিৎকার করে উঠলেন সঙ্গে থাকা বনরক্ষী। মুহূর্তের মধ্যে বন্দুক তাক করে পজিশন নিলেন। সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়ে সতর্ক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম বাঘের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে। আতঙ্কের ছাপ সবার চোখে-মুখেই স্পষ্ট। দূরে ডেকে উঠল কয়েকটা বনমোরগ। কিছুক্ষণ সেখানে থেকে এগোলাম সমুদ্রসৈকতের দিকে। বনরক্ষী জানাল এই জায়গাটা বাঘের ডায়নিং নামে খ্যাত। এখানে রয়েছে একটি স্বাদু পানির ডোবা। বনের প্রাণীরা আসে পানি খেতে। কথাটা কতটা সত্য তা আশপাশের ঘাসগুলো দেখলে বোঝা যায় সহজেই। ঘাসের মধ্যে প্রাণীদের চলার পথ; কোথাও কোথাও আবার বিশ্রাম নেওয়ায় ঘাসগুলো মাটির সঙ্গে মিশে রয়েছে। জামতলা সৈকতে পৌঁছে দেখলাম সিডরের আঘাতের চিহ্ন এখনো স্পষ্ট। তা সত্ত্বেও একপাশে জঙ্গল আরেক পাশে সাগরের মায়াবী জলরাশির অবিশ্রান্ত গর্জন এক অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে দেয় মন। ফেরার পথে পর্যবেক্ষণ (ওয়াচ) টাওয়ারে উঠে চারপাশটা চোখ বুলিয়ে নিলাম। এ পথের পাশে ঘন জঙ্গলে বাঘ, হরিণ, শূকর, বিষধর সাপসহ বিভিন্ন প্রাণীর আনাগোনা জায়গাটিতে এনেছে গা-ছমছমে ভাব।
বিকেলে লঞ্চে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রামে যেতেই সন্ধ্যা নামল। আকাশের বুকে অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ল নদীতে; জঙ্গলজুড়ে। পড়ন্ত আলোয় চারদিকে এক মায়াবী পরিবেশ। সবাই তখন লঞ্চের ডেকে বসে নিশ্চুপ হয়ে উপভোগ করছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। রাত নামতেই লঞ্চের ভেতর থেকে ভেসে এল বাঁশির সুর; কোথাও আবার দরদি কন্ঠের গান। লঞ্চ এগিয়ে যাচ্ছে পরের গন্তব্যে। পরদিনের গন্তব্য হিরন পয়েন্ট। এবার নদী থেকে খালে প্রবেশ। দুপাশে ম্যানগ্রোভ গাছের সারি। কয়েকটি গাছে সাদা বকের ঝাঁক ও অন্যান্য পাখির আনাগোনা সঙ্গে কিচিরমিচির চিৎকার। হিরন পয়েন্টের অন্য নাম নীলকমল। এখানে আছে বন বিভাগের অফিস, মিঠাপানির পুকুর, পুকুরপাড়ের কাছেই ঘন জঙ্গলসংলগ্ন ওয়াচ টাওয়ার।
সেখান থেকে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে রওনা হলাম দুবলার চরে। বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপটি শুঁটকিপল্লি নামেই খ্যাত। মাছ ধরার মৌসুমে বিভিন্ন স্থানের জেলেরা প্রতিবছর এখানে অস্থায়ী ঘরবাড়ি তৈরি করেন। তাঁরা প্রচুর মাছ ধরে তা থেকে শুঁটকি বানান। পুরো চরেই শুঁটকির মাচা। এই চরেই প্রতিবছর কার্তিক মাসে রাসপূর্ণিমায় বসে রাসমেলা। রাসমেলা উপলক্ষে অনেক দেশি-বিদেশি পুণ্যার্থী ও পর্যটকেরা আসেন। প্রচুর গাঙচিলের আনাগোনা সৈকতের চারপাশে। অনেকেই এখান থেকে শুঁটকি কিনল। খেলাম স্বুস্বাদু গরম জিলাপি। এরপর সৈকতে মেতে উঠা বর্ণাঢ্য ফুটবল খেলায়। খেলা শেষে পড়ন্ত বিকেলে লঞ্চে ফেরা।
সবার বিনোদনে রাতে আয়োজন করা হয় খেলাধুলা, র্যাফেল ড্র, মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। প্রতিটি খেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও র্যাফেল বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয় দারুন সব পুরস্কারে। এ ছাড়া অংশগ্রহণকারী সবাইকে দেওয়া হয় আকর্ষণীয় পুরস্কার। ব্যবসায়িক ব্যস্ততার ফাঁকে এ ধরনের আনন্দভ্রমণ আকিজ সিমেন্ট বিক্রেতাদের মাঝে সৃষ্টি করেছে দারুণ উৎসাহের। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানিকে অংশগ্রহণকারীদের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানানো হয়। এ ছাড়া সফলভাবে এই রোমাঞ্চকর ভ্রমণ সুসম্পন্ন করায় আকিজ সিমেন্টের সিনিয়র ম্যানেজার (সেলস, ওয়েস্ট রিজিয়ন) নাসিম হাসান পিকুল, সিনিয়র এরিয়া ম্যানেজার (যশোর জোন) মো. ইয়ামিন আলী, টেরিটরি ম্যানেজার (নাভারন) ওয়ালিদুর রহমান ও সি. টেরিটরি অফিসার (খুলনা) তৌহিদুল ইসলাম সরকারের প্রতি প্রকাশ করা হয় বিশেষ কৃতজ্ঞতা।
ফেরার দিন ভ্রমণে যাই হাড়বাড়িয়া ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রে। হারবাড়িয়া বাঘের জন্য বিখ্যাত। এক কিলোমিটারেরও অধিক কাঠের ট্রেইল পার হয়ে পৌঁছায় চমৎকার এক পুকুরপাড়ে। পুকুরে ফুটে আছে রাশি রাশি পদ্ম। সেখানে কিছু সময় কাটিয়ে যাওয়া গোলপাতার বনে। ভেজা মাটিতে বাঘের পায়ের ছাপ চোখে পড়ে। ছাপযুক্ত জায়গাটির ছবি ক্যামেরাবন্দী করি। যদিও ট্যুর অপারেটররা দর্শনার্থীদের চমক দেওয়ার জন্য কখনো কখনো বাঘের পায়ের ছাপওয়ালা ডাইস হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। তবে এখানে দেখা ছাপটি আসল হোক বা নকল, সুন্দরবনে ভয়ংকর বাঘের সামনাসামনি পড়ার থেকে পায়ের ছাপ দেখা তো ঢের ভালো!
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৫তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৮।