প্লাস্টিক ব্লকে বর্ণিল স্থাপনা

খেলতে ভালোবাসে শিশুরা। এই খেলার মাঝেই তারা খুঁজে পায় জাগতিক আনন্দ। আর তাই একটু সুযোগ পেলেই মেতে ওঠে প্রিয় খেলা ও খেলনা নিয়ে। বুদ্ধিমান মা-বাবাও কম যান না। শিশুটিকে চান খেলার ছলেই শেখাতে। খেলতে খেলতে শেখার এক অনন্য উপকরণ প্লাস্টিকের খেলনা। এই বুদ্ধিদীপ্ত খেলনার মাধ্যমেই শিশুর মধ্যে ভবিষ্যতের একজন স্থপতি বা প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্নবীজ বুনে দেওয়া যায়। শিশুটি ওই খেলনা ব্লকগুলো দিয়ে স্থাপনা বানায়; পছন্দ না হলে তা ভেঙে আবার গড়ে নবউদ্যোমে। খেলাটি হয়তো আপনিও খেলেছেন। আপনার ডিজাইন করা প্রিয় সে রঙিন বাড়িটি বানানোর ইচ্ছেটা হয়তো এখনো রয়ে গেছে মনের গভীরে। এমন যদি হতো আপনি সত্যি সত্যিই সেই বাড়িটি বানাতে পারছেন, তবে নিশ্চয় মন্দ হতো না! আপনার সেই চাওয়া পূরণ করতে বিশ্বের খ্যাতনামা কয়েকটি নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান উদ্ভাবন করেছে ইন্টারলকিং প্লাস্টিক ব্লক। আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে উদ্ভাবিত এসব ব্লক প্রায় সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণের উপযোগী। সমকালীন স্থাপত্য নির্মাণ উপকরণে এই ব্লক এক নবতর সংযোজন, যা আপনাকে দিবে বর্ণিল স্বপ্নময় এক স্থাপনার আস্বাদ।

টয় ব্লক, বিল্ডিং ব্রিকস, বিল্ডিং ব্লকস, লেগো ব্লক অথবা ইন্টারলকিং ব্লক নামেই পরিচিত স্থাপনা নির্মাণের এই প্লাস্টিক ব্লক। আয়তকার, বর্গাকার, ত্রিকোণ, গোলাকার, সিলিন্ডারসহ হরেক আকৃতির এই ব্লকগুলো দিয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ও সহজে যেকোনো আকার, আকৃতি, প্যাটার্নে ইচ্ছেমতো ভবন নির্মাণ করা যায়। প্লাস্টিক ব্লকের সহজ ও ঝামেলামুক্ত নির্মাণ-সুবিধার কারণে উদ্ভাবক প্রতিষ্ঠানগুলো এ নির্মাণ উপকরণটি তৈরি ও বাজারজাতকরণে আগ্রহী। তারা লাইফ-সাইজ মডিউলার বিল্ডিং ব্লক উদ্ভাবন করেছে, যা দিয়ে প্রায় সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা সম্ভব। ব্লকগুলো খেলনা ব্লকের মতো হরেক রঙে তৈরি হওয়ায় স্থাপনাগুলোও হয়ে ওঠে রঙিন। এর জন্য বাড়তি রং করার প্রয়োজনও নেই। এমনকি প্লাস্টার করারও কোনো প্রয়োজন পড়ে না। তা ছাড়া এই স্থাপনাগুলো বিভিন্ন থিমভিত্তিক মডিউল আকারে ডিজাইন করা। আপনি চাইলে প্রটোটাইপ স্থাপনা বানিয়ে আপনার পছন্দের পরীক্ষা নিতে পারেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি তৃপ্ত না হচ্ছেন ততক্ষণ আপনি ডিজাইন পরিবর্তন করতে পারবেন। কেননা, এই ব্লক দিয়ে যা কিছুই তৈরি করুন না কেন তা যদি পছন্দ না হয় বা কোনো কারণে ডিজাইন পরিবর্তন করতে হয় তাহলে আপনি সহজেই তা খুলে নতুনভাবে সাজিয়ে পুনরায় অ্যাসেম্বল করতে পারবেন। এই সুবিধা মাটি, ইট, কংক্রিট, স্টিল বা অন্য কোনো নির্মাণ উপকরণ দিয়ে করা সম্ভব নয়। চাইলে কয়েক বছর পরপর আপনি আপনার স্থাপনার ডিজাইনও পরিবর্তন করতে পারবেন বিস্ময়কর এই নির্মাণ উপকরণের সাহায্যে।

স্থাপত্য ডিজাইনের নমুনা

ইন্টারলকিং প্লাস্টিক ব্লক দিয়ে আবাসন, অফিস ভবন, বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ সম্ভব হলেও ছোট আয়তনের অস্থায়ী স্থাপনা বা কাঠামো নির্মাণের জন্য আদর্শ এটি। বিশেষ করে বাণিজ্যিক পণ্যের প্রদর্শনী স্টল, বাণিজ্য মেলার প্রদর্শনী স্টল, ফুড কোর্ট, স্টোরেজ শেড, প্রহরী শেডসহ নানামাত্রিক স্থাপনার মডিউল নির্মাণে দারুন কার্যকর। এই ব্লকের সুবিধা হচ্ছে স্থাপনা নির্মাণের পর প্রয়োজন হলে তা পরিবর্তন, সম্প্রসারণ বা বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব।

পিন্টারেস্ট

এমনকি কাস্টমাইজড এই কাঠামো স্থানান্তরের প্রয়োজন হলে তা বিকল্প কোনো স্থানে নতুন করে স্থাপন করা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী দরজা, জানালা, ভেন্টিলেশন সিস্টেম এমনকি এয়ার কন্ডিশনার ইউনিট ইনস্টল করা সম্ভব। এ ছাড়া চেয়ার, টেবিল বা কাউন্টার টপের মতো আসবাবও তৈরি করা যায়। এসব আসবাবের ফ্ল্যাট মসৃণ শীর্ষদেশের জন্য ব্লক মডিউলারে রয়েছে ফিনিশিং ক্যাপ, যেগুলোর সাহায্যে চমকপ্রদ আসবাব তৈরি করা সম্ভব। এ ছাড়া প্লাস্টিক ব্লকে যেসব স্থাপনা ও কাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব; তা হচ্ছে-

স্থাপনা ও কাঠামো

  • আবাসিক ভবন
  • অফিস ও বাণিজ্যিক ভবন
  • রিসোর্ট হাউস
  • থিম পার্কের স্থাপনাসমূহ
  • গেমস জোন
  • দোকান
  • স্টোরেজ রুম/শেড
  • গার্ড রুম
  • টিকিট বুথ
  • থিয়েটার মঞ্চ
  • প্রটোটাইপ স্থাপত্য ডিজাইন
  • সরঞ্জাম পরিবেষ্টনী
  • বাড়ি বা বাগানের সীমানাপ্রাচীর।

ভ্রাম্যমাণ ও ক্ষণকালীন স্থাপনা

  • প্যাভিলিয়ন
  • মুভি সেট
  • বাণিজ্যিক পণ্যের প্রদর্শনী স্টল
  • মেলার প্রদর্শনী স্টল
  • ফুড কোর্ট
  • বিজ্ঞাপন বুথ
  • বিক্রয় ও প্রদর্শনী কাউন্টার
  • কাস্টমাইজড ব্যাকড্রপ ও ডিসপ্লে
  • আউটডোর এক্সিবিশন সেন্টার
  • অস্থায়ী ডিভাইডার দেয়াল।

ইন্টেরিয়র ডিজাইনে

  • অ্যাপার্টমেন্ট বা অফিসের অভ্যন্তরীণ রুম ডিভাইডার
  • বার, বিউটি পার্লার, রেস্টুরেন্ট কাউন্টার
  • ডেকর, প্রপ ও সিনারি ওয়াল
  • কেবিনেট
  • রুম স্টোরেজ
  • আর্কিটেক্টচারাল ওয়াল
  • মার্কেটিং ওয়াল
  • পনি ওয়াল।

আসবাব ডিজাইন

  • চেয়ার
  • টেবিল
  • খাট
  • সোফা
  • বেঞ্চ
  • শিশুদের স্কুলবেঞ্চ
  • টুল
  • বুকশেলফ
  • টেবিলসহ বুকশেলফ
  • টিভি স্ট্যান্ড ও অন্যান্য।

প্লাস্টিক ব্লকের গঠন বৈচিত্র্য ও ওজন

ইন্টারলকিং প্লাস্টিক ব্লকগুলোকে নির্মাণকাজের সুবিধার্থে বিভিন্ন আকার, আকৃতি, প্যাটার্নে তৈরি করা হয়েছে, যাতে রয়েছে ইন্টারলকিং স্ট্যাকিং সিস্টেম যা বিশেষায়িত এসব ব্লকগুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • ফুল সাইজ বা পূর্ণাঙ্গ ব্লক
  • হাফ সাইজ বা অর্ধাকার ব্লক
  • কোয়ার্টার সাইজ বা চার-তৃতীয়াংশ ব্লক
  • ফিনিশিং ক্যাপ
  • ফ্ল্যাট প্যানেল
  • লগ
  • কেব্ল
  • রিইনফোর্সমেন্ট রড।

মডিউলারের আকৃতিভেদে ওজন

স্থাপত্য ও কাঠামো মডিউল নির্মাণকৌশল

যদিও প্লাস্টিক ব্লকে কাঠামো নির্মাণকৌশল খুবই সহজ তা সত্ত্বেও উদ্ভাবক ও বাজারজাতকরণ প্রতিষ্ঠানগুলো ভবন নির্মাণের সুবিধার্থে নানা ধরনের থিমভিত্তিক মডিউলার ডিজাইন করেই বাজারে ছাড়ছে এ ধরনের ব্লক। এই উপকরণটির নির্মাণকৌশল ক্রেতারা সরাসরি ভিডিওতে দেখেই সে আদলে স্থাপনা, কাঠামো বা আসবাব ডিজাইন বা নির্মাণ করতে পারবেন। প্রতিটি প্লাস্টিক ব্লকেই রয়েছে ইন্টারলকিং স্ট্যাকিং সিস্টেম, যা দেয় সব ধরনের নির্মাণসুবিধা। ইন্টারলকিং স্ট্যাকিংয়ের কারণেই মূলত স্থাপনায় দেওয়া যায় ভিন্ন প্যাটার্ন দ্রুততম সময়ে। ব্লকে ফিনিশিং ক্যাপযুক্ত মডিউলার থাকায় প্লাম্বিং, ইলেকট্রিক্যাল ও পাইপ ফিটিংয়ের কাজগুলো করা যায় সহজেই।

