পৃথিবীর সুপ্রাচীনতম সভ্যতা মেসোপটেমিয়া। ঐতিহাসিক ও গবেষকেরা এ সভ্যতাকে বিশেষায়িত করেছেন সভ্যতার আঁতুড়ঘর বা ভিত (Cradle of Civilization) হিসেবে। সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয়, কাসাইট ও আদসিরীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির মিশেলে গড়ে উঠেছিল এটি। উন্নত নগরব্যবস্থা, বড় বড় শৈল্পিক স্থাপনা, উন্নত সড়ক যোগাযোগ, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ও অন্যান্য সুবিধা থাকায় এর নগরগুলো ছিল অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর ও সমৃদ্ধ। নির্মাণকৌশল, জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ও ধর্ম চর্চায় তারা অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছিল। কিন্তু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প, বন্যা, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, প্লেগের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিসহ নানা কারণে অগ্রগামী এ সভ্যতাটি বিলুপ্ত হয় বলে ধারনা গবেষকদের। যদিও পরে অনেকে বসতি গড়ে পুনরায় নগরায়ণ করতে চেষ্টা করেছে কিন্তু নানা অসংগতি ও অজানা কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। শুধু ধ্বংসস্তূপকে সঙ্গী করে এ সভ্যতাটি বিশ্বের বুকে ইতিহাস হয়ে রয়েছে।
ভৌগোলিক পটভূমি
মেসোপটেমিয়া প্রাচীন গ্রিক শব্দ। অর্থ ‘দুটি নদীর মধ্যবর্তী ভূমি’। বর্তমান ইরাকের টাইগ্রিস (দাজলা) ও ইউফ্রেটিস (ফোরাত) নদী দুটির মধ্যবর্তী অঞ্চলে গড়ে ওঠায় এমন নামকরণ সভ্যতাটির। নদী দুটি তুরস্কের আনাতোলিয়া (আর্মেনিয়া) পর্বতমালা থেকে দক্ষিণ-পূর্বে প্রবাহিত হয়ে পারস্য উপসাগরে মিশেছে। সভ্যতাটির দক্ষিণ ও পশ্চিমে আরব মরুভূমি ও পূর্বে জাগরাস পার্বত্য অঞ্চল দ্বারা পরিবেষ্টিত। অবস্থানগত বৈশিষ্ট্য ও আরবদের আদিম যাযাবর সংস্কৃতির মিশেলে একটি মিশ্র সভ্যতার ধারা নিয়ে গড়ে উঠেছিল মেসোপটেমিয়া। আসলে পলিসমৃদ্ধ নদী সভ্যতা দুটির বিকাশে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল। নদীর কাছে হওয়ায় এ অঞ্চলের মাটি ছিল খুবই উর্বর, খাল কেটে পানি আনাও সহজ হওয়ায় এ অঞ্চলে প্রচুর ফসল ফলত। তা ছাড়া মাছের সহজ প্রাপ্তির কারণে এখানে খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৬ হাজার বছর থেকেই যাযাবররা এসে সমাবেত হয়। কালক্রমে এরাই মেসোপটেমিয়া সভ্যতার বীজ বপন করে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০-৩০০০ অব্দের মধ্যে মেসোপটেমিয়ায় খুবই উন্নত এক সভ্যতার উšে§ষ ঘটেছিল। তবে আগে এ সভ্যতা ব্যবিলনীয় বা ব্যবিলনীয় আসিরীয় নামে পরিচিত ছিল। মেসোপটেমিয়ার উত্তরাংশের নাম আসিরীয়া ও দক্ষিণাংশের নাম ব্যবিলনীয়া। ব্যবিলনীয়ার দুটি অংশ- দক্ষিণে সুমের ও উত্তরে আক্কাদ। এই অঞ্চল মিশরীয় সভ্যতার থেকে অনেকটাই ভিন্ন ছিল। এ সভ্যতা অনেক উন্নতি লাভ করলেও তা স্থায়ী হয়নি। নদীবিধৌত এবং প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় এটি কালক্রমে বহিঃশত্রুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। অসংখ্য আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে এই সভ্যতায় কয়েকটি সাম্রাজ্যের উন্মেষ ঘটে। ইরাক, সিরিয়ার উত্তরাংশ, তুরস্কের উত্তরাংশ এবং ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের অঞ্চলগুলোই প্রাচীনকালে মেসোপটেমিয়ার অন্তর্গত ছিল বলে ধারনা করা হয়। পরে এখান থেকেই ব্রোঞ্জ যুগে আক্কাদীয়, ব্যবিলনীয়, আসিরীয় ও লৌহ যুগে নব্য-আসিরীয় এবং নব্য-ব্যাবিলনীয় সভ্যতা গড়ে ওঠে।
খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০ সালের দিকে মেসোপটেমিয়া পার্সিয়ানদের নিয়ন্ত্রণেই ছিল কিন্তু পরে এ ভূখণ্ডের আধিপত্য নিয়ে রোমানদের সঙ্গে যুদ্ধ হয় এবং রোমানরা এই অঞ্চল ২৫০ বছরের বেশি শাসন করতে পারেনি। দ্বিতীয় শতকের শুরুর দিকে পার্সিয়ানরা এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত এই অঞ্চল তাদের শাসনেই থাকে, এরপর শুরু হয় মুসলিম শাসনামল। মুসলিম খিলাফত শাসনে এই অঞ্চল পরে ইরাক নামে পরিচিতি লাভ করে।
নগর কাঠামো ও জীবনব্যবস্থা
আদি মেসোপটেমিয়ানরা নগরের প্রাণকেন্দ্রে বাস করত। নগরের অদূরেই ছিল গ্রাম। বড় নগরের ক্ষেত্রে ছোট শহরগুলোও তাদের আওতাধীন থাকত। ছোট শহরে প্রায় ২০ হাজার এবং বড় নগরে ৫০ হাজারের মতো মানুষ বাস করত। তবে ধারণা করা হয়, দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ায় ব্যাবিলনরা সংখ্যায় প্রায় ১ লাখ। প্রতিটি শহরেই মন্দির, ভাস্কর্য, গুদাম এবং মন্দিরকেন্দ্রিক প্রশাসনিক ভবন থাকত। শহরগুলো মাটি ও ইটের তৈরি দেয়ালে পরিবৃত্ত ছিল। এক বা একাধিক প্রশস্ত সড়ক নগরের প্রধান ফটকের সঙ্গে যুক্ত থাকত। ধনীরা ইটের ভবনে, মধ্যবিত্তরা ইট বা মাটির বাড়ি এবং নিচু শ্রেণির মানুষেরা বস্তির মতো এলাকায় একসঙ্গে গাদাগাদি করে বাস করত। খুবই দরিদ্র শ্রেণি যারা শহরের ব্যয় বহনে অক্ষম, তাদের বাস ছিল শহরের বাইরে কুঁড়েঘরে। সমুদ্রের উপকূলে থাকত বিদেশি বণিক, অবশ্য এদের শহরে বাস করার অনুমতিও ছিল না।
বসতবাড়ি
নগর গড়ে ওঠার আগে সুমেরিয়ানরা গোলাকার কুঁড়েঘরে থাকত। নগর যুগে আবাসিক ভবনগুলো ছোট ছোট ঘরে বিভক্ত ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা পরিবর্তিত হয়ে চারকোণা রূপ নেয়। বাড়ির উঠানও চারকোণা। জনপদটি প্রচণ্ড গরম হওয়ায় বাড়িগুলোতে রাখা হতো ইনার কোট। উঠানসমৃদ্ধ এমন বাড়ি এ এলাকার প্রাচীন শহরগুলোতে এখনো দেখা মেলে। স্থাপনার ছাদ অনেকটাই বাড়তি রাখা হতো যাতে এতে ঘরে যথেষ্ঠ আলো ও বাতাস দুই-ই প্রবেশ করতে পারে। ভবনের দেয়ালের ওপরের অংশ কাদা ও ইট দিয়ে এবং নিচের অংশ পোড়ানো ইট, কাদা ও সিমেন্ট দিয়ে নির্মাণ করা হতো। বাইরের তাপমাত্রা থেকে বাঁচতে দেয়াল ২ দশমিক ৫ মিটার পর্যন্ত পুরু করা হতো। অধিকাংশ বাড়ির দেয়ালে সাদা রংও করা হতো। মেঝে তৈরিতে ব্যবহৃত হতো পাথরবিশিষ্ট মাটি। কোথাও কোথাও আবার প্লাস্টারও করা হতো। বাড়িগুলোর ছাদের নিচে অনেকটা ফলস সিলিংয়ের আদলে কাঠের পাটাতন সংযোজন করা হতো এবং তা মাটি দিয়ে লেপে দেওয়া হতো অতিরিক্ত তাপদাহ থেকে রক্ষা পেতে। ভবনের দরজাগুলো তৈরি হতো কাঠে এবং দরজার ফ্রেমে লাল রঙের বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিকৃতি আঁকা থাকত। জানালায় শাটার ব্যবহার করা হতো, রোদ থেকে বাঁচতে। প্রতিটি ঘরের জানালার পাল্লা ছিল ঘরের ভেতরমুখী।
শয়ন, রান্না, গুদাম ও অভ্যর্থনার জন্য আলাদা আলাদা ইউনিট নির্মাণ করা হতো বাড়িতে। বাড়ির দ্বিতীয় তলায় রাখা হতো পরিবারের সদস্যদের থাকার ঘর, নিচ তলায় থাকত চাকর ও অতিথিদের ঘর। বাড়ির পেছনে রাখা হতো চ্যাপেল এবং ছাদে ইটে তৈরি একটি বেদী থাকত তাতে ব্যক্তিগত পূজার জন্য দেব-দেবীর মূর্তি বসানো হতো। কিছু বাড়িতে পারিবারিক সমাধিকেন্দ্র থাকত। বাড়ির আকার এবং ডিজাইন বৈচিত্র্য মালিকের সামাজিক অবস্থান প্রকাশ করত।
স্থাপনা ও ভাস্কর্য
মেসোপটেমিয়ানদের মধ্যে সুমেরিয়ান স্থাপত্যকে বলা হয় সভ্যতার সূচনা। প্রথম দিকে নির্মিত হয় চোখ ধাঁধানো সব মন্দির। সুমেরিয়ান স্থাপত্যে স্থাপনা নকশা ও ভবন ডিজাইনের প্রমাণ মেলে প্রিন্স গাডেয়ার (Prince Gudea) ভাস্কর্যে যেখানে তাঁর হাঁটুর ওপর রাখা একটি ভূমি পরিকল্পনার নকশা দেখা যায়। কিছু মাটির তৈরি টেবিলেও নকশা চিত্র পাওয়া যায়। এসব থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় কোনো মন্দির বা ভবন নির্মাণের আগে তারা প্রোটোটাইপ ডিজাইন করত। প্রতিটি নগরেই থাকত মন্দির। মন্দিরই ছিল সবচেয়ে বড় স্থাপত্য। জিগগুরাট ছিল তাদের সবচে পবিত্র মন্দির। মন্দিরগুলো ডিজাইন করা হতো আয়তকার ফর্মে। প্রথম দিকে এর প্ল্যাটফর্মগুলো মাটির এবং ছোট আকারে ছিল কিন্তু সময়ের বিবর্তনে তা অনেক উঁচু এবং অতিকায় হয়ে ওঠে, যা পরে ক্ল্যাসিক্যাল মেসোপটেমিয়ান জিগুরাট হয়ে ওঠে।
মন্দিরগুলো নির্মাণ করা হতো পাহাড়ের আদলে অর্থাৎ নিচে প্রশস্ত এবং ওপরে সরু। কারণ, মন্দিরকে বিবেচনা করা হতো পৃথিবী ও স্বর্গের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনকারী মহাপবিত্র স্থান হিসেবে, যেখানে দেবতা এবং মানুষ মিলিত হতে পারে। এই মন্দিরগুলোর প্রতিটিতেই ছিল ইটের তৈরি অনেক ধাপবিশিষ্ট সিঁড়ি, যা মিলত সমতল ছাদের সঙ্গে। মন্দির তৈরি করতে অত্যন্ত সূক্ষ¥ নকশা করতে হতো, যার দায়িত্বে থাকত দক্ষ স্থপতি এবং নির্মাণকাজ তদারকি করতেন অভিজ্ঞ প্রকৌশলী। মন্দিরগুলো দেখে সহজেই অনুমান করা যায় এতে অনেক সূক্ষ¥ গাণিতিক হিসাব ছিল। এ ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভবনে রাখা হতো অনেক কলাম। দেয়ালে ড্রেনের অস্তিত্ব পাওয়া যায় যেন পানিতে দেয়ালের ক্ষতি না হয়। তবে দরজা ও জানালা তৈরি তাদের জন্য ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে তাঁরা সমস্যাটিকে পোস্ট ও লিন্টেল পদ্ধতিতে সমাধান করতো। দুটি উল্লম্ব কলাম বিমকে সাপোর্ট দিত। বিম হিসেবে ব্যবহৃত হতো বড় কাঠের টুকরো অথবা পাথরের চায়। দরজায় আর্চের ব্যবহারও লক্ষণীয়। সেখানে কোরবেল ও স্ট্যান্ডার্ড এ দুই ধরনের আর্চ করা হতো।
ঈশ্বরের ঘর বলে মন্দিরকে সব সময় মেরামত ও যত্নআত্তির ওপর রাখা হতো। যখন অনেক বেশি মেরামতের দরকার হতো তখন তা ভেঙে আরেকটি নতুন মন্দির নির্মাণ করা হতো। মন্দির দেয়ালে মানুষ, প্রাণী ও জিওম্যাট্রিক প্রতিকৃতি অঙ্কণ করা হতো। মূল মন্দির ভবনকে ঘিরে থাকত একটি কমপ্লেক্স, কোর্ট ইয়ার্ড, সিরিনস, যাজকদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চেম্বার, সমাধিস্তম্ভ, প্রশাসনিক ভবন, ওয়ার্কশপ, শস্য রাখার গুদাম ঘর প্রভৃতি। সব ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান মন্দির প্রাঙ্গণেই হতো। ধর্ম চর্চার পাশাপাশি এই মন্দিরই ছিল মেসোপটেমিয়ানদের কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক কার্যালয়। নগরের মোট উর্বর ভূমির ফসলের তিন ভাগের এক ভাগ ঈশ্বরের প্রাপ্য হিসেবে মন্দিরে জমা দেওয়ার রেওয়াজ ছিল।
ভাস্কর্য নির্মাণেও সুমেরীয়রা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। মানুষ্য ভাস্কর্যে বড় বড় চোখ ও সিলিন্ডার আকৃতির দেহ দেখা যায়। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দে মার্বেল পাথরে নির্মিত নারীমূর্তিটি তেমনই এক অসম্ভব সুন্দর অভিব্যক্তি। এর ঠোঁট ও চিবুকের স্নিগ্ধ সৌন্দর্য চোখে পড়ে। সুমেরীয়ান ভাস্কর্যের মধ্যে অন্যতম টেল-আসমারে আবুর মন্দির থেকে উক্ত পূজারিদের মূর্তিগুলো। মূর্তিগুলোর সবকটি উপাসনার ভঙ্গিতে দণ্ডায়মান। এগুলো ঘাঘরাসদৃশ পোশাক পরিহিত। পুরুষ মূর্তির লম্বা ও কুঞ্চিত চুল ও দাড়ি সম্পূর্ণ কামানো। এ সময়ের অধিকাংশ ভাস্কর্যই ছিল রিলিফ ভাস্কর্য। এ সময়ের ভাস্কর্যগুলোতে হিংস্রভাব প্রকাশ পেয়েছে। মানুষের সমস্ত সুকোমল বৃত্তিকে নির্বাসিত করে আসিরীয় সম্রাটগণ রাক্ষুসে বা রক্তলোলুপ ভাবটিকে তীব্রভাবে প্রকাশ করার জন্য যেন শিল্পীদের নিযুক্ত করেছিল। ভাস্কর্যগুলোর অভিব্যক্তিতে কঠোর ও অনমনীয় ভাব। এসব ভাস্কর্যের অভিব্যক্তিতে প্রকাশ পেয়েছে উদ্ধত প্রকৃতির শাসকের ক্ষমাহীন বা নির্মম মনোভাব।
আসিরীয়ান স্থাপত্য
অ্যাসিরীয়ানরা সভ্যতা গড়ে উত্তর মেসোপটেমিয়ায় টাইগ্রিস নদীর তীরকে অ্যাসিরীয়া নগর বলে। তাদের স্থাপত্য নকশা সুমেরিয়ান ও ব্যবিলনিয়ানদের সঙ্গে অনেক সদৃশ থাকলেও কিছু পরিবর্তন লক্ষণীয়। তারা তাদের ভবনগুলোকে উজ্জ্বল রঙের ইট ও বিভিন্ন ভাস্কর্য দিয়ে সাজাত। তারা রোদে পোড়া ইট দিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করত। কিছু ভিত্তি ও নকশার কাজে পাথর ব্যবহৃত হতো। প্রতিটি ভবনের ছিল ফ্ল্যাট সিলিং। কিছু ঘরের উচ্চতা ৯ মিটার পর্যন্ত পৌঁছাত। ব্যাবিলনিয়ান মন্দিরগুলোর সিঁড়ি তিন স্তরে একবারে চূড়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু আসিরীয়ানদের একটি পেঁচানো সিড়ি উঁচু তলা পর্যন্ত থাকত। আসিরিয়ান শহর ও জনপদেও প্রধান ফটক বেশ উঁচু স্থানে থাকত যেন অনেক দূর থেকে আগন্তুকের অস্তিস্ত বোঝা যায়। প্রাসাদের দেয়াল রং করাও থাকত।
আসিরীয়ান ভাস্কর্যের অন্যতম নিদর্শন মেলে খ্রিষ্টপূর্ব ৭২০ অব্দে। এ সময়ে নির্মিত ভাস্কর্য লামাস্সুতে অদ্ভুত আকৃতি লক্ষণীয়। এর মুখ মানুষের মতো এবং দেহ সিংহের মতো। পিঠের ওপরে ঈগলের পাখাযুক্ত। ‘ডাইং লায়নস’ নামক ভাস্কর্যটিতে বাণবিদ্ধ মরণোš§ুখ সিংহী অঙ্কিত রয়েছে। এর তুলনা বিশ্বের শিল্পভান্ডারে দুর্লভ। তিনটি বাণ সিংহীর পৃষ্ঠদেশ ভেদ করে চলে গেছে। তবু সে দেহের সমস্তভার ন্যস্ত করে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। এখানে আহত সিংহীর বাঁচার জন্য চোখে ফুটে উঠেছে তার অসহায়ত্ব। আসিরীয়রা ছিল মহাপরাক্রান্ত এবং রণকৌশলে নিপুণ। আসিরীয় সম্রাটগণ যুদ্ধক্ষেত্র এবং শিকারের কাহিনিকে তাদের কলাকৌশল এবং বীরত্বের কাহিনিকে প্রাসাদের গায়ে ভাস্কর্য ও চিত্রকলার মাধ্যমে রূপ দিতে শিল্পীদের নির্দেশ দেন। তাই যুদ্ধক্ষেত্র এবং শিকারের দৃশ্যপট আসিরীয় শিল্পের মূল উপজীব্য।
নির্মাণ উপকরণ
মেসোপটেমিয়ার নগরগুলো বিশেষ করে সুমেরিয়ান শহর পুরোটাই ইটের তৈরি। প্রথম দিকের ইটগুলো ছিল আকারে বড় ও সরু। খ্রিষ্টপূর্ব ৪ হাজার থেকে ৩ হাজার বছর আগের ইটগুলোর আকার ছিল আয়তকার। এ ছাড়া এল আকৃতির ইটও দেখা মেলে। তবে যুগের বিবর্তনে ইটের আকার পরিবর্তিত হতে থাকে। প্রতিটি যুগে এর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের ইটের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বাঁকানো অসমতল ইটও লক্ষণীয়। আক্কাদিয়ান শাসনামলে বর্গাকার ইটেরও ব্যবহার মেলে।
ইট উদ্ভাবনের আগে মেসোপটেমিয়ানরা জলাভূমির আগাছা ও ঘাস দিয়ে তৈরি কুঁড়েঘরে বাস করত। পরে তারা এঁটেল মাটি দিয়ে ইট তৈরিতে সক্ষম হয়। স্থাপনায় অল্পসংখ্যক পাথর ব্যবহৃত হলেও তার হার অত্যন্ত নগণ্য। ব্যবহৃত পাথর দূরবর্তী বিভিন্ন মৃত আগ্নেয়গিরি থেকে সংগ্রহ করা হতো। তবে তা ছিল অত্যন্ত ঝামেলাপূর্ণ। এ জন্য তারা পাথরের পরিবর্তে পলিমাটি রোদে শুকিয়ে অথবা আগুনে পুড়িয়ে ইট তৈরি করে ব্যবহার করতেই স্বচ্ছন্দ্যবোধ করত। তবে কাঠের অভাবে বেশি ইট পোড়ানো যেত না বলে রোদে পোড়ানো ইটের ব্যবহারই ছিল বেশি। রোদে পোড়া ইটগুলো বেশ শক্তপোক্ত হতো। কারণ, বেশির ভাগ ইট তৈরি হতো গ্রীষ্মে, যখন তাপমাত্রা পৌঁছে যেত ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ইটের শক্তিমাত্রা ও স্থায়িত্ব বাড়াতে মাটির সঙ্গে খড় মেশাত তারা। পরিবারের সদস্যরা মিলেই ইট ও ঘর তৈরি করে ফেলতে পারত। ইটগুলো জোড়া লাগাতে ও শূন্যস্থান পূরণে মর্টার হিসেবে মাটিই ব্যবহার করত। রুক্ষ আবহাওয়া থেকে স্থাপনাকে বাঁচাতে প্লাস্টার কোটিং করা হতো এবং বিটুমিন দিয়েও লেপে দেওয়া হতো। নদীবিধৌত এলাকা হওয়ায় এই উপকরণগুলো পানি ও আর্দ্রতারোধী হিসেবে কাজ করত। ভবনগুলো মাটিতে তৈরি হওয়ায় ভালো ইনসুলেটরের কাজ করত।
আসিরীয় শহরগুলোর স্থাপনা, মন্দির ও ভাস্কর্যের নির্মাণ উপকরণ হিসেবে লাইমস্টোন এবং অ্যালবাস্টারের ব্যবহারও লক্ষ করা যায়। অ্যালবাস্টার পাথরকে আসিরীয়াতে ‘মোসুল মার্বেল’ নামে পরিচিত। এ ছাড়া সিমেন্ট এবং লাইমের ব্যবহারও শুরু হয়। দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ান পাথর এবং কাঠের ব্যবহার ছিল খুবই কম। খুব প্রয়োজন হলে উত্তর এবং পুবের চিরহরিৎ পার্বত্য অঞ্চল এবং লেবানন থেকে কাঠ সংগ্রহ করা হতো। তবে কাঠের পরিবর্তে তারা নদীতীরে জন্মানো নলখাগড়া গুচ্ছ করে ব্যবহার করত বেশি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
মেসোপটেমিয়ানরা গণিত শাস্ত্রের উদ্ভাবন ও উন্নতিসাধন করতে সক্ষম হয়। তাদের সংখ্যাগুলো ষষ্ঠিক বা ষাটকেন্দ্রিক ছিল। সেখান থেকেই এক ঘণ্টায় ষাট মিনিট ও এক মিনিটে ষাট সেকেন্ডের হিসাব আসে। এ ছাড়া তারাই প্রথম বছরকে ১২ মাসে এবং এক মাসকে ৩০ দিনে ভাগ করে হিসাব করা শুরু করে। ধারণা করা হয় যে তারাই প্রথম ১২টি রাশিচক্র এবং জলঘড়ি আবিষ্কার করে। প্রথম দিকে তাদের ধারণা ছিল পৃথিবীটা চ্যাপ্টা চাকতির মতো কিন্তু পরে তাদের মধ্যে গোল পৃথিবীর ধারণা জন্মায় এবং তারাই প্রথম পৃথিবীকে ৩৬০ ডিগ্রিতে ভাগ করে। ধাতুর ব্যবহারের ক্ষেত্রে মেসোপটেমীয়রা বেশ উন্নত ছিল। তারা তামা, সোনা, ব্রোঞ্জ ও পরে লোহার ব্যবহার আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়। ফলে কৃষিকাজ ও হস্তশিল্পে ব্যাপক বিকাশ ঘটে। বিভিন্ন মন্দির এবং জিগুরাট থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন তৈজসপত্র থেকে প্রমাণ মেলে তারাই তামা ও টিনের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ব্রোঞ্জ আবিষ্কার করে। এ ছাড়া খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ১৬০০ থেকে মেসোপটেমিয়ায় কাচের ব্যবহার শুরু হয় বলে ধারণা করা হয়।
কৃষি
সময়কাল বিচারে মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীরা ছিল অতি উন্নত চিন্তার কৃষিবিদ। দুটি নদী থেকে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যেত বলে তারা প্রচুর ফসল উৎপাদন করতে পারত। এসব ফসলের মধ্যে বার্লি, গম, পেঁয়াজ, আঙুর, আপেল, খেজুর ছিল অন্যতম। তাদের প্রধান ফসল ছিল গম। খেজুরগাছকে তারা অভিহিত করত ‘জীবনদায়িনী বৃক্ষ’ বলে। খেজুর থেকে তারা তৈরি করত ময়দা ও মধু। তারা বিয়ার এবং মদও তৈরি করত। এ ছাড়া করত পশু পালন, ধরত মাছ। এ সভ্যতাতে প্রথম জমিকর্ষণের কাজে কোদালের ব্যবহার শুরু হয়।
মেসোপটেমিয়ানরাই প্রথম মানুষ যারা বিশাল পরিসরে ইন্টিগ্রেটেড সিস্টেমের মাধ্যমে ডিকস, রিজার্ভার, খাল, ড্রেন ইত্যাদির ব্যবহারে পানি সংগ্রহ করত। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত নদী দুটি থেকে বন্যা হয়ে চরাচর প্লাবিত করার মাধ্যমে মাটিকে উর্বর করত। দুই নদীর মাঝে যে জলাভূমি ছিল তা খাল হিসেবে ফসলে সেচ দেওয়া এমনকি যাতায়াতের পথ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
ধর্মীয় ব্যবস্থা
মেসোপটেমিয়া সভ্যতার মানুষ ছিল অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। তারা বহু ঈশ্বরবাদে বিশ্বাস করত। এ সভ্যতায় বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তিপূজার প্রমাণ পাওয়া যায়। এসবের মধ্যে ২ হাজারেরও বেশি দেব-দেবী চিহ্নিত করা গেছে। তবে সময়ের ধারার সঙ্গে কিছু কিছু গোষ্ঠীর ধর্মমত পাল্টাতে থাকে এবং প্রধান দেবতার পরিবর্তন ঘটে। ভালোবাসা, ঘৃণা, সমুদ্র, পাপ, চাঁদ সবকিছুরই ভিন্ন ভিন্ন দেবতা ছিল। সুমেরিয়ানদের প্রধান দেবতা ছিলেন এনলিন; অন্তরিক্ষ দেবতা। ব্যবিলনিয়ানরা পূজা করত মারডাককে এবং আশুর ছিলেন আশুরিয়ানদের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেবতা। প্রতিটি জিগুরাট ও মন্দিরেই বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের বসার ব্যবস্থা ছিল। মন্দিরে তারা বিভিন্ন বস্তু উৎসর্গ করত। মেসোপটেমিয়ানরা যার যার নিজ বাড়িতে দেবতাদের পূজা দিত। এতে এই সভ্যতার সর্বজনীন ধর্মব্যবস্থার পরিচয় পাওয়া যায়। তাদের বিশ্বাস ছিল পৃথিবী একটি বিশাল ফাঁকবিশিষ্ট স্থানে অবস্থিত একটি গোলাকার চাকতি, যার ওপরে বা আকাশে স্বর্গ এবং মাটির নিচে নরক। পানি সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল, পৃথিবী জল দিয়েই তৈরি এবং এর চারপাশজুড়েই রয়েছে পানি। তাদের ঝুলিতে ছিল সমৃদ্ধ মিথ ও ঐতিহাসিক রূপকথার বিপুল সম্ভার।
ভাষা ও সাহিত্য
মেসোপটেমিয়ানরা যে ভাষায় কথা বলত ইতিহাসবিদেরা তাকে সেমিটিক ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের এই ভাষায় দৈনন্দিন ভাবের আদান-প্রদানসহ বিজ্ঞানচর্চা, প্রশাসনিক কাজে এবং ধর্ম-কর্ম পরিচালনা করত। তাদের প্রধান কৃতিত্ব হলো প্রয়োজনীয় ভাব বা বার্তা বোঝানোর জন্য আদিম লেখন পদ্ধতির উদ্ভাবন। প্রথম দিকে এই ভাষা কিছু অর্থোবোধক ছবির মাধ্যমে প্রকাশ করা হতো। চিত্রধর্মী এই পদ্ধতিকে পিকটোগ্রাফি বলা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব নবম থেকে সপ্তম শতাব্দীর নব্য আসিরীয় সভ্যতার একটি মূর্তি পাওয়া যায়, যেখানে একটি সিংহ একটি মানুষের ঘাড়ে কামড় দিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এই পিকটোগ্রাফি ছিল তাদের লিখিত মত প্রকাশের প্রধান মাধ্যম।
মেসোপটেমিয়ানরা প্রধানত কাদামাটির ওপর নলখাগড়ার সূচালো মাথা দিয়ে লিখে শুকিয়ে নিত। ধীরে ধীরে তা বর্ণমালায় রূপ নেয়। আনুমানিক ৩৪০০ খ্রিষ্টপূর্ব অব্দের এই বর্ণমালার মাধ্যমে লিখিত দলিল পাওয়া যায়। সেই সময়ের লেখালেখি শুধু হিসাবনিকাশ সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হতো। আধুনিক যে দপ্তরীয় দলিল দেখতে পাওয়া যায় তা সুমেরীয়দের মধ্যেই প্রথম দেখা যায়।
সাহিত্যের জন্য মেসোপটেমিয়ানরা যে ভাষা ব্যবহার করত তাকে বিজ্ঞানীরা হেমেটিক ভাষা বলছেন। প্রখ্যাত লেখক হোমার তাঁর ‘ইলিয়াড’ এবং ‘ওডেসি’ লেখারও প্রায় এক হাজার বছর পূর্বে সুমেরীয়রা তাদের নিজস্ব ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছিল। এর নাম ছিল গিলগামেশ। এই সাহিত্য থেকে জানা যায় যে এখানকার লোকজন ছিল অত্যন্ত কল্পনাপ্রবণ। ব্যাবিলনীয় শাসনামলে তাদের লেখালেখিতে পারলৌকিক চিন্তার প্রভাব লক্ষণীয়। বস্তুত এগুলো ছিল ধর্মাশ্রয়ী সাহিত্যচিন্তা।
আর্থিক ও সমাজব্যবস্থা
মেসোপটেমিয়ানদের ছিল সমৃৃদ্ধ ও স্বনির্ভও এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। তবে এসব নিয়ন্ত্রণ থাকত মন্দির কর্তৃপক্ষের হাতে। কারুশিল্পী, কামার, কুমোর, তন্তু বয়ানকারী, তাঁতি, কাঠমিস্ত্রিসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ সমাজের অন্তর্গত হলেও সবাই ছিল মন্দিরের সেবক। সমাজের উঁচু স্তরের মধ্যে ছিল সম্ভ্রান্ত ধনী, যাজক, সরকারি কর্মকর্তা ও যোদ্ধা। অধিকাংশ মানুষই ছিল মধ্যবিত্ত, যাদের মধ্যে কৃষক, ব্যবসায়ী ও কারুশিল্পী অন্যতম। নিচুস্তরের মধ্যে ছিল দিনমজুর, দাস ও ক্ষেতমজুর। সমাজে বহুবিবাহ প্রথার চল ছিল না, তবে কতিপয় ধনী ব্যক্তিরা একাধিক বিয়ে করত। সমাজে মেয়েদের সম্মানের চোখে দেখা হতো। ছেলে-মেয়ে উভয়ই সম্পদের সমান ভাগ পেত। উদ্বৃত্ত ফসল মন্দিরে জমা দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। কৃষকদের মধ্যে কে কতটা ফসল মন্দিরে জমা দিল এই হিসাব রাখত পুরোহিতরা।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৭তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৭।