…পূর্ব প্রকাশের পর
ইট ছাড়া অন্যান্য মালমাল যেমন- কাঠ, বোর্ড, গ্লাস, অ্যালুমিনিয়াম ইত্যাদি ব্যবহারে পার্টিশন ওয়াল তৈরি করার জন্য আলাদা আলাদাভাবে নকশা ও স্পেসিফিকেশন তৈরি করতে হয়। মনে রাখা দরকার, উল্লেখিত প্রতিটি মালামাল ব্যবহার করার জন্য কাজের পদ্ধতি ও মিস্ত্রি আলাদা। এ ছাড়া, পার্টিশন ওয়ালের নকশা কী হবে এবং কী মালামাল ব্যবহার করা হবে, তা সাধারণত মালিক কিংবা ব্যবহারকারীর চাহিদা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। ফলে, প্রয়োজনীয় নকশা প্রণয়ন এবং ব্যবহৃতব্য মালামাল নির্বাচন করার বিষয়টি প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কাঠের পার্টিশন ওয়াল তৈরি করার জন্য বিভিন্ন ধরনের কাঠ ব্যবহার করা যেতে পারে। অত্র বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নকশা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। যেমন- সলিড কাঠের ব্যবহার (কারুকার্যখচিত কিংবা প্লেইন), প্লেইন বোর্ডের ব্যবহার, সলিড কাঠের ফ্রেম তৈরি করে তার সঙ্গে বোর্ড কিংবা গ্লাসের ব্যবহার ইত্যাদি। এসব মালামালের কোনটি বাস্তব কাজে ব্যবহার করা হবে, তা বাস্তবায়নকারীর রুচি এবং আর্থিক সংগতির ওপর নির্ভরশীল। তবে মনে রাখা দরকার, কাঠের পার্টিশন ওয়াল দৃষ্টিনন্দন এবং আভিজাত্যের প্রতীক। ফলে এর নির্মাণব্যয়ও তুলনামূলকভাবে বেশি।
পাশাপাশি এটাও জানা থাকা প্রয়োজন যে সলিড কাঠ কিংবা কাঠের বোর্ড উভয়েরই রয়েছে নানা প্রকারভেদ এবং এই প্রকারভেদ অনুযায়ী আছে দামের পার্থক্য ও দৃষ্টিনান্দনিকতা। অতএব, ব্যবহারকারী তাঁর নিজের রুচি বা চাহিদা অনুসারে বোর্ড বা কাঠ নির্বাচন করতে পারে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নানা ধরনের বোর্ড কিংবা সলিড কাঠের মধ্যে সেগুন কাঠই অন্য সব কাঠের তুলনায় দৃষ্টিনন্দন, টেকসই ও দামি। এ ছাড়া কাঠের ব্যাপারে আরও একটি বিষয় সম্পর্কে জানা থাকা জরুরি যে আমাদের দেশে বিভিন্ন এলাকায় কম-বেশি কিছু কাঠ উৎপন্ন হয়। কিন্তু সব এলাকার কাঠের গুণগত মান এক নয়। ফলে, উৎপত্তিস্থল অনুসারে কাঠের গুণগত মান ও দামের তারতম্য ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, পার্বত্য অঞ্চলের কাঠের মান সব থেকে ভালো এবং তদ্নুযায়ী দামও বেশি।
এ অবস্থায়, যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সলিড কাঠের প্রকারভেদ ও গুণগত মান যাচাই করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের ওপর যথার্থ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকবল নিয়োগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ ছাড়া, কাঠের কাজ কারুকার্যখচিত কিংবা সাদামাটা যা-ই হোক না কেন, ব্যবহৃতব্য কাঠের অপচয় রোধ তথা সার্বিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণকল্পে মালামাল কেনার আগে প্রণীত নকশা বুঝে নেওয়া এবং তদ্নুযায়ী প্রয়োজনীয় মালামালের পরিমাণ সঠিকভাবে নিরূপণ করার জন্য অভিজ্ঞ কোনো মিস্ত্রি কিংবা প্রকৌশলীর পরামর্শ নেওয়া এবং সে মোতাবেক কাজ করা জরুরি।