ইট, পাথর আর কংক্রিটে ক্রমেই ভরে উঠছে এ নগর। গড়ে উঠছে ঝাঁ-চকচকে দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। সবুজ বনানী, খেলার মাঠ, খোলা প্রান্তর, জলাধার এখন যেন বিলাসিতা। একটা ভবন থেকে আরেকটা ভবনের দূরত্ব একেবারেই নগণ্য। বহুতল ভবনে ঠাঁসা এই শহরে ঘনত্বের সঙ্গে তাপমাত্রার যেন গা-ঘেঁষাঘেঁষি সম্পর্ক; আলো-বাতাসও স্বাধীন নয়। নির্ভরতা তাই বৈদ্যুতিক বাতি, পাখা আর শীতাতপ যন্ত্রের ওপর। এ নগরের মানুষেরা ক্রমেই বঞ্চিত হচ্ছে প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য থেকে। স্থাপনা নির্মিত হয় মানুষের প্রশান্তি ও সার্বিক নিরাপত্তার জন্য কিন্তু তা যদি পরিবেশ ও মানুষের হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায় তবে তা অবশ্যই কারও কাম্য নয়!
জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈষ্ণিক উষ্ণতা বাড়ার পাশাপাশি সবুজ বনানী ও জলাধার কমায় বাড়ছে নগরের তাপমাত্রা। গাছপালা ও জলাধার তাপ কমাতে সাহায্য করলেও ইট, কংক্রিট ও কাচসমৃদ্ধ স্থাপনা ঠিক তার বিপরীত। দিনে সৌরতাপ এসব স্থাপনায় জমা হয়ে অনেক রাত পর্যন্ত তাপমাত্রা আস্তে আস্তে ছেড়ে অন্দর ও বাহির উভয় স্থানকেই গরম রাখে। ফলে শহরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক মাত্রার থেকে থাকে বেশি। বিশেষ করে বাণিজ্যিক ভবন, অফিস, শপিং মলগুলোতে কাচের ব্যবহার বাড়ায় উষ্ণতা ক্রমেই বাড়ছে। মূলত ইউরোপীয় ও শীতপ্রধান দেশগুলোর ভবনে কাচের ব্যবহার বেশি হয়, কেননা সেখানকার তাপমাত্রা থাকে অনেক কম। অনেকটা গ্রিন হাউস পদ্ধতিতে সৌরতাপ কাচের মধ্য দিয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে ঘরকে উষ্ণ রাখার জন্যই এ ব্যবস্থা। কাচ শীতপ্রধান দেশগুলোর জন্য কার্যকরী হলেও আমাদের মতো নাতিশীতোষ্ণ দেশের জন্য তা আদর্শ নয়। অথচ সমসাময়িক স্থাপত্যচর্চার অজুহাত দেখিয়ে অন্যান্য দেশের মতো এ দেশেও আবহাওয়ার পক্ষে বেমানান, বহুতল ভবনগুলোতে সংযোজিত হচ্ছে কাচ। ফলে ভবনের অন্দরে স্বাভাবিকের চেয়ে বিরাজ করে বেশি তাপমাত্রা। অন্দর ঠান্ডা রাখতে তাই এসি লাগানোর বিকল্প নেই। বিষয়টি অনেকটা এ রকম কাচ দিয়ে তাপ সৃষ্টি করে শীতাতপ যন্ত্র দিয়ে তাপ কমানোর চেষ্টা। অথচ মাত্র ১ ডিগ্রি ফারেনহাইট (০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রা বাড়লে একটি শহরের শক্তি বেড়ে যায় খরচ দেড় থেকে দ্বিগুণ। যার বাস্তব প্রমাণ শহরের লোডশেডিং।
স্থাপত্য পরিসর মানুষের মনের ওপর প্রভাব ফেলে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইমোশনাল টেম্পারমেন্ট বদলায়। ফলে অনেকে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। মনে বিরক্তিবোধের জš§ নেয়। মনের ওপর এমন চাপের ফলে আচরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সমাজে বাড়ে অপরাধপ্রবণতাও। অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘিঞ্জি পরিবেশ মানুষের অপরাধপ্রবণতাকেও উসকে দেয়। যেমন, বস্তি কিংবা শহরের খুপরি ঘরের বাসিন্দারা চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা পেশায় জড়িয়ে পড়ে। অভাবের তাড়নায়ই যে শুধু এমনটা করে তা কিন্তু নয় বরং তাদের বসবাসের পরিবেশ তাদের হীনম্মন্যতায় ভোগায়। অপরাধকর্ম শুধু বস্তিতেই সীমিত নয় বরং এখন অ্যাপার্টমেন্ট