ভূগর্ভস্থ পানির সংকট মেটাতে

পানি অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। একসময় নদী-নালা, পুকুর, খাল ও জলাধারের পানি পান করতে, গোসল, কৃষিতে সেচসহ সর্বত্রই ব্যবহৃত হতো। কিন্তু ব্যাপক নদীদূষণ, ফসলে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার, ইঞ্জিনচালিত নৌযানের পোড়া তেল, কলকারখানার বর্জ্য ও ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশে ভূপৃষ্ঠের জলরাশির ব্যবহার দিন দিন কমছে। এমনকি অসংখ্য উৎসের পানি পরিশোধন করেও ব্যবহার করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। আর সে কারণেই দৈনন্দিন প্রয়োজনে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা বাড়ছে। এখন চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পানিই উত্তোলন করা হচ্ছে ভূগর্ভস্থ থেকে। অপরিকল্পিতভাবে গভীর ও অগভীর নলকূপ দ্বারা এই পানি উত্তোলনের ফলে দেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছে আশঙ্কাজনকভাবে। সবচেয়ে দ্রুত নামছে রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। ফলে ভয়াবহ এক পরিবেশ বিপর্যয়ের দোরগোড়ায় আমরা। সুপেয় পানির সংকট ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

ভূগর্ভস্থ পানি (Groundwater) ভূপৃষ্ঠের নিচে জমে থাকা বিশাল পানির আধার। এই পানি সঞ্চিত থাকে মাটি, শিলাস্তর ও অন্যান্য খনিজ স্তরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপরের স্তরকে বলে        ভূ-জলপৃষ্ঠ (Water Table)। পৃথিবীর পানযোগ্য পানি সম্পদের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে ভূগর্ভ থেকে, যা আহরণযোগ্য স্বাদু পানির প্রায় ৯৭ শতাংশ। নদী জলাশয়ে এই পানির পরিমাণ ১ শতাংশেরও কম। বাকি ৬৯ শতাংশ সঞ্চিত রয়েছে হিমবাহ আকারে। ভূগর্ভস্থ পানির এই স্তরকে বলে অ্যাক্যুইফার (Aquifer)। ভূগর্ভস্থ পানি একদিকে যেমন বিশুদ্ধতার দিক থেকে খুবই ভাল, অন্যদিকে খনিজ ও রাসায়নিক গুণেও মানসম্পন্ন। আর এই পানি কোনো পরিশোধন ছাড়াই কূপ, নলকূপ ও গভীর নলকূপের মাধ্যমে সহজেই উত্তোলন করা যায়।

ভূগর্ভ থেকে নানা উপায়ে পানি উত্তোলন করা হলেও বিভিন্নভাবে তা আবার পূর্ণ হয়ে যায়। সাধারণত তা হয় দুই উপায়ে। এক বৃষ্টির পানি, অন্যটি ভূ-উপরিভাগের জমে থাকা (পুকুর, খাল, নদী প্রভৃতি) পানি চুঁইয়ে চুঁইয়ে ভূগর্ভে প্রবেশের মাধ্যমে। এই পানি ভূ-অভ্যন্তরে প্রবেশকালীন পানিরাশির এক দীর্ঘ ও মন্থর যাত্রা শুরু হয়, যার গতি দিনে মাত্র কয়েক মিলিমিটার থেকে কয়েক মিটার পর্যন্ত হতে পারে। ভূ-জলপৃষ্ঠের ওপরের তলভাগকে অপরিপৃক্ত অঞ্চল (Unsaturated Zone) ও নিচের তলভাগকে পরিপৃক্ত অঞ্চল (Saturated Zone) বলা হয়। অপরিপৃক্ত অঞ্চলের মৃত্তিকা ও শিলা পানির প্রধান প্রধান অপদ্রব্য পরিশোধন করে। পরিপৃক্ত অঞ্চলের শিলা ও মৃত্তিকা তা আরও বেশি পরিমাণে পরিশ্রুত ও বিশুদ্ধ করে তোলে। এই প্রক্রিয়ায় পানি জীবাণু ও দূষণমুক্ত হয়। সাধারণত বর্ষা মৌসুমে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভূপৃষ্ঠের খুব কাছে উঠে আসে। আবার এপ্রিল মাসে প্রচণ্ড খরার সময় পানির স্তর সবচেয়ে নিচে নেমে যায়।

