রাজধানীর মতিঝিল থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নানা মন্ত্রণালয়ের অফিস তথা সচিবালয়। এতে একদিকে যেমন সরকারের প্রশাসনিক কাজে সমন¦য়হীনতার সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে অপচয় হচ্ছে অর্থ ও সময়ের। নাগরিকদের বিড়ম্বনারও শেষ নেই। সমস্যাটি সমাধানে দীর্ঘদিন পরে হলেও সম্প্রতি সরকার একই ছাতার নিচে জাতীয় সচিবালয় স্থাপনে উদ্যোগী হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে বাড়বে কাজের গতি, কমবে দুর্নীতি। অর্থ ও সময়ের অপচয়ও রোধ হবে বহুগুণে। কিন্তু এই স্থাপনাটির ডিজাইন ও নির্মাণকাজ হতে হবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে স্থাপনাটির গুরুত্ব অনুধাবন করে লুই আই কানের স্থাপত্যশৈলীর আদলে প্রকল্পটি নিয়ে কাজ করছেন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন তালুকদার। ফাইনাল থিসিস হিসেবেই এই প্রকল্পের কাজটি তিনি করেছেন। প্রকল্পটির নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সচিবালয়’, যা একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রকল্প। প্রাথমিকভাবে স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার আগারগাঁওয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠটিকে।
শেরেবাংলা নগরের ক্যাপিটাল কমপ্লেক্সটি লুই আই কানের স্থাপত্যশৈলীর একটি মহাকাব্য একই সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় গৌরবের উৎস। এই ক্যাপিটাল কমপ্লেক্সটি বাংলাদেশকে আধুনিক স্থাপত্যের সর্বাপেক্ষা অত্যাধুনিক উদাহরণগুলোকে দারুণভাবে উপস্থাপন করে। লা কর্বুশিয়ারের চন্দ্রিগড়ের পাশে, এটি এই অঞ্চলের স্থাপত্য সংস্কৃতির প্রভাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। যদিও, কর্বুশিয়ারের বিপরীতে কান একটি বিল্ডিং নির্মাণের জন্য একটি ক্যানন প্রদান করেননি, তিনি নিয়ম ও আকারের ওপর ভিত্তি করে বস্তুগত ও কাঠামোর স্থাপত্যকেন্দ্রের ওপর ভিত্তি গড়ে তোলার একটি উপায় প্রদান করেছেন। তাঁর বিল্ডিং প্ল্যাটনিক ফর্ম এবং আকারের সঙ্গে সজ্জিত একটি শব্দভান্ডার প্রদান করে যা যেকোনো নকশা আইনে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
প্রাথমিকভাবে সংসদ ভবনটির বিপরীতে একটি সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। প্রকৃতপক্ষে লুই কান একটি নকশাও সম্পন্ন করেছিলেন। কিন্তু ঢাকার ভবিষ্যৎ শহুরে উন্নয়নের সঙ্গে এই প্রোটোটাইপ নির্মাণের জন্য শহরের উত্তর এলাকায় উন্নয়নের পরিকল্পনার সঙ্গে অন্যান্য দিক মিলিয়ে সমগ্র ধারণাটি ছিল সীমাবদ্ধ। কান ১৯৬৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম ভ্রমণের সময় ভূষিতির সূত্রটির স্বীকৃতি দেন। তিনি এই বদ্বীপীয় দেশটির মৌলিক বিল্ডিংয়ের বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেছেন যে উভয় প্ল্যাটফর্ম এবং প্রোটো-স্থাপত্যে ও আকার প্রদানের জন্য মাটির ছাঁচ নির্মাণ। তিনি ‘খনন ও ঢিবি’র প্রক্রিয়া হিসেবে এই ধারণাটি ধারণ করেন, যেটি একটি মাটির ঢিবি তৈরিতে ভূগর্ভস্থ খননের মাধ্যমে ওপর ভিত্তি করে স্থাপন করা হয়। খনন করা পিটটি রূপ নেয় পুকুরের।
লুই আই কানের প্রস্তাবে প্রকল্পটির ক্ষেত্রফল ছিল প্রায় ৪৫ একর। কিন্তু পরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের জন্য ১০ একর জায়গা প্রয়োজন হয়। বাকি ৩৫ একর এর ওপর নতুন এই প্রকল্পটির প্রস্তাব আনা হয়, যা এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলাস্থল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইকবাল হোসাইনের এই প্রকল্পের উপদেষ্টা ছিলেন স্থপতি শেখ ইতমাম সউদ। তা ছাড়া শ্রেণিশিক্ষক সারাহ্ বাশনীন প্রকল্পটি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে সহযোগিতা করেছেন।
ইকবাল হোসাইন বলছিলেন, ‘লুই আই কান আমার সব থেকে পছন্দের একজন স্থপতি। ওনার কাজের জ্যামিতিক আকার, বিশালত্ব ও সার্ভ-সার্ভিস ভাগ করা এই স্থাপত্য চর্চাগুলো আমাকে ভালোবাসতে বাধ্য করে। এ ছাড়া কানকে পছন্দ করার আরেকটি কারণ হচ্ছে অধ্যাপক মোহাম্মাদ আলী নকী স্যার। তিনি আমাদের সব সময় এই ডেকোরামগুলোর কথা বলতেন এবং শিখাতেন।’
কানের পরিকল্পনার সর্বাধিক নিখুঁত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাদের আপাতদৃষ্টিতে দ্বিপার্শ্বিক সাদৃশ্য যেখানে ভবন ও পৃথক ইউনিটগুলো প্রথাগত শাস্ত্রীয় পদ্ধতিতে সাজানো হয়। লুই আই কান বইয়ের লেখক রবার্ট ম্যাককাতার তাঁর বইয়ে সংসদ এবং সচিবালয় ভবনের মধ্যে অক্ষীয় সংযোগ সম্পর্ক দেখিয়েছেন (চিত্র: ০১)। এই সম্পর্কটি ক্যাপিটাল কমপ্লেক্স ও সচিবালয় প্রকল্পের জন্য রেফারেন্স হিসেবে নিয়ে এর পুনরাবৃত্তিমূলক বহুবিধতা এবং দ্বিপার্শ্বিক সাদৃশ্য জ্যামিতিক নীতি অনুসরণ করে ফাংশনাল ইউনিটগুলো সাজানো হয়েছে। কানের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা না করে, ফাংশনাল স্পেসগুলো একটি কেন্দ্রীয় স্থানকে ঘিরে বসানো হয়েছে এবং ওই কেন্দ্রীয় স্থানটি একটি গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নাগরিকেরা আসবে, তাদের মত বিনিময় করবে শাসক শ্রেণীর সঙ্গে। যখন একটি দেশের শাসক সংস্থার কর্মক্ষেত্রের কেন্দ্রীয় স্থানে দেখা যাবে সাধারণ নাগরিকেরা শান্তভাবে বসে মত বিনিময় করছে কিংবা কেউ তাঁদের অবসর সময়ে শুধু ওই স্থানটি দর্শনে এসেছেন তখনই শাসক সংস্থার উপলব্ধি হবে হ্যাঁ আমরা নাগরিকদের চাহিদামতো কাজ করছি কি করছি না। সচিবলায় প্রকল্পের প্রস্তাবিত উচ্চতা (১৩৫ মিটার) থেকে বিদ্যমান সংসদ ভবনের উচ্চতা (১৫৫ মিটার) বেশি। তা ছাড়া প্রকল্পের প্রস্তাবিত নির্মাণ উপকরণ এবং কাঠামোর বিষয়ে কানের মতাদর্শকে সাবধানে বিবেচনা নেওয়া হয়েছে।
সচিবালয় প্রকল্পের প্রস্তাবিত ডিজাইনে পাবলিক, সেমি-পাবলিক এবং স্পেস বিবেচনা করে প্রোগ্রামগুলো সাজানো হয়েছে। আমরা যদি গ্রাউন্ডফ্লোর প্ল্যান দেখি, সংসদ ভবনের অক্ষ বরাবর একতলাবিশিষ্ট যে বর্গটি রয়েছে তা হচ্ছে পাবলিক স্পেস, যেখানে সব মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি পরিদর্শক কেন্দ্র, খাবার সুবিধাসহ একটি ৩০০ আসনের মিলনায়তন, ২০০ আসনের একটি সম্মেলনকেন্দ্র এবং অন্যান্য সুবিধা রয়েছে। তার ছাদটি হয়ে যাচ্ছে উন্মুক্ত প্লাজা।
প্রয়োজনীয় চেকিং হয়ে প্রবেশমুখের সিঁড়ি ব্যবহার করে প্লাজায় প্রবেশ করা যায়। প্লাজার দক্ষিণে একটি লেক রয়েছে যা দক্ষিণা বাতাসকে বয়ে এনে পুরো প্রকল্পটিকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করবে। প্লাজার পূর্বে এবং পশ্চিমে বৈসাদৃশ্যিক ৯তলাবিশিষ্ট ভবনগুলো হচ্ছে ৪৮টি মন্ত্রণালয়ের কর্মস্থল। মন্ত্রণালয়ের ভবনগুলোর জন্য সর্বমোট প্রায় ৩০ লাখ বর্গফুট জায়গা রয়েছে। ৯তলা ভবনের নিচতলা হচ্ছে সেমি-পাবলিক, যেখানে মন্ত্রণালয়গুলোর প্রয়োজনীয় ব্যাংক, পোস্ট অফিস, ফায়ার সার্ভিস, মেডিকেল ব্যবস্থাসহ এয়ার টিকিটিং, নিরাপত্তা অফিস ও রক্ষণাবেক্ষণের অফিস রয়েছে।
উত্তর ও দক্ষিণের ভবনগুলোই হচ্ছে প্রধান কাজের জায়গা (সার্ভ স্পেস) ও পূর্ব-পশ্চিমে ভবন দুটি হচ্ছে সার্ভিস স্পেস, যেখানে মন্ত্রণালয়গুলোর ডাইনিং সুবিধা, পাঠাগার, নামাজের জায়গা, স্টোর ও টয়লেট সুবিধা রয়েছে। যেই জায়গাটি প্রধান কাজের জন্য, তার মাঝখানের জায়গাটি উন্মুক্ত উঠান রাখা হয়েছে, যেখানে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আড্ডা ও খেলাধুলা (টেনিস, ব্যাডমিন্টন) করতে পারবেন। দর্শনার্থীদের জন্যও প্রকল্পটির পশ্চিমে সারফেস পার্কিং এবং মন্ত্রণালয়ের জন্য ৯৮৬টি বেইজমেন্ট পার্কিং সুবিধা রাখা হয়েছে।
কানের সংসদ ভবন স্থাপত্যের নির্দিষ্ট কিছু উপাদান এই প্রস্তাবিত সচিবালয় প্রকল্পের ডিজাইনে রাখার চেষ্টা করেছেন ইকবাল হোসাইন। তার মধ্যে অন্যতম ‘ডাবল প্রাচীর ধারণা’, যা বাসযোগ্য স্থানের জন্য একটি ভেতরের প্রাচীর এবং জলবায়ু সুরক্ষার জন্য একটি পৃথক বাইরের প্রাচীর হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়া কংক্রিট শিয়ার ওয়াল স্ট্রাকচার, ওয়াফল স্লাবের ডিজাইন সুপারিশ করা হয়েছে এই প্রকল্পে।
তবে এই প্রকল্পের কাজটি করতে গিয়ে কিছু বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। লুই কানকে বুঝতে অনেক সময় লেগেছে তাঁর। এমনকি এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি তিনি। প্রথম দিকে শেরেবাংলা নগর নিয়ে তেমন বই পাচ্ছিলেন না ইকবাল। পরে অবশ্য থিসিস উপদেষ্টা শেখ ইতমাম সউদ তাঁকে সহযোগিতা করেন স্থপতি কাজী খালেদ আশরাফ ও কাজী সাইফুল হকের শেরেবাংলা নগর বইটি সংগ্রহ করে দেওয়ার মাধ্যমে। এ ছাড়া অধ্যাপক মোহাম্মাদ আলী নকী, অধ্যাপক মীর আশরাফুর রেজা, শেখ ইতমাম সউদ, সারাহ্ Ÿাশনীন, রাতুল, আলাউদ্দিন, কামাল, রিয়াজ, শরিফ, শারমিন নাহার ও ইকবালের মা-বাবাসহ আরও অনেকেই এই প্রকল্পটির জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।
প্রকল্পটি বাস্তাবায়িত হলে দেশ তথা স্থানীয় মানুষ নানাভাবে উপকৃত হবে। বর্তমান সচিবালয় যা এখন তোপখানা রোডে অবস্থিত, যেটি প্রথমে নির্মাণ করা হয়েছিল ইডেন মহিলা কলেজ হিসেবে। এখন এখানে ৩৫টি মন্ত্রণালয় প্রায় ৭.৫ লাখ বর্গফুট জায়গা নিয়ে কাজ করছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এ ছাড়া আরও ৪টি মন্ত্রণালয় ঢাকার অন্যান্য জায়গায় অবস্থিত। কিন্তু প্রস্তাবিত প্রকল্পটিতে একসঙ্গেই ৪৮টি মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় জায়গা নিয়ে সংসদের কাছাকাছি থাকতে পারবে। প্রকল্পটির কেন্দ্রীয় স্থানটি একটি গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম, যা শেরেবাংলা নগর এবং ঢাকার নাগরিকদের জন্য একটি উন্মুক্ত স্থান। লুই আই কান সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এই প্রস্তাবটি রেখেছিলেন। এ ছাড়া সচিবালয়ের কর্মকর্তারা কাজ করার উপযোগী একটি স্পেস পাবেন, যা এখন তাঁরা পুরোপুরিভাবে পাচ্ছেন না বললেই চলে।
ইকবাল হোসাইন তালুকদারের এই থিসিস জুরিতে উপস্থিত ছিলেন স্থপতি নুরুর রাহমান খান, অধ্যাপক কাজী আজিজুল মাওলা, অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী নকী, অধ্যাপক মীর আশরাফুর রেজা, স্থপতি কাজী নুরুল করিম দিলু, স্থপতি শেখ ইতমাম সউদ, স্থপতি সারাহ্ Ÿাশনীনসহ আরও অনেকেই।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯২তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭।