ইমারত নির্মাণ ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ (পর্ব-১৩)

(….পূর্ব প্রকাশের পর)

জানালা

একটি ইমারতের প্রতিটি কক্ষের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করতে ঘরের বহির্দেয়ালসমূহে জানালা ব্যবহার করা হয়, যা বিভিন্ন ধরনের মালামালের সাহায্যে তৈরি করা হয়ে থাকে। অতীতে এই কাজটি সম্পাদন করার জন্য সর্বত্রই কাঠের ব্যবহার ছিল সমধিক। সলিড কাঠের ওপর নানাবিধ নকশা অনুযায়ী এসব কাজ সম্পন্ন করা হতো। ইদানীং কাঠের জানালার ব্যবহার নেই বললেই চলে, গ্রামে-গঞ্জে মাঝেমধ্যে কিছু কিছু কাঠের জানালা দেখা যায়।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে কালের বিবর্তনে এই জানালা তৈরির কাজে ব্যবহৃত মালামালের পরিবর্তন হচ্ছে। সময়ের বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অত্র কাজের জন্য কাঠ, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম সেকশনসমূহ ধারাবাহিকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে জানালা তৈরির কাজে সর্বক্ষেত্রেই কাঠ, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের সঙ্গে কাচ (গ্লাস প্যান) সংযোজিত হয়ে থাকে। ব্যবহারকারীর আর্থিক সংগতি এবং রুচির সঙ্গে সামঞ্জস্যতা রক্ষা করে এসব মালামাল ব্যবহার করা হয়।

কাঠের জানালা

বহুল প্রচলিত কাঠের জানালার কিছু প্রকারভেদ রয়েছে, যেমন- ১. সলিড কাঠের চৌকাঠের সঙ্গে কাঠের তক্তা ব্যবহারে পাল্লা তৈরি করা, ২. সলিড কাঠের চৌকাঠের সঙ্গে কাঠের ফ্রেম তৈরি করে তার ওপর কাচ (গ্লাস প্যান) আটকিয়ে পাল্লা তৈরি করা এবং ৩. সলিড কাঠের চৌকাঠের সঙ্গে কাঠের ফ্রেম এবং কাঠের চিকন স্ট্রিপ দিয়ে পাল্লা তৈরি করা। উল্লেখ্য, কাঠের স্ট্রিপ দিয়ে তৈরি করা এ ধরনের পাল্লাকে সাধারণত খড়খড়ি নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

এই খড়খড়ি নামের জানালাগুলো বেশ ব্যয়বহুল সেই সঙ্গে আভিজাত্যের প্রতীকও বটে। প্রাচীনকালে জমিদারবাড়িতে এই জাতীয় জানালার প্রচলন ছিল বেশি। এই জানালা ব্যবহারের বিশেষ সুবিধা হলোÑরুমে আলো-বাতাস ঢোকার জন্য পুরো পাল্লাটি খোলার প্রয়োজন পড়ে না। পাল্লা তৈরির জন্য ব্যবহৃত সলিড কাঠের চিকন স্ট্রিপগুলো সিরিজ আকারে সাজিয়ে এমনভাবে এটি তৈরি করা হয়, যাতে সব স্ট্রিপ একত্রে ওঠানামা করিয়ে ঘরের ভেতর আলো-বাতাস ঢোকা কিংবা বন্ধ করার সুব্যবস্থা করা যায়।

কাঠের জানালা তৈরির কাজে বিভিন্ন ধরনের কাঠ ব্যবহৃত হয়। সহজলভ্যতার কারণে গ্রামাঞ্চলে সাধারণত আম, জাম, কাঁঠাল, নিম, কড়ই ইত্যাদি এবং শহরাঞ্চলে কাঁঠাল, কড়ই, চাপালিশ, তেল্শু, সেগুন ইত্যাদি কাঠ ব্যবহার করা হয়। এসব কাঠের মধ্যে আম কাঠ শুধু পাল্লা তৈরির কাজে এবং জাম, নিম ও  কড়ই শুধু চৌকাঠ তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া অন্য সব কাঠ দিয়েই চৌকাঠ ও পাল্লা দুটোই তৈরি করা হয়ে থাকে।