ভবনগুলোতে ঘটছে বিভিন্ন প্রকার অপরাধ। পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশী কে তা ঠিকমতো জানা হয় না। তাই কারও পক্ষে সম্ভব হয় না কী ঘটছে তা জানা। এর অন্যতম কারণ স্থাপত্য নকশার ধরন। আবাসিক ভবনগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকায় অ্যাপার্টমেন্টের দরজা-জানালা সব সময় বন্ধ রাখতে হয়। তাই দৃশ্যমান ক্ষমতা কমে যায় এবং বাইরে ও ভেতরের আন্তসম্পর্ক নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তা ছাড়া ঘনবসতি হওয়ায় পাশের স্থাপনা থেকে গোপনীয়তা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকার সরু বা অপ্রশস্ত জানালা কিংবা উন্মুক্ত জায়গা তৈরি করা হয়, যা অনিরাপদ দৃষ্টিসম্পন্ন স্থাপনার জন্ম দেয়।
পরিবেশ বিপর্যয় যখন চরমে তখন ধরণিকে রক্ষার জন্য চলছে নানা আয়োজন। সচেতনতা এসেছে স্থাপত্য ডিজাইন ও নির্মাণে। গবেষণা চলছে কীভাবে পরিবেশবান্ধব স্থাপনা নির্মাণ করা যায়। বিভিন্ন ধরনের কনসেপ্ট নিয়ে চলছে আলোচনা সবুজ সচেতন স্থাপত্য, গ্রিন বিল্ডিং, ইকো আর্কিটেকচার নিয়ে। স্থপতিরাও চেষ্টা করছেন পরিবেশবান্ধব পরিসর ডিজাইনে। স্থাপনাজুড়ে লাগাছে গাছ। লাগাছে উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন ফিটিংস। স্পেস ডিজাইনে সূর্যের আলো, প্রাকৃতিক বাতাস ইত্যাদি কাজে লাগানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও স্থানীয় নির্মাণ উপকরণ ব্যবহারে আগ্রহ দেখাছেন স্থপতিরা। বিশ্বের প্রসিদ্ধ স্থপতি ও পরিবেশবিদেরা তুলে ধরছেন তাঁদের সুচিন্তিত মতামত। বাংলাদেশেও চলছে এরই ধারাবাহিকতা। যার মধ্যে রয়েছে-
- প্রত্যেকের দেশীয় ঐতিহ্য ও ভবন নির্মাণ নিয়মনীতি মেনে স্থাপনার নকশা প্রণয়ন।
- দিনের আলো ও প্রাকৃতিক বাতাস কাজে লাগানো। সে লক্ষ্যে সরাসরি সূর্যের আলো যেন ঘরের মধ্যে ঢুকতে না পারে সে জন্য প্রশস্ত জানালার পাশাপাশি ভেন্টিলেশন সিস্টেম কিংবা ল্যুভার রাখা। তবে জানালার ওপরে অবশ্যই শেড ব্যবহার করা। অন্যথায় সূর্যের আলো সরাসরি ঘরে প্রবেশ করে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেবে।
- বর্তমানে নিরাপত্তা বিবেচনায় অনেকেই অ্যাপার্টমেন্টের চারদিক ঘিরে রাখে। এমনকি প্রয়োজনীয় ভেনটিলেশনের ব্যবস্থাও থাকে না। এ কারণে রান্নাঘরের অভ্যন্তরে থাকা গ্যাসের সিলিন্ডার কোনো কারণে ছিদ্র হয়ে গেলে গ্যাস বেরোনোর পথ থাকে না বলে যেকোনো মুহূর্তে আগুন লাগতে পারে। এ জন্য দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে রান্নাঘরে ভেন্টিলেশন-ব্যবস্থা রাখা অত্যন্ত জরুরি।
- ভবনে রং করার ক্ষেত্রে গাঢ় রঙের বদলে পরিবেশবান্ধব হালকা রং ব্যবহার করা উত্তম। গাঢ় রঙে তাপ প্রতিফলিত কম হয়। ফলে অধিক পরিমাণ কৃত্রিম আলোর প্রয়োজন হয়। এতে বিদ্যুৎ অপচয় বেশি হয়।
- ছাদে সবুজায়ন বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়, যা স্থাপনার তাপ কমাতে এবং পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখে। গ্রিনরুফ বা সবুজ ছাদ কৌশলের সাহায্যে বিভিন্ন ধরনের ফুল, ফল ও সবজি পাওয়া যায়।
- ভবনের দেয়ালে সবুজায়ন ব্যবস্থাটিও বিশ্বব্যাপী ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। উন্নত দেশগুলোতে ব্যবহৃত হচ্ছে সবুজ বা জৈব কংক্রিট। এ ছাড়া ভবনের দেয়ালে স্টিল, কাঠ, প্লাইউড, পিভিসি দিয়ে বিশেষ কাঠামোর মাটির স্তর বানিয়ে লতাবট, ফার্ন, মানিপ্লান্ট-জাতীয় লতানো গাছ রোপণ করে ভবনকে সবুজের আবরণে ঢেকে দেওয়া যায়।
- পানির অপচয় কমাতে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিক রাখার জন্য রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কার্যকর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্থাপনায় এ ব্যবস্থাটি রাখা হলেও বাংলাদেশে এখনো এর ব্যবহার ব্যাপক নয়। প্রতিটি স্থাপনার ছাদে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা এবং তা সঞ্চয়ের জন্য ভূগর্ভস্থ বা ভূপরিস্থ জলাধার করলে পানির চাহিদা যেমন মিটবে, তেমনি রক্ষা পাবে পরিবেশের ভারসাম্যও।
- প্রতিটি দেশেই ভবন নির্মাণে নির্দেশনামূলক নিয়মনীতি থাকে। বাংলাদেশেও রয়েছে এমন একটি নীতিমালা, যা বিএনবিসি (BNBC-Bangladesh National Building Code) নামে পরিচিত। এই কোডে ফ্লোর এরিয়া রেশিওসহ (FAR) ভবন ও পরিবেশ বিষয়ক নানা বিধিনিষেধ ও পরামর্শসংক্রান্ত দিকনির্দেশনা রয়েছে। স্থাপনা নির্মাণে এগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিতে হবে।
- স্থাপনায় পরিবেশবান্ধব ও বুদ্ধিদীপ্ত ফিটিংস ও ফিক্সারস লাগানো উচিত। যেমন, সেন্সরযুক্ত কমোড পানি এবং সেন্সরযুক্ত বৈদ্যুতিক উপকরণ বিদ্যুতের অপচয় কমায়।
- স্থাপনার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, তাপমাত্রা, আলোর পরিমাণ, আর্দ্রতাসহ স্বাস্থ্যগত বিষয়ে পরিমাপ করার জন্য বর্তমানে বেশ কিছু সফটওয়্যার বাজারে পাওয়া যায়। এসব সফটওয়্যার ব্যবহার করেও সহজে পরিবেশগত বিষয়ের তারতম্য নির্ণয় করা সম্ভব।
আমাদের মনে রাখা উচিত, স্থাপত্য শুধু ভবন ডিজাইন নয়, তা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক বন্ধনও। স্থাপত্যের অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে, যা একটি সমাজ বা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনে প্রেরণা হতে পারে। তাই একটি পরিবেশবান্ধব স্থাপনা যেমন মানুষের মনকে আন্দোলিত করে, তেমনি ভিন্ন ভিন্ন স্থাপত্যিক সৌন্দর্য মানুষের বিশ্বাস, অনুভূতি ও ধারণা বদলাতে সাহায্য করে। একটি সচেতন স্থাপত্য ডিজাইনের মাধ্যমে প্রায় ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অপচয় রোধ করা সম্ভব। তাই মানুষের সার্বিক কল্যাণের কথা চিন্তা করে একটি টেকসই নগর গড়ে তুলতে পরিবেশবান্ধব স্থাপনা ডিজাইন ও নির্মাণ একান্তই জরুরি।
বিশেজ্ঞ মত
অধ্যাপক জেবুন নাসরিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক এবং স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন। ছিলেন স্থাপত্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে কাজ করেছেন। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গ্রিন আর্কিটেকচার, এনভায়রনমেন্ট এবং সাসটেইন্যাবিলিটি বিষয়ে শিক্ষকতা, গবেষণা এবং নির্দেশনার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে। শিক্ষকতার শুরু ১৯৮৮ সালে। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি জার্নাল পেপারে তাঁর লিখিত প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন সেমিনারে। তিনি বুয়েট থেকে স্থাপত্যে স্নাতক শেষ করে ১৯৮৭ সালে যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড সিটি পলিটেকনিক থেকে এমফিল এবং ১৯৯৪ সালে ডি মন্টফোর্ট ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। স্থাপনা ও তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ-আবহাওয়ার সম্পর্ক নিয়ে রয়েছে তাঁর প্রচুর গবেষণা। বিশেষ করে প্রাকৃতিক আলো ও তাপ তাঁর আগ্রহের বিষয়। কাজ করছেন সবুজ স্থাপত্য নিয়েও। বুয়েটের গ্রিন আর্কিটেকচার সেলের কোর মেম্বার হিসেবে এখন দায়িত্বরত। গুণী এ অধ্যাপকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্থপতি খালিদ মাহমুদ
একটি আদর্শ, নান্দনিক ও পরিবেশবান্ধব স্থাপনার বৈশিষ্ট্য কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
পরিবেশবান্ধব স্থাপনা বর্তমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাবনা। সারা বিশ্বে পরিবেশবান্ধব স্থাপনার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। পরিবেশবান্ধব স্থাপনার মূল ধারণাই হলো স্থাপনাকে পরিবেশের প্রতি স্পর্শকাতর হতে হবে। এবং কার্যকারণ হিসেবে খুব অল্প কথায় বলতে গেলে একটি পরিবেশবান্ধব স্থাপনাকে কয়েকটি মৌলিক চাহিদা বা দাবি পূরণ করতে হয়। প্রথমত, এটি পরিবেশে কোনো ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলবে না। যেমন একটি স্থাপনার নির্মাণ, সংরক্ষণ এবং ধ্বংস বা বিন্যাস এর প্রতিটি পর্যায়ে সর্বোচ্চ মাত্রার সহনশীল হতে হবে। এটি পরিবেশ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধাসমূহ গ্রহণ করবে। যেমন- প্রাকৃতিক বাতাস, সূর্য থেকে প্রাপ্ত দিনের আলো, বৃষ্টির পানি, হাতের কাছের বিভিন্ন ধরনের উপকরণ।
বাসস্থানে সুন্দর বসবাস নিশ্চিত করতে প্রাকৃতিক আলো, বাতাস, বৃষ্টির মতো প্রকৃতির সান্নিধ্য কতটা জরুরি?
স্থাপত্য হচ্ছে ব্যবহারিক শিল্প। এটা মানুষ শুধু দেখে তা নয় বরং এর মধ্যে সে নিজের সময়, অনুভূতি ব্যয় করে। সুতরাং শুধু সুন্দর বললে আসলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমরা বলি একটি নিরাপদ, আরামদায়ক এবং উপযোগী বাসস্থান মানুষের জন্য প্রয়োজন। প্রাকৃতিক আলো এবং বাতাস একটি পরিসরকে নিরাপদ, আরামদায়ক ও উপযোগী করে গড়ে তোলে। আর আমাদের দেশে প্রাকৃতিক আলো এবং বাতাসের অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। সব দেশে এ সুযোগ থাকে না। যেমন-শীতপ্রধান একটি দেশে মানুষকে বাধ্য হয়ে প্রাকৃতিক বাতাস আটকে নিজেদের তৈরি উষ্ণ পরিসরে বাস করতে হয়। আবার মরুর লু হাওয়া থেকে বাঁচতে ঘরের সবকটা জানালা বন্ধ করতে হয় কিন্তু আমরা এদিক থেকে দারুণ সৌভাগ্যবান। প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের ব্যবহার আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা তৈরি করে। প্রকৃতির রং, রূপ, বিচিত্রতা পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের জীবনকে অবগাহন করতে পারি। মানুষ হিসেবে আমরা সব সময়ই চাই প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে। তবে আলো ও বাতাসের থেকে বৃষ্টির সান্নিধ্য ব্যাপারটা একটু অন্য রকম। আমরা বৃষ্টিকে উপভোগ করতে চাই কিন্তু বৃষ্টিকে গায়ে মাখতে চাই না। এই বিষয়কে মাথায় রেখেই আমাদের নান্দনিক ভাবনাকে সাজাতে হয়।
টেকসই স্থাপত্যের জন্য দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় কেন?