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে যেকোনো কাজের সার্বিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণকল্পে মালামালের পাশাপাশি লেবার খরচ নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অতএব কাঠের কাজ যদি কারুকার্যখচিত হয়, সে ক্ষেত্রে মিস্ত্রি খরচের হিসাবটি নিরূপণ করা একটু কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ফলে, প্রণীত নকশা অনুযায়ী কাজ সম্পাদন করার জন্য মিস্ত্রি বাবদ খরচের হিসাবগুলো সাধারণত চুক্তিভিত্তিক কিংবা বাস্তব কাজের ওপর ভিত্তি করে ডেইলি হাজিরার ভিত্তিতে করা হয়ে থাকে। সুতরাং, কাজের প্রারম্ভেই মিস্ত্রির সঙ্গে কথা বলে লেবার খরচের বিষয়টি চূড়ান্ত করে কাজ করা ভালো।
সলিড কাঠ দিয়ে পার্টিশন ওয়াল তৈরি করার ক্ষেত্রে কী কাঠ ব্যবহার করা হবে সে ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে আগেই বলা হয়েছে। তাই কাঠের প্রকারভেদ, কৃত কাজের দৃষ্টিনান্দনিকতা, দামের তারতম্য ইত্যাদি বিষয় মাথায় রেখে এসব কাজে ব্যবহৃতব্য বিভিন্ন প্রকার কাঠের গুণগত মান এবং দামের ঊর্ধ্বক্রম অনুসারে আমাদের দেশে প্রাপ্য গাছসমূহ হলো; সেগুন, টিক চাম্বল, তেলসু/টেলসু, চাপালিশ, গামারি, গর্জন ইত্যাদি।
পুনশ্চ, একটি প্রকল্প বাস্তবায়নকল্পে প্রয়োজনীয় কাঠসমূহ নকশা মোতাবেক নির্ধারিত সাইজ অনুযায়ী স মিল থেকে কেটে এনে সেগুলোকে পুনরায় কারুকার্য অনুসারে চাঁচা-ছিলা করার পর নির্দিষ্ট কাজে লাগানো হয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে কাঠ বেশ মূল্যবান নির্মাণসামগ্রী। ফলে, সাইজড কাঠের পরিমাপ ও পরিমাণ সঠিকভাবে নির্ণয় করার বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে সম্যক জ্ঞান না থাকলে কাঠের পরিমাণ বুঝে নেওয়া বেশ কঠিন বিষয় বৈ কি! প্রসঙ্গত, সব সলিড কাঠের মূল্যমান সাধারণত ঘনফুটে নির্ণয় করা হয় এবং প্রয়োজনীয় কাঠের পরিমাণ নির্ণয় করার জন্য একটি সাইজড কাঠের ছেদন ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফলকে মোট দৈর্ঘ্য দিয়ে গুণ করলে ঘনফুট পাওয়া যায়।
ধরা যাক,
একটি সাইজড্ কাঠের ছেদন ক্ষেত্রের মাপ ১” x ৬” অর্থাৎ একদিকের মাপ ১” (ইঞ্চি), অন্য দিকের মাপ ৬” (ইঞ্চি) এবং এই কাঠটির দৈর্ঘ ৭’ (ফুট)।
অতএব,
এমন একটি কাঠের পরিমাণ হবে;
১” /১২ x ৬” /১২ x ৭’ = ০.২৯২ ঘনফুট (প্রায়)
(১২ ইঞ্চি = ১ ফুট)
আবার,
অন্য একটি কাঠের ছেদন ক্ষেত্রের মাপ ৩” x ১.৫” অর্থাৎ একদিকের মাপ ৩” (ইঞ্চি), অন্য দিকের মাপ ১.৫” (ইঞ্চি) এবং এই কাঠটির দৈর্ঘ্য ৫’ (ফুট)।
অতএব,
এমন একটি কাঠের পরিমাণ হবে;
৩” /১২ x ১.৫” /১২ x ৫’= ০.১৫৬ ঘনফুট (প্রায়)
(১২ ইঞ্চি = ১ ফুট)
এভাবে প্রতিটি কাঠের মাপ অনুযায়ী আলাদাভাবে পরিমাণ বের করে একসঙ্গে যোগ করলে সর্বমোট পরিমাণ পাওয়া যায়। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে যেকোনো সাইজড কাঠের অর্ডার দেওয়ার সময় মিস্ত্রি কিংবা প্রকৌশলী কর্তৃক নির্দেশিত ছেদন ক্ষেত্রের উভয় দিকের মাপ থেকে ১/৮” মাপ বেশি দিতে হয়, যা কাঠের মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে হিসাবে এলেও বাস্তবে কাঠের মাপে তা পাওয়া যায় না। এটাকে সিসটেম লস হিসেবে ধরে নিতে হয়। অর্থাৎ এই ১/৮” পরিমাণ বেশি কাঠের মাপ অনুযায়ী কাঠের দাম দিতে হয়।