পিন্টারেস্ট

প্রতিটি ব্লকের মধ্যে থাকে ইন্টিগ্রেটেড চ্যানেল। এই চ্যানেলের মধ্যে বিশেষ ধরনের ক্যাবল অথবা রিইনফোর্সড রড স্থাপন করতে হয় কাঠামোর শক্তি বৃদ্ধিতে। প্রতিটি ১র্২র্  ব্লকে ২টি এবং র্৬র্  ব্লকে ১টি কেব্ল চ্যানেল থাকে। সারিবদ্ধ ব্লকের মধ্যে পাওয়ার কেব্ল চালনা করলে কাঠামোর দৃঢ়তা নিশ্চিত হয়। তা ছাড়া এই চ্যানেলের মধ্যে থাকে বিশেষ ধরনের রিব, যা অতিরিক্ত ওজন লোডিং ক্ষমতা ও সমর্থন প্রদান করে। এই রিব তার বা রডের সঙ্গে ব্লকসমূহকে দৃঢ়ভাবে আটকে রাখে। ব্লক চ্যানেলে ধাতব রড ছাড়াও গোলাকার কাঠ, পিভিসি বা স্টিল পাইপও ব্যবহার করা যায়। এই কেব্ল বা রড শুধু ব্লকগুলোকে দৃঢ়ভাবে আটকেই রাখে না বরং অতিরিক্ত বায়ু লোডিং ক্ষমতা ও স্ট্রাকচারাল শক্তি জোগায়। এ পদ্ধতিতে দীর্ঘ ও উঁচু দেয়াল তৈরি করা যায়। ইন্টারলকিং স্টাকিং ও কেব্লিং সিস্টেম থাকায় কাঠামো নির্মাণে বাড়তি কোনো সরঞ্জাম, মর্টার, আঠা, বা সহায়ক হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না। তবে বৃহৎ স্থাপনা নির্মাণের জন্য এ বিষয়ে অভিজ্ঞ পুরকৌশলীর সাহায্য নেওয়াটাই উত্তম। 

যদিও এই লকিং সিস্টেম কাঠামোতে স্থায়ী ও টেকসই সংযোগ তৈরি করে, তা সত্ত্বেও আকার ও আয়তনের ওপর নির্ভর করে স্থাপনার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে, শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় হতে পারে। অর্থাৎ আপনি যদি বহুতল ভবন বা উঁচু স্থাপনা নির্মাণ করতে চান, সেখানে অতিরিক্ত শক্তির জন্য গ্রাউন্ডে অ্যাংকরিং করার প্রয়োজন হবে। কংক্রিট বা স্টিল কাঠামোতে শুধু পার্টিশন ওয়াল ও ইন্টেরিয়র উপকরণ তৈরিতে তেমন কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু মাঝারি মানের স্থাপনার জন্য মাটিতে ভিত স্থাপন করতে হয়। সাধারণ স্থাপনায় এ কাজটিকে ফাউন্ডেশন ওয়ার্ক নামে পরিচিত হলেও ব্লক স্থাপনার ক্ষেত্রে মাটিতে অ্যাংকর হোল্ডিং করতে হয়, যা ব্লকের কেব্ল চ্যানেলের সঙ্গে যুক্ত থাকে। অ্যাংকরিং করলে ব্লক স্থাপনার স্থায়িত্ব বেড়ে যায় এবং ঝড়, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে অবকাঠামো থাকে সুরক্ষিত।

ইন্টারলকিং প্লাস্টিক ব্লক কাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি ইন্টেরিয়র ডিজাইন ও আসবাব তৈরিতেও আদর্শ বলা চলে। অফিস বা অ্যাপার্টমেন্টের ইন্টেরিয়রে বা কক্ষের মধ্যে বিভাজক দেয়াল তৈরি করা যায় সহজেই। এই অস্থায়ী প্রাচীরগুলো স্থানান্তরিত ও অপসারণ করা যায়। ড্রয়িং ও ডাইনিং রুমের পার্টিশন দেয়াল বা আড়াল শেড নির্মাণে ব্লকগুলো সবচেয়ে কার্যকরী। কারণ, রুচি ও আধুনিকতার সঙ্গে যেমন আসবাব বদল হয়; পরিবর্তিত হয় ঘরের সজ্জা, তেমনি ড্রয়িং ও ডাইনিং রুমের কাঠামোও পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে। তা ছাড়া এই দেয়াল বর্ণিল ও কনট্রাস্ট রঙে রাঙানো যায় বিধায় অন্দরের লুকটাই অন্য রকম দেখায়। তা ছাড়া দেয়ালে ড্রিল করা যায় বিধায় গৃহকর্তার ইচ্ছেমতো নানা ছবি বা ওয়ালম্যাট স্থাপন করা যায়। তা ছাড়া এর মসৃণ পৃষ্ঠদেশ হওয়ার কারণে সহজেই ধুলা-ময়লা পরিষ্কার করা সম্ভব।

ডিঅ্যাসেম্বলিং মডিউল

ইন্টারলকিং প্লাস্টিক ব্লকের সবচেয়ে সুবিধা হচ্ছে, দরকার না হলে নির্মিত মডিউলগুলো খুলে ফেলা যায়। স্থাপনা থেকে ব্লকগুলো ছড়িয়ে নেওয়াও অত্যন্ত সহজ। ব্লক খুলতে চাইলে ওপর থেকে নিচের সারির ব্লকগুলো একে একে খুলতে হয়। সবচেয়ে মজার বিষয়, এই ব্লকগুলো বিচ্ছিন্ন করা হলেও তা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, যা অন্য কোনো নির্মাণ উপকরণের ক্ষেত্রে ভাবাই যায় না। ব্লকগুলো খোলা হয়ে গেলে বিচ্ছিন্ন করা ব্লকগুলো যত্নসহকারে সংরক্ষণ ও পরিবহন করতে হবে যেন ভেঙে না যায়। যত্নসহকারে ও সুন্দরভাবে ব্লকগুলো সংরক্ষণ করা গেলে তা দীর্ঘদিন পরও ব্যবহার করা যায়। 

প্লাস্টিক ব্লকের নানা সুবিধা

  • শক্ত, মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী
  • সহজ নির্মাণপদ্ধতি
  • অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নির্মাণ করা যায়
  • স্বল্প শ্রম ও বাড়তি শ্রম মজুরির প্রয়োজন হয় না
  • প্রয়োজনে স্থাপত্য কাঠামো প্রসারিত করা যায়
  • ডিজাইন পরিবর্তন করা সম্ভব
  • হালকা হওয়ায় সহজে স্থানান্তর ও পরিবহনযোগ্য
  • রং করার প্রয়োজন নেই
  • তাপ ও শব্দরোধী
  • জলরোধী হওয়ায় ড্যাম্প হয় না
  • পানিতে পচে না
  • পোকামাকড়ে নষ্ট হয় না
  • সহজে পরিষ্কারযোগ্য
  • যেকোনো আবহাওয়ায় খাপ খাওয়াতে পারে
  • পরিবেশের তেমন ক্ষতি করে না
  • ব্লক উপকরণগুলো পুনর্ব্যবহারযোগ্য যা গ্রিন বিল্ডিং সমর্থন করে   
  • অবকাঠামো তৈরিতে কোনো সরঞ্জাম, আঠা, যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না
  • ড্রিল করা যায়
  • দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ করা যায়।

প্লাস্টিক ব্লকের স্থায়িত্ব

ইন্টারলকিং প্লাস্টিক ব্লক বেশ হালকা ধাঁচের হলেও তা প্রথাগত প্লাস্টিকের মতো দুর্বল নয়। এই প্লাস্টিক ব্লক উচ্চমানের (High Impact) পলিপ্রোপালিইন কো-পলিমার সঙ্গে ইউভি ইনহিবিটরস (UV Inhibitor) মিশ্রণে তৈরি, যা এই উপকরণটিকে দেয় মজবুত ও দৃঢ়তা। ফলে নির্মিত স্থাপনাও হয় টেকসই। এই ব্লক স্থাপনার ভেতর-বাইরে উভয় স্থানেই ব্যবহারের উপযোগী। তা ছাড়া এর লুবগুলো অত্যন্ত মজবুত হওয়ায় বারবার ব্যবহারেও নষ্ট হয় না। ব্লকে ইউভি ইনহিবিটরস থাকায় সূর্যের তাপে রং জ্বলে বিবর্ণ হয় না এবং দীর্ঘদিন একই ঔজ্জ্বল্য বজায় থাকে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ব্লকগুলো প্লাস্টিকে তৈরি হলেও বিশেষ ধরনের এই ব্লক আগুনে তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ব্লকের UL94HB (আন্ডাররাইটার ল্যাবরেটরি ইয়েলো কার্ড নম্বর) উপাদান বেশ ধীরে আগুনে পোড়ে। ০.৫”  বিশিষ্ট ব্লক প্রতি মিনিটে ২ ইঞ্চি হারে পোড়ে। সবচেয়ে বড় কথা, এই উপাদানটি আগুনের স্ফুলিঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে না। ব্লকগুলো ফাঁপা হলেও এতে সংযোজন করা হয়েছে রিব, যা সৃষ্টি করে বাড়তি শক্তি ও দৃঢ়তা। ফলে ব্লকগুলো খুলে যায় না। তা ছাড়া ব্লক চ্যানেল ও লগগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন তা পর্যাপ্ত চাপ সহ্য করে টিকতে পারে।

বিশ্বব্যাপী আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে আমাদের অবকাঠামো ও স্থাপনাতেও। ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি এবং সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বাড়ায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার বেড়েছে লবণাক্ততা। লবণাক্ততার মারাত্মক শিকার হচ্ছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন। লবণাক্ততার কারণে ভবনের কলামে লম্বা ফাটল ধরছে। ফাটল আছে ছাদের বিমেও। বিম ফেটে বেরিয়ে এসেছে ভেতরের মরিচা ধরা রড। গ্রিলগুলোতে ধরছে মরিচা। রড পারছে না কংক্রিটের ঢালাই ধরে রাখতে। ফলে ভবনগুলো হচ্ছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যবহারের অনুপযোগী। এ ছাড়া ভবনের গায়ে ড্যাম্প (Damp) হওয়া একটি সাধারণ সমস্যা। এসব সমস্যা থেকে সুরক্ষিত থাকতে এই উচ্চমানের প্লাস্টিক ব্লক খুবই কার্যকরী। এই ব্লকগুলো বিরূপ আবহাওয়ায়ও দিব্যি টিকে থাকতে পারে। উচ্চমানের প্লাস্টিক ব্লকগুলো পানি, আর্দ্রতা ও রাসায়নিক প্রতিরোধী। নির্মিত স্থাপনা ভেজা বা শুষ্ক উভয় পরিবেশে ব্যবহার করা যায়। এই উপাদানটি পানি ও জলীয় বাষ্প শোষণ করে না ফলে পরিবেশের ক্ষতিকারক রাসায়নিক প্রবেশ করতে পারে না। দেশের উপকূলীয় এলাকার বাড়িঘর ও অন্যান্য কাঠামো নির্মাণে এই ব্লক স্থাপন করা গেলে ওই এলাকার মানুষের জন্য টেকসই আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব।

প্লাস্টিক ব্লক ব্যবহারের নবক্ষেত্র

মেলা, ইভেন্ট ও ব্র্যান্ড প্রমোশনে

বাণিজ্যিক পণ্যের প্রচার ও প্রসারে মেলা, ইভেন্ট ও ব্র্যান্ড অ্যাক্টিভেশন ও প্রমোশনের মতো কাজগুলো এখন অধিক প্রচলিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা, পণ্য ও সেবা মেলা ছাড়াও বিভিন্ন উৎসবে কোম্পানিগুলো তাদের ক্ষণকালীন প্যাভিলিয়ন ও স্টল স্থাপন করে থাকে। এসব স্টলে বিভিন্ন রকম নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করা হয়। সাধারণত মেলা বা উৎসব শেষে এই স্টলগুলো অবলুপ্ত করা হয়। এতে নির্মাণসামগ্রীর কম উপাদানই পুনর্ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করা যায়। অধিকাংশ উপকরণই নষ্ট হয়ে যায় বা ব্যবহারের উপযোগী থাকে না। কিন্তু যদি এসব স্থানে এই প্লাস্টিক ব্লক দিয়ে প্যাভিলিয়ন বা স্টল বানানো যায়, তাহলে তা দেখতে হয় নজরকাড়া। হরেক রকম ব্লক দিয়ে পণ্যের প্রদর্শনীর কাউন্টার, তাক, গ্যালারি এমনকি ঝুলন্ত গ্যালারিও তৈরি করা যায়। মেলা শেষে তা খুলে পুনরায় ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করা যায়। এতে সম্পদের অপচয় রোধ হয় এবং পণ্যের প্রচার ও প্রসারের ব্যয় কমে।

বিনোদনজগতের স্থাপনা

বিনোদনজগৎ এমনই এক জগৎ যেখানে প্রতিনিয়ত স্থাপনার প্রেক্ষাপট বদলাতে হয়। অর্থাৎ নতুন নতুন বর্ণিল ডিজাইনের মঞ্চ, স্টেজ সেট, প্রপস, ব্যাকড্রপ, স্থাপনা প্রভৃতি। আর এ কাজটি নিখুঁতভাবে করতে প্লাস্টিক ব্লকের জুড়ি মেলা ভার।

বিনোদনকেন্দ্র, গেমস জোন ও পাজেল হাউস

থিয়েটার, চিত্তবিনোদন পার্ক, বিনোদনকেন্দ্র, ফান হাউস, গেমস জোনে শিশুদের জন্য রাখা হয় বর্ণিল স্থাপনা। প্লাস্টিক ব্লক দিয়ে বানানো যায় দৃষ্টিনন্দন ও শিশুদের প্রিয় নানা ধরনের বিনোদন স্থাপনা।

ভাসমান বাড়ি

প্রতিবছর প্রলয়ংকরী বন্যায় ভেসে যায় দেশের বিস্তীর্ণ জনপদ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্থাপনা ও অবকাঠামো। প্রতিবছর এমন বন্যায় বন্যাকবলিত জনপদের মানুষ ঘরবাড়ি, গোয়ালঘর, ফসলের গোলা হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। বছরের পর বছর এমন দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে প্লাস্টিক ব্লক দিয়ে ভাসমান স্থাপনা নির্মাণ করা যেতে পারে। এর সহজ নির্মাণকৌশল হওয়ায় গ্রামের সাধারণ মানুষেরাও বাড়িগুলো বানাতে পারবে। এতে বিড়ম্বনা ও সম্পদহানি কমবে।

শেষের আগে

ক্রমাগত নির্মাণের উৎকর্ষতায় বদলে যাচ্ছে বিশ্ব। নির্মাণপণ্যের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির মিশেল প্রতিনিয়ত উপহার দিচ্ছে নান্দনিক সব স্থাপনা। প্লাস্টিক ব্লককে বলা চলে নির্মাণপণ্যজগতের নবতর সংযোজন। নির্মাণ উপকরণগুলো বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে দ্রুতই। বিশেষ করে ব্যবসা প্রসারে ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনে। বাংলাদেশে এখনো এ ধরনের পণ্যের ব্যবহার শুরু হয়নি। হয়তো অদূরভবিষ্যতে এ দেশেও নির্মিত হবে এ পণ্যটির স্থাপনা। কিন্তু দেশের চাহিদা অনুযায়ী প্লাস্টিক পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন দেশীয় উৎপাদন। বর্তমানে এ দেশে প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিয়মিত পণ্যের পাশাপাশি যদি উন্নতমানের এ পণ্যটিও উৎপাদনে মনোযোগী হয়, তাহলে দেশের নির্মাণশিল্পে যোগ হবে বাড়তি মাত্রা। পণ্যটির রয়েছে যথেষ্ট রপ্তানির সম্ভাবনাও। এ ছাড়া বিভিন্ন মেলা ও ক্ষণকালীন স্থাপনার পাশাপাশি ডেকোরেটর ব্যবসার মতো এই পণ্যটিও ভাড়া ব্যবসা হিসেবেও নেওয়া যাবে। ব্যবসার নতুন ক্ষেত্র হিসেবেও উন্মোচিত হতে পারে প্লাস্টিক ব্লক ব্যবসাটি। তবে এ পণ্যটির ব্যবহারে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রকৌশলী, স্থপতি ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯১তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৭।

প্রকৌশলী সুবীর কুমার সাহা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top