ভেঁপু বাজছে। প্রচণ্ড কান ঝালাপালা করা শব্দ চারপাশে। লম্বা সারিতে দাঁড়িয়ে আছে গাড়ি। এর মধ্যেও কেউ কেউ মনের আনন্দে কারণে-অকারণে ভেঁপু বাজাচ্ছেন। স্কুল ছুটির সময় অবস্থাটা হতে পারে আরও করুণ। আপনি মেহেদীবাগে আসুন, জামালখানে যান কিংবা স্টেশন রোড ধরে চলছেনÑদেখবেন পুলিশও দাঁড়িয়ে আছে; কারও প্রতিক্রিয়া নেই; নির্বিকার! আমি নিশ্চিন্তে বলব, এই হবে আপনার প্রতিদিনের পথচলার অভিজ্ঞতা। আমি চট্টগ্রাম মহানগরীর অসহনীয় শব্দদূষণের কথা বলছি।
বিয়ে-শাদি; আনন্দের অনুষ্ঠান। মেহেদি অনুষ্ঠান আরও বেশি আনন্দেরÑঅন্তত তরুণ-তরুণীদের কাছে। প্রায়ই আপনার কিংবা আমার বাড়ির আশপাশে কোথাও না কোথাও মেহেদি অনুষ্ঠান হচ্ছে। উচ্চ স্বরে বাজনা, মাইকে গান ইত্যাদি হচ্ছে মেহেদি অনুষ্ঠানের আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। সাউন্ড বক্সের ক্ষমতা প্রমাণে হয় রীতিমতো প্রতিযোগিতা। কোনো কোনো সাউন্ড বক্স আয়তনে এত বড় হয় যে ছাদ পর্যন্ত পৌঁছে যায় এর উচ্চতা। আয়তনের সঙ্গে এর আওয়াজের বড় মধুর সম্পর্কÑযত বড় শরীর তত বড় আওয়াজ। বড় আওয়াজ বুড়ো মানুষের দুর্বল হৃদয়ে অসহনীয় কম্পন সৃষ্টি করে। দেখবেন অনেকটা নিজের অজান্তেই তাঁরা এই সাউন্ড বক্স থেকে নিরাপদ দূরত্বে বসার চেষ্টা করেন। বাচ্চাদের সেই চিন্তার বালাই নেই, সাউন্ড বক্সের সামনেই তাদের যত নাচানাচি ও হইহুল্লোড়। এই প্রচণ্ড আওয়াজের মাত্রা মেপে পাওয়া গেছে ১৬০ ডিবি (ডেসিবেল) এর কাছাকাছি। ডাক্তারি মতে, আওয়াজের মাত্রা যদি ১৫০ ডিবি অতিক্রম করে তাহলে কানের পর্দা ফেটে যাবে। ১২০ ডিবির ওপরে হলে কানে অসহ্য ব্যথা অনুভূত হবে। আর ১০০ ডিবির ওপরের আওয়াজের মধ্যে কেউ যদি ১ মিনিটের ওপরে থাকে তাহলে তার শ্রবণক্ষমতার ক্ষতি হবে। আমাদের ছেলেমেয়েদের শ্রবণক্ষমতা এখনো যদি ঠিক থেকে থাকে তাহলে সেটা মনে হয় আল্লাহর অশেষ রহমতে ঠিক আছেÑডাক্তারের কেরামতিতে নয়! তারপরেও সেটা নিশ্চিত করে কেমনে বলি? কেউ কি কখনো নিজ বাচ্চার শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করে দেখেছেন? আমার তো মনে হয় কোলাহলমুক্ত পরিবেশে থাকার কারণে গ্রামের বাচ্চাদের শ্রবণশক্তি হট্টগোলের মধ্যে বাস করা শহুরে বাচ্চাদের চেয়ে অনেক ভালো।
আমাদের আশপাশে চলতে-ফিরতে মাঝেমধ্যে কিছু লোক চোখে পড়বে, যাঁরা স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে একটু জোরেÑউচ্চ স্বরে কথা বলছেন। তাঁরা বোধ হয় ভাবেন, চিল্লিয়ে কথা না বললে লোকজন তাঁদের কথা শুনতে পায় না। তাঁরা উচ্চ স্বরে কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কারণের খোঁজে একটু গভীরে গেলে, খোঁজ নিলে হয়তো দেখা যাবে এসব লোকজন কোলাহলময় বাস টার্মিনালের কাছে থাকেন। অথবা এমন কোনো শিল্পকারখানায় কাজ করেন, যেখানে প্রতিনিয়ত উচ্চ আওয়াজের মেশিনের ঘড় ঘড় আওয়াজ শুনতে হয়। ৫০ বছর হতে না-হতেই এসব লোকজন কানে কম শুনে, ৮০ বছরের বৃদ্ধ হওয়ার আগেই তাঁদের কানের দফারফা হয়ে যায়।
শহর অঞ্চলের এই সমস্যা নিয়ে খুব একটা কেউ ভাবছে বলে মনে হয় না। শব্দদূষণের মাত্রাকে সহনশীল পর্যায়ে আনতে না পারলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে। শব্দদূষণ সংক্রান্ত পরিবেশ আইন:
- Noise Pollution Regulation And Control Rules 2016
- Environmental conservation Act 1995
- Environmental conservation Rules 1997
-এর প্রয়োগ হচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তর জনবলের অভাবের কথা বলে তাদের অপারগতার কথা শুনিয়েছে অনেকবার, যা খবর হয়েছে পত্রিকায়।