উপরোল্লিখিত কাঠসমূহের দামের পার্থক্য অনেক। তন্মধ্যে সেগুনই সর্বাপেক্ষা মূল্যবান কাঠ এবং এর দৃষ্টি নান্দনিকতাও বেশি। ফলে মানুষ যে যার রুচি ও আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী কাঠ ব্যবহার করে থাকে। কাঠ পচনশীল  পদার্থ, যার সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে না পারলে অকালেই নষ্ট হতে পারে। এ ছাড়া কাঠের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে মানুষ এখন এসব কাজের জন্য বিকল্প মালামাল হিসেবে স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম সেকশন ব্যবহার করছে।

স্টিলের জানালা

জানালা তৈরির ক্ষেত্রে কাঠের বিকল্প হিসেবে প্রাথমিকভাবে স্টিল ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। স্টিলের জানালা তৈরি করতে বিভিন্ন ধরনের এমএস (মাইল্ড স্টিল) সেকশন (অ্যাঙ্গেল, জেড, ফ্ল্যাট বার), এমএস শিট এবং গ্লাস প্যান ব্যবহার করা হয়ে থাকে। জানালা বন্ধ থাকা অবস্থায় যাতে রুমের ভেতর আলো প্রবেশ করতে পারে, সে জন্য জানালার পাল্লা তৈরি করার জন্য স্টিলের ফ্রেমের সঙ্গে আংশিক কিংবা সম্পূর্ণ অংশে গ্লাস ব্যবহার করা হয়।

গঠন প্রণালি অনুসারে স্টিলের জানালাকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে, যেমন:

১.       ফুল শিটেড পাল্লা

২.      আংশিক শিটেড কাম আংশিক গ্লেইজড পাল্লা

৩.      ফুল গ্লেইজড পাল্লা।

ফুল শিটেড পাল্লা

এই জানালা তৈরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের এমএস সেকশনের সাহায্যে আউটার ফ্রেমসহ পাল্লার ফ্রেম তৈরি করে তার ওপর সম্পূর্ণ অংশে এমএস শিট লাগিয়ে পাল্লা তৈরি করা হয়। এই পাল্লার কিছু সুবিধা ও কিছু অসুবিধা দুই-ই রয়েছে। যেমন- অত্র জানালা বন্ধ থাকা অবস্থায় চুরি-ডাকাতির ক্ষেত্রে নিরাপদ, কিন্তু ঘরে কোনো আলো প্রবেশ করতে পারে না। জানালা বন্ধ থাকলে দিনের বেলায়ও লাইট জ্বালানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। 

আংশিক শিটেড এবং আংশিক গ্লেইজড পাল্লা

এই ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের এমএস সেকশনের সাহায্যে আউটার ফ্রেমসহ পাল্লার ফ্রেম তৈরি করে তার ওপর আংশিক (১/৩ বা ১/২ বা ২/৩ অংশ) এমএস শিট এবং বাকি অংশে গ্লাস লাগিয়ে পাল্লা তৈরি করা হয়। এই জানালার সুবিধা-পাল্লা বন্ধ থাকা অবস্থায়ও ঘরে আলো প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু চুরি-ডাকাতির ক্ষেত্রে কিছুটা অনিরাপদ। কাচের অংশ ভেঙে রুম থেকে জামাকাপড়সহ ছোটখাটো জিনিসপত্র বের করে নেওয়া সম্ভব।

ফুল গ্লেইজড পাল্লা

অত্র পাল্লা তৈরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের এমএস সেক্শনের সাহায্যে আউটার ফ্রেমসহ পাল্লার ফ্রেম তৈরি করে তার ওপর সম্পূর্ণ অংশে গ্লাস লাগিয়ে পাল্লা তৈরি করা হয়। এই জানালা দৃষ্টিনন্দন যা ঘরের মধ্যে পর্যাপ্ত আলো প্রবেশে বিশেষভাবে সহায়ক। তবে উপরোল্লিখিত আলোচনার নিরিখে চুরি-ডাকাতির ক্ষেত্রে অত্র জানালা একইভাবে অনিরাপদ।