টেকসই স্থাপত্য কথাটা কিন্তু খুবই বিস্তৃত বিষয়। এর শর্ত হচ্ছে সম্পদকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে যেন নিজের প্রয়োজন পূরণ করার পর যা আগামী প্রজন্মকে নিরাপদ রাখবে। আমরা সম্পদকে আমাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করব। যেমন-আমরা বিদ্যুৎ ব্যবহার করি আলো সংস্থানের জন্য। বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রচুর খনিজ জ্বালানি ব্যয় করতে হয়। এই জ্বালানি সম্পদ কিন্তু অসীম নয়। সুতরাং দিনের আলো ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা অন্তত একটি উল্লেখযোগ্য সময় বিদ্যুতের ওপর চাপ কমাতে পারি। অর্থাৎ প্রথম গুরুত্ব হচ্ছে শক্তি বা এনার্জির ব্যবহার কমানো। আমরা যদি প্রাকৃতিক আলো এবং বাতাসকে কাজে না লাগাতে পারি তাহলে কৃত্রিম উপায়ে আরও বেশি সংগ্রহ করতে হবে। তার মানে আমাদের অহেতুক শক্তি উৎপাদনে খরচ করতে হবে। এটা এক ধরনের অপচয়। দ্বিতীয়ত, মানুষের সুস্থতা এবং উৎপাদনক্ষম থাকার পেছনে প্রাকৃতিক আলোর ভূমিকা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘ সময় একনাগাড়ে কৃত্রিম আলোয় কাজ করে, তাদের বিভিন্ন মনোজাগতিক সমস্যা হয়। মানুষের শরীর কাজের উপযোগী থাকার সময় হচ্ছে দিন। দিনের আলোয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা থাকে বেশি, মনোযোগ থাকে এ কারণে পরোক্ষভাবে কাজের সুফল পাওয়া যায় বেশি। একটি সমাজের সার্বিক ক্ষমতা বিচার করতে গেলে এটি মোটেই ফেলে দেওয়ার মতো বিষয় নয়। তৃতীয়ত, আরও বলা যায়, প্রকৃতি মানুষকে বৈচিত্র্য দান করেছে। প্রাকৃতিক আলো স্থাপত্য এবং তার ব্যবহারকারীর মধ্যে অন্তস্থ যোগসূত্র দান করে। আলো-ছায়ার খেলায় স্থাপত্য জীবন্ত হয়ে ওঠে। এটা হয়তো চোখে দেখা যায় না কিন্তু অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করা যায়। সুতরাং স্থাপনায় প্রাকৃতিক আলোর কার্যকর প্রবেশ থাকতেই হবে।
বাংলাদেশি স্থপতিদের কাজে প্রাকৃতিক আলোর প্রতি সচেতনতা কেমন? অনেকেই অভিযোগ করেন, সম্প্রতি স্থপতিরা কৃত্রিম আলোর ব্যবহার বেশি করছেন– এ সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
প্রাকৃতিক আলোর প্রতি সচেতনতা কেমন এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করা ঠিক হবে না। স্থপতিরা অনেকগুলো বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের স্থাপত্য চর্চা করেন। প্রাকৃতিক আলোকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কমবেশি হতেই পারে। তবে সচেতনতা নেই তা কিন্তু নয়। দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা স্থাপত্য চর্চা করছেন, আমাদের দেশের মাটি, মানুষ আবহাওয়া নিয়ে তাঁদের স্বপ্ন আছে। স্থাপনার সম্মুখ দিক নির্বাচন, স্থাপনার আকৃতি, নির্মাণ উপকরণ, প্রবহমান বাতাসের অনুকূলে চলাচলের পথ ইত্যাদি সাজানোর ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব একটি রীতি গড়ে উঠেছে। এটা আসলে নতুন করে আসেনি। অভিযোগের বিষয়ে বললে বলতে হয় অভিযোগের সত্যতা আছে। বিশেষ করে বিভিন্ন কমার্শিয়াল ধাঁচের স্থাপত্যের ক্ষেত্রে এই অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। আমরা অনেক সময়ই অন্যদের থেকে আলাদা কিছু করতে গিয়ে কিংবা দেশের বাইরের চোখ ধাঁধানো স্থাপনা অনুসরণ করতে গিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত ধারার চর্চা করি। তবে আবারও বলতে হয় আগের চেয়ে স্থপতিরা এখন অনেক বেশি সচেতন। প্রাকৃতিক আলোর ব্যবহারের ওপর আমাদের আগ্রহ এবং মনোযোগ ক্রমেই বাড়ছে।
আলো আসতে দিলে তাপ আসবে; আসবে শব্দ, এসব কীভাবে সমন্বয় হবে?
হ্যাঁ, আলো আসতে দিলে তাপ আসবে আরও অনেক কিছু আসবে। আমি কোনটাকে আসতে দেব কোনটাকে আসতে দেব না, সেটাই হচ্ছে আমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়। ডিজাইন আসলে কম্প্রোমাইজের বিষয়। আমরা স্থপতিরা যেটা করি সেটা হচ্ছে প্রায়োরিটি ঠিক করা। কোনটাকে বেশি গুরুত্ব দেব। আমি যেটাকে স্বাগত জানাব, সেটাকে ভিত্তি ধরে আমার ডিজাইনের সিদ্ধান্তগুলো তৈরি হবে। অবশ্যই আমি যা চাইব না তাও আসতে চাইবে। আমি তখন সেটাকে বিরত রাখার জন্য ভিন্ন কিছু কৌশল অবলম্বন করব। আমি আলো আনার জন্য ছাদ খুলে দেওয়ার চিন্তা করছি, আমি জানি আমার গায়ে বৃষ্টি পড়বে। সুতরাং বৃষ্টিকে বিরত রাখার জন্য আমি ছাদ মুক্ত না করে দেয়ালে বড় জানালা স্থাপন করার কথা ভাবতে পারি। বড় জানালা দিলে সূর্যের তাপে আমার পরিসর গরম হয়ে যাবে। সুতরাং সরাসরি সূর্যের আলো না আসতে পারে এ জন্য পর্যাপ্ত শেডের ব্যবস্থা করব। একইভাবে বাতাসের ক্ষেত্রে আমরা না চাইলেও শব্দ চলে আসবে। সে শব্দ যদি হয় কোনো পাখির আনমনা সুর, তাহলে হয়তো আমাদের আপত্তি থাকে না কিন্তু সেটা যদি হয় রাস্তার বিকট শব্দ, তাহলে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সুতরাং শব্দকে দূরে রাখার কৌশলগুলো প্রয়োগ করতে হবে। মোট কথা বিভিন্ন বিকল্পগুলোকে মাথায় নিয়ে এগোতে হবে। একটি কাজ বিভিন্নভাবে করা যায়। একটি ইচ্ছাকে বিভিন্নভাবে পূরণ করা যায়। কোন পথটি সবচেয়ে উপযোগী ডিজাইনার সেটাই খুঁজে বের করবেন।
আধুনিক স্থাপনা বিশেষ করে কমার্শিয়াল স্থাপনার সৌন্দর্যে প্রচুর কাচের ব্যবহার হচ্ছে। এতে কি সমস্যা তৈরি হচ্ছে না? যেমন এসির ব্যবহার বাড়ছে, কীভাবে এই সমস্যাটিকে সমন্বয় করা সম্ভব?
অবশ্যই সমস্যা তৈরি হচ্ছে। কাচের ব্যবহারে আমরা হয়তো বেশি আলোর ব্যবস্থা করতে পারছি। কিন্তু আমাদের পরিবেশের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে তাপমাত্রা বাড়ার কারণে। আমরা অনেক সময় যে ধরনের গ্লাস ব্যবহার করছি তা সূর্যরশ্মির তাপকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না বরং প্রতিফলিত করে পরিবেশে ছেড়ে দিচ্ছে। আবার আমরা নিজেদের আবাস বা কর্মস্থলকে তাপ সহনীয় রাখতে যে এসি ব্যবহার করছি, তাতে অতিরিক্ত তাপ বাইরে নিঃসরণ করছে। এর ফলে শহরের এলাকায় অল্প জায়গায় অনেক বেশি তাপ জমা হচ্ছে, যেটাকে হিট আইল্যান্ড বা তাপদ্বীপ বলা হয়। পৃথিবীজুড়েই এই সমস্যা বিদ্যমান। এই সমস্যার সমাধান পুরোটা করা অসম্ভব না হলেও কিছুটা করা সম্ভব যদি আমরা আমাদের ডিজাইন ধারণার সঙ্গে পরিবেশ সচেতনতা যুক্ত করতে পারি। আমাদের আবহাওয়া বিবেচনায় নিয়ে নির্মাণ উপকরণ ঠিক করতে হবে। তাপবান্ধব ডিজাইনের কৌশল নিয়ে বাংলাদেশেও এখন প্রচুর গবেষণা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্তি গ্লাসের ব্যবহার কমিয়ে নজরকাড়া ডিজাইন করা সম্ভব। কাচঘেরা বদ্ধ পরিবেশ তৈরি না করে প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলকে প্রাধান্য দিলে এসির ব্যবহার কমে আসবে। এনার্জি ব্যবহার কমবে। এসি লাগবে তবে সেটা প্রয়োজন অনুযায়ী। এখন যেমন সব সময়ের জন্য ব্যবহার হচ্ছে তেমন নয়।
সুর বা মিউজিক নিয়ে আপনার বেশ আগ্রহের কথা জানি। স্থাপত্যের সঙ্গে কি এর কোনো যোগসূত্র আছে?
সুর শুধু স্থাপত্যের সঙ্গে নয়, মানুষের সমগ্র জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সুর মানুষের মনকে আন্দোলিত করে, সুর বা মিউজিক অনেকগুলো ব্যাকরণ মেনে চলে। স্থাপত্য চর্চায় সেই একই ব্যাকরণ কাজ করে। যেমন ছন্দ, অনুপাত, সাম্যতা, ভারসাম্য ইত্যাদি। ব্যাকরণের এই উপাদানগুলো শুধু স্থাপত্য নয় যে কোনো তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক শিল্পকে প্রভাবিত করে। স্থাপত্য একটি ব্যবহারিক শিল্প। স্থপতির চিন্তা, কল্পনা, তাড়না থেকে স্থাপত্যের প্রথম সূচনা। বিভিন্ন প্রয়োজন এবং বাস্তবতা একে ব্যবহার উপযোগী করে প্রকাশ করে। তারপর মানুষ তা নির্মাণ করে। সুরের সঙ্গে স্থাপত্যের খুব গভীর একটা যোগসূত্র আছে। তবে এই ধরনের তাত্ত্বিক আলোচনার জন্য এ মাধ্যমই যথেষ্ট নয়। আমার মনে হয় প্রসঙ্গটা এসেছে আমার ‘মিউজিক এপ্রিসিয়েশন’ বিষয়টাকে দেখে, যেটা স্নাতক পর্যায়ে আমি কোর্স করিয়ে থাকি। এটার বিষয়বস্ত কিন্তু একটু ভিন্ন। মানুষের কাজের ফাঁকে একটি রিফ্রেশনেস দরকার। অর্থাৎ কাজটা যাতে বিরক্তিকর, একঘেয়ে না হয়ে ওঠে এ জন্য একটা সময় পুরো বিষয়টাকে একটু বিরতি দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কাজে নিজের মনকে জড়ানো হয়। এটা অনেকটা মেডিটেশনের মতো। এর ফলে সাময়িকভাবে মানুষ একটু চাপমুক্ত হয়, তারপর আবার কঠিন পরিশ্রমে যাওয়ার মতো একটি মানসিক উদ্যম তৈরি হয়। একজন স্থপতি বা স্থাপত্য পেশার সঙ্গে জড়িত সবার জন্য এটি খুব কার্যকর হতে পারে। শুধু তা-ই না, এটি আসলে সবার জন্যই উপকারী। এটা শুধু মিউজিক না হয়ে অন্য কিছুও হতে পারে। যেমন বেড়ানো, খেলাধুলা, ছবি আঁকা এবং এ ধরনের কিছু একটা। তবে সুরের সুবিধা হচ্ছে এর জন্য অবস্থান পরিবর্তন করতে হয় না বা বিশেষ কোনো ব্যবস্থাপনা দরকার হয় না। নিজের ডেস্কে বসেই খানিক সময়ের জন্য ভিন্ন জগতে হারিয়ে যাওয়া যায়।
আমাদের এই নগরের উন্মুক্ত স্থান, খেলার মাঠ, জলাশয় দখল হয়ে যাচ্ছে, ছোট ছোট ফ্ল্যাটে আমরা কীভাবে আলো, বাতাস আর সুরের এই প্রকৃতিকে নিয়ে আসব।
এটা আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের শহরগুলো গড়ে উঠছে মাত্রাতিরিক্ত ঘনত্ব নিয়ে। ভবনের সঙ্গে গায়ে গা লাগিয়ে ভবন তৈরি হচ্ছে। একটি ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে তাকালে পাশের ভবনের দেয়াল ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। আমাদের এখন আবাসনের ধরন নিয়ে ভাবতে হবে। কমিউনিটি হাউজিংয়ের ধারণা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। ছোট ছোট অনেক ভবন না হয়ে একত্রে প্রয়োজনে বেশি উঁচু একটি ভবন হবে, যেখানে পর্যাপ্ত খোলামেলা জায়গা থাকবে। আলো-বাতাস, সবুজ গাছপালা, প্রকৃতির ছোঁয়া নিয়ে আসার চেষ্টা করা যাবে। ছোট হোক, বড় হোক সব ধরনের ফ্ল্যাট এখান থেকে উপকৃত হবে। সিঙ্গাপুরের মতো ছোট এবং ঘন বসতিপূর্ণ শহর কিন্তু এভাবেই তাদের পরিবেশকে আমূল বদলে ফেলেছে। এর ফলে বিভিন্ন সার্ভিসের ব্যবস্থা করাও সহজ হয়ে যায়। তবে তারও আগে দরকার আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। আমরা নিয়ম মানার ক্ষেত্রে ভীষণ রকমের অসচেতন। রাজউকের যে বিধিমালা আছে, সেটাকেও আমরা ক্রমান্বয়ে অমান্য করে যাচ্ছি। ২০০৮ সালের পর থেকে এফএআর (ফ্লোর এরিয়া রেসিও) নিয়ম চালু হয়েছে। আমরা সে নিয়মটাকে পজিটিভলি কাজে লাগাচ্ছি না। ভবনের চতুর্দিকে যে জায়গাটুকু ছাড়া আবশ্যক, সেটা নিয়ে আমরা ভিন্নমুখী পরিকল্পনা করতে পারি। দুটি বা তিনটি ভবনের মধ্যবর্তী জায়গাকে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে উন্মুক্ত পরিসর তৈরি করা যায়। স্থপতিদের দায়িত্ব দেওয়া হলে তাঁরা নতুন নতুন ধারণার বাস্তবায়ন করতে পারবেন। মোট কথা, ইচ্ছা থাকলে অনেক কিছুই করা সম্ভব। আমাদের কী দরকার এই মানসিকতাটা আগে তৈরি করতে হবে।
আমাদের দেশের প্রচলিত ভবনগুলো কতটা পরিবেশবান্ধব? যদি তা না হয় তাহলে পরিবেশবান্ধব করতে স্থাপনায় কী ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন?
