প্লেট লোড পরীক্ষার সাতসতেরো

মাটি চরম ভারবহন ক্ষমতা এবং সম্ভাব্য বসে যাওয়ার পরিমাণ নির্ণয় করার জন্য মাঠে প্লেট লোড পরীক্ষা করা হয়। এ পরীক্ষা করার জন্য ভিত্তির গভীরতা বরাবর একটি স্টিল প্লেটের ওপর ধাপে ধাপে বর্ধিত হারে লোড দিয়ে মাটির বসে যাওয়ার পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। যে লোডের কারণে প্লেট দ্রুত হারে বসে যেতে থাকে, সেই লোডকে চরম ভারবহন ক্ষমতা হিসেবে গণ্য করা হয়।

এ পরীক্ষা করার জন্য যে প্লেট ব্যবহার করা হয় তা বর্গাকার, যার সর্বনিম্ন আকার ৩০x৩০ সে.মি. এবং সর্বোচ্চ আকার ৭৫x৭৫ সে.মি.। প্লেটের পুরুত্ব এমন হবে, যাতে সর্বোচ্চ আগত লোড নিরাপদে বহন করতে পারে। প্লেটের পুরুত্ব ২৫ মি.মি.-এর কম হওয়া উচিত নয়।

পরীক্ষার জন্য যে গর্ত খনন করা হয় তার প্রস্থ প্লেটের প্রস্থের ৫ গুণ। গর্তের কেন্দ্রে প্লেটের সমান মাপের একটি গর্ত করা হয়, যার তলদেশ ভিত্তির তলদেশ বরাবর অবস্থান করে। এ গর্তের গভীরতা এমন হবে যাতে-

Dp/Bp=D/B

হয়।

এখানে,

Dp = গর্তের মাঝখানের ছোট গর্তের গভীরতা

Bp = প্লেটের প্রস্থ

D =  ভিত্তির গভীরতা

B =  ভিত্তির প্রস্থ

প্লেটের ওপর হাইড্রোলিক জ্যাকের মাধ্যমে লোড দেওয়া হয়। হাইড্রোলিক জ্যাকের ওপর দুই প্রকার লোড প্রদান করা যায়-

১.     গ্রাভিটি লোডিং প্ল্যাটফর্ম পদ্ধতি এবং

২.    রি-অ্যাকশন ট্রাস পদ্ধতি।

গ্রাভিটি লোডিং প্ল্যাটফর্ম পদ্ধতিতে প্রথমে প্লেটের ওপর হাইড্রোলিক জ্যাক স্থাপন করা হয়। এ জ্যাকের ওপর রি-অ্যাকশন বিম স্থাপন করা হয়। এই রি-অ্যাকশন বিমের ওপর লম্বভাবে প্রধান গার্ডার স্থাপন করে প্রধান গার্ডারে আড়াআড়িভাবে ক্রস প্রদান করা হয়। প্লেটের সঙ্গে দুই থেকে চারটি ডিফরমেশন ডায়াল গেজ লাগানো থাকে। গ্রাভিটি লোড প্ল্যাটফর্ম থেকে জ্যাকে লোড স্থানান্তরের জন্য একটি হাইড্রোলিক পাম্প জ্যাকের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।  এই হাইড্রোলিক পাম্পের সঙ্গে লাগানো লোড ডায়ালের সাহায্যে কী পরিমাণ লোড জ্যাকে স্থানান্তরিত হয় তা জানা যায়। প্রথমে ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট পরিমাণ করে লোড জ্যাকে স্থানান্তর করা হয়। কিছু সময়ব্যাপী ধরে রাখা হয় এবং এ সময় প্লেট কী পরিমাণ করে লোড জ্যাকে স্থানান্তর করা হয়। কিছু সময়ব্যাপী ধরে রাখা হয় এবং এ সময় প্লেট কী পরিমাণ বসে যায় তা ডিফরমেশন ডায়ালের সাহায্যে তালিকাবদ্ধ করা হয়। প্রতি ধাপে লোড দেওয়ার পর প্লেটের বসে যাওয়ার হার একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে না নামা পর্যন্ত আর কোনো লোড বাড়ানো হয় না।

আবার লোডের পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট সীমায় পৌঁছালে লোডকে ধাপে ধাপে কমানো হয় এবং প্লেট কী পরিমাণ ওপরের দিকে উঠে আসে তা তালিকাবদ্ধ করা হয়। প্রতি ধাপে লোড দেওয়ার পর ১, ৫, ১০, ২০, ৪০, এবং ৬০ মিনিট ও পরে ১ ঘণ্টা পরপর ডিফরমেশন ডায়াল গেজ পাঠ নেওয়া হয়, যতক্ষণ না প্রতি ঘণ্টায় বসে যাওয়ার হার

০.০২ মি.মি.-এর কম না হয়। প্রতি ধাপে লোড বৃিদ্ধর পরিমাণ অনুমানকৃত অনুমোদনীয় ভারবহন ক্ষমতা ১/৫ অংশ অথবা চরম ভারবহন ক্ষমতার ১/১০ অংশ। গ্রাভিটি লোডের পরিমাণ চরম লোডের ১ x ১/২ গুণ অথবা অনুমোদনীয় লোডের ৩ গুণ।

সোকোটেক ইউ.কে

পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর X অক্ষ বরাবর লোডের তীব্রতা এবং Y অক্ষ বরাবর বসে যাওয়ার পরিমাণ নিয়ে কার্ভ অঙ্কন করা হয়। এ রূপে অঙ্কিত লোড সেটেলমেন্ট কার্ভের ঢাল পরিবর্তন বিন্দু চরম ভারবহন ক্ষমতা নির্দেশ করে। যদি লোড সেটেলমেন্ট কার্ভের কোনো স্পষ্ট ঢাল পরিবর্তন বিন্দু পাওয়া না যায়, তবে IS কোডের মতে প্লেটের প্রান্তের এক-পঞ্চমাংশ পরিমাণ যে লোডে বসে, সে লোডকে চরম ভারবহন ক্ষমতা বলে। আবার ASTM কোডের মতে, যে লোডের কারণে প্লেটের নেট সেটেলমেন্টের পরিমাণ ২৫ মি.মি. হয়, সেই লোডকে চরম ভারবহন ক্ষমতা বলে। প্রাপ্ত চরম ভারবহন ক্ষমতাকে ২-৩ দ্বারা ভাগ করে অনুমোদনীয় ভারবহন ক্ষমতা নির্ণয় করা হয়।

ফুটিংয়ের আকারের ওপর ভারবহন ক্ষমতার প্রভাব

ফুটিংয়ের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বালু ও গ্রাভেলের ভারবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এ ধরনের ভারবহন ক্ষমতা নিচের সূত্রের মাধ্যমে করা যায়।

qf=M+N BF/Bp

কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে, qF = qp x BF/Bp সূত্রের দ্বারা নির্ণয় করা হয়।

যেখানে,

      qf = ফুটিংয়ের প্রকৃত ভারবহন ক্ষমতা

                  BF = ফুটিংয়ের প্রস্থ

      Bp = প্লেটের প্রস্থ

      qp = প্লেট লোড পরীক্ষায় প্রাপ্ত ভারবহন ক্ষমতা

      M = মাটির ভারবহন ক্ষমতার সহগ Nc এবং Nq-এর অন্তর্ভুক্ত

      N = মাটির ভারবহন ক্ষমতার সহগ NY-এর অন্তর্ভুক্ত

কাদামাটির ক্ষেত্রে ভারবহন ক্ষমতা ফুটিংয়ের আকারের ওপর নির্ভর করে না। তাই এ ধরনের মাটির বল,

qF=qp

প্লেট লোড পরীক্ষার সীমাবন্ধতা

প্লেট লোড পরীক্ষার যত সীমাবদ্ধতা-

  • প্লেটের নিচে প্লেটের প্রস্থের দুই গুণের কম গভীরতার মাটির ভারবহন ক্ষমতা নির্দেশ করে এবং নিচের মাটির ভারবহন ক্ষমতার সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। কিন্তু ফুটিং অনেক বড় তাই মাটির সেটেলমেন্ট এবং শিয়ার এর দ্বারা অকৃতকার্য হওয়ার জন্য বাধা অনেক গভীর মাটির জন্য ঘটে থাকে। তাই প্লেট পরীক্ষার দ্বারা ফুটিংয়ের প্রকৃত সেটেলমেন্ট এবং ভারবহন ক্ষমতা পাওয়া যায় না।
  • প্লেট লোড পরীক্ষা একটি নির্দিষ্ট সময়ব্যাপী সম্পাদন করা হয় এবং পরীক্ষার দ্বারা চরম সেটেলমেন্টের পরিমাণ পাওয়া যায় না। বিশেষ করে সংশক্তিপ্রবণ মাটির বেলার এই ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। কেননা কাদাজাতীয় মাটির ওপর লোড দিলে মাটির সেটেলমেন্ট দীর্ঘদিনব্যাপী চলতে থাকে।
  • কাদামাটির বেলায় বড় ভিত্তির ক্ষেত্রে মাটির চরম ভারবহন ক্ষমতা এবং প্লেট লোড পরীক্ষার দ্বারা প্রাপ্ত মাটির ভারবহন ক্ষমতা একই। কিন্তু বালুযুক্ত মাটির বেলায় ফুটিংয়ের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটির চরম ভারবহন ক্ষমতার মানও বাড়তে থাকে।
  • ফুটিংয়ের তলার ওপর ভূ-গর্ভস্থ জলতলের হলে পাম্পিং করে পানির তলকে ফুটিংয়ের তলার নিচে নামিয়ে দেওয়া হয় এবং এই অবস্থায় পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু এ ধরনের পরীক্ষায় প্রকৃত ভারবহন ক্ষমতা পাওয়া যায় না। কেননা পানির তলে নিচে মাটির ভারবহন ক্ষমতা কমে যায়। কিন্তু পানির তল যখন নামিয়ে দেওয়া হয় তখন ওই অংশের মাটির ভারবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
  • যেসব ক্ষেত্রে মাটির লোড সেটেলমেন্ট কার্ভের দ্বারা স্পষ্টভাবে চরম ভারবহন ক্ষমতা পাওয়া যায় না, সেসব ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যক্তির বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে মাটির ভারবহন ক্ষমতা নির্ণয়ের তারতম্য ঘটতে পারে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৮তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৭।

প্রকৌশলী সুবীর কুমার সাহা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top