চট্টগ্রাম নগরীর এই কোলাহল এবং অতিরিক্ত শব্দদূষণ সব সচেতন নগরবাসীকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছেÑসন্তানসন্ততির ভবিষ্যৎ ভেবে অনেকেই শঙ্কিত হচ্ছেন। সাদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, এই শব্দদূষণের ভয়াবহতা নিরূপণের জন্য ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি, এপ্রিল, মে, জুন ও নভেম্বর মাসে এক সমীক্ষা চালায়। চট্টগ্রাম নগরীর ৩২টি কোলাহলময় ও জনগুরুত্বপূর্ন স্থানে ডিজিটাল সাউন্ড মিটারের মাধ্যমে তারা আওয়াজের মাত্রা পরিমাপ করে। এই যন্ত্রকে অনেক সময় ডিবি মিটারও বলা হয়। কারণ শব্দ পরিমাপের এককের নাম ডেসিবেল বা ডিবি। দুজন শিক্ষক ও তিনজন ছাত্রের একটি টিম সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শব্দ পরিমাপের এই কাজটি চালিয়ে যায়। এই ৩২টি নির্ধারিত স্থানের মধ্যে রয়েছে স্কুল, হাসপাতাল, রাস্তার মোড়, বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা।
শব্দ পরিমাপের জন্য নির্ধারিত স্থানসমূহ:
হাসপাতাল
- চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হসপিটাল
- আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতাল
- চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
স্কুল ও কলেজ
- বাওয়া স্কুল (চট্টগ্রাম ওয়াসার মোড়)
- হাজেরা-তজু ডিগ্রি কলেজ
- সাদার্ন ইউনিভার্সিটি/ন্যাশনাল হাসপাতাল
- চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজ
- খাস্তগীর গার্লস হাইস্কুল
- অর্কিড স্কুল (নাছিরাবাদ)।
বাস টার্মিনাল
- বহদ্দারহাট টার্মিনাল
- অক্সিজেন বাস টার্মিনাল
- বটতলী রেলওয়ে স্টেশন
- কদমতলী বাস টার্মিনাল
- সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল।
রাস্তার মোড়/চৌরাস্তা
- জিইসি মোড়
- কাপ্তাই রাস্তার মাথা
- বহদ্দারহাট মোড়
- মুরাদপুর মোড়
- বন্দর মোড়
- চকবাজার (গুলজার মোড়)
- দেওয়ানহাট মোড়
- এ কে খান মোড়
- ২ নম্বর গেট মোড়
- নিউমার্কেট মোড়
- আন্দরকিল্লা মোড়
- আগ্রাবাদ মোড়।
বাণিজ্যিক এলাকা
- নিউমার্কেট বাণিজ্যিক এলাকা
- আন্দরকিল্লা বাণিজ্যিক এলাকা
- আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা।
আবাসিক এলাকা
খুলসী আবাসিক এলাকা
সুগন্ধা আবাসিক এলাকা
নাছিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি/আবাসিক এলাকা
চাঁদগাঁও আবাসিক এলাকা।
চট্টগ্রামের প্রায় সব প্রধান কোলাহলপূর্ণ স্থানসমূহকে বিবেচনায় নিয়ে এই ৩২টি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। সকাল, দুপুর এবং রাত এই তিনটি সময় জোনের মধ্যে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন আওয়াজ রেকর্ড করা হয়েছে। প্রতিটি সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন আওয়াজের মাত্রার সঙ্গে ব্রাকেটে সময়টিও দেওয়া হয়েছে, যাতে বোঝা যায় সর্বোচ্চ কিংবা সর্বনিম্ন আওয়াজ দিনের কোন বিশেষ সময়ে হয়ে থাকে। এভাবে স্কুল, হাসপাতাল, রাস্তার মোড়, বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা ইত্যাদির আওয়াজের মাত্রাসংক্রান্ত তথ্যাদি দিয়ে আলাদা আলাদা তালিকা তৈরি করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে রাস্তার মোড়সমূহের শব্দ পরিমাপের একটি তালিকা সংযোজিত হলো:
চট্টগ্রাম নগরীর মোড়সমূহের (Intersection) শব্দদূষণের পরিমাপ
এই সমীক্ষার ফলাফল আমাদের আশাহত করেছে। আমরা যতটুকু ভেবেছি শব্দদূষণের মাত্রা পাওয়া গেছে তার চেয়ে অনেক বেশি। এই ৩২টি স্টেশনের প্রতিটিতেই বাংলাদেশের অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে উচ্চ মাত্রার আওয়াজ পাওয়া গেছে। স্কুল-কলেজের সামনে আওয়াজের সর্বোচ্চ অনুমোদিত মাত্রা ৫০ ডিবি। সেখানে বাওয়া স্কুলের সামনে সকালবেলা সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন আওয়াজ পাওয়া গেছে যথাক্রমে ৮৯.৭ ডিবি ও ৭৪.৭ ডিবি। হাসপাতালের সামনে আওয়াজ ৫০ ডিবির নিচে থাকার কথা। সেই ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালের সামনে সন্ধ্যাবেলায় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন আওয়াজ পাওয়া গেছে যথাক্রমে ৯০.৬ ডিবি ও ৭৬.৬ ডিবি। বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালে দুপুরের দিকে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন আওয়াজ পাওয়া গেছে যথাক্রমে ১০২.৫ ডিবি ও ৭৩.৩ ডিবি। জিইসি মোড়ে দুপুরবেলা সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন আওয়াজ পাওয়া গেছে যথাক্রমে ৯৮.৯ ডিবি ও ৭৬.৯ ডিবি। বাণিজ্যিক এলাকায় আওয়াজের অনুমোদিত পরিমাণ ৭০ ডিবি। সেই ক্ষেত্রে আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় সকাল ৮টা থেকে ৯টা এবং ৯টা হতে ১০টার মধ্যে গড়ে আওয়াজের মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৮৯.৯ ডিবি ও ৯০.৭ ডিবি। আবাসিক এলাকা বলতে আমরা সাধারণত বুঝে থাকিÑএকটি শান্ত সমাহিত নিরিবিলি এলাকা। আবাসিক এলাকার সেই চরিত্র নষ্ট হয়েছে অনেক আগেই। আবাসিক এলাকায় এখন দোকানপাট, স্কুল-কলেজ থেকে রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত প্রায় সবকিছইু আছে। সুগন্ধা আবাসিক এলাকায় সকালবেলায় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন আওয়াজ পাওয়া গেছে যথাক্রমে ৮১.৩ ডিবি ও ৭০.৪ ডিবি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আওয়াজ অনুমোদিত মাত্রার ওপরে পাওয়া গেছে। এমনকি সর্বনিম্ন আওয়াজও ৭০ ডিবির ওপরে। World Health Organization (WHO)-এর হিসাব অনুযায়ী এই সর্বনিম্ন ৭০ ডিবি আওয়াজও কানের জন্য পীড়াদায়ক ও বিরক্তিকর।
WHO-র নির্দেশনা অনুযায়ী ধরনভেদে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত শব্দের মাত্রা
WHO নির্দেশিত শব্দের অনুমোদিত মাত্রাকে বিবেচনায় নিয়ে বলতে হয় চট্টগ্রাম নগরীতে আমরা প্রতিনিয়ত সেই মাত্রাকে অতিক্রম করে চলছি। যাঁরা দীর্ঘদিন এই উচ্চ আওয়াজের মধ্যে থাকবেন, তাঁদের হতে পারে উচ্চ রক্তচাপ। এতে মানুষ খিটখিটে হয়ে যায়, উগ্র আচরণ করে। ঘুমের সমস্যা হয়। সহজে ঘুম আসে না। মাথাব্যথা ও মাইগ্রেইন হতে পারে। বধির হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সর্বোপরি বাড়ে ব্রেইনস্টোকের ঝুঁকি।
শব্দদূষণের এই অত্যাচার ঠেকানোর জন্য আমাদের আইন আছে কিন্তু নেই সেই আইনের প্রয়োগ। পরিবেশ অধিদপ্তর বলে, তাদের লোকবলের অভাব তাই কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। পুলিশ বলে, তাদের কাছে অভিযোগ এলে তারা ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা হলো, অশিক্ষিত ও শিক্ষিত প্রায় সবাই তাঁদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। শব্দদূষণ নিয়ে তাই কোনো অভিযোগই সাধারণত পুলিশ কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরে যায় না। সচেতনতা বাড়াতে হবে। বড় ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আগেই এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চাই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কি এ ব্যাপারে একটু দৃষ্টি দেবেন?
অধ্যাপক এম আলী আশরাফ একজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ও নগর পরিকল্পনাবিদ। সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত উপ-উপাচার্য এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত। তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স, চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের বর্তমান সভাপতি এবং ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯২তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭।