বাংলার প্রকৃতিতে এখন শরৎকাল। বর্ষা বিদায় নিলেও বৃষ্টির প্রকোপ কমেনি এতটুকু বরং বেড়েছে। মাঠ-ঘাট, নদী-নালা, খাল-বিল সর্বত্রই অথৈ পানি। নোয়াখালীর চৌমুহুনী থেকে সোনাইমুড়ী যাওয়ার পথে চোখে পড়ল অসাধারণ কিছু দৃশ্য। সড়কের দুই ধারে জলমগ্ন পানিতে ছেলে-বুড়োরা মেতেছে মাছ ধরার আনন্দে। কেউ জাল ফেলে, কেউ বড়শি পেতে, আবার কেউ-বা নৌকায় ঘুরে মাছ ধরছে। মনোরম এমন দৃশ্য উপভোগ করতে করতে পৌঁছালাম নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী উপজেলার সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী মো. লোকমান হোসেনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। শহরের বাইপাস রোডের লোকমান অ্যান্ড সন্স-এর কর্ণধার তিনি। বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বের এ সংখ্যার সফল মুখ যিনি। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক পিন্টু চন্দ্র গোস্বামীর সহযোগিতায় জানাব তাঁরই সাফল্যগাথা।
ব্যবসায়ী লোকমান হোসেনের জন্ম ১৯৬৭ সালের ১১ জানুয়ারি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে। পিতা মরহুম মো. রুস্তম আলী ও মা মরহুমা আতরুন্নেসা। সংসারে ছয় ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট। বাল্যকাল থেকেই বেশ সাংসারিক। স্কুলে ভর্তি হলেও প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনো হয়নি। বড় ভাইয়েরা যখন লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত তখন তিনি সংসারের উন্নয়নে কৃষিকাজ ও গবাদিপশু লালন পালনে ব্রত। বাল্যকাল পেরিয়ে যখন তিনি কৈশোরে, তখন ড্রাইভিং শিখে শুরু করেন ট্রাক্টর চালানো। প্রায় বছর দুয়েক পর জড়িয়ে পড়েন ধান-চালের ব্যবসায়। এ ব্যবসাও চলে দুই বছর। এরপর ১৯৯৪ সালে শুরু করেন ইট ও বালুর ব্যবসা। চলমান ব্যবসাটি অব্যাহত রেখে পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে কেনেন একটি ট্রাক। ২০১৪ সালে তাঁর ব্যবসাসম্ভারে যুক্ত হয় সিমেন্ট ও রড। সবশেষে তিনি চালু করেছেন আধুনিক আসবাবপত্রের শোরুম।
ব্যবসায়ী লোকমান হোসেনে যে ব্যবসাতেই হাত দিয়েছেন তাতেই পেয়েছেন ঈর্ষণীয় সাফল্য। এর অন্যতম কারণ পরিশ্রম। বাল্যকাল থেকেই তিনি এই পরিশ্রমকে সঙ্গী করেই ব্যবসা তথা জীবনে উন্নতি করতে পেরেছেন। কোনো কাজকে তিনি ছোট করে দেখেননি। বিশেষ করে নিজ ব্যবসার উন্নয়নের স্বার্থে যা যা প্রয়োজন তা-ই করেছেন। ব্যবসার ফাঁকে ফাঁকে নিজেই ট্রাকে করে ইট-বালু পরিবহন করেছেন। ব্যবসার পণ্য নিজেই করেছেন ডেলিভারি। ট্রাক মালিক সমিতির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়েছেন। তাঁর এমন কর্মকাণ্ডের ফলে স্বল্পসময়ে রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ও এসেছে সাফল্য। সম্প্রতি তিনি ডিলার হিসেবে কেএসআরএম স্টিল ও আকিজ সিমেন্ট বিক্রিতে নোয়াখালী টেরিটরির অন্যতম সেরা বিক্রেতা। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য বিক্রি এবং কোম্পানি কর্তৃক প্রদত্ত বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার স্বীকৃতিস্বরূপ কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, টেলিভিশন, ডিজিটাল ক্যামেরা, মোবাইল, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকাসহ নানা উপহারসামগ্রী। আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের অফারও পান নিয়মিত।
পরিশ্রম ছাড়াও ব্যবসায়ী লোকমান হোসেনের ব্যবসা উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে সোনাইমুড়ীতে তাঁর নিজস্ব পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা। সবসময় ন্যায্যমূল্যে গুণগতমানের পণ্য বিক্রি করেন। চেষ্টা করেন সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যবসা করতে। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে সমসাময়িক স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেও তাঁর এমন ব্যবসায়িক নীতির কারণে তিনি ঠিকই সফল ব্যবসায়ীর কাতারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তেমন কোনো ব্যবসায়িক সমস্যার সম্মুখীনও হতে হয়নি তাঁকে।
ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন বিয়ে করেন ১৯৯১ সালে। সহধর্মিণী নুরুন্নাহার। এ দম্পতির তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে নূর আলম রুবেল বাবার ব্যবসায় যুক্ত, দ্বিতীয় মেয়ে মরিয়ম আক্তারের বিয়ে হয়েছে, তৃতীয় মেয়ে আকলিমা খাতুন সোনাইমুড়ী ডিগ্রি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, চতুর্থ ছেলে রবিউল আলম সোনাইমুড়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি এবং পঞ্চম ছেলে জহিরুল ইসলাম দারুল ছুববাহ মাদ্রাসায় তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। লোকমান হোসেন দীর্ঘ সময় ধরে সোনাইমুড়ী ট্রাক মালিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ পদে আছেন। বর্তমানে তাঁর ছোট-বড় মিলিয়ে ছয়টি ট্রাক রয়েছে। এ ছাড়া সোনাইমুড়ীতে তিনি একটি বাড়িও বানিয়েছেন। নির্মাণপণ্যের এ ব্যবসাটিকে আরও বড় পরিসরে প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর এখনকার লক্ষ্য।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৯তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৭।