সর্বোপরি, সলিড কাঠের কাজের ব্যাপারে আর একটি বিশেষ বিষয়ে লক্ষ রাখা দরকার। তা হলো, যেকোনো কাঠ কাজে লাগানোর আগে ভালোমতো শুকিয়ে নেওয়া (সিজন্ড করা) জরুরি। কাঁচা বা ভেজা কাঠ কোনো অবস্থায় কাজে ব্যবহার করা উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে, কাঠ সাইজড করার পর তা প্রাকৃতিকভাবে ঠিকমতো শুকিয়ে নিতে হয় অথবা কৃত্রিম উপায়ে সিজন্ড করতে হয়। এ ব্যাপারে কোনো প্রকার শিথিলতা দেখানো উচিত নয়। অন্যথায় কাজ করার পর বিভিন্ন প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া সাইজ্ড কাঠ কেনার সময় সার-অসার (পুষ্ট-অপুষ্ট) দেখে নেওয়ার একটা বিষয় আছে, যা বিবেচনায় না নিলে পরবর্তীতে কাঠে ঘুণ ধরে সবকিছু নষ্ট করে দিতে পারে। সুতরাং কাঠের কাজ সুন্দর ও টেকসই করার জন্য উল্লেখিত বিষয়গুলোর ওপর সতর্ক থাকা অপরিহার্য।
সলিঠ কাঠ ছাড়াও পার্টিশন ওয়াল তৈরির জন্য নানা ধরনের বোর্ডের প্রচলন আছে, যেমন- প্লেইন পারটেক্স বোর্ড, কমার্শিয়াল বোর্ড, মেলামাইন বোর্ড, ভিনিয়ার্ড পারটেক্স বোর্ড, হার্ড বোর্ড, প্লাই উড, প্লাস্টিক উড ইত্যাদি। এসব বোর্ডের আবার আছে নানা প্রকারভেদ। উদাহরণস্বরূপ, ভিনিয়ার্ড পারটেক্স বোর্ডের ক্ষেত্রে- সেগুন ভিনিয়ার্ড, চাপালিশ ভিনিয়ার্ড, গর্জন ভিনিয়ার্ড ইত্যাদি। প্লাইউডের ক্ষেত্রেÑ সেগুন প্লাই, চাপালিশ প্লাই, গর্জন প্লাই ইত্যাদি। তদ্রুপভাবে, মেলামাইন বোর্ডের ক্ষেত্রেও আছে নানা ধরনের রং ও টেক্সার। এ ছাড়া প্রতিটি বোর্ডের ক্ষেত্রে আছে পুরুত্ব ও দামের পার্থক্য।
বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন বোর্ডের প্রকারভেদ অনুসারে এর পুরুত্ব ও সাইজের তালিকা:
সর্বশেষে, ইট, কাঠ ছাড়াও পার্টিশন ওয়াল তৈরি করতে গ্লাস কিংবা অ্যালুমিনিয়াম সেকশনও বহুল প্রচলিত। এসব ক্ষেত্রে শুধু গ্লাস, শুধু অ্যালুমিনিয়াম সেকশন কিংবা অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেমের সঙ্গে গ্লাস বা করুগেটেট অ্যালুমিনিয়াম শিট ব্যবহার করেও বিভিন্নভাবে পার্টিশনওয়াল তৈরি করা হয়ে থাকে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নকশা অনুযায়ী আলাদা আলাদাভাবে মালামালের এবং মিস্ত্রির খরচের হিসাব বের করতে হয়। মালামাল ও মিস্ত্রি উভয়ক্ষেত্রেই প্রতি ‘এসএফটি’ দর হিসাবে মোট খরচের একটি হিসাব বের করা হয়। গ্লাস পার্টিশন ওয়াল তৈরির ক্ষেত্রে গ্লাসের পুরুত্বের পার্থক্য আছে, আছে তদ্নুযায়ী দামের পার্থক্যও। এসব বিষয় বিবেচনা করেই বাস্তব কাজের পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
চলবে….
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৪তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৭।