বাংলাদেশে প্রায় ৯৭ শতাংশ গ্রামের মানুষ খাবার পানির জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। শহর অঞ্চলেও পানির প্রধান উৎস ভূগর্ভ। রাজধানীর মোট পানি সরবরাহের ৮৭ শতাংশের বেশি আসে ভূগর্ভস্থ পানি থেকে, বাকিটা বিভিন্ন নদী থেকে সংগ্রহ করে পরিশোধন করা। বাংলাদেশে তুলনামূলক কম গভীরতায় ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া যায়। প্লাবনভূমি অঞ্চলে নদীবাহিত অবক্ষেপের মধ্যে ভূগর্ভস্থ জলস্তর গঠিত হয়েছে। উচ্চতর সোপানসমূহে (বরেন্দ্র ও মধুপুর গড় অঞ্চলে) প্লাইস্টোসিন যুগের ডুপিটিলা বালু ভূগর্ভস্থ জলস্তর হিসেবে কাজ করে। পাহাড়ি অঞ্চলে প্লায়োসিন টিপাম বালু জলস্তরের জন্য উপযুক্ত। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই ভূজলপৃষ্ঠ, ভূপৃষ্ঠের খুব কাছে অবস্থান করে এবং বার্ষিক আগমন ও নির্গমন ধারায় ওঠানামা করে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) তথ্যমতে, দেশে প্রায় ৫০ লাখ নলকূপ রয়েছে। এই নলকূপসমূহ থেকে মাত্রাতিরিক্ত পানি তোলা হয়। ফলে আমাদের পাতাল পানি বা গ্রাউন্ড ওয়াটারের লেভেল প্রতিবছর গড়ে প্রায় চার-পাঁচ মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। জাতিসংঘ, ওয়াটার এইড, ঢাকা ওয়াসা এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানিসম্পদ প্রকৌশল বিভাগের একাধিক জরিপ ও গবেষণায় এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

সত্তরের দশকের শুরুতে কৃষিকাজের জন্য দেশে প্রথম ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার শুরু হয়। আশির দশকে তা ব্যাপকতা পায়। এরপর ক্রমেই এই ব্যবহার বেড়েছে, যা আর নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। গত চার দশকে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়েছে প্রায় শতভাগ। কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যাপকভাবে ব্যবহারে ক্রমেই নিচে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। গত কয়েক বছরের সেচ মৌসুমে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সম্প্রতি যা রূপ নিয়েছে ক্ষরায়। সেচকাজে ব্যবহৃত শ্যালো পাম্প ও হস্তচালিত নলকূপগুলোতে ঠিকমতো পানি উঠছে না। অকেজো হয়ে পড়েছে হস্তচালিত নলকূপ। পানি কম ওঠায় আরও গভীরে নামানো হচ্ছে শ্যালো পাম্পের পাইপ। পানির স্তর ক্রমাগত নিম্নমুখী হওয়ায় কৃষি উৎপাদন মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে। লাখ লাখ হেক্টর জমির আবাদ সেচের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে কৃষিকাজে ব্যবহৃত বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প, বিএডিসি ও পানাসি প্রকল্পের হাজার হাজার গভীর নলকূপের পাশাপাশি লাখ লাখ কৃষক ব্যক্তিগতভাবে গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি সেচকাজে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) এক গবেষণায় দেখা যায়, ষাটের দশকে ৫০ ফুট নিচ থেকে গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি ওঠানো যেত কিন্তু এখন ১৫০ ফুটের অধিক নিচ থেকে পানি তুলতে হয়। সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলে কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার হচ্ছে ৯৮ শতাংশ। আর ভূপৃষ্ঠের পানি মাত্র ২ শতাংশ। এভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যাপক ব্যবহারে উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশে কৃষি উৎপাদান মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে।

কৃষিবিদ, কৃষিবিজ্ঞানী ও গবেষকদের বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে বছরে পর বছর ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করায় জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। পানি, সার ও কীটনাশক বেশি লাগায় বেড়ে যাচ্ছে উৎপাদন ব্যয়। এতে প্রতিবছর কৃষকের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। বোরো মৌসুমে এক একর জমিতে ৪০ থেকে ৬০ লাখ লিটার পানির প্রয়োজন। দেশে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ জমিতে ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে সেচকাজ করা হয়। বাকি ১০ লাখ হেক্টর জমিতে ভূ-উপরিভাগের পানি ব্যবহার করা হয়। রোপা আমন মৌসুমে অধিকাংশ জমির সেচকাজ বৃষ্টি, বর্ষা ও নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল হলেও মৌসুমের শুরুতে অধিকাংশ জমিতে গভীর ও অগভীর নলকূপের পানি দিয়েই সেচ দেওয়া হয়। সাধারণত অন্য মৌসুমে পানির খরচ হয় একরপ্রতি প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। আর তা শুষ্ক মৌসুমে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকায়।

ঢাকা ওয়াসার হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা শহরে প্রতিদিন ২ দশমিক ৪২ বিলিয়ন লিটার পানির প্রয়োজন। অধিকাংশ পানির চাহিদা ভূগর্ভস্থ পানি হ্রাসকরণের মাধ্যমে পূরণ করা হয় এবং হিসাব অনুযায়ী যা প্রায় ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশ। বাকি ২১ দশমিক ০৯ শতাংশ পানির চাহিদা ভূপৃষ্ঠস্থ পানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। ফলে শহরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর এক থেকে তিন মিটার (৩ দশমিক ২৮ থেকে ৯ দশমিক ৪৮ ফুট) নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামার প্রক্রিয়া অনবরত চলতে থাকলে একটা সময় লবণাক্ত পানি ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রবেশের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির গুণগত মানে প্রকট সমস্যার সৃষ্টি হবে। ঢাকা ওয়াসা এবং ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) তথ্যমতে, ঢাকা শহর ও এর আশপাশের এলাকায় ৩০০ মিটারের মধ্যে ভূগর্ভস্থ জলাধারের তিনটি স্তর রয়েছে। সেগুলো-

১.     আপার ডুপিটিলা অ্যাক্যুইফার-১, পুরুত্ব গড়ে ৬৯ মিটার

২.    আপার ডুপিটিলা অ্যাক্যুইফার-২, পুরুত্ব গড়ে ৩২ মিটার

৩.    লোয়ার ডুপিটিলা অ্যাক্যুইফার-৩, পুরুত্ব ৯৩ মিটার।

প্রথম স্তরের (ডুপিটিলা অ্যাক্যুইফার-১) পানি ৭০ মিটার নিচে নেমে গেছে। ফলে এ জলাধারের অর্ধেক শুষ্ক অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে ঢাকার পানির চাহিদা প্রধানত মেটানো হচ্ছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তর থেকে উত্তোলন করে।

সম্প্রতি দেশি-বিদেশি পানি বিজ্ঞানী ও গবেষকগণ ঢাকার কাছাকাছি বেশ কয়েকটি এলাকার ভূগর্ভস্থ শিলা সংগ্রহ করেছেন। বিভিন্ন শিলাস্তর গঠনকারী অ্যাক্যুইফার বিশ্লেষণ থেকে প্রমাণিত হয়েছে অতিমাত্রায় পানি উত্তোলনের কারণে ঢাকার আশপাশের এলাকায় পানির স্তর দ্রুত নিচে নামছে এবং এর ফলে অ্যাক্যুইফারের গভীর স্তরে ওপরের স্তর থেকে দূষিত পানি প্রবেশ করছে। এ ছাড়া একাধিক জরিপ থেকে স্পষ্ট, প্রতিবছর যে পরিমাণ পানি ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে, সে পরিমাণ পানি ভূগর্ভে রিচার্জ হচ্ছে না। গবেষণায় আরও দেখানো হয়েছে, সাধারণত মাটির নিচ থেকে যে পানি ওঠানো হয় তা নদী, খাল, বিল ও জলাধার থেকে তৈরি হওয়া। পানি ওঠালেও প্রাকৃতিকভাবেই আবার তা পূর্ণ হয়ে যায় কিন্তু সম্প্রতি জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে এবং মাত্রাতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে প্রয়োজনীয় পানি আর ভূগর্ভে প্রবেশ করছে না। এর অন্যতম কারণ-

  • বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়া
  • শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই উত্তরাঞ্চলের নদ-নদী ও খাল-বিলগুলোতে পানি প্রবাহ কমে যাওয়া
  • বোরো মৌসুমে প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে পানি সেচের জন্য ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন
  • পানির স্তরের বিশ্লেষণ না করে বেসরকারিভাবে এবং ওয়াসার বিক্ষিপ্তভাবে গভীর নলকূপ বসিয়ে পানি উত্তোলন
  • প্রাকৃতিকভাবে নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয় পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া
  • শহরাঞ্চলে উন্মুক্তস্থান ও জলাধার ভরাট করে অবকাঠামো নির্মাণসহ নানা কারণ।

জলাভূমি শহুরে জীবনে ফুসফুসস্বরূপ। জলাভূমি ভরাট করে অবকাঠামো নির্মাণ করায় নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। নগরীর অধিকাংশ এলাকা দখল করে আছে ভবন ও অবকাঠামো, বাকি অংশ কংক্রিটে মোড়ানো সড়ক। ফাঁকা জায়গা না থাকায় যে পরিমাণ পানি উত্তোলন হয়, সে পরিমাণ রিচার্জ হয় না। ফলে পানির স্তর আরও নিচে নেমে যায়। এই কংক্রিট চুঁইয়ে বৃষ্টির পানি নিচে নামতে বাধা পায়। ফলে বন্যা বা বৃষ্টির পানি রাজধানীর ওপরিভাগ থেকে সামান্যই নিচে নামতে পারে। নগরের আশপাশের বিল ও জলাভূমি শিল্পবর্জ্য ফেলে পরিবেশকে করে তোলে আরও বিষাক্ত। ঢাকার প্রান্তীয় এলাকায় এ পানির স্তর মাত্র ২০ থেকে ২৫ মিটার নিচে থাকলেও তেজগাঁও, খিলগাঁও, বনানী, রমনা এলাকায় দ্বিতীয় স্তরের জলাধার প্রায় ৮০ মিটার নিচে নেমে গেছে।

বিশ্বব্যাপী পানির উৎস প্রতিদিনই কমছে। এ জন্য পানিসংকটের মুখে সমগ্র বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাকাশ সংস্থার (নাসা) তথ্যমতে, পৃথিবীর ভূগর্ভে পানির যত মজুত আছে তার এক-তৃতীয়াংশই মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ভূগর্ভের বাকি দুই-তৃতীয়াংশ পানির সঠিক পরিমাণ কত তা স্পষ্টভাবে জানা না থাকায় তা জানা এবং সে পানি কত সময় পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে তা বের করার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। নাসার মতে, পৃথিবীর ৩৭টি বৃহৎ পানির স্তরের মধ্যে ২১টির পানি ফুরিয়ে যাচ্ছে। এ স্তরগুলোর অবস্থান ভারত ও চীন থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের সীমানার মধ্যে। নাসা ১৩টি পানির স্তরকে আখ্যায়িত করেছে চরম সংকটাপন্ন হিসেবে, যেগুলো প্রায় শুকিয়ে গেছে। এ স্তরগুলো ব্যবহারের উপযোগী করা অর্থাৎ প্রাকৃতিক উপায়ে স্তরগুলো পানিতে পরিপূর্ণ করার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। এশিয়া ছাড়াও আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে পানির সংকট বাড়ছে ক্রমেই। বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরবসহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে পানিসংকট তীব্রতর হয়ে উঠছে। দজলা ও ফোরাত নদীর পানি নিয়ে বিবাদে জড়িয়েছে তুরস্ক, সিরিয়া, ইরান ও ইরাক। জর্ডান নদী নিয়ে লড়ছে ইসরায়েল, জর্ডান, লেবানন ও পশ্চিম তীর। আফ্রিকা মহাদেশেও রয়েছে নীল নদের পানি নিয়ে বিবাদ। গঙ্গা, তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের সংকট চলছে বহু বছর ধরে। আন্তর্জাতিক নদীসমূহের ন্যায্য পানিবণ্টনের জন্য সংগ্রাম চলছে ১৯৭৬ সাল থেকেই। জাতিসংঘ তথ্য অনুসারে আগামী ২০ বছরের কম সময়ের মধ্যে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ২০২৫ সাল নাগাদ ২/৩ অংশের মানুষের (৪৮টি দেশের ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মানুষ) বিশুদ্ধ পানি সমস্যার সম্মুখীন হবে। বিশ্বের ৭০ শতাংশ পানি ব্যবহৃত হয় কৃষিকাজে, ২২ শতাংশ ব্যবহৃত হয় শিল্প-কারখানায় এবং ৮ শতাংশ ব্যবহার হয় মিউিনিসিপ্যালটি ও নিত্য ব্যবহার্যে। সংস্থাটির গবেষণা মতে যে যে কারণে পানির অপচয় হয় বেশি-

  • মানুষ দিনে গড়ে প্রায় ১৯০ লিটার পানি খরচ করে
  • বাড়িতে মোট পানির দুই-তৃতীয়াংশ ব্যবহৃত হয় বাথরুমে
  • প্রতিবার ‘ফ্লাশ’ করলে প্রায় সাড়ে ৭ লিটার পানির অপচয় হয়
  • কল খুলে রেখে দাঁত মাজতে খরচ হয় সাড়ে ৭ লিটার
  • পুরোপুরি কল বন্ধ না করলে, পাইপ লিক থাকলে তা থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ে দিনে সাড়ে ৭ লিটার পর্যন্ত পানি নষ্ট হয়
  • হোসপাইপ দিয়ে গাড়ি ধোয়া, গাছে পানি দেওয়া, গবাদিপশু ধৌত করাসহ নানা কাজে প্রচুর পানি অপচয় হয়।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ ও পানি সম্পদের দিক দিয়ে অত্যন্ত সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও পানির স্তর নেমে যাওয়া কিছুতেই রোধ করতে পারছে না। বর্ষাকালে এখানে সারা দেশ পানিতে থইথই করে। বাংলাদেশে বার্ষিক গড় বৃষ্টির পরিমাণ প্রায় ২০৫০ মিলিমিটার। আর বর্ষাকালে অর্থাৎ জুন থেকে অক্টোবরের মধ্যে ৮০ শতাংশ বৃষ্টিপাত হয়। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, কর্ণফুলী, সুরমা, তিস্তাসহ অসংখ্য ছোট-বড় নদী ও শাখানদী দেশটিকে জালের মতো ছেয়ে রেখেছে। ছোট-বড় মিলিয়ে দেশে প্রায় ৭০০ নদ-নদী এবং অসংখ্য খাল-বিল, দিঘি-পুকুর ও হাওর-বাঁওড় ছিল, কিন্তু কমছে জলাধারের সংখ্যা। এখন দেশে নদীর সংখ্যা মাত্র ৩১০। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ৫৮টি আন্তর্জাতিক নদীর ৫৫টির উৎপত্তি হিমালয়সহ ভারতের অন্যান্য উৎস থেকে। এত নদী থাকা সত্ত্বেও পানির স্তর ক্রমেই নামছে। এর প্রধান কারণ উজানে পানি প্রত্যাহার। দেশের উজানে পদ্মা ও তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪টি নদীতে ভারত কর্তৃক বাঁধ নির্মাণসহ নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণে ভূগর্ভস্থ পানির চাহিদা বেড়েছে। নদ-নদীর পানির ধারণক্ষমতা হ্রাসও এ বিপদের জন্য দায়ী। দেশের নদীর পানি এভাবে কমে যাওয়ায় পানির উৎস আজ হুমকির সম্মুখীন। প্রমত্তা পদ্মাসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী অনেকটাই শুকিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের প্রায় ১৮ হাজার কিলোমিটার নদ-নদী বিলীন হয়ে গেছে। অনেকগুলো বিলীনের পথে।  

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকহারে নিচে নেমে যাওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ-প্রতিবেশ। বাড়ছে ভূমিকম্প ও ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রবণতা। তবে সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয়, অপরিকল্পিতভাবে পানি উত্তোলনের ফলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ঢাকাসহ উপকূলীয় এলাকার পানি লবণাক্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের ছয় কোটি মানুষ ভূগর্ভে লবণাক্ততা বৃদ্ধির হুমকিতে রয়েছেন। এ ছাড়া নানা ধরনের দুর্ঘটনারও আশঙ্কা করা হচ্ছে। যেমন-

  • পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া
  • জমির উর্বরতা কমে যাওয়া
  • কৃৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়ে খাদ্যাভাব দেখা দেওয়ার ঝুঁকি
  • ভূগর্ভের ওয়েল শুকিয়ে (wells) প্রবল হচ্ছে সিংকহোল সৃষ্টির আশঙ্কা
  • ভূপৃষ্ঠের (নদী, খাল, লেক) পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া
  • ভূপৃষ্ঠের (নদী, খাল, লেক) পানি কমে গেলে বৃষ্টিপাতও কম হবে
  • কমবে পানির স্বাভাবিক মান।

সম্প্রতি ভয়ংকর এক সমীকরণে দেশ। পানির স্তর নিচে নামার ফলে ভূগর্ভ থেকে পানির সঙ্গে উঠে আসছে আর্সেনিক, ব্যাকটেরিয়াসহ ক্ষতিকর ভারী ধাতু ও দূষিত পদার্থ। এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ পরিচালিত ওয়াটার কোয়ালিটি টেস্টিং ল্যাবরেটরির (ডব্লিউকিউটিএল) এক গবেষণায় বলছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ নলকূপের পানিতে ব্যাকটেরিয়া ছাড়াও ম্যাঙ্গানিজ নামের  ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। মলমূত্রের কলিফর্মও মিলেছে অনেক স্থানে বিশেষ করে অগভীর নলকূপে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ভারী ধাতু স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এতে পানিবাহিত রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। এ ছাড়া এই পানি পানে ও ব্যবহারে হেপাটাইটিস, টাইফয়েড, ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, জন্ডিসের মতো নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, এ রকম দূষিত পানি দীর্ঘদিন পান করতে থাকলে ক্যানসার, কিডনি রোগ, আলসার, রক্তচাপ, অ্যাজমা, যক্ষ্মা ইত্যাদি রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা ভূগর্ভস্থ পানিতে ব্যাপক আর্সেনিকদূষণ।

প্রকৃতি ও পরিবেশের কথা না ভেবে অপরিকল্পিত চাষাবাদ, বন উজাড় করা, পাহাড়-টিলা কেটে ও সমতল ভূমি ভরাট ব্যাপক নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট করে অট্টালিকা, কলকারখানা, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের ফলে ভবিষ্যতে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছি আমরা, যেখানে থাকবে স্বাদু পানির জন্য শুধুই হাহাকার। সিঙ্গাপুর, মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে পানির যে হাহাকার এবং ব্যবহারযোগ্য পানি পেতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয় তা যদি আমাদের ব্যয় করতে হয়, তা হবে আমাদেও জন্য অত্যন্ত অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ। এ জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো এখন সময়ের দাবি। পানিসংকট মোকাবিলায় সরকার, নীতিনির্ধারক, ব্যবহারকারীকে সচেতন হবে হবে, নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ।

সুপারিশমালা

  • ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো এবং ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়াতে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়ন।
  • নদী, খাল ও অন্যান্য জলাধার খনন করে পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক গতিধারা ফিরিয়ে আনা এবং পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।
  • এ দেশের এখনো যেসব নদ-নদী, খাল, বিল, পুকুর, দিঘি রয়েছে তা সংরক্ষণ করা এবং দখলকৃত জলাধারসমূহ দখলমুক্ত করা।
  • বিশুদ্ধ পানির উৎসসমূহ (নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়) ভরাট বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
  • নদীতে অপ্রয়োজনীয় ও অসাঞ্জস্যপূর্ণ বাঁধ, সেতু, কালভার্ট ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ করে পানির অপসারণ রোধ এবং সাগরে নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে অক্ষুণ্ন রাখা।
  • দেশের ভেতরের আন্তর্জাতিক নদীর পানির পানির ন্যায্য হিস্যা বুঝে পেতে সব ধরনের কূটনীতিক তৎপরতা চালানো।  
  • ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ভবন নির্মাণ নীতিমালার যেন সঠিক প্রয়োগ হয় তা বাস্তবায়ন করা। বিশেষ করে ৩০ শতাংশ স্থান উন্মুক্ত রাখা।
  • শিল্প-কারখানার দূষিত বর্জ্য, পয়োবর্জ্য ও অন্যান্য আবর্জনা নদী বা জলাশয়ে ফেলা বন্ধ করা এবং ফেললেও সঠিক পরিশোধন করে ফেলানো।
  • নদী দূষণকারী ও দখলদারদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ ও জরিমানা আদায় করা।
  • বর্ষা মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে পুকুরে এবং শহরে বাড়ির ছাদে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা।
  • বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে (রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং) দেশে জাতীয়ভাবে কোনো বিল্ডিং কোড নেই। তাই গুরুত্বপূর্ণ এই পানি সংরক্ষণে প্রয়োজন আইনগত কাঠামো, নীতিমালা, কৌশল ও নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন।
  • ভূগর্ভের স্তর স্বাভাবিক রাখতে ব্যক্তিগত নলকূপ স্থাপনে নিরুৎসাহিত করা এবং লাইসেন্সের নেওয়া বাধ্যতামূলক করা।
  • কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১৭-এর খসড়ায় অনুযায়ী উপজেলা পরিষদের লাইসেন্স ছাড়া কোনো নলকূপ স্থাপন করা যাবে না। আবেদনের ভিত্তিতে উপজেলা কমিটি অনুসন্ধান করে নলকূপ বসানের লাইসেন্স দেবে। সে ক্ষেত্রে উপজেলা কমিটি যেখানে নলকূল স্থাপন করা হবে, সেখানকার ভূগর্ভে সঞ্চিত পানির অবস্থা এবং নিকটবর্তী নলকূপের দূরত্বসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে অনুসন্ধান করবে। যেকোনো ধরনের নলকূপের দূরত্ব বিবেচনা করে লাইসেন্স দিতে হবে। এ জন্য নতুন আইন জরুরি ভিত্তিতে পাস প্রয়োজন।
  • ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে ১৯৮৬ সালে জারি করা অধ্যাদেশ পুনরায় বাস্তবায়ন করা এবং ১৯৯২ সালের প্রজ্ঞাপন স্থগিত করা।
  • ১৯৮৬ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী একটি গভীর নলকূপ থেকে আরেকটি গভীর নলকূপ স্থাপন করতে হবে ২ হাজার ৫০০ ফুট দূরত্বে; কিন্তু সরকারের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) এক অসমর্থিত প্রতিবেদনে যা কমিয়ে করা হয় ১ হাজার ২০০ ফুট। আর তাই পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রাখতে নীতিমালা সংশোধন করা।
  • পানি ব্যবহারে সংযমী হতে জনসাধারণকে উৎসাহী করা। সে লক্ষ্যে শাওয়ারের পরিবর্তে গোসল করতে বালতি ব্যবহার, কল খুলে শাকসবজি না ধুয়ে পাত্রে পানি দিয়ে ধোয়া, গাড়ি ধোঁয়া বা গাছে পানি দিতে হোসপাইপ ব্যবহার না করা, ত্রুটিযুক্ত পুরোনো কল ও প্লাম্বিং লাইন বদলে নতুন লাইন স্থাপন করাসহ নানাভাবে পানির অপচয় রোধ করা।
  • পানির অপচয় রোধে পানির পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা।
  • সীমিত পানি, উন্নত প্রযুক্তি ও চাষ পদ্ধতি ব্যবহার করে ফসল ফলানোর বিষয়ে কৃষকদের উৎসাহী করা। সে লক্ষ্যে হাইড্রোপনিক ও গ্রিন হাউস প্রযুক্তির মতো উন্নত চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষিত করে তোলা এবং সে পদ্ধতিতে চাষ করতে বাধ্য করা।
  • নদীদূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৫তম সংখ্যা, মে ২০১৭।

প্রকৌশলী সুবীর কুমার সাহা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top