যৌথ প্রয়াসে দারুণ সাফল্য

বিক্রমপুর প্রাচীন বঙ্গের অন্যতম রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জনপদ। এলাকাটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হাজারো গৌরবগাথা, সমৃদ্ধময় প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর এবং বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুসহ বহু কীর্তিমান মনীষীর জন্ম এ জনপদে। ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি (বিশেষত আলু চাষ) এবং প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ এ জেলার অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ব্যবসায়ী মো. দেলোয়ার হোসেন ও মতিন পাঠান এখানকারই সফল দুই ব্যবসায়ী। ভাগ্যকূল রোড, শ্রীনগর, মুন্সিগঞ্জের ‘মেসার্স শ্রীনগর ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী দুজন সম্পর্কে সহোদর। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব ব্যবসায়ী ভ্রাতৃদ্বয়ের বর্ণাঢ্য জীবনকাহিনি। সঙ্গে ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা রিয়াজ মাহমুদ।

২০০৯ সালে একসঙ্গে ব্যবসা শুরু করেন এই সহোদর। প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবসার শুরু ইলেকট্রনিকস-ইলেকট্রিক্যাল ও ল্যান্ড প্রমোটরের মাধ্যমে। ২০১৩ সালে জড়িয়ে যান নির্মাণপণ্য ব্যবসায়। বছর যেতে না-যেতেই বিক্রি শুরু করেন আকিজ সিমেন্ট। নির্মাণ এ পণ্যটি বিক্রিতে শুরুতেই বেশ সাড়া পান; হয়ে ওঠেন মুন্সিগঞ্জ টেরিটরির অন্যতম সেরা বিক্রেতা। পণ্যটির ব্যবসায়িক সম্ভাবনা বুঝতে পেরে নেন আকিজ সিমেন্টের এসিআরডি ডিলারশিপ। পরিবেশক হয়েও সফলতা বজায় রাখার সাফল্যে পান আকিজ সিমেন্টের শ্রীনগর ও লৌহজং টেরিটরির এক্সক্লুসিভ ডিলারশিপ। এ ছাড়া তাঁরা একটি স্বনামধন্য স্টিল কোম্পানির স্থানীয় ডিলার। তাঁদের নজরকাড়া সাফল্যের ধারাবাহিকতায় কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল, ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকারসহ অসংখ্য উপহারসামগ্রী। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, চীন, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অফার।

ব্যবসায়ী মো. দেলোয়ার হোসেনের জন্ম ১৯৬৭ সালের ৭ মার্চ শ্রীনগর, মুন্সিগঞ্জের বেজগাঁও গ্রামে। পিতা আলহাজ আবদুল মান্নান শেখ ও মা হাজি মাবিয়া বেগম। তিনি শ্রীনগর পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হন। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে পাড়ি জমান। চার বছর পর দেশে ফিরে জড়িয়ে পড়েন ব্যবসায়। ১৯৯৫ সালের ১৩ জানুয়ারি বিয়ে করেন এ ব্যবসায়ী। তাঁর সহধর্মিণী মিসেস চায়না বেগম। তাঁদের দুই মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ে শামিমা আক্তার দোলন, ঢাকা মহানগর কলেজে ব্যবস্থাপনায় দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, মেজো মেয়ে অনামিকা আক্তার নেহা সেন্ট্রাল গার্লস স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী এবং ছোট ছেলে মো. রাইম ইসলাম নিরব ক্যামব্র্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজে ধোলাইপাড় শাখায় ৫ম শ্রেণিতে পড়ছে। ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক কাজেও জড়িত ব্যবসায়ী দেলোয়ার। তিনি শ্রীনগর বাজার কমিটির জয়েন সেক্রেটারি, আয়েশা সিদ্দিক মসজিদের সভাপতি এবং দক্ষিণ বেজগাঁও জামে মসজিদের সেক্রেটারি।

ব্যবসায়ী মতিন পাঠানের জন্ম ১৯৭১ সালের ৭ জুলাই শ্রীনগর, মুন্সিগঞ্জের মত্তগ্রাম। পিতা আবদুল জব্বার পাঠান ও মা সোনাতারা বেগম। কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি পাড়ি জমান দক্ষিণ কোরিয়ায়। সেখানে প্রায় চার বছর থাকার পর দেশে ফিরে আবারও বেছে নেন প্রবাসজীবন। এ যাত্রায় যান সিঙ্গাপুর। থাকেন প্রায় চার বছর। দেশে ফিরে যুক্ত হন নিজ ব্যবসায়। বিয়ে করেন ১৯৯৬ সালের ১২ আগস্ট। সহধর্মিণী খুশি বেগম। তাঁদের দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে খৈশব পাঠান শ্রীনগর পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী, মেজো মেয়ে মাইশা আক্তার অন্তু গ্রীন পাইলট স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে এবং ছোট ছেলে আব্দুল্লাহ আল মাহাদির বয়স তিন বছর।

ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন এবং মতিন পাঠান দুজনই কর্মজীবনের শুরুতেই বিদেশ যান এবং দেশে ফিরে নিজ নিজ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। দক্ষতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করলেও বিভিন্ন সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে নিজের ব্যবসাতেই ঠিকমতো সময় দিতে পারছিলেন না। একা ব্যবসা সামলাতে না পারায় আশানুরূপ ফলও আসছিল না। ঠিক সে সময়ে দেশে ফেরেন মতিন পাঠান। ব্যবসায়ের এমন বেহাল দশায় উভয়েই সিদ্ধান্ত নেন যৌথভাবে ব্যবসা করার। দুজনের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক থাকায় কাজটি আরও সহজ হয়। এরপর তাঁরা নব উদ্যমে ব্যবসা প্রসারে উদ্যোগী হন। একজন এক কাজে ব্যস্ত থাকলে অন্যজন অন্যদিকটা সামলে নেন। প্রতিনিয়ত হিসাবনিকাশ ঠিকভাবে রাখেন। তাঁদের এমন যৌথ প্রয়াস, এলাকায় পরিচিতি, ক্রেতা ও খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অত্যন্ত সুসম্পর্ক থাকায় দিন দিন তাঁদের ব্যবসার দ্রুত প্রসার ঘটে। নির্মাণপণ্যের এ ব্যবসা ছাড়াও ল্যান্ড, রিয়েল এস্টেট ও রেন্ট-এ-কার ব্যবসা রয়েছে তাঁদের। এসব ব্যবসায় প্রায় ২০-২৫ জন কর্মচারী জড়িত। ব্যবসার লভ্যাংশ থেকে বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানায় তাঁরা নিয়মিত অনুদান দেন।

নিজেদের মধ্যে চমৎকার বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমনি¦ত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছে তাঁদের ব্যবসা। আর তা সম্ভব হচ্ছে কারণ তাঁরা ব্যবসাকে দেখেন ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে। ব্যবসার পরিসর আরও বাড়ানো এবং আকিজ সিমেন্টের এক্সক্লুসিভ ডিসট্রিবিউটর হওয়ায় তাঁদের এখনকার লক্ষ্য।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৭তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৭।

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top