অ্যালুমিনিয়ামের জানালা

সময়ের ব্যবধানে মানুষের রুচি ও আর্থিক সংগতির পরিবর্তন ঘটেছে অনেক। যার ফলে জানালা তৈরির কাজে কাঠ, স্টিল দুটোই বাদ গিয়ে অ্যালুমিনিয়াম-গ্লেইজড জানালাই এখন বহুল প্রচলিত। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শহরাঞ্চলে শতভাগ এবং সাধ ও সামর্থ্য অনুযায়ী গ্রামাঞ্চলে আংশিকভাবে হলেও এই অ্যালুমিনিয়ামের জানালা ব্যবহৃত হচ্ছে। এই জানালাকে কাচের জানালাও বলা যেতে পারে। কারণ, একটি জানালার ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই কাচ দিয়ে তৈরি।

অত্র জানালা তৈরি করতে বিভিন্ন ধরনের অ্যালুমিনিয়ামের সেকশনের মাধ্যমে ফ্রেম তৈরি করে তার ওপর ৫ মিমি পুরুত্বের গ্লাস প্যান বসানো হয়। এই অ্যালুমিনিয়াম সেকশন এবং গ্লাস প্যান উভয়েরই রং ও পুরুত্ব অনুযায়ী  প্রকারভেদ আছে। আছে অত্র মালামাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মান অনুসারে উৎপাদিত মালামালের গুণগত মান আর দামের পার্থক্য। ব্যবহারকারী যে যাঁর সামর্থ্য এবং রুচি মোতাবেক এসব মালামাল ব্যবহার করে থাকে।

ভৌত কাজ বাস্তবায়ন

এই জানালা তৈরিতে চুক্তিভিত্তিকভাবে প্রয়োজনীয় সব মালামাল সরবরাহ করা এবং লেবার মজুরিসহ প্রতি এসএফটির দর হিসাবে সর্বমোট মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। একটি ইমারতের জন্য প্রয়োজনীয় জানালা তৈরি ও সরবরাহকাজের পরিমাণ সাধারণত এসএফটি হিসাবে নির্ণয় করা হয়। এক একটি জানালার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ গুণ করলে প্রতিটি জানালার ক্ষেত্রফল পাওয়া যায়। আলাদা আলাদাভাবে নির্ণয়কৃত সব জানালার ক্ষেত্রফল একত্রে যোগ করলে সর্বমোট কাজের পরিমাপ বেরিয়ে আসে।

উপরোল্লিখিত নিয়মটি শুধু স্টিল কিংবা অ্যালুমিনিয়াম দ্বারা তৈরি জানালার পরিমাপ এবং মূল্য নির্ধারণ করার লক্ষ্যে প্রযোজ্য। কাঠের জানালার ক্ষেত্রে লেবার মজুরি বা চুক্তিভিত্তিক কাজের বেলায় এসএফটির দর হিসাবে সর্বমোট মূল্য নির্ধারণ করা হলেও প্রয়োজনীয় কাঠ কেনার লক্ষ্যে কাঠের মাপ অনুযায়ী প্রতি সিএফটির দর হিসাবে মোট মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এ ছাড়া জানালা তৈরি করার জন্য লেবার মিস্ত্রির মজুরি দৈনিক হাজিরাভিত্তিকও হয়ে থাকে। 

যা-ই হোক, উপরোল্লিখিত প্রতিটি কাজ সম্পন্ন করতে মালামালের পাশাপাশি কাজের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি একটি বিষয়। বিশেষ করে কাঠের জানালা তৈরির ক্ষেত্রে ভালো মানের কাঠ কেনা প্রয়োজন। এ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সব মালামালের গুণগত মান নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। অতএব, ভালো মানের মালামাল চিনে নেওয়া এবং কাজের গুণগত মান বুঝে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞ লোকের। অতএব, সব কাজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং সার্বিক অপচয় রোধ করার লক্ষ্যে অভিজ্ঞ লোক নিয়োগ দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

(চলবে….)    

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৩তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৮।

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top