বর্তমান সময়ের পরিবেশবান্ধব ধারণা বলতে যা বোঝায়, আমাদের দেশের প্রচলিত ভবনগুলো আসলে সেভাবে গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে যে ভবনগুলো আমরা দেখি তাতে বেশ কিছু সমস্যা রয়েই গেছে। প্রায়ই এতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের কমতি থাকে। এটাই বড় সমস্যা। তা ছাড়া পরিসরের সুগঠিত রূপ পাওয়া যায় না। নির্মাণ এবং রক্ষাবেক্ষণে পরিবেশবান্ধব নীতির প্রয়োগ হয় না। পর্যায়ক্রমে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। একটি পরিবেশবান্ধব স্থাপনার জন্য ডিজাইনে খুব বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। আমরা কয়েকটি বিষয়কে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখে থাকি। প্রথমত বায়ু চলাচল এবং প্রাকৃতিক আলোর সংস্থান যেটা আরামদায়ক এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করে। এ জন্য বাহ্যিক স্থাপনার চেয়ে ভেতরের পরিসরের পুনর্গঠন বেশি জরুরি। আর যেখানে সুযোগ আছে সেখানে ভবনের বাহ্যিক আকৃতি, সম্মুখভাগ, জানালা বা মুক্তপথের অবস্থান, ভবনের নির্মাণ উপকরণ, উন্মুক্ত পরিসর ইত্যাদি নিয়ে নির্মাণের আগেই ভাবতে হবে।
স্থাপনাকে পরিবেশবান্ধব করার লক্ষ্যে অনেকেই গাছ লাগিয়ে থাকেন, তাতে কি স্থাপনাটি পরিবেশবান্ধব হয়? বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন?
গাছ লাগানো পরিবেশবান্ধব হওয়ার একটি মাত্র উপায় কিন্তু এটাই একমাত্র উপায় নয়। বারান্দায় কয়েকটি গাছ লাগালেই আমার স্থাপনা পরিবেশবান্ধব হয়ে যাবে, এমন ভাবাটা কিন্তু বড় ভুল। কারণ, পরিবেশবান্ধব ধারণার বিস্তারিত একটি কর্মকৌশল আছে। আমি ওপরে সংক্ষেপে বিষয়টা বলেছি।
দেশে অনেক তরুণ ও উদীয়মান স্থপতি স্থাপত্য চর্চা করছেন, পরিবেশের বিষয়ে তাঁদের সচেতনতা কি যথেষ্ট?
আমি মনে করি, নতুন প্রজন্ম যারা স্থাপত্য পেশায় নিয়োজিত, তাদের মধ্যে যথেষ্ট সচেতনতা আছে। তবে মনে রাখতে হবে, তারা এখনো নতুন। তাদের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা করে এগোতে হচ্ছে। একটি প্রকল্পের সবকিছু আসলে স্থপতির নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এখানে মালিকপক্ষেরও ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে জড়িয়ে আছে আর্থিক বিষয়, অভিজ্ঞতার বিষয়। পরিবেশসচেতন কাজের ক্ষেত্রে কখনো কখনো প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি প্রয়োজন হয়। সুতরাং নির্মাতা বা কর্তৃপক্ষকে সচেতন এবং আগ্রহী হতে হয়। তরুণ স্থপতিরা অনেক সময় চাইলেও অনেক কিছু ম্যানেজ করতে পারে না। তার মধ্যেও ভালো কিছু উদাহরণ আমরা দেখছি।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৭